জিনসেং ট্যাবলেট এর কাজ কি

জিনসেং ট্যাবলেট এর ১০টি উপকারিতা,পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং খাওয়ার নিয়ম

জিনসেং (Ginseng) হাজার বছর ধরে প্রচলিত একটি শক্তিশালী ভেষজ বা হারবাল সাপ্লিমেন্ট, যা বিশ্বজুড়ে “ওষুধের রাজা” হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকেই জিনসেং ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট সেবন করেন, বিশেষ করে যৌন স্বাস্থ্য, শারীরিক দুর্বলতা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে।

কিন্তু ফার্মেসিতে পাওয়া প্যানাক্স জিনসেং ৫০০ এমজি (Panax Ginseng 500mg) আসলে কতটা কার্যকরী? এর জিনসেনোসাইড (Ginsenosides) উপাদানটি কীভাবে কাজ করে? এই আর্টিকেলে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে জিনসেং ট্যাবলেটের কাজ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এবং খাওয়ার সঠিক নিয়ম বিস্তারিত জানবো।

জিনসেং কী? 

জিনসেং হলো অ্যারালিয়াসি (Araliaceae) পরিবারের উদ্ভিদ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে অ্যাডাপটোজেন (Adaptogen) বলা হয়, যার অর্থ এটি শরীরকে বিভিন্ন মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।

বাজারে প্রধানত দুই ধরণের জিনসেং ট্যাবলেট পাওয়া যায়:
১. এশিয়ান বা কোরিয়ান জিনসেং (Panax Ginseng): এটি শরীরের উত্তেজনা ও তাপ বৃদ্ধি করে। যৌন অক্ষমতা এবং শারীরিক দুর্বলতায় এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।
২. আমেরিকান জিনসেং (Panax Quinquefolius): এটি শরীর ঠান্ডা রাখে এবং রিলাক্সেশনে সাহায্য করে।

মূল উপাদান: জিনসেং-এর সমস্ত ঔষধি গুণের মূলে রয়েছে জিনসেনোসাইড (Ginsenosides) বা প্যানাক্সোসাইড নামক রাসায়নিক যৌগ। একটি ভালো মানের ৫০০ এমজি ক্যাপসুলে পর্যাপ্ত পরিমাণ জিনসেনোসাইড থাকা জরুরি।

জিনসেং ট্যাবলেট এর কাজ কি ও ১০টি প্রধান উপকারিতা

গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অনুযায়ী, জিনসেং ট্যাবলেট শরীরের বিভিন্ন ফাংশন বা কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:

১. লিঙ্গোত্থানজনিত সমস্যা (Erectile Dysfunction) দূরীকরণ

জিনসেং ট্যাবলেট পুরুষের ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা উত্থানজনিত সমস্যা সমাধানে কার্যকরী। এটি শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড (Nitric Oxide) উৎপাদন বাড়ায়, যা রক্তনালীগুলো প্রসারিত করে যৌনাঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। কোরিয়ান রেড জিনসেং এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেয়।

২. দ্রুত বীর্যপাত ও কামশক্তির অভাব পূরণ

যৌন উত্তেজনা বা লিবিডো (Libido) বাড়াতে এবং দীর্ঘস্থায়ী মিলনে অক্ষমতা দূর করতে জিনসেং উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এটি প্রাকৃতিকভাবে টেস্টোস্টেরন হরমোনের কাজকে সমর্থন দেয়।

৩. শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি (Chronic Fatigue) দূরীকরণ

যাঁরা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিতে ভুগছেন, তাদের জন্য এটি দারুণ কার্যকরী। বিশেষ করে ক্যান্সার বা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (MS) জনিত ক্লান্তিতে জিনসেং সেবন করলে শরীরের কোষগুলো নতুন শক্তি পায় এবং জীবনীশক্তি বাড়ে।

৪. জ্ঞানীয় ক্ষমতা বা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি (Cognitive Function)

