খেজুর

খেজুর: ঐতিহ্য, চাষাবাদ, জাত, পুষ্টিগুণ এবং উপকারিতা

মরুভূমির ‘মিষ্টি সোনা’ হিসেবে পরিচিত খেজুর শুধু একটি ফলই নয়, এটি পুষ্টি, শক্তি এবং ইতিহাসের এক দারুণ সমন্বয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খেজুর, যার উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও। আপনি কি জানেন, খেজুরের পুষ্টিগুণ এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা কতটা ব্যাপক?

খেজুরের প্রধান উৎস হলো খেজুর গাছ, যার বৈজ্ঞানিক নাম Phoenix dactylifera। ঐতিহাসিকভাবে, এই ফলটি মেসোপটেমীয় সভ্যতা এবং প্রাচীন মিশরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি কেবল খাদ্য হিসেবেই নয়, বরং তাদের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। সাংস্কৃতিকভাবে, খেজুর রমজান মাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এবং এটি ইফতারের একটি অপরিহার্য প্রতীক।

খেজুরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

খেজুরের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো এবং মানব সভ্যতার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর উৎপত্তির সম্ভাব্য স্থান হিসেবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে বিবেচনা করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দেও পূর্বাঞ্চলীয় আরবে এর চাষ হতো।  মেসোপটেমীয় সভ্যতা, প্রাচীন মিশর ও সিন্ধু সভ্যতায় এর ব্যাপক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।  খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ার মানুষ খেজুর খেত, এবং হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতায়ও (খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১১০০ সাল) এর প্রচলন ছিল।  প্রাচীন মিশরীয়রা খেজুরকে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করত এবং তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এটি ব্যবহার করত। সে সময় ব্যাবিলনেও খেজুরের ব্যবহার ছিল।

বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে খেজুরের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পবিত্র কুরআন ও বাইবেলে এই ফলের কথা বলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে খেজুরকে পবিত্র ফল হিসেবে গণ্য করা হয়, বিশেষ করে রমজান মাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআনে প্রায় ২০ বার খেজুরের উল্লেখ রয়েছে এবং এটিকে জান্নাতের ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে যে প্রসব বেদনার সময় আল্লাহ তাকে খেজুর খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

রমজানের ইফতারে খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা একটি ঐতিহ্যগত রীতি, যার স্বাস্থ্যগত সুবিধাও রয়েছে।  এই সময়ে খেজুর খাওয়া সুন্নত হিসেবে পালিত হয়, কারণ নবী করিম (সা.) খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরে শক্তির জোগান দিতে খেজুর অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়াও, বিয়ে এবং আশুরার মতো বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও খেজুরের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। 

খেজুরের পুষ্টিগুণ: একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ 

 খেজুর পুষ্টির এক অসাধারণ উৎস। একে প্রাকৃতিক শক্তির উৎস বলা হয়, কারণ এর শর্করার প্রায় ৮০%-ই হলো ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ, যা শরীরে দ্রুত শক্তি যোগায়।  এছাড়াও এটি বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ এবং স্বাস্থ্যকর উপাদানে ভরপুর। 

১০০ গ্রাম মেডজুল খেজুরের পুষ্টির একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো (USDA Food Data Central অনুযায়ী):

