ইনসুলিন দেওয়ার নিয়ম

ডায়াবেটিস ইনসুলিন দেওয়ার সঠিক নিয়ম কী? | সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিন একটি জীবন রক্ষাকারী হরমোন। আপনার ডাক্তার যখন আপনাকে ইনসুলিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন, তখন মনে নানা প্রশ্ন বা ভয় আসাটা স্বাভাবিক। অনেকেই ভাবেন, ইনজেকশন নেওয়া মানে হয়তো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যা মোটেও সত্যি নয়। বরং, এটি আপনার শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিসের জটিলতা থেকে সুরক্ষিত রাখার একটি বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর পদক্ষেপ।

এই নির্দেশিকাটি আপনাকে ইনসুলিন ইনজেকশন দেওয়ার প্রতিটি ধাপ সহজভাবে বুঝতে সাহায্য করবে—প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সঠিক কৌশল প্রয়োগ এবং ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিরাপদে নিষ্পত্তি করা পর্যন্ত। চলুন, ভয়কে জয় করে আত্মবিশ্বাসের সাথে ইনসুলিন দেওয়ার সঠিক নিয়ম জেনে নিই।

ইনসুলিন কি? 

ইনসুলিন আমাদের শরীরের অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে নিঃসৃত একটি প্রাকৃতিক হরমোন, যা রক্তে থাকা চিনি বা গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে শক্তি জোগায়।

  • টাইপ ১ ডায়াবেটিসে: শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তাই বাইরে থেকে ইনজেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন সরবরাহ করা অত্যাবশ্যক।

  • টাইপ ২ ডায়াবেটিসে: সময়ের সাথে সাথে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা তৈরি হওয়া ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং মুখে খাওয়ার ঔষধ যখন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট হয় না, তখন ইনসুলিন থেরাপির প্রয়োজন হয়।

ইনসুলিনের প্রকারভেদ

ইনসুলিন বিভিন্ন প্রকারের হয় এবং এদের কার্যকারিতা শুরু ও স্থায়িত্বের সময় ভিন্ন। আপনার ডাক্তার আপনার জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ইনসুলিনটি নির্ধারণ করে দেবেন।

ইনসুলিনের প্রকারভেদ কাজ শুরু হতে সময় সর্বোচ্চ কার্যকারিতা স্থায়িত্বকাল কখন নিতে হয়
র‍্যাপিড-অ্যাক্টিং ৫-১৫ মিনিট ১-২ ঘণ্টা ৩-৫ ঘণ্টা খাবার ঠিক আগে বা hemen পরেই
শর্ট-অ্যাক্টিং ৩০ মিনিট ২-৩ ঘণ্টা ৬-৮ ঘণ্টা খাবারের ৩০ মিনিট আগে
ইন্টারমিডিয়েট-অ্যাক্টিং ২-৩ ঘণ্টা ৪-১২ ঘণ্টা ১৩-১৬ ঘণ্টা দিনে একবার বা দুইবার
লং-অ্যাক্টিং ২-৪ ঘণ্টা কোনো নির্দিষ্ট পিক নেই প্রায় ২৪ ঘণ্টা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একবার
প্রি-মিক্সড (মিশ্রিত) ১০-৩০ মিনিট পরিবর্তিত (২টি পিক থাকতে পারে) প্রায় ২৪ ঘণ্টা খাবারের আগে, সাধারণত দিনে দুইবার

ইনজেকশনের জন্য প্রস্তুতি (ধাপে ধাপে)

সঠিক প্রস্তুতি একটি নির্ভুল এবং আরামদায়ক ইনজেকশনের চাবিকাঠি।

  1. সরঞ্জাম সংগ্রহ করুন: একটি পরিষ্কার জায়গায় আপনার প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নিন:

    • ইনসুলিনের ভায়াল (শিশি) বা পেন কার্ট্রিজ।

    • সঠিক মাপের নতুন সিরিঞ্জ এবং সুচ (নিডল)।

    • অ্যালকোহল প্যাড বা ভেজা তুলা।

    • ব্যবহৃত সুচ ও সিরিঞ্জ ফেলার জন্য একটি শক্ত, মুখবন্ধ পাত্র (শার্পস কন্টেইনার)।

  2. হাত পরিষ্কার করুন: সাবান ও পানি দিয়ে আপনার হাত ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নিন।

  3. ইনসুলিন পরীক্ষা করুন:

    • মেয়াদ: বোতলের গায়ে লেখা মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ দেখে নিন।

    • অবস্থা: স্বচ্ছ ইনসুলিন (যেমন Regular, Lispro, Glargine) জলের মতো পরিষ্কার আছে কিনা দেখুন। যদি এটি ঘোলাটে বা জমাট বেঁধে থাকে তবে ব্যবহার করবেন না।

    • মেঘলা ইনসুলিন (যেমন NPH) মেশানো: এই ধরনের ইনসুলিনের বোতলটি ব্যবহারের আগে দুই হাতের তালুর মধ্যে রেখে আলতো করে ১০-১২ বার ঘোরান (Roll) যাতে এটি ভালোভাবে মিশে যায়। কখনোই ঝাঁকাবেন না, কারণ এতে ইনসুলিন কার্যকারিতা হারাতে পারে।

