অনিয়মিত মাসিক হলে কি বাচ্চা হয়

অনিয়মিত পিরিয়ডে গর্ভবতী হওয়ার উপায়: পিসিওএস (PCOS) ও ওভুলেশন সমাধান

সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করার সময় একজন নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার মাসিক চক্র বা পিরিয়ডের হিসাব রাখা। সাধারণত ২৮ দিনের একটি নিয়মিত চক্রে ডিম্বস্ফোটনের (Ovulation) সময় নির্ধারণ করা সহজ। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩০-৪০% নারীই অনিয়মিত পিরিয়ডের সমস্যায় ভোগেন।

Table of Contents

আপনার মনে যদি প্রশ্ন থাকে, “মাসিক অনিয়মিত হলে কি আমি গর্ভবতী হতে পারব?” তবে উত্তর হলো—অবশ্যই, হ্যাঁ। তবে এর জন্য প্রয়োজন শরীরের হরমোনাল প্যাটার্ন বোঝা, সঠিক ওভুলেশন ট্র্যাকিং এবং কিছু নির্দিষ্ট জীবনযাত্রার পরিবর্তন। এই আর্টিকেলে আমরা মেডিক্যালি প্রমাণিত উপায় এবং টিপস আলোচনা করব।

অনিয়মিত মাসিক এবং গর্ভাবস্থা: আসল সমস্যাটি কোথায়?

অনিয়মিত পিরিয়ড মানেই যে আপনি বন্ধ্যা (Inutile), তা ভাবা সম্পূর্ণ ভুল। গর্ভধারণের মূল চাবিকাঠি পিরিয়ড নয়, বরং ওভুলেশন বা ডিম্বস্ফোটন

সাধারণত, যদি আপনার মাসিক চক্র ২১ দিনের চেয়ে ছোট অথবা ৩৫ দিনের চেয়ে বড় হয়, তবে তাকে মেডিক্যালি অনিয়মিত পিরিয়ড বলা হয়। এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো ‘অ্যানোভুলেশন’ (Anovulation) বা ডিম্বাণু নির্গত না হওয়া। যখন চক্র অনিয়মিত হয়, তখন ঠিক কোন দিন ওভুলেশন হচ্ছে তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, যা গর্ভধারণে বিলম্ব ঘটায়।

কেন এমন হয়? (Root Causes)

সঠিক চিকিৎসা বা প্রতিকারের জন্য আগে কারণ জানা জরুরি। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  1. পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS): এটি হরমোনের ভারসাম্যহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ। এতে শরীরে এন্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন) বেড়ে যায় এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, ফলে ডিম্বাণু পরিপক্ক হয়ে ফুটতে বাধা পায়।

  2. থাইরয়েড সমস্যা (Thyroid Disorders): শরীরে TSH হরমোনের মাত্রা খুব বেশি বা খুব কম হলে তা সরাসরি উর্বরতাকে প্রভাবিত করে।

  3. হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়া: রক্তে প্রোল্যাক্টিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে মস্তিষ্ক মনে করে শরীর গর্ভবতী বা স্তন্যপান করানোর অবস্থায় আছে, ফলে মাসিক ও ডিম্বস্ফোটন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

  4. ওভারিয়ান রিজার্ভ কমে যাওয়া: যাদের বয়স ৩৫-এর বেশি, তাদের অ্যান্টি-মুলিয়ান হরমোন (AMH) কমে যাওয়ার কারণে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে।

অনিয়মিত পিরিয়ডে ওভুলেশন ট্র্যাকিং করার সঠিক ও বৈজ্ঞানিক নিয়ম

সাধারণ ক্যালেন্ডার বা পিরিয়ড ট্র্যাকিং অ্যাপগুলো নিয়মিত চক্রের জন্য কার্যকর হলেও, অনিয়মিত মাসিকের ক্ষেত্রে এগুলো প্রায়শই ভুল তথ্য দেয়। তাই আপনাকে নিজের শরীরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করতে হবে।

পদ্ধতি ১: সার্ভাইক্যাল মিউকাস পর্যবেক্ষণ (Cervical Mucus Method)