১০০ গ্রাম খেজুরের পুষ্টি উপাদান

পুষ্টি উপাদান পরিমাণ (প্রায়) দৈনিক চাহিদার শতাংশ (DV) প্রধান কাজ
ক্যালোরি ২৭৭ ক্যালরি ১৪% শরীরের শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
কার্বোহাইড্রেট ৭৫ গ্রাম ২৫% মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও शारीरिक শক্তির জন্য জরুরি।
ডায়েটারি ফাইবার ৬.৭ গ্রাম ২৪% খাদ্য আঁশের এক চমৎকার উৎস হওয়ায় এটি হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে। 
চিনি (প্রাকৃতিক) ৬৬.৫ গ্রাম   শরীরে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে।
প্রোটিন ১.৮ গ্রাম ৪% কোষ গঠন এবং মাংসপেশি সুরক্ষায় সহায়তা করে।
খনিজ পদার্থ      
পটাশিয়াম ৬৯৬ মিলিগ্রাম ১৫% এর উচ্চ পটাশিয়াম উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।  এটি শরীরের সোডিয়ামের ভারসাম্য রক্ষা করে। 
ম্যাগনেসিয়াম ৫৪ মিলিগ্রাম ১৩% উচ্চ রক্তচাপ কমাতে এবং হাড়ের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 
কপার ০.৩৬২ মিলিগ্রাম ৪০% আয়রন শোষণে এবং শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে।
ম্যাঙ্গানিজ ০.২৯৬ মিলিগ্রাম ১৩% হাড়ের স্বাস্থ্য এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইম তৈরিতে সহায়ক।
আয়রন ০.৯ মিলিগ্রাম ৫% রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে এবং রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে। 
সেলেনিয়াম ৩ মাইক্রোগ্রাম ৫% এটি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা কোষকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়।
ভিটামিন      
ভিটামিন বি৬ ০.২৪৯ মিলিগ্রাম ১৫% মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। 
ভিটামিন কে ২.৭ মাইক্রোগ্রাম ২% রক্ত জমাট বাঁধতে এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজন। 
ভিটামিন এ ৭ মাইক্রোগ্রাম ১% দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। 

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান:

খেজুরে পলিফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো শরীরের কোষকে ফ্রি-র‍্যাডিক্যালের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, যা বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। খেজুরের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) মাঝারি ধরনের হওয়ায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায় না, তবে ডায়াবেটিস রোগীদের পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। 

এছাড়াও, খেজুর Electrolyte বা খনিজ লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা ব্যায়াম বা গরম আবহাওয়ায় শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া খনিজ পূরণে কার্যকর। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা পালন করে, কারণ এটি রক্তনালীকে শিথিল করে এবং সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব কমায়। অপরদিকে, খাদ্য আঁশ বা ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে। এটি মলের পরিমাণ বাড়িয়ে অন্ত্রের চলাচল নিয়মিত রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়তা করে। তাই পরিমিত পরিমাণে খেজুর গ্রহণ আপনার দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে। 

খেজুরের প্রমাণিত স্বাস্থ্য উপকারিতা

খেজুরের স্বাস্থ্য উপকারিতা শুধুমাত্র প্রচলিত ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। নিচে এর উল্লেখযোগ্য কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা তুলে ধরা হলো:

