জিনসেং গাছ

জিনসেং: গবেষণা, উপকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ব্যবহার ও চেনার উপায়

প্রাচীনকাল থেকেই মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভেষজ চিকিৎসার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে একটি নাম জিনসেং (Ginseng)। একে অনেকে ‘মুকুটহীন সম্রাট’ বা ‘অলৌকিক মূল’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু লোককথার বাইরে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান জিনসেং সম্পর্কে কী বলছে? এটি কি সত্যিই পুরুষের যৌন স্বাস্থ্যের সমাধান, নাকি কেবলই প্লাসিবো? নারীদের হরমোনাল বা হাড়ের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা কতটুকু? এবং বাজারে প্রাপ্ত অসংখ্য ভেজাল পণ্যের ভিড়ে আপনি কীভাবে বেস্ট জিনসেং চিনবেন?

Table of Contents

এই আর্টিকেলে আমরা কোনো ভাসা ভাসা তথ্য দেব না। এখানে বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মাকোলজি এবং ক্লিনিক্যাল রিসার্চের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জিনসেং-এর রাসায়নিক গঠন, কার্যকারিতা, সিরাপ বনাম ট্যাবলেটের বিশ্লেষণ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে।

জিনসেং কী? 

জিনসেং মূলত Araliaceae পরিবারের Panax গণের একটি উদ্ভিদ। ‘Panax’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘Panacea’ থেকে, যার অর্থ “সর্ব রোগের মহৌষধ”। জিনসেং বলতে মূলত এই উদ্ভিদের মাংসল মূল (Root)-কে বোঝানো হয়।

রাসায়নিক গঠন (The Chemistry Behind It)

জিনসেং-এর ঔষধি গুণের পেছনের প্রধান কারিগর হলো এক ধরনের বিশেষ বায়ো-অ্যাক্টিভ যৌগ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় জিনসেনোসাইড (Ginsenosides) বা প্যানাক্সোসাইড।
গবেষণায় দেখা গেছে, জিনসেনোসাইডগুলোর গঠন স্টেরয়েড হরমোনের মতো। এটি মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (CNS), কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম এবং হরমোনাল গ্ল্যান্ডগুলোর রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে।
এছাড়া এতে রয়েছে:

  • পলিস্যাকারাইড (Polysaccharides): যা ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

  • পেপটাইড এবং পলিঅ্যাসিটাইলিন: যা কোষে শক্তি উৎপাদন এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

জিনসেং এর প্রধান প্রকারভেদ

বাজারে বিভিন্ন নামের জিনসেং পাওয়া যায়, কিন্তু রাসায়নিক গঠন এবং ‘তাপীয় প্রকৃতি’ (Thermal Nature) অনুযায়ী এদের প্রভাব ভিন্ন।

এশিয়ান বা কোরিয়ান জিনসেং (Panax ginseng)

একে বলা হয় “গরম” বা উদ্দীপক জিনসেং। এটি মূলত চীন এবং কোরিয়াতে জন্মায়। মানসিক এবং শারীরিক শক্তি বৃদ্ধিতে এবং ইরেক্টাইল ডিসফাংশন (ED) চিকিৎসায় এটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। বিশেষত, কোরিয়ান রেড জিনসেং (Korean Red Ginseng) প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে এতে জিনসেনোসাইডের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে।

আমেরিকান জিনসেং (Panax quinquefolius)

এটি প্রকৃতিতে “ঠান্ডা”। এটি মূলত উত্তর আমেরিকায় জন্মে। এটি শরীরকে রিলাক্স করতে এবং ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশি কার্যকরী।

সাইবেরিয়ান জিনসেং (Eleutherococcus senticosus) 

জেনে রাখা জরুরি, এটি প্রকৃত জিনসেং বা প্যানাক্স গোত্রের উদ্ভিদ নয়। যদিও এটিও একটি অ্যাডাপটোজেন, তবুও প্যানাক্স জিনসেং-এর মতো শক্তিশালী যৌগ এতে নেই।

আধুনিক মেডিকেল সায়েন্স ও জিনসেং রিসার্চ

আধুনিক বিজ্ঞান জিনসেংকে একটি অ্যাডাপটোজেন (Adaptogen) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অ্যাডাপটোজেন হলো এমন প্রাকৃতিক উপাদান যা শরীরকে বিভিন্ন ধরনের চাপ বা স্ট্রেস (শারীরিক, মানসিক ও পরিবেশগত) এর সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

গবেষণালব্ধ তথ্যাবলি:

  • অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহনাশক: Journal of Translational Medicine-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, জিনসেনোসাইড মানবদেহে সাইটোকাইন বা প্রদাহ সৃষ্টিকারী প্রোটিনগুলোর মাত্রা কমিয়ে আনে।

  • কগনিটিভ ফাংশন: গবেষণায় দেখা গেছে, জিনসেং মস্তিষ্কের কোষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে আলঝেইমার্স (Alzheimer’s) বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে।

  • ক্যান্সার প্রতিরোধে: Cochrane রিভিউ এবং মেটা-এনালাইসিস ইঙ্গিত দেয় যে, জিনসেনোসাইড টিউমার সেলের বৃদ্ধি এবং ছড়িয়ে পড়া (Metastasis) রোধ করতে পারে, বিশেষ করে কোলন ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের ক্ষেত্রে। তবে এটি ক্যান্সারের ঔষধ নয়, বরং প্রতিরোধক সাপ্লিমেন্ট হিসেবে বিবেচ্য।

পুরুষদের জন্য জিনসেং-এর বিশেষ উপকারিতা

জিনসেং পুরুষদের স্বাস্থ্য, বিশেষ করে প্রজনন স্বাস্থ্য এবং সেক্সুয়াল ফাংশনের উন্নতির জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এর কার্যকারিতা নিচে সিনট্যাকটিক লজিক (Mechanism -> Effect) অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা হলো।

ইরেক্টাইল ডিসফাংশন (Erectile Dysfunction – ED) নিরাময়ে

পুরুষদের লিঙ্গোত্থানবা ইরেকশনের জন্য শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড (Nitric Oxide – NO) উৎপাদন জরুরি। জিনসেং এর কার্যপদ্ধতি নিম্নরূপ:

  1. মেকানিজম: জিনসেং-এর উপাদান রক্তনালীর এনডার্থেলিয়াল কোষগুলোতে নাইট্রিক অক্সাইড সিন্থেসিস বাড়িয়ে দেয়।

  2. প্রসেস: এই নাইট্রিক অক্সাইড পুরুষাঙ্গের করপাস ক্যাভারনোসাম (Corpus Cavernosum) পেশীকে শিথিল করে এবং রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দেয়।

  3. ফলাফল: পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী এবং শক্ত ইরেকশন বা লিঙ্গোত্থান ঘটে। British Journal of Clinical Pharmacology-তে প্রকাশিত এক রিভিউ অনুযায়ী, ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের চিকিৎসায় প্লাসিবোর তুলনায় রেড জিনসেং ৬০% বেশি কার্যকর।

টেস্টোস্টেরন হরমোন বৃদ্ধি এবং শুক্রাণুর মান উন্নয়ন

বয়স বাড়ার সাথে সাথে বা অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে পুরুষদের টেস্টোস্টেরন কমে যায়। জিনসেং পিটুইটারি গ্ল্যান্ড এবং অন্ডকোষের লেডিগ কোষকে (Leydig Cells) উদ্দীপিত করে টেস্টোস্টেরন উৎপাদনে সাহায্য করে।

  • স্পার্ম কাউন্ট ও মোটিলিটি: গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্যানাক্স জিনসেং সেবনে শুক্রাণুর ঘনত্ব এবং সচলতা (Motility) বৃদ্ধি পায়, যা পুরুষদের বন্ধ্যত্ব দূর করতে সহায়ক।

স্ট্যামিনা ও এনার্জি বুস্টিং

শারীরিক মিলনের সময় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়া বা দৈনন্দিন কাজে অলসতা—এই সমস্যার সমাধানে জিনসেং অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এটি কোষে এটিপি (ATP) বা এনার্জি উৎপাদন বাড়ায় এবং ল্যাকটিক এসিড জমা হওয়া রোধ করে। ফলে পেশীর ক্লান্তি (Muscular Fatigue) দূর হয়।

নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য জিনসেং 

অনেকে মনে করেন জিনসেং শুধু পুরুষদের জন্য। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। নারীদের জন্যও এটি অত্যন্ত উপকারী।

মেনোপজকালীন উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ

নারীদের ৪০-৪৫ বছরের পর মেনোপজ শুরু হলে শরীরে ইস্ট্রোজেন কমে যায়। এর ফলে হট ফ্ল্যাশ (Hot flashes), মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়।

  • কার্যকারিতা: কোরিয়ান রেড জিনসেং হরমোনাল ভারসাম্য রক্ষা করে এবং হট ফ্ল্যাশের তীব্রতা কমায়।

