পাইলস

পাইলস বা অর্শ: কারণ, লক্ষণ, প্রকারভেদ ও আধুনিক চিকিৎসা

“পাইলস” বা “অর্শ”—এই শব্দটি শুনলেই অনেকে ভয়, লজ্জা বা উদ্বেগে ভোগেন। এটি এমন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা যা নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু সত্য হলো, পাইলস একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং নিরাময়যোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য জানা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন, তাই আপনি একা নন।

Table of Contents

এই বিস্তৃত নির্দেশিকাটিতে আমরা পাইলস সম্পর্কে আপনার মনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। আমরা আলোচনা করব পাইলস কী এবং কেন হয়, এর বিভিন্ন প্রকারভেদ, সাধারণ থেকে গুরুতর লক্ষণগুলো কী কী, কীভাবে ঘরোয়া পদ্ধতিতে এর যত্ন নেওয়া যায়, এবং কখন একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এছাড়াও, আমরা পাইলসের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেমন—বিনা অপারেশনে চিকিৎসা থেকে শুরু করে সার্জারি পর্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা করব এবং জানাব কীভাবে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এই রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আমাদের লক্ষ্য হলো আপনাকে পাইলস সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়া, যাতে আপনি ভয়কে জয় করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।

পাইলস বা অর্শ কী? (What is Piles/Hemorrhoids?)

সহজ ভাষায়, পাইলস হলো মলদ্বার (Anus) এবং এর নিম্নভাগে অবস্থিত রেকটামের (Rectum) ভেতরের বা বাইরের অংশের ফুলে যাওয়া এবং প্রদাহযুক্ত রক্তনালী। এই রক্তনালীগুলো যখন অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রসারিত হয় ও ফুলে যায়, তখন পাইলস বা অর্শের সৃষ্টি হয়। একে পায়ের ভ্যারিকোজ ভেইনের (Varicose Veins) সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা:

আমাদের মলদ্বারের ভেতরে রক্তনালী, মাংসপেশি এবং টিস্যু দিয়ে তৈরি এক ধরনের নরম আবরণ থাকে, যাকে হেমোরয়েডাল কুশন (Hemorrhoidal Cushions) বলা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় এগুলি মলত্যাগের সময় মলদ্বারকে সুরক্ষিত রাখে এবং মল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিন্তু যখন দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য, গর্ভাবস্থা বা অন্য কোনো কারণে এই অংশের রক্তনালীগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তখন রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং শিরাগুলো বেলুনের মতো ফুলে ওঠে। এই অবস্থাকেই পাইলস বা হেমোরয়েড বলা হয়।

পাইলসের প্রকারভেদ (Types of Piles)

পাইলস মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত—অভ্যন্তরীণ পাইলস এবং বাহ্যিক পাইলস। তবে এর কিছু জটিল রূপও রয়েছে।

১. অভ্যন্তরীণ পাইলস (Internal Hemorrhoids):

এই ধরণের পাইলস মলদ্বারের ভেতরে, রেকটামের প্রাচীরে তৈরি হয়। এটি সাধারণত চোখে দেখা যায় না বা অনুভব করা যায় না, কারণ রেকটামের ভেতরের অংশে ব্যথার অনুভূতি কম থাকে। এর প্রধান লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় ব্যথাহীন রক্তপাত।

গুরুত্ব অনুসারে অভ্যন্তরীণ পাইলসকে ৪টি গ্রেডে ভাগ করা হয়:

  • গ্রেড-১: পাইলস মলদ্বারের ভেতরেই থাকে, বাইরে বেরিয়ে আসে না। প্রধান লক্ষণ হলো মাঝে মাঝে রক্তপাত হওয়া।

  • গ্রেড-২: মলত্যাগের সময় পাইলস মলদ্বার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, কিন্তু মলত্যাগ শেষ হলে নিজে থেকেই আবার ভেতরে চলে যায়। এক্ষেত্রে রক্তপাত ও হালকা অস্বস্তি হতে পারে।

  • গ্রেড-৩: এই পর্যায়ে পাইলস বাইরে বেরিয়ে আসে, কিন্তু নিজে থেকে ভেতরে যায় না। আঙুলের সাহায্যে বা চাপ দিয়ে এটিকে ভেতরে প্রবেশ করাতে হয়। এতে ব্যথা এবং রক্তপাত হতে পারে।