  • তাৎক্ষণিক শক্তি প্রদান করে: খেজুর প্রাকৃতিক চিনি, বিশেষ করে ফ্রুক্টোজ এবং ডেক্সট্রোজের একটি চমৎকার উৎস, যা শরীরকে তাৎক্ষণিকভাবে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। সারাদিন রোজা রাখার পর বা কঠোর পরিশ্রমের পর দ্রুত শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য খেজুর একটি আদর্শ খাবার। 
  • মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য উন্নত করে: গবেষণায় দেখা গেছে, খেজুর মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য উন্নতিতে সহায়ক। পরীক্ষাগারে গবেষণায় দেখা গেছে যে খেজুর মস্তিষ্কে ইন্টারলিউকিন-৬ (IL-6) এর মতো প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান কমাতে সাহায্য করে। উচ্চ মাত্রার IL-6 আলঝেইমারের মতো নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।  “জার্নাল অফ এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ফুড কেমিস্ট্রির এক গবেষণা অনুযায়ী” খেজুরের উপাদান মস্তিষ্কে প্লেক তৈরি প্রতিরোধ করে স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। খেজুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিশেষ করে ফ্ল্যাভোনয়েড, মস্তিষ্কের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। 
  • হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী: খেজুর ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, কপার এবং ম্যাঙ্গানিজের মতো খনিজ পদার্থে ভরপুর। এই খনিজ উপাদানগুলো হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং অস্টিওপরোসিসের মতো হাড়-ক্ষয়জনিত রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: খেজুর উচ্চ মাত্রার খাদ্য আঁশ বা ফাইবারে সমৃদ্ধ। প্রায় ১০০ গ্রাম খেজুরে ৭ গ্রাম ফাইবার থাকে, যা হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং মল তৈরি সহজ করে।  এটি কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে এবং একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা ২১ দিন ধরে প্রতিদিন ৭টি করে খেজুর খেয়েছেন, তাদের মলত্যাগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 
  • রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে: অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার একটি প্রধান কারণ হলো শরীরে আয়রনের ঘাটতি। খেজুর আয়রনের একটি ভালো উৎস হওয়ায় এটি রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।  আয়রন প্রতিরোধ করে অ্যানিমিয়া।
  • হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা দেয়: খেজুরে থাকা পটাশিয়াম এবং সামান্য সোডিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, যা হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।  এর ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা কমাতে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরোধ করে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস।
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর: অন্যান্য শুকনো ফলের তুলনায় খেজুরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এতে ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড ও ফেনোলিক অ্যাসিডের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। খেজুরে থাকা এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে ফ্রি-র‍্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করে, যা ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। 
  • প্রাকৃতিক প্রসব ত্বরান্বিত করে: গর্ভধারণের শেষ কয়েক সপ্তাহে খেজুর খাওয়া প্রসব প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে। PubMed-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসকল গর্ভবতী নারী প্রসবের ৪ সপ্তাহ আগে থেকে প্রতিদিন ৬টি করে খেজুর খেয়েছেন, তাদের সার্ভিকাল ডায়ালেশন (জরায়ুমুখের প্রসারণ) তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল এবং তাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রসবের হারও বেশি ছিল।  খেজুরে থাকা ট্যানিন নামক যৌগ জরায়ুর সংকোচনকে সহজ করে এবং এটি অক্সিটোক্সিন হরমোনের মতো কাজ করে বলে মনে করা হয়, যা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য সহায়ক। 

বিশ্বে জনপ্রিয় খেজুরের জাত (ছবিসহ পরিচিতি)

বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন হাজার প্রজাতির খেজুর থাকলেও কয়েকটি জাত তাদের বিশেষ স্বাদ, পুষ্টি ও সৌন্দর্যের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। নিচে এমন কিছু জনপ্রিয় খেজুরের জাত সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

আজওয়া (Ajwa): 

নবী (সাঃ) এর খেজুর” হিসেবে পরিচিত আজওয়া খেজুর সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। আজওয়া খেজুরকে এর বিশেষ ঔষধি গুণের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান মনে করা হয়।  হাদিসে এই খেজুরকে জান্নাতের ফল বলা হয়েছে এবং এর রোগ নিরাময়ের গুণের কথা উল্লেখ আছে।  এটি দেখতে কালো, গোলাকার এবং আকারে ছোট থেকে মাঝারি হয়। এর স্বাদ হালকা মিষ্টি এবং আসল আজওয়ার গায়ে সূক্ষ্ম সাদা রেখা দেখা যায়।  বাংলাদেশে এর দাম প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। 

আজওয়া খেজুর

মেডজুল (Medjool)

খেজুরের রাজা” হিসেবে খ্যাত মেডজুল খেজুর তার বিশাল আকার এবং মাখনের মতো টেক্সচারের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এটি খেতে বেশ নরম, রসালো এবং এর স্বাদ অনেকটা ক্যারামেলের মতো।  এই খেজুরে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ফাইবার থাকে। উত্তর আফ্রিকা, বিশেষ করে মরক্কোকে এর উৎপত্তিস্থল মনে করা হয়।  এর বড় আকারের একটি বৈশিষ্ট্য। 

মেডজুল Medjool

মাবরুম (Mabroom)