ওয়েবএমডি (WebMD) এর তথ্য মতে, জিনসেং সেবনে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ে। এটি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং গাণিতিক হিসাব করার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। বয়স্কদের আলঝেইমার্স (Alzheimer’s) প্রতিরোধে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

৫. টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ (Blood Sugar Regulation)

জিনসেং প্যানক্রিয়াসের বিটা-সেল এর কার্যকারিতা বাড়ায় এবং ইনসুলিন উৎপাদন উন্নত করে। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে, যা ইনসুলিন-অনির্ভর ডায়াবেটিস (Non-insulin dependent diabetes) রোগীদের জন্য উপকারী।

৬. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বৃদ্ধি

শীতকালীন সর্দি, কাশি এবং ফ্লু (Influenza) প্রতিরোধে জিনসেং কার্যকরী। এটি রক্তের শ্বেতকণিকার কার্যকারিতা বাড়িয়ে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।

৭. মেনোপজ পরবর্তী সমস্যা উপশম

নারীদের মেনোপজের পর শরীরে যে অস্বস্তি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং বিষণ্ণতা দেখা দেয়, জিনসেং তা কমাতে সাহায্য করে এবং নারীদের যৌন আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে পারে।

জিনসেং খাওয়ার নিয়ম ও সঠিক মাত্রা

জিনসেং একটি শক্তিশালী ভেষজ, তাই এটি মুড়ির মতো খাওয়া যাবে না। সঠিক ফলাফল পেতে নিচের নিয়ম মানা জরুরি:

  • সাধারণ মাত্রা: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত দৈনিক ২০০ মিগ্রা থেকে ৩ গ্রাম (200mg – 3g) জিনসেং মূল বা এর সমতুল্য নির্যাস সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়।

  • ক্যাপসুল/ট্যাবলেট: বাংলাদেশে সাধারণত ৫০০ মিগ্রা (500mg) ক্যাপসুল আকারে এটি পাওয়া যায়।

    • সেবন বিধি: প্রতিদিন ১টি বা ২টি ক্যাপসুল সকালে বা দুপুরে ভরা পেটে পানি দিয়ে খাওয়া উত্তম।

  • সাইকেল বা চক্র মেনে চলা: জিনসেং একটানা দীর্ঘদিন খাওয়া নিরাপদ নয়। সাধারণত ২-৩ সপ্তাহ খাওয়ার পর ১-২ সপ্তাহ বিরতি দেওয়া উচিত।

    • সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একনাগাড়ে ৩ মাস বা ৬ মাসের বেশি সেবন করবেন না, এতে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

দ্রষ্টব্য: ঘুমানোর আগে জিনসেং খাবেন না, কারণ এটি অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া তৈরি করতে পারে।

জিনসেং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Side Effects & Toxicity)

যদিও এটি একটি প্রাকৃতিক উপাদান, তবুও জিনসেং ট্যাবলেট সবার জন্য নিরাপদ নয়। এর সাধারণ এবং মারাত্মক কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে:

১. অনিদ্রা (Insomnia): এটি জিনসেং-এর সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
২. উচ্চ রক্তচাপ ও বুক ধড়ফড়: জিনসেং হৃৎস্পন্দন ও ব্লাড প্রেসার বাড়িয়ে দিতে পারে (বিশেষ করে সেবনের প্রথম দিকে)।
৩. গাইনোকোমাস্টিয়া: পুরুষদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ব্যবহারে স্তনে ব্যথা বা স্তন টিস্যু বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. মাসিকজনিত সমস্যা: নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্রে অনিয়ম বা অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে।
৫. এলার্জি: র‍্যাশ, চুলকানি বা স্টিভেনস-জনসন সিনড্রোম (Stevens-Johnson syndrome)-এর মতো বিরল কিন্তু মারাত্মক ত্বকের রোগ হতে পারে।

সতর্কতা ও প্রতিনির্দেশনা  – কারা জিনসেং খাবেন না?