সিরিঞ্জে ইনসুলিন ভরার নিয়ম

একটি ইনসুলিন ভরার পদ্ধতি:

  1. ইনসুলিনের শিশির রাবারের ঢাকনাটি অ্যালকোহল প্যাড দিয়ে মুছে শুকিয়ে নিন।

  2. আপনার ডোজ অনুযায়ী সিরিঞ্জের প্লাঞ্জার (Plunger) টেনে ততটুকু বাতাস সিরিঞ্জে ভরে নিন।

  3. সিরিঞ্জের সুচটি শিশির রাবারের ঢাকনার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করান এবং বাতাসটুকু ভেতরে পুশ করুন। এটি শিশির ভেতরে একটি চাপ তৈরি করে যা ইনসুলিন বের করতে সাহায্য করে।

  4. শিশি এবং সিরিঞ্জ একসাথে উল্টো করে ধরুন। সুচের ডগা যেন ইনসুলিনের নিচে থাকে।

  5. এবার ধীরে ধীরে প্লাঞ্জার টেনে আপনার প্রয়োজনীয় ডোজ পর্যন্ত ইনসুলিন সিরিঞ্জে ভরে নিন।

  6. সিরিঞ্জে বুদবুদ আছে কিনা পরীক্ষা করুন। যদি থাকে, সিরিঞ্জে আলতো করে টোকা দিন যাতে বুদবুদ ওপরে উঠে যায়। এরপর প্লাঞ্জার সামান্য পুশ করে বুদবুদগুলো শিশিতে ফেরত পাঠিয়ে সঠিক ডোজটি আবার ঠিক করে নিন।

  7. সাবধানে সিরিঞ্জটি বের করে এমনভাবে রাখুন যেন সুচটি কিছু স্পর্শ না করে।

দুটি ইনসুলিন একসাথে মেশানোর নিয়ম

সবসময় মনে রাখবেন, আপনার ডাক্তার যে ক্রমে ইনসুলিন মেশাতে বলেছেন, ঠিক সেভাবেই করবেন। সাধারণ নিয়মটি হলো— “আগে স্বচ্ছ, পরে মেঘলা (Clear before cloudy)”

  1. প্রথমে আপনার দুটি ডোজের (যেমন ১০ ইউনিট স্বচ্ছ ও ২০ ইউনিট মেঘলা) মোট পরিমাণ (৩০ ইউনিট) জেনে নিন।

  2. প্রথমে মেঘলা (NPH) ইনসুলিনের বোতলে ২০ ইউনিট বাতাস প্রবেশ করান এবং সিরিঞ্জটি বের করে নিন।

  3. এরপর স্বচ্ছ (Regular) ইনসুলিনের বোতলে ১০ ইউনিট বাতাস প্রবেশ করান।

  4. এবার স্বচ্ছ ইনসুলিনের বোতলটি উল্টে ধরে ১০ ইউনিট ইনসুলিন সিরিঞ্জে ভরে নিন। বুদবুদ পরীক্ষা করে বের করে দিন।

  5. সবশেষে, মেঘলা ইনসুলিনের বোতলে সাবধানে সুচ প্রবেশ করিয়ে উল্টে ধরুন এবং ধীরে ধীরে প্লাঞ্জার টেনে মোট ৩০ ইউনিট পর্যন্ত ইনসুলিন ভরে নিন।

  6. গুরুত্বপূর্ণ: একবার দুটি ইনসুলিন মিশে গেলে অতিরিক্ত ইনসুলিন আবার শিশিতে ফেরত দেওয়া যাবে না। তাই খুব সাবধানে পরিমাণটি মাপুন।

ইনজেকশন দেওয়ার সঠিক স্থান ও কৌশল

ইনজেকশনের জন্য আদর্শ স্থান

ইনসুলিন ইনজেকশন ত্বকের ঠিক নিচে থাকা চর্বির স্তরে (Subcutaneous tissue) দিতে হয়।

  • পেট (Abdomen): নাভির চারপাশের ২ ইঞ্চি (৫ সেমি) জায়গা বাদ দিয়ে সবচেয়ে দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে ইনসুলিন শোষিত হয়।

  • বাহু (Upper Arms): বাহুর বাইরের দিকের পেছনের অংশে।

  • উরু (Thighs): উরুর বাইরের দিকের উপরের অংশে।

  • নিতম্ব (Buttocks): নিতম্বের উপরের অংশে।

স্থান পরিবর্তন (Site Rotation) কেন জরুরি?