  • গ্রেড-৪: এটি সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়। পাইলস সব সময় মলদ্বারের বাইরেই অবস্থান করে এবং এটিকে আর ভেতরে প্রবেশ করানো সম্ভব হয় না। এর ফলে তীব্র ব্যথা, রক্তপাত এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে। এই অবস্থাকে প্রল্যাপসড পাইলস (Prolapsed Hemorrhoids) বলা হয়।

২. বাহ্যিক পাইলস (External Hemorrhoids):

এই পাইলস মলদ্বারের বাইরে, চারপাশের ত্বকের নিচে তৈরি হয়। এখানে প্রচুর স্নায়ু থাকায় বাহ্যিক পাইলসে সাধারণত ব্যথা, চুলকানি, জ্বালাপোড়া এবং অস্বস্তি হয়। মলত্যাগের পর এই অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।

৩. থ্রম্বোসড পাইলস (Thrombosed Hemorrhoids):

এটি বাহ্যিক পাইলসের একটি জটিল অবস্থা। যখন বাহ্যিক পাইলসের ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে যায় (Blood Clot), তখন এটিকে থ্রম্বোসড পাইলস বলে। এর ফলে মলদ্বারের পাশে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথাযুক্ত, শক্ত এবং নীলচে বা বেগুনী রঙের একটি পিণ্ড তৈরি হয়। এই অবস্থায় অসহনীয় ব্যথা হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

পাইলসের সাধারণ ও গুরুতর লক্ষণসমূহ

পাইলসের লক্ষণ এর প্রকারভেদ এবং তীব্রতার উপর নির্ভর করে। নিচে সাধারণ ও গুরুতর লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো:

  • উজ্জ্বল লাল রক্তপাত: মলত্যাগের সময় বা পরে টয়লেট পেপারে, প্যানের ভেতরে বা মলের গায়ে তাজা রক্ত দেখা যাওয়া। এটি অভ্যন্তরীণ পাইলসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ।

  • মলদ্বারে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া: মলদ্বারের আশেপাশে ক্রমাগত চুলকানি বা অস্বস্তিকর অনুভূতি।

  • ব্যথা ও অস্বস্তি: বিশেষ করে বাহ্যিক পাইলসের ক্ষেত্রে বসার সময় বা মলত্যাগের সময় ব্যথা অনুভব করা।

  • পিণ্ড বা ফোলা: মলদ্বারের আশেপাশে এক বা একাধিক নরম বা শক্ত পিণ্ড বা মাংসপিণ্ড অনুভব করা।

  • অসম্পূর্ণ মলত্যাগ: মলত্যাগের পরেও মনে হয় যেন পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।

  • শ্লেষ্মা (Mucus) নিঃসরণ: মলদ্বার থেকে পিচ্ছিল পদার্থ বা শ্লেষ্মা নির্গত হওয়া।

কখন দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ বা জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?

সাধারণত পাইলস মারাত্মক কোনো রোগ নয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন:

  • অতিরিক্ত পরিমাণে বা ক্রমাগত রক্তপাত হলে।

  • মলদ্বার থেকে বড় আকারের রক্তপিণ্ড (Blood Clot) বের হলে।

  • তীব্র ও অসহনীয় ব্যথা হলে, যা সাধারণ ব্যথানাশকে কমছে না।

  • মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলে (অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের লক্ষণ)।

  • পাইলসের সাথে জ্বর, কাঁপুনি বা মলদ্বার থেকে পুঁজ বের হলে (ইনফেকশনের লক্ষণ)।

পাইলস কেন হয়? – প্রধান কারণ ও ঝুঁকিসমূহ

পাইলস মূলত মলদ্বারের রক্তনালীর উপর অতিরিক্ত চাপের ফলে হয়। এর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ও ঝুঁকি জড়িত থাকে।

১. জীবনযাত্রা-সম্পর্কিত কারণ:

  • দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য: শক্ত মলত্যাগ করার জন্য অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে রক্তনালীগুলো ফুলে যায়।

  • ডায়রিয়া: দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়াও মলদ্বারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