সৌদি আরবের অন্যতম উৎকৃষ্ট এই খেজুরটি লম্বাটে, গাঢ় লালচে-বাদামী রঙের এবং কিছুটা শক্ত ও চিবিয়ে খাওয়ার মতো। এর স্বাদ মাঝারি মিষ্টি এবং এতে ক্যারামেলের হালকা ছোঁয়া পাওয়া যায়। মাবরুম খেজুরও বেশ পুষ্টিকর এবং আরব বিশ্বে জনপ্রিয়। 

মাবরুম (Mabroom)

সুক্কারি (Sukkari)

আরবি ‘সুক্কার’ বা ‘চিনি’ শব্দ থেকে এর নামকরণ, যা এর মিষ্টি স্বাদের পরিচয় দেয়। সোনালি-বাদামী রঙের এই খেজুর মুখে দিলে প্রায় গলে যায়। সৌদি আরবের আল-কাসিম অঞ্চলে এর চাষ হয়। ক্লান্তি দূর করতে এবং কোলেস্টেরল কমাতে এটি উপকারী। এর দামও তুলনামূলকভাবে কম।

সুক্কারি

সাফাওয়ি (Safawi)

মদিনায় উৎপাদিত এই খেজুরটি নরম এবং রসালো হয়। এর রঙ গাঢ় কালো এবং এটি ভিটামিনে ভরপুর। খালি পেটে খেলে এটি পেটের কৃমি নাশ করতে পারে বলে প্রচলিত আছে। 

সাফাওয়ি

আম্বর (Amber)

মদিনা শহরে উৎপাদিত খেজুরগুলোর মধ্যে আম্বর আকারের দিক থেকে সবচেয়ে বড়।  তবে এর বীজ খুব ছোট হওয়ায় খাওয়ার অংশ বেশি থাকে। এটি অত্যন্ত নরম, মাংসল এবং অভিনব স্বাদের জন্য বিখ্যাত। এর রঙ গাঢ় লাল এবং দাম বেশ চড়া। এটি আরবে ‘আনবারা’ নামেও পরিচিত। 

আম্বর

দেগলেত নূর (Deglet Noor)

আলোর খেজুর” নামে পরিচিত এই খেজুরটি অর্ধ-শুষ্ক এবং এর স্বাদ কিছুটা বাদামের মতো। এটি আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ায় প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয় এবং রান্নার কাজে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। 

দেগলেত নূর

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য জাত:

খুদরি (Khudri): গাঢ় বাদামী রঙের এই খেজুরটি আকারে বেশ বড় এবং কম মিষ্টি।  সতেজ থাকার কারণে এটি বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করা হয়। 

কালমি (Kalmi): এটি দেখতে কালো এবং গাঢ় খয়েরি রঙের হয় এবং স্বাদে অনেকটা মরিয়ম খেজুরের মতো। 

মরিয়ম (Mariam): খয়েরি ও কালো রঙের লম্বাটে এই খেজুরটি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়, বিশেষ করে ইফতারের সময়।  এটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা শক্ত ও শুকনো প্রকৃতির। 

জাহেদি (Zahidi): সোনালি রঙের, ডিম্বাকার এবং পুরু ত্বকের এই খেজুরটিতে চিনির পরিমাণ কম থাকে এবং এটি উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ। 

খেজুর চাষাবাদ: গাছ রোপণ থেকে ফসল সংগ্রহ

সঠিক পদ্ধতিতে খেজুর চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। এর জন্য উপযুক্ত জলবায়ু থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই যত্নবান হতে হয়।