মাসিকের ব্যথা (Dysmenorrhea) এবং হরমোনাল ভারসাম্য

জিনসেং-এর অ্যাডাপটোজেনিক বৈশিষ্ট্য কর্টিসল হরমোন (Stress Hormone) নিয়ন্ত্রণ করে। এটি মাসিকের সময় জরায়ুর পেশী সংকোচন জনিত ব্যথা এবং মানসিক অবসাদ (PMS) কমাতে সাহায্য করে।

অ্যান্টি-এজিং এবং ত্বকের যত্ন

নারীদের সৌন্দর্য সচেতনতায় জিনসেং এক জাদুকরী উপাদান। জিনসেং মূল রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং ত্বকে কোলাজেন সংশ্লেষণ বৃদ্ধি করে।

  • ফলাফল: ত্বকের বলিলেখা দূর হয়, ত্বক টানটান থাকে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে। এটি ফ্রি-রেডিক্যাল ড্যামেজ কমিয়ে ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে।

ব্যবহার বিধি: জিনসেং ট্যাবলেট নাকি সিরাপ? 

বাজারে জিনসেং মূলত দুইটি ফর্মে বেশি পাওয়া যায়: ট্যাবলেট/ক্যাপসুল এবং সিরাপ। কোনটি আপনার জন্য সেরা? নিচে এদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বা Comparative Analysis তুলে ধরা হলো।

প্যারামিটার জিনসেং ট্যাবলেট/ক্যাপসুল জিনসেং সিরাপ
সক্রিয় উপাদান (Purity) সাধারণত স্ট্যান্ডার্ডাইজড এক্সট্রাক্ট থাকে। এতে জিনসেনোসাইড-এর পরিমাণ (যেমন ৪% বা ৮%) নির্দিষ্ট থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই জিনসেং-এর পরিমাণ কম থাকে, ফ্লেভার এবং চিনি বেশি থাকে।
শোষণের হার (Absorption) শোষিত হতে কিছুটা সময় নেয় (৩০-৬০ মিনিট), কারণ ক্যাপসুলটি পাকস্থলীতে গলতে হয়। লিকুইড হওয়ার কারণে এটি দ্রুত শোষিত হয় এবং দ্রুত অ্যাকশন শুরু করে।
সুগার কন্টেন্ট এতে সাধারণত কোনো সুগার থাকে না। এটি ক্যালোরি ফ্রি স্বাদ বাড়ানোর জন্য এতে প্রচুর পরিমাণে চিনি বা ফ্রুক্টোজ সিরাপ যোগ করা হয়।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ এবং সুপারিশকৃত। এটি ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত চিনি ইনসুলিন স্পাইক ঘটাতে পারে।
ডোজের সঠিকতা প্রতিটি ক্যাপসুলে সমান ডোজ নিশ্চিত করা থাকে। চামচ দিয়ে পরিমাপ করার সময় ডোজে কমবেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সংরক্ষণ (Stability) আর্দ্রতা বা তাপে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কম। দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ করা যায়। বোতল খোলার পর দ্রুত নষ্ট হতে পারে বা অক্সিডাইজড হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ রায় (Verdict):

  • যদি আপনি দীর্ঘমেয়াদী উপকারের জন্য (যেমন হরমোন ব্যালেন্স বা যৌন শক্তি বৃদ্ধি) জিনসেং নিতে চান এবং ডায়াবেটিস বা ক্যালোরি নিয়ে সচেতন হন, তবে ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল (Standardized Extract) হলো সেরা বিকল্প।

  • যদি আপনার তাৎক্ষণিক এনার্জি প্রয়োজন হয় এবং আপনার সুগার লেভেল নিয়ে কোনো সমস্যা না থাকে, তবে সিরাপ বেছে নিতে পারেন। তবে অধিকাংশ চিকিৎসকরা ট্যাবলেটের পক্ষপাতী কারণ এতে ডোজ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।

সঠিক ডোজ এবং সেবন বিধি

জিনসেং একটি শক্তিশালী ভেষজ, তাই এটি “যত বেশি তত ভালো” নিয়মে কাজ করে না। অতিরিক্ত ডোজ উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সুপারিশকৃত ডোজ

  • সাধারণ সুস্থতার জন্য: ২০০ – ৪০০ মি.গ্রা. প্যানাক্স জিনসেং এক্সট্রাক্ট (দিনে১-২ বার)। 

  • ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা বিশেষ প্রয়োজনে: ৯০০ মি.গ্রা. থেকে ১০০০ মি.গ্রা. পর্যন্ত নেওয়া যেতে পারে (বিভক্ত মাত্রায়)।

  • সিরাপের ক্ষেত্রে: ১-২ চা চামচ (প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী)।