  • ভুল খাদ্যাভ্যাস: খাবারে আঁশ বা ফাইবার (যেমন—শাকসবজি, ফল, ডাল) কম খেলে মল শক্ত হয়।

  • অপর্যাপ্ত জল পান: জল কম খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ে।

  • অস্বাস্থ্যকর টয়লেট অভ্যাস: মলত্যাগের বেগ এলে তা চেপে রাখা অথবা দীর্ঘ সময় ধরে টয়লেটে বসে থাকা (যেমন—বই পড়া বা মোবাইল ব্যবহার করা)।

২. শারীরবৃত্তীয় কারণ:

  • গর্ভাবস্থা: গর্ভকালীন সময়ে জরায়ুর আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মলদ্বারের শিরার ওপর চাপ বাড়ে, যা পাইলসের অন্যতম প্রধান কারণ।

  • স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন: শরীরের অতিরিক্ত ওজন তলপেট ও মলদ্বারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

  • বার্ধক্য: বয়স বাড়ার সাথে সাথে রেকটাম ও মলদ্বারের মাংসপেশি এবং রক্তনালীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে পাইলসের ঝুঁকি বাড়ে। ৫০ বছরের পর এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

৩. অন্যান্য কারণ:

  • বংশগত: পরিবারে কারও পাইলসের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

  • নিয়মিত ভারী জিনিস তোলা: যারা নিয়মিত ভারী ওজন তোলেন বা কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাদের পাইলসের ঝুঁকি বেশি।

  • অ্যানাল ইন্টারকোর্স (Anal Intercourse): এটি মলদ্বারের রক্তনালীতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া (Diagnostic Process)

পাইলস নির্ণয় সাধারণত খুব সহজ। লজ্জার কারণে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন, যা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একজন চিকিৎসক নিম্নলিখিত উপায়ে রোগ নির্ণয় করেন:

  • ইতিহাস জানা ও শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক প্রথমে রোগীর কাছ থেকে তার লক্ষণ, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত শোনেন। এরপর বাহ্যিক পাইলস আছে কিনা তা দেখার জন্য মলদ্বার পরীক্ষা করেন।

  • ডিজিটাল রেক্টাল এক্সাম (DRE): অভ্যন্তরীণ পাইলস পরীক্ষার জন্য চিকিৎসক গ্লাভস পরে আঙুলের সাহায্যে মলদ্বারের ভেতরটা পরীক্ষা করেন। এর মাধ্যমে কোনো অস্বাভাবিক পিণ্ড বা ফোলা আছে কিনা তা বোঝা যায়।

  • প্রোক্টোস্কোপি/অ্যানোস্কোপি: এটি একটি ছোট, সরু নলের মতো যন্ত্র, যার মাথায় একটি লাইট ও ক্যামেরা থাকে। এর সাহায্যে মলদ্বার ও রেকটামের ভেতরটা পরিষ্কারভাবে দেখা যায় এবং পাইলসের আকার ও অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।

  • কোলোনোস্কোপি: যদি রোগীর বয়স বেশি হয় বা রক্তপাতের কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে চিকিৎসক কোলন ক্যান্সার বা অন্য কোনো রোগের সম্ভাবনা বাতিল করার জন্য কোলোনোস্কোপি করার পরামর্শ দিতে পারেন।

পাইলসের চিকিৎসা (Comprehensive Treatment of Piles)

পাইলসের চিকিৎসা এর প্রকার, গ্রেড এবং তীব্রতার উপর নির্ভর করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘরোয়া যত্ন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই পাইলস নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ঔষধ বা সার্জারির প্রয়োজন হয়।

১. ঘরোয়া চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন (করণীয় ও বর্জনীয়):

সাধারণত গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পাইলস এই পদ্ধতিতেই সেরে ওঠে।

  • করণীয় (Do’s):

    • উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার: প্রতিদিনের খাবারে প্রচুর পরিমাণে আঁশযুক্ত খাবার, যেমন—লাল আটার রুটি, ওটস, ডাল, শাকসবজি (পালং, পুঁই, কচু), ফল (পেঁপে, কলা, আপেল), এবং ইসবগুলের ভুসি যোগ করুন।