মাসের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে জরায়ুমুখের স্রাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করুন। যখন স্রাবটি কাঁচা ডিমের সাদার মতো স্বচ্ছ, পিচ্ছিল এবং ইলাস্টিক (Elastic) হবে, তখন বুঝতে হবে আপনি আপনার ‘ফারটাইল উইন্ডো’ বা উর্বরতার সময়সীমার মধ্যে আছেন। এটি ওভুলেশনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক লক্ষণ।

পদ্ধতি ২: ফলিকুলার স্টাডি বা টিভিএস স্ক্যান (Follicular Study via TVS)

যদি আপনি দ্রুত গর্ভবতী হতে চান এবং ক্যালেন্ডার মেলাতে না পারেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে ‘ফলিকুলার স্টাডি’ করা সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডাক্তার সরাসরি দেখতে পান আপনার ওভারিতে ডিম্বাণু বা ফলিকল বড় হচ্ছে কিনা এবং সেটি কবে ফুটতে পারে। একে Cycle Monitoring ও বলা হয়।

পদ্ধতি ৩: বেসাল বডি টেম্পারেচার (BBT)

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে বিছানায় থাকা অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা মাপুন। ওভুলেশনের ঠিক পর পর শরীরের প্রোজেস্টেরন হরমোনের কারণে তাপমাত্রা সামান্য (০.৫-১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেড়ে যায়। কয়েক মাস এটি চার্ট করলে আপনি আপনার ওভুলেশন প্যাটার্ন বুঝতে পারবেন।

পদ্ধতি ৪: ওভুলেশন কিট বা এলএইচ (LH) টেস্ট স্ট্রিপ

ফার্মেসিতে প্রেগন্যান্সি টেস্টের মতোই ওভুলেশন কিট পাওয়া যায়। এটি প্রস্রাবে লুটিনাইজিং হরমোনের (LH Surge) মাত্রা মাপে।

সতর্কতা: আপনার যদি PCOS থাকে, তবে এই কিট সবসময় সঠিক ফল নাও দিতে পারে। কারণ PCOS রোগীদের শরীরে এলএইচ হরমোনের মাত্রা সবসময়ই একটু বেশি থাকে, যা কিটে ‘False Positive’ দেখাতে পারে।

গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানোর ৫টি কার্যকরী টিপস 

ঔষধের পাশাপাশি আপনার জীবনযাত্রায় ছোট কিছু পরিবর্তন শরীরে হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে জাদুর মতো কাজ করে।

লো-কার্ব বা লো-জিআই (Low GI) ডায়েট

যেসব খাবার রক্তে সুগার দ্রুত বাড়ায় (যেমন: চিনি, সাদা ভাত, ময়দা) সেগুলো পরিহার করুন। এর বদলে লাল চাল, ওটস, ডাল এবং শাকসবজি খান। এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমিয়ে প্রাকৃতিকভাবে মাসিক নিয়মিত করতে সাহায্য করে।

ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং বিএমআই (BMI)

গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের নারীরা যদি তাদের বর্তমান ওজনের মাত্র ৫-১০ শতাংশ ওজন কমাতে পারেন, তবে অনেকের ক্ষেত্রে কোনো ওষুধ ছাড়াই ওভুলেশন পুনরায় শুরু হয়ে যায়।

সীড সাইক্লিং (Seed Cycling)

যদিও এটি প্রথাগত চিকিৎসার অংশ নয়, তবুও অনেক ফাংশনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হরমোন ব্যালেন্সের জন্য মাসে পর্যায়ক্রমে তিসির বীজ (Flax seeds), কুমড়োর বীজ, তিলের বীজ এবং সূর্যমুখীর বীজ খাওয়ার পরামর্শ দেন।

মানসিক চাপ কমানো

অতিরিক্ত টেনশন বা স্ট্রেস ‘কর্টিসল’ হরমোন নিঃসরণ করে, যা প্রজনন হরমোনকে দমন করে রাখে। গর্ভধারণের চেষ্টার সময় পর্যাপ্ত ঘুম এবং মেডিটেশন অত্যন্ত জরুরি।

সঠিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ

ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ফলিক এসিড (Folic Acid) শুরু করুন। পাশাপাশি ভিটামিন-ডি এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড ডিম্বাণুর গুণমান উন্নত করতে সাহায্য করে।

চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ঔষধ 

ঘরোয়া পদ্ধতিতে কাজ না হলে, বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা সাধারণত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করেন। মনে রাখবেন, কোনো ঔষধই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করবেন না।

  1. ওভুলেশন ইন্ডাকশন (Ovulation Induction): ডাক্তাররা সাধারণত ক্লোমিফেন সাইট্রেট (Clomiphene) অথবা লেট্রোজল (Letrozole) নামক ঔষধ প্রেসক্রাইব করেন। এই ঔষধগুলো ওভারিকে সংকেত দেয় নির্দিষ্ট সময়ে ডিম্বাণু বড় করার জন্য। পিসিওএস রোগীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে লেট্রোজল বেশি জনপ্রিয়।

  2. ইনসুলিন সেনসিটাইজার: যদি আপনার PCOS থাকে, তবে ডাক্তার আপনাকে মেটফর্মিন (Metformin) দিতে পারেন। এটি সরাসরি প্রজনন ঔষধ না হলেও ইনসুলিন লেভেল ঠিক করে ওভুলেশন নিয়মিত করতে সাহায্য করে।

  3. আইইউআই (IUI): যদি ওভুলেশন ঔষধ কাজ না করে বা স্বামীর শুক্রাণুর সমস্যা থাকে, তবে ডাক্তার ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন বা IUI-এর পরামর্শ দিতে পারেন।

সহবাসের সঠিক সময় (Timing Intercourse)

যেহেতু অনিয়মিত পিরিয়ডে ওভুলেশনের সঠিক দিনক্ষণ আগে থেকে বলা কঠিন, তাই ডাক্তাররা সাধারণত পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর থেকে পরবর্তী পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতি ২ বা ৩ দিন অন্তর মেলামেশার পরামর্শ দেন।

মনে রাখবেন, শুক্রাণু নারীর শরীরে ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু ডিম্বাণু মাত্র ১২-২৪ ঘণ্টা জীবিত থাকে। তাই ওভুলেশনের আগে থেকেই শুক্রাণু শরীরে উপস্থিত থাকলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা সর্বোচ্চ হয়।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQs)

প্রশ্ন: মাসিক অনিয়মিত হলে কি ওভুলেশন হয়?
উত্তর: অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়মিত মাসিকের অর্থ হলো অনিয়মিত ওভুলেশন। তবে কিছু ক্ষেত্রে অ্যানোভুলেটরি সাইকেল বা ওভুলেশন ছাড়াই পিরিয়ড হতে পারে। টিভিএস বা প্রোজেস্টেরন টেস্টের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়।

প্রশ্ন: কতদিন চেষ্টা করার পর ডাক্তার দেখাব?
উত্তর: আপনার বয়স যদি ৩৫-এর কম হয়, তবে ১ বছর স্বাভাবিক চেষ্টার পর। আর বয়স ৩৫-এর বেশি হলে বা পিরিয়ড যদি ৩ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

প্রশ্ন: পিসিওএস (PCOS) থাকলে কি স্বাভাবিকভাবে মা হওয়া সম্ভব?
উত্তর: অবশ্যই সম্ভব। পিসিওএস এখন অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা এবং সঠিক ডায়েট ও সামান্য চিকিৎসায় পিসিওএস আক্রান্ত নারীরা সফলভাবে সুস্থ সন্তান ধারণ করছেন।

উপসংহার

অনিয়মিত পিরিয়ড গর্ভধারণের পথকে কিছুটা চ্যালেঞ্জিং করতে পারে, কিন্তু এটি অসম্ভব কিছু নয়। আপনার প্রয়োজন সঠিক কারণ শনাক্ত করা এবং ধৈর্য ধরে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও চিকিৎসার সংমিশ্রণ ঘটানো। “কেন হচ্ছে না”—এই দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে ওভুলেশন ট্র্যাকিং এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকে মনোনিবেশ করুন, সাফল্য আসবেই।

Shopping Cart
Scroll to Top