সেবনের নিয়ম

  • সকালে নাস্তার পরে বা দুপুরের খাবারের পরে খাওয়া সবচাইতে উত্তম।

  • রাতে ঘুমানোর আগে জিনসেং না খাওয়াই ভালো, কারণ এর উদ্দীপক প্রভাবের কারণে অনিদ্রা (Insomnia) হতে পারে।

  • এটি টানা ৩ মাস খাওয়ার পর অন্তত ২-৩ সপ্তাহের বিরতি দেওয়া উচিত, যাতে শরীর এর প্রতি রেজিস্ট্যান্স তৈরি না করে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সতর্কতা (Safety Profile)

যদিও জিনসেং একটি প্রাকৃতিক উপাদান, তবুও এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা Side Effects এবং ঔষধের সাথে প্রতিক্রিয়া (Drug Interaction) হতে পারে।

সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

  • অনিদ্রা বা ঘুমে ব্যাঘাত (সবচেয়ে সাধারণ)।

  • মাথাব্যথা এবং মাথা ঘোরা।

  • পেটে অস্বস্তি বা ডায়রিয়া (অতিরিক্ত সেবনে)।

  • রক্তচাপ বৃদ্ধি বা হ্রাস (জিনসেং রক্তচাপের ওপর দ্বিমুখী প্রভাব ফেলতে পারে)।

যাদের জিনসেং খাওয়া একদমই উচিত নয়

১. অটোইমিউন রোগী: লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস-এর রোগীরা জিনসেং এড়িয়ে চলবেন। কারণ জিনসেং ইমিউন সিস্টেমকে আরও সক্রিয় করে রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
২. গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী: জিনসেনোসাইড ভ্রূণের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে, তাই গর্ভাবস্থায় এটি নিরাপদ নয়।
৩. অস্ত্রোপচারের রোগী: যেহেতু জিনসেং রক্ত পাতলা করতে পারে (Blood thinning property), তাই যেকোনো সার্জারির অন্তত ৭ দিন আগে এটি বন্ধ করা উচিত।

ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন (সতর্কতা)

আপনি যদি নিচের ঔষধগুলো সেবন করেন, তবে জিনসেং খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন:

  • রক্ত তরলীকরণের ঔষধ (যেমন Warfarin): জিনসেং এই ঔষধের কার্যকারিতা কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা রক্তক্ষরণ বা জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়।

  • ডায়াবেটিসের ঔষধ (Insulin বা Metformin): জিনসেং নিজেও ব্লাড সুগার কমায়। তাই ঔষধের সাথে জিনসেং নিলে সুগার লেভেল অতিরিক্ত কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।

  • MAOIs (অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট): মানসিক অবসাদের ঔষধের সাথে জিনসেং তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

বেস্ট জিনসেং চেনার উপায় (Quality Identification Guide)

বাজারে অসংখ্য ভেজাল এবং নিম্নমানের জিনসেং প্রোডাক্ট রয়েছে। সেরা ফলাফল পেতে অরিজিনাল এবং উচ্চমানের জিনসেং চেনা জরুরি। কেনার আগে নিচের চেকলিস্টটি মিলিয়ে নিন:

মূলের বয়স (Age of Root)

সেরা জিনসেং হলো সেটি, যা ৬ বছর বয়সে সংগ্রহ করা হয়েছে।

  • কেন? জিনসেং-এর মূলে পর্যাপ্ত পরিমাণে জিনসেনোসাইড তৈরি হতে পূর্ণ ৬ বছর সময় লাগে। এর চেয়ে কম বয়সের মূলে কার্যকারিতা অত্যন্ত কম থাকে। পণ্যের প্যাকেটে “6 Years Grown” লেবেলটি চেক করুন।

প্রসেসিং মেথড: রেড বনাম হোয়াইট

  • রেড জিনসেং (Red Ginseng): ৬ বছরের পুরনো মূলকে খোসাসহ স্টিম (Steam) করা হয়। এতে জিনসেনোসাইডের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং শোষণ ক্ষমতা (Bioavailability) বাড়ে। এটিই স্বাস্থ্যের জন্য বেস্ট চয়েস

  • হোয়াইট জিনসেং: এটি কেবল শুকানো মূল, খোসা ছাড়ানো। এতে রেড জিনসেং-এর চেয়ে কম পুষ্টিগুণ থাকে।

জিনসেনোসাইড কন্টেন্ট (Ginsenoside Content)

একটি ভালো মানের সাপ্লিমেন্টে জিনসেনোসাইড (বিশেষত Rb1 এবং Rg1) এর পরিমাণ উল্লেখ থাকে।