    • পর্যাপ্ত জল পান: দিনে ৮-১০ গ্লাস (২-৩ লিটার) জল পান করুন।

    • সিজ বাথ (Sitz Bath): একটি গামলায় হালকা গরম জলের মধ্যে লবণ বা পভিডোন-আয়োডিন মিশিয়ে দিনে ২-৩ বার ১০-১৫ মিনিটের জন্য বসুন। এটি ব্যথা, চুলকানি এবং ফোলা কমাতে সাহায্য করে।

    • নরম ও পরিষ্কার রাখা: মলত্যাগের পর শুকনো টয়লেট পেপারের পরিবর্তে জল বা ভেজা বেবি ওয়াইপস দিয়ে পরিষ্কার করুন। জায়গাটি সবসময় শুকনো রাখুন।

    • বরফের সেঁক: বাহ্যিক পাইলসের ব্যথায় আরাম পেতে একটি কাপড়ে বরফ মুড়ে ফোলা জায়গায় লাগাতে পারেন।

    • নিয়মিত ব্যায়াম: হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

  • বর্জনীয় (Don’ts):

    • অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকুন: মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।

    • মলত্যাগের বেগ চেপে রাখবেন না: বেগ এলেই টয়লেটে যান।

    • দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা: টয়লেটে অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় কাটাবেন না।

    • অতিরিক্ত ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন: এই ধরনের খাবার অস্বস্তি বাড়াতে পারে।

    • কোষ্ঠকাঠিন্য সৃষ্টিকারী ঔষধ পরিহার করুন: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোডেইনযুক্ত ব্যথানাশক খাবেন না।

২. ঔষধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল চিকিৎসা:

ঘরোয়া চিকিৎসায় কাজ না হলে চিকিৎসক কিছু ঔষধ ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন:

  • পাইলসের মলম বা ক্রিম: হাইড্রোকর্টিসন (Hydrocortisone), লিডোকেইন (Lidocaine) বা জিঙ্ক অক্সাইডযুক্ত ক্রিম বা মলম ব্যথা, চুলকানি এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

  • সাপোজিটরি: অভ্যন্তরীণ পাইলসের জন্য মলদ্বারে ব্যবহারের জন্য সাপোজিটরি দেওয়া হয়।

  • ব্যথানাশক: ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ খাওয়া যেতে পারে। তবে রক্তপাত হলে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন এড়িয়ে চলা উচিত।

  • মল নরম করার ঔষধ: কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ল্যাক্সেটিভ (Laxatives) বা স্টুল সফটনার দেওয়া হয়।

৩. নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা (অপারেশন ছাড়া):

গ্রেড-২ বা গ্রেড-৩ পাইলসের ক্ষেত্রে এবং ঔষধপত্রে কাজ না হলে এই পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত কার্যকর।

  • রাবার ব্যান্ড লাইগেশন (Rubber Band Ligation): এটি সবচেয়ে প্রচলিত এবং কার্যকর পদ্ধতি। এতে একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পাইলসের গোড়ায় একটি ছোট রাবার ব্যান্ড পরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পাইলসে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং ৭-১০ দিনের মধ্যে পাইলসটি শুকিয়ে নিজে থেকেই ঝরে পড়ে।

  • স্ক্লেরোথেরাপি (Sclerotherapy): এই পদ্ধতিতে পাইলসের মধ্যে একটি বিশেষ রাসায়নিক ইনজেকশন দেওয়া হয়, যা রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে এবং পাইলসটি শুকিয়ে যায়।

  • ইনফ্রারেড কোয়াগুলেশন (Infrared Coagulation): ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার করে পাইলসের ভেতরের রক্তনালীতে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে এটি সংকুচিত হয়ে যায়।

৪. সার্জিক্যাল চিকিৎসা:

যখন গ্রেড-৩ এর শেষ পর্যায় বা গ্রেড-৪ পাইলস হয়, অথবা অন্য কোনো চিকিৎসায় কাজ না হয়, তখন সার্জারির প্রয়োজন হয়।

