ডায়াবেটিস পয়েন্ট

ডায়াবেটিস পয়েন্ট: খালি ও ভরা পেটে নরমাল মাত্রা ও মৃত্যুর ঝুঁকি

ডায়াবেটিস বা মধুমেহ এমন একটি রোগ যা নীরবে শরীরের ভেতরে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই রোগের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হলো রক্তের শর্করার মাত্রা বা ডায়াবেটিস পয়েন্ট সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা। খালি পেটে এবং ভরা পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা কত থাকা উচিত, কখন তা স্বাভাবিক, কখন বিপজ্জনক এবং কোন পর্যায়ে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হতে পারে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক। এই আর্টিকেলে আমরা ডায়াবেটিস পয়েন্টের প্রতিটি পর্যায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

রক্তের গ্লুকোজ বা ব্লাড সুগার কী?

আমরা যখন কোনো খাবার খাই, আমাদের শরীর সেই খাবারকে ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তরিত করে, যা রক্তের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে শক্তি জোগায়। অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন (Insulin) নামক একটি হরমোন এই গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। যখন শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না বা শরীর ইনসুলিনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই ডায়াবেটিস বলা হয়। 

“ডায়াবেটিস পয়েন্ট” বলতে রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে (mg/dL) বা প্রতি লিটারে (mmol/L) গ্লুকোজের পরিমাণকে বোঝানো হয়।

রক্তের শর্করার মাত্রা পরিমাপের মূল পদ্ধতি

রক্তের শর্করার সঠিক অবস্থা বুঝতে মূলত তিন ধরনের পরীক্ষা করা হয়:

১. খালি পেটে রক্তের শর্করা (Fাস্টিং ব্লাড সুগার – FBS): টানা ৮-১০ ঘণ্টা কিছু না খেয়ে সকালে এই পরীক্ষা করা হয়। এটি আপনার শরীরের বেসলাইন গ্লুকোজ লেভেল নির্দেশ করে।
২. ভরা পেটে রক্তের শর্করা (পোস্টপ্রান্ডিয়াল ব্লাড সুগার – PPBS): খাবার খাওয়া শুরু করার ঠিক ২ ঘণ্টা পর এই পরীক্ষাটি করা হয়। এটি বুঝতে সাহায্য করে যে আপনার শরীর খাবার থেকে আসা শর্করাকে কতটা কার্যকরভাবে সামাল দিতে পারছে।
৩. এইচবিএ১সি (HbA1c) পরীক্ষা: এই পরীক্ষাটি গত তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা নির্দেশ করে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদী চিত্র তুলে ধরে।

ডায়াবেটিস পয়েন্ট চার্ট: একটি সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

খালি পেট এবং ভরা পেটে রক্তে শর্করার মাত্রার ওপর ভিত্তি করে একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা বোঝা যায়। নিচের চার্টটি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে শুরু করে ডায়াবেটিসের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেবে।

স্বাস্থ্যগত অবস্থা পরীক্ষার সময় নরমাল মাত্রা (mg/dL) নরমাল মাত্রা (mmol/L)
সুস্থ ব্যক্তি খালি পেটে ৭০ – ৯৯ mg/dL ৩.৯ – ৫.৫ mmol/L
  খাবার ২ ঘণ্টা পর ১৪০ mg/dL এর নিচে ৭.৮ mmol/L এর নিচে
প্রি-ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা) খালি পেটে ১০০ – ১২৫ mg/dL ৫.৬ – ৬.৯ mmol/L
  খাবার ২ ঘণ্টা পর ১৪০ – ১৯৯ mg/dL ৭.৮ – ১১.০ mmol/L
ডায়াবেটিস রোগী খালি পেটে ১২৬ mg/dL বা তার বেশি ৭.০ mmol/L বা তার বেশি
  খাবার ২ ঘণ্টা পর ২০০ mg/dL বা তার বেশি ১১.১ mmol/L বা তার বেশি

রিডিং বিশ্লেষণ: নরমাল থেকে উচ্চ ঝুঁকি

প্রতিটি রিডিংয়ের একটি নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে এবং তা শারীরিক অবস্থার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

১. স্বাভাবিক মাত্রা (Normal Level)

  • তাৎপর্য: এই মাত্রায় রক্তে শর্করা থাকলে বোঝা যায় যে শরীর সঠিকভাবে ইনসুলিন উৎপাদন ও ব্যবহার করছে। এটি সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যেমন—কিডনি, চোখ, এবং স্নায়ুতন্ত্র—সুরক্ষিত রয়েছে।

২. প্রি-ডায়াবেটিস (Prediabetes)

  • তাৎপর্য: এটি একটি সতর্ক সংকেত। এই পর্যায়ে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু ডায়াবেটিস হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সঠিক জীবনযাত্রা পরিবর্তন, যেমন—খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে এই অবস্থা থেকে আবারও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসা সম্ভব। প্রি-ডায়াবেটিসকে উপেক্ষা করলে তা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

৩. ডায়াবেটিস (Diabetes)

  • তাৎপর্য: এই পর্যায়ে শরীর ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়েছে (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স) অথবা পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারছে না। এই অবস্থায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এটি শরীরের একাধিক অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