  • সাপ্লিমেন্ট ফ্যাক্টস লেবেলে দেখুন: “Standardized to contain 4% to 7% Ginsenosides”। এর কম হলে কার্যকারিতা পাওয়া কঠিন।

ব্র্যান্ড ও সার্টিফিকেশন

কেনার সময় দেখুন পণ্যটি GMP (Good Manufacturing Practice) সার্টিফাইড কিনা। কোরিয়ান ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে কোরিয়া সরকারের কোয়ালিটি সিল বা সার্টিফিকেশন চেক করুন।

স্বাদ ও গঠন

আসল জিনসেং-এর নির্যাস বা মূলের স্বাদ হয় তীব্র তেঁতো এবং কিছুটা মাটির মতো গন্ধযুক্ত। যদি আপনার জিনসেং পণ্যটি খুব বেশি মিষ্টি বা সুস্বাদু হয়, তবে বুঝবেন এতে আসল উপাদানের চেয়ে চিনি এবং ফ্লেভারই বেশি।

উপসংহার

জিনসেং কেবল একটি ভেষজ নয়, এটি প্রকৃতির এক অনন্য শক্তি বর্ধক উপহার। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, শারীরিক দুর্বলতা কাটানো থেকে শুরু করে পুরুষদের যৌন অক্ষমতা দূরীকরণ, এবং নারীদের হরমোনাল সুস্বাস্থ্য রক্ষায় জিনসেং কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয় যা রাতারাতি সব সমস্যা দূর করবে। সেরা ফলাফলের জন্য:
১. ৬ বছরের পুরনো কোরিয়ান রেড জিনসেং বেছে নিন।
২. সিরাপের বদলে স্ট্যান্ডার্ডাইজড ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল ব্যবহার করুন।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সঠিক ডোজে গ্রহণ করুন।

সঠিক তথ্য জানুন, ভেজাল পণ্য এড়িয়ে চলুন এবং প্রকৃতির এই শক্তিকে আপনার সুস্বাস্থ্যের অংশ করে তুলুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. জিনসেং কি ভায়াগ্রার মতো তাৎক্ষণিক কাজ করে?
উত্তর: না। জিনসেং একটি ভেষজ বা ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট। ভায়াগ্রা রাসায়নিকভাবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করে, কিন্তু জিনসেং নিয়মিত সেবনের ফলে শরীরের নাইট্রিক অক্সাইড এবং হরমোন সিস্টেমকে ধীরে ধীরে উন্নত করে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দেয়। এর পূর্ণ ফলাফল পেতে ৪-৮ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

২. আমি কি দুধের সাথে জিনসেং খেতে পারি?
উত্তর: হ্যাঁ, জিনসেং দুধের সাথে মিশিয়ে খাওয়া যায়। তবে অনেকে মনে করেন দুধের প্রোটিন কিছু এন্টিঅক্সিডেন্টের শোষণ কমিয়ে দিতে পারে। তবে স্বাদের জন্য বা পুষ্টির জন্য দুধের সাথে খাওয়ায় বড় কোনো বাধা নেই। তবে পানি দিয়ে ক্যাপসুল গেলাই সর্বোত্তম।

৩. সুস্থ মানুষের কি জিনসেং খাওয়া উচিত?
উত্তর: সুস্থ মানুষরাও অ্যাডাপটোজেন বা এনার্জি বুস্টার হিসেবে জিনসেং খেতে পারেন। এটি ক্লান্তি দূর করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে একটানা দীর্ঘদিন না খেয়ে মাঝেমধ্যে বিরতি দেওয়া উচিত।

৪. জিনসেং এর দাম কত?
উত্তর: আসল এবং ৬ বছরের পুরনো কোরিয়ান রেড জিনসেং-এর দাম তুলনামূলক বেশি হয়। বাজারে সস্তা দামে যেসব জিনসেং পাউডার বা সিরাপ পাওয়া যায়, সেগুলোতে আসল মূলের পরিমাণ খুবই নগণ্য বা থাকে না বললেই চলে। মানের সাথে দামের সামঞ্জস্য বুঝেই কিনুন।

৫. কোন ব্র্যান্ডের জিনসেং সেরা?
উত্তর: ব্র্যান্ড নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, তবে বিশ্বজুড়ে Korean Ginseng Corp (CheongKwanJang) ব্র্যান্ডটি তাদের মানের জন্য স্বীকৃত। বাংলাদেশে বা আপনার স্থানীয় বাজারে যারা সরাসরি কোরিয়া থেকে আমদানি করে এবং বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদিত, তাদের পণ্য যাচাই করে কিনুন।

Shopping Cart
Scroll to Top