চিকিৎসা পদ্ধতিসংক্ষিপ্ত বিবরণব্যথাসুস্থ হতে সময়পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা
হেমোরয়েডেক্টমি (Hemorrhoidectomy)এটি পাইলসের প্রচলিত অপারেশন, যেখানে পাইলস কেটে বাদ দেওয়া হয়।অপারেশনের পর তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যথা হয়, যা ঔষধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।সম্পূর্ণ সুস্থ হতে ২-৪ সপ্তাহ লাগতে পারে।খুবই কম, এটি সবচেয়ে স্থায়ী সমাধান।
স্ট্যাপলড হেমোরয়েডোপেক্সি (Stapled Hemorrhoidopexy)একটি বিশেষ যন্ত্র (স্ট্যাপলার) ব্যবহার করে ঝুলে পড়া পাইলসকে আবার মলদ্বারের ভেতরে স্থাপন করা হয় এবং রক্ত সরবরাহ বন্ধ করা হয়।প্রচলিত অপারেশনের চেয়ে ব্যথা অনেক কম।৭-১০ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়।প্রচলিত অপারেশনের চেয়ে সামান্য বেশি।
ট্রান্সঅ্যানাল হেমোরয়েডাল ডিআর্টেরিয়ালাইজেশন (THD)এটি একটি অত্যাধুনিক ও প্রায় ব্যথাহীন পদ্ধতি। আল্ট্রাসাউন্ড ডপলারের সাহায্যে পাইলসের রক্ত সরবরাহকারী ধমনী খুঁজে সেলাই করে দেওয়া হয়।ব্যথা প্রায় হয় না বললেই চলে।১-২ দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক কাজ করা যায়।খুব কম, তবে নতুন পাইলস হতে পারে।

পাইলস প্রতিরোধের উপায়

“প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম”—এই কথাটি পাইলসের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কিছু নিয়ম মেনে চললে পাইলসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব:

  • আঁশযুক্ত খাবার খান: আপনার খাদ্যতালিকায় ফাইবার-সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন।

  • প্রচুর পরিমাণে জল পান করুন: এটি আপনার মলকে নরম রাখবে।

  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন।

  • স্বাস্থ্যকর টয়লেট অভ্যাস: মলত্যাগের সময় চাপ দেবেন না এবং বেশিক্ষণ বসে থাকবেন না।

  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।

  • ভারী জিনিস তোলার সময় সতর্ক থাকুন: সঠিক পদ্ধতিতে এবং শ্বাস ধরে না রেখে ওজন তুলুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

  • প্রশ্ন: পাইলস থেকে কি ক্যান্সার হতে পারে?

    • উত্তর: না, পাইলস থেকে ক্যান্সার হয় না। তবে পাইলস এবং কোলন বা রেক্টাল ক্যান্সারের কিছু লক্ষণ (যেমন—রক্তপাত) একরকম হতে পারে। তাই রক্তপাত হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণটি নিশ্চিত করা উচিত।

  • প্রশ্ন: চিকিৎসা ছাড়া কি পাইলস সেরে যায়?

    • উত্তর: প্রাথমিক পর্যায়ের (গ্রেড-১/২) পাইলস প্রায়শই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে সেরে যায়। তবে গুরুতর পর্যায়ে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

  • প্রশ্ন: গর্ভাবস্থায় পাইলস হলে কী করণীয়?

    • উত্তর: গর্ভাবস্থায় পাইলস একটি সাধারণ সমস্যা। প্রচুর জল পান করা, ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ মলম ব্যবহার করা যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রসবের পর এটি தானாகவே সেরে যায়।

  • প্রশ্ন: অপারেশনের পর পাইলস কি আবার হতে পারে?

    • উত্তর: সার্জারি পাইলসকে পুরোপুরি সরিয়ে দেয়। তবে অপারেশনের পর যদি পুরনো অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়া হয় (যেমন—কোষ্ঠকাঠিন্য, কম জল পান), তাহলে নতুন করে আবার পাইলস হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সারসংক্ষেপ

পাইলস একটি অস্বস্তিকর কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। লজ্জা বা ভয় পেয়ে এটিকে অবহেলা না করে এর কারণ ও লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে ঘরোয়া যত্ন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনেই এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যদি সমস্যা বাড়তে থাকে, তবে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না। মনে রাখবেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে পাইলসের অত্যন্ত কার্যকর ও প্রায় ব্যথাহীন চিকিৎসা উপলব্ধ আছে। সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আপনি একটি সুস্থ ও আরামদায়ক জীবনযাপন করতে পারেন।

 
 
 
 
 
 
Shopping Cart
Scroll to Top