বিপজ্জনক মাত্রা: কখন ঝুঁকি সর্বোচ্চ

রক্তে শর্করার মাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে চলে গেলে তা তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় ক্ষেত্রেই মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।

হাইপারগ্লাইসেমিয়া (Hyperglycemia): যখন রক্তে শর্করা মারাত্মক বেশি

যদি রক্তে শর্করার মাত্রা ২৫০ mg/dL (১৩.৯ mmol/L)-এর বেশি হয়ে যায়, তখন শরীর জটিলতার দিকে যেতে শুরু করে। এর লক্ষণগুলো হলো:

  • অতিরিক্ত তৃষ্ণা পাওয়া।

  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।

  • ঝাপসা দৃষ্টি।

  • তীব্র ক্লান্তি এবং দুর্বলতা।

  • ওজন কমে যাওয়া।

মৃত্যুর ঝুঁকি কখন?

রক্তে শর্করার মাত্রা যদি ৪০০ mg/dL থেকে ৬০০ mg/dL (২২.২ – ৩৩.৩ mmol/L) বা তার বেশি হয়ে যায়, তখন ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (Diabetic Ketoacidosis – DKA) বা হাইপারগ্লাইসেমিক হাইপারosmolar স্টেট (HHS)-এর মতো প্রাণঘাতী অবস্থা তৈরি হতে পারে।

  • ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (DKA): এটি সাধারণত টাইপ-১ ডায়াবেটিসে বেশি দেখা যায়। শরীর শক্তি উৎপাদনের জন্য গ্লুকোজের বদলে চর্বি ভাঙতে শুরু করে, যার ফলে রক্তে কিটোন (Ketones) নামক অ্যাসিডিক পদার্থ জমা হয়। এর লক্ষণগুলো হলো—বমি বমি ভাব, পেট ব্যথা, ফলের মতো মিষ্টি গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস এবং দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে এটি কোমা বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া (Hypoglycemia): যখন রক্তে শর্করা মারাত্মক কম

শুধুমাত্র উচ্চ শর্করা নয়, নিম্ন শর্করাও বিপজ্জনক। রক্তে শর্করার মাত্রা ৭০ mg/dL (৩.৯ mmol/L)-এর নিচে নেমে গেলে তাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়।
এর লক্ষণগুলো হলো:

  • শরীর কাঁপা, ঘাম হওয়া।

  • তীব্র ক্ষুধা।

  • মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি।

  • দ্রুত হৃদস্পন্দন।

মৃত্যুর ঝুঁকি কখন?

রক্তে শর্করার মাত্রা যদি ৪০ mg/dL (২.২ mmol/L)-এর নিচে চলে যায়, তখন রোগী জ্ঞান হারাতে পারে, খিঁচুনি হতে পারে এবং মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতিসহ মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এটি সাধারণত ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের ভুল ডোজের কারণে হয়ে থাকে।

যেসব বিষয় ব্লাড সুগারকে প্রভাবিত করে 

  • খাদ্য: শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।

  • ব্যায়াম: শারীরিক কার্যকলাপ রক্ত থেকে গ্লুকোজ ব্যবহার করে, ফলে শর্করার মাত্রা কমে।

  • মানসিক চাপ: স্ট্রেস বা মানসিক চাপের সময় শরীর হরমোন নিঃসরণ করে যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

  • অসুস্থতা: যেকোনো ধরনের ইনফেকশন বা অসুস্থতা রক্তে শর্করার মাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে।

  • ওষুধ: ডায়াবেটিসের ওষুধ ছাড়াও কর্টিকোস্টেরয়েড (Corticosteroids)-এর মতো কিছু ওষুধ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ

ডায়াবেটিস পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ঝুঁকি এড়ানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

১. নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: বাড়িতে একটি ভালো মানের গ্লুকোমিটার (Glucometer) দিয়ে নিয়মিত খালি পেটে ও ভরা পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা মাপুন।
২. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার, যেমন—ফল, শাকসবজি, এবং গোটা শস্য—খাদ্যতালিকায় রাখুন। পরিশোধিত শর্করা ও চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করুন।
৩. নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন।
৪. ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৫. পেশাদার পরামর্শ: একজন ডাক্তার (Doctor) বা এন্ডোক্রিনোলজিস্ট (Endocrinologist)-এর পরামর্শ অনুযায়ী চলুন। প্রি-ডায়াবেটিস পর্যায়ে ধরা পড়লে জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

উপসংহার

ডায়াবেটিস পয়েন্ট শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, এটি আপনার স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। খালি পেটে ও ভরা পেটে এর স্বাভাবিক মাত্রা জানা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে আপনি প্রি-ডায়াবেটিস, ডায়াবেটিস এবং এর থেকে উদ্ভূত মারাত্মক জটিলতা, যেমন—কিডনি রোগ (Kidney Disease)পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি (Peripheral Neuropathy) এবং হৃদরোগ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। সচেতনতাই হলো ডায়াবেটিস মোকাবিলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বিপদসীমা সম্পর্কে অবগত থাকুন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন।

Shopping Cart
error: Content is protected !!
Scroll to Top