নিচের শারীরিক অবস্থায় জিনসেং খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করতে হবে:

  • গর্ভবতী নারী (Pregnancy): গবেষণায় দেখা গেছে, জিনসেং-এর রাসায়নিক উপাদান ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় এটি এড়িয়ে চলুন।

  • অস্ত্রোপচার (Surgery): আপনার যদি আগামী ৭-১৪ দিনের মধ্যে কোনো অপারেশন থাকে, তবে জিনসেং খাওয়া বন্ধ করুন। এটি রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়, ফলে অপারেশনের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে।

  • অটো-ইমিউন রোগ: লুপাস (Lupus), রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস রোগীদের জিনসেং পরিহার করা উচিত, কারণ এটি ইমিউন সিস্টেমকে অতি-সক্রিয় করে রোগের তীব্রতা বাড়াতে পারে।

  • হরমোন সেনসিটিভ রোগ: ব্রেস্ট ক্যান্সার বা জরায়ুর ফাইব্রয়েড থাকলে এটি এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ জিনসেং কিছুটা ইস্ট্রোজেন (Estrogen) হরমোনের মতো আচরণ করে।

ঔষধের সাথে মিথস্ক্রিয়া 

জিনসেং কিছু ঔষধের কার্যকারিতা কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিতে পারে। আপনি যদি নিচের ঔষধগুলো সেবন করেন, তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া জিনসেং খাবেন না:

ঔষধের নাম ধরন সমস্যা/ঝুঁকি
ওয়ারফারিন (Warfarin) রক্ত তরল কারক রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমিয়ে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
ইনসুলিন / ওরাল ডায়াবেটিক ড্রাগ সুগার নিয়ন্ত্রণ রক্তে শর্করার মাত্রা খুব বেশি কমিয়ে ফেলতে পারে (Hypoglycemia)।
ইমিউনোসাপ্রেশেন্টস অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট ঔষধ ঔষধের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
MAOIs (এন্টিডিপ্রেসেন্ট) ডিপ্রেশনের ঔষধ মাথাব্যথা, কাঁপুনি বা ম্যানিক এপিসোড হতে পারে।
ক্যাফেইন (Caffeine) উদ্দীপক কফি এবং জিনসেং একসাথে খেলে উচ্চ রক্তচাপ ও বুক ধড়ফড় করতে পারে।

বাংলাদেশে জিনসেং এর দাম ও প্রাপ্যতা

বাংলাদেশে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হারবাল কোম্পানি জিনসেং বাজারজাত করে। বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড বেছে নেওয়া জরুরি।

  • ব্র্যান্ড উদাহরণ: টোটাল হারবাল অ্যান্ড নিউট্রাসিউটিক্যালস (Total Herbal & Nutraceuticals) এর জিনসেং ক্যাপসুল।

  • উপাদানের ধরন: প্যানাক্স জিনসেং (Panax Ginseng).

  • স্ট্রেংথ: ৫০০ মিগ্রা (500 mg).

  • দাম (Price context):

    • প্রতি পিস (Unit Price): ৩৩.০০ টাকা (প্রায়)।

    • প্রতি পাতা (Strip of 10): ৩৩০.০০ টাকা

সতর্কতা: ফুটপাত বা অনুমোদনহীন দোকান থেকে “জিনসানা” বা নামহীন জিনসেং ট্যাবলেট কিনবেন না। এগুলোতে অনেক সময় স্টেরয়েড মেশানো থাকে যা কিডনির ক্ষতি করতে পারে। সবসময় DAR বা MA লাইসেন্স যুক্ত ফার্মেসির ঔষধ কিনবেন।

উপসংহার:

জিনসেং একটি অলৌকিক ভেষজ হলেও এটি সবার জন্য সমান উপকারী নয়। এটি শারীরিক শক্তি এবং যৌন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘদিন একটানা সেবন করা উচিত নয়। আপনার যদি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হার্টের সমস্যা থাকে, তবে জিনসেং ট্যাবলেট (Ginseng Tablet) শুরু করার আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Shopping Cart
error: Content is protected !!
Scroll to Top