একই জায়গায় বারবার ইনজেকশন দিলে সেখানকার চর্বি জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যেতে পারে, যাকে লিপোহাইপারট্রফি (Lipohypertrophy) বলা হয়। এই শক্ত জায়গায় ইনসুলিন ঠিকমতো শোষিত হয় না, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যেতে পারে।

করণীয়:

  • প্রতিটি ইনজেকশনের জন্য নতুন জায়গা ব্যবহার করুন।

  • একটি নির্দিষ্ট স্থানের (যেমন, পেট) বিভিন্ন অংশে ঘোরান। প্রতিটি নতুন ইনজেকশন আগেরটি থেকে কমপক্ষে ১ ইঞ্চি (২.৫ সেমি) দূরে দিন।

  • কোনো ফোলা, কালশিটে বা শক্ত জায়গায় ইনজেকশন দেবেন না।

ইনজেকশন দেওয়ার কৌশল:

  1. ইনজেকশনের জায়গাটি পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। জায়গাটি ময়লা না হলে অ্যালকোহল দিয়ে মোছার প্রয়োজন নেই।

  2. এক হাত দিয়ে ইনজেকশনের জায়গার ত্বক আলতো করে চিমটি দিয়ে কিছুটা ওপরে তুলে ধরুন।

  3. অন্য হাতে সিরিঞ্জটি কলমের মতো করে ধরে ৯০° কোণে (সোজাভাবে) ত্বকের গভীরে সম্পূর্ণ প্রবেশ করান। যদি আপনার শরীরের গঠন খুব পাতলা হয়, তবে আপনার ডাক্তার বা নার্স আপনাকে ৪৫° কোণে ইনজেকশন দিতে বলতে পারেন।

  4. সুচ প্রবেশ করানোর পর চিমটি ছেড়ে দিন এবং ধীরে ধীরে প্লাঞ্জার চেপে সমস্ত ইনসুলিন পুশ করুন।

  5. ইনজেকশন শেষে, সুচ বের করার আগে মনে মনে ৫ থেকে ১০ পর্যন্ত গুনুন। এতে সম্পূর্ণ ইনসুলিন শোষিত হবে এবং বাইরে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা কমবে।

  6. যে কোণে সুচটি প্রবেশ করিয়েছিলেন, সেভাবেই সোজাভাবে বের করে আনুন।

  7. ইনজেকশনের পর জায়গাটি ঘষবেন না বা ম্যাসাজ করবেন না।

সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

ইনসুলিন সংরক্ষণ

  • না খোলা ভায়াল/পেন: ফ্রিজের সাধারণ অংশে রাখুন (ডিপ ফ্রিজে নয়)।

  • ব্যবহাররত ভায়াল/পেন: ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (৩০°C বা ৮৬°F-এর নিচে) ২৮ দিন পর্যন্ত রাখা যায়। সরাসরি রোদ বা গরম জায়গা থেকে দূরে রাখুন।

ব্যবহৃত সুচ ও সিরিঞ্জ নিষ্পত্তি

ব্যবহৃত সুচ ও সিরিঞ্জ সাধারণ ময়লার পাত্রে ফেলবেন না। এতে অন্য কারো আঘাত লাগার ঝুঁকি থাকে।

  • একটি মুখবন্ধ, শক্ত প্লাস্টিকের বোতল বা কন্টেইনারে (শার্পস কন্টেইনার) ব্যবহৃত সুচগুলো ফেলুন।

  • পাত্রটি প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভরে গেলে এর মুখ শক্ত করে আটকে দিন এবং স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী পৌরসভার নির্ধারিত স্থানে বা হাসপাতালের নির্দিষ্ট বিনে ফেলুন।

সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সমাধান

  • ব্যথা: নতুন ও সঠিক মাপের সুচ ব্যবহার করলে ব্যথা কম হয়। ঠাণ্ডা ইনসুলিন ব্যবহারে ব্যথা হতে পারে, তাই ইনজেকশনের ৩০ মিনিট আগে ফ্রিজ থেকে বের করে রাখুন।

  • ওজন বৃদ্ধি: ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ শুরু করলে শরীর গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে, যা আগে নষ্ট হয়ে যেত। এতে সামান্য ওজন বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

  • হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করা কমে যাওয়া): এটি ইনসুলিন ব্যবহারের সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

    • লক্ষণ: শরীর কাঁপা, ঘাম হওয়া, বুক ধড়ফড় করা, প্রচণ্ড খিদে, মাথা ঘোরা এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।

    • করণীয়: রক্তে শর্করা ৪.০ mmol/L (৭০ mg/dL) এর নিচে নেমে গেলে দ্রুত ১৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, যেমন ৪-৫টি গ্লুকোজ ট্যাবলেট, আধা গ্লাস ফলের রস বা ১ চামচ চিনি পানিতে গুলে খেয়ে নিন। ১৫ মিনিট পর আবার ব্লাড সুগার মাপুন।

উপসংহার

ইনসুলিন নেওয়া ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কোনো ব্যর্থতা নয়। সঠিক নিয়ম ও কৌশল জানা থাকলে এটি আপনার জন্য একটি সহজ এবং সাধারণ দৈনন্দিন কাজ হয়ে উঠবে। আপনার ডাক্তার বা ডায়াবেটিস এডুকেটরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। যদি কোনো সমস্যা হয় বা কিছু বুঝতে অসুবিধা হয়, তবে তাদের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না। আত্মবিশ্বাসের সাথে ইনসুলিন নিন এবং একটি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন।

Shopping Cart
error: Content is protected !!
Scroll to Top