  • উপযুক্ত জলবায়ু ও মাটি: পর্যাপ্ত রোদ, উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া, এবং কম বৃষ্টিপাত খেজুর চাষের জন্য উপযোগী। এই গাছ লবণাক্ত ও সাময়িক জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। বেলে-দো-আঁশ মাটি খেজুর চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, তবে মাটি উপযুক্ত না হলে গর্ত করে জৈব পদার্থ ও বালি মিশ্রিত মাটি দিয়ে ভরাট করে চারা রোপণ করা যায়।  পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকা জরুরি। 
  • বংশবিস্তার: খেজুর গাছের প্রজনন পদ্ধতি মূলত দুই ধরনের।  একটি হলো মাতৃগাছের কাণ্ড থেকে গজানো অফ-শুট (তেউড় বা সাকার) সংগ্রহ করে নতুন বাগান তৈরি করা। অন্যটি হলো টিস্যু কালচার পদ্ধতি। বীজ থেকে উৎপাদিত চারার ক্ষেত্রে গাছের জাতের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে না এবং প্রায় ৮০ ভাগেরও বেশি গাছ পুরুষ হতে পারে।] অপরদিকে, টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে স্ত্রী গাছ থেকে শুধু স্ত্রী চারা তৈরি করা হয়, যা রোপণের তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই ফল দিতে সক্ষম। খেজুর গাছ এর প্রজনন পদ্ধতি হলো টিস্যু কালচার ।
  • পরাগায়ন: খেজুর গাছ একলিঙ্গ, অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা হয়।  তাই ভালো ফলনের জন্য কৃত্রিম পরাগায়ন অপরিহার্য।  খেজুর গাছের সফল পরাগায়নের জন্য পুরুষ গাছের ফুল থেকে রেণু সংগ্রহ করে স্ত্রী গাছের ফুলে স্থাপন করতে হয়।  স্ত্রী গাছে ফুল আসার পর এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়, যা ফলন নিশ্চিত করে। 
  • সেচ ও সার প্রয়োগ: খেজুর গাছ খরা সহনশীল হলেও ভালো ফলনের জন্য নিয়মিত সেচ প্রয়োজন। বিশেষ করে ফুল ফোটা ও ফল বড় হওয়ার সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা দরকার। উন্নত সেচ ব্যবস্থাপনার জন্য ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।  গাছের বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য সুষম মাত্রায় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা উচিত। 
  • রোগ ও পোকামাকড় দমন: খেজুর গাছ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যেমন—লিফ ব্লাইট বা পাতা ঝলসানো রোগ, শুটি মোল্ড (পাতায় কালো ময়লা জমা) এবং গোড়া পচা রোগ। পোকার মধ্যে স্কেল বা খোসা পোকা এবং রেড পাম উইভিল (সূঁস পোকা) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।  নিয়মিত বাগান পরিদর্শন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করে এসব রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায়। 
  • ফল সংগ্রহ: খেজুর সংগ্রহের উপযুক্ত সময় হলো এর পাকার পর্যায়, যা স্থানীয়ভাবে ডোক্কা, ডেং বা পিন্ড নামে পরিচিত। আরবিতে খেজুর পাকার বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে, যেমন: কাঁচা সবুজ ফলকে ‘কিমরি’, পুষ্ট বা আধা-পাকা ফলকে ‘খালাল’ (হলুদ বা লাল), নরম পাকা ফলকে ‘রুতাব’ এবং সবশেষে শুকনো পাকা ফলকে ‘তমর’ বলা হয়। সাধারণত, খেজুর পেকে গেলে গাছ থেকে কাঁদি কেটে ফল সংগ্রহ করা হয়।

 বাংলাদেশে খেজুর: চাষ, অর্থনীতি ও ঐতিহ্য

বাংলাদেশে খেজুরের দুটি ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। একটি হলো দেশীয় খেজুর গাছ, যা মূলত রসের জন্য জনপ্রিয়; অন্যটি হলো বিদেশি জাতের ফলের খেজুর, যার চাষ সম্প্রতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

রস ও গুড়ের ঐতিহ্য:

শীতের সকালে খেজুরের তাজা রস আর পাটালি গুড়ের পায়েস বাঙালির এক চিরন্তন ঐতিহ্য।  শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে এই গাছের রস ও গুড় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শীত এলেই ‘গাছি’রা খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করেন এবং তা থেকে তৈরি হয় জিভে জল আনা নলেন গুড় ও পাটালি গুড়। বিশেষ করে যশোর ও ফরিদপুর অঞ্চল তাদের উৎকৃষ্ট মানের খেজুরের গুড়ের জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত। যশোর → এর জন্য বিখ্যাত (Is famous for) → খেজুরের গুড়। গাছি → সংগ্রহ করে (Collects) → খেজুরের রস। এই গুড় গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিদেশি জাতের ফলের চাষ:

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে ময়মনসিংহ, ভালো খবর, রাজশাহী, পাবনাসহ দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সৌদি আরবের ও অন্যান্য দেশের দামী জাতের খেজুর চাষে সাফল্য আসছে। বারহি, মেডজুল, আজওয়া, আম্বার ও সুক্কারি জাতের মতো খেজুর এখন দেশের মাটিতেই উৎপাদিত হচ্ছে, যা এক নতুন কৃষি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। 

  • সম্ভাবনা: আমদানি করা খেজুরের উচ্চ মূল্যের কারণে স্থানীয়ভাবে চাষ করা খেজুরের বড় বাজার রয়েছে। এটি কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক ফসল হতে পারে এবং দেশের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এই বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছে এবং সফলভাবে কয়েকটি জাত সনাক্ত করেছে। 
  • চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত খেজুরের ফল পাকা ও শুকানোর পর্যায়ে বড় বাধা সৃষ্টি করে।  সফল পরাগায়ন, পোকামাকড় দমন এবং সঠিক পরিচর্যার জন্য বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন, যা এখনও অনেক কৃষকের কাছে সহজলভ্য নয়। তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে বিদেশি খেজুর চাষের পরিধি দিন দিন বাড়ছে। 

কিভাবে ভালো খেজুর চিনবেন এবং সংরক্ষণ করবেন?

ক্রেতাদের জন্য খেজুর কেনার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। ভালো মানের খেজুর চেনার উপায় নিচে দেওয়া হলো:

  • ক্রয়ের সময় লক্ষণীয় বিষয়:
    • রঙ ও উজ্জ্বলতা: সতেজ খেজুরের রঙ সাধারণত উজ্জ্বল ও সমান হয়। জাতের ওপর নির্ভর করে রঙ গাঢ় বা হালকা হতে পারে, তবে বিবর্ণ বা ফ্যাকাশে খেজুর পুরানো বা নষ্ট হওয়ার লক্ষণ।
    • ত্বকের মসৃণতা: ভালো খেজুরের চামড়া সাধারণত মসৃণ, অক্ষত এবং কিছুটা চকচকে থাকে। খুব বেশি কুঁচকানো বা ফাটা ত্বক এড়িয়ে চলুন, কারণ এটি খেজুরের শুষ্কতার ইঙ্গিত দেয়।
    • চিনির স্ফটিক: খেজুরের ত্বকের ওপর সাদা চিনির আস্তরণ বা স্ফটিক থাকা মানে এটি পুরোনো হতে পারে।
    • গঠন: খেজুর হাতে নিয়ে হালকা চাপ দিলে সেটি নরম এবং মাংসল অনুভূত হওয়া উচিত, অতিরিক্ত শক্ত বা একদম নরম নয়।
    • গন্ধ: সতেজ খেজুরে মিষ্টি গন্ধ থাকে। টক বা কোনো অপ্রীতিকর গন্ধযুক্ত খেজুর কেনা থেকে বিরত থাকুন।
  • সংরক্ষণ পদ্ধতি:
    • নরম ও অর্ধ-শুষ্ক খেজুর: মেডজুল বা আজওয়ার মতো নরম ও রসালো খেজুর বায়ুরোধী পাত্রে ভরে ফ্রিজে রাখলে এর সতেজতা ও আর্দ্রতা কয়েক মাস পর্যন্ত বজায় থাকে।
    • শুকনো খেজুর: জাহেদি বা দেগলেত নূরের মতো শুকনো খেজুর বায়ুরোধী পাত্রে মুখ বন্ধ করে সাধারণ তাপমাত্রায়, সরাসরি রোদ ও আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখলে অনেকদিন ভালো থাকে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে খেজুরের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বহু মাস ধরে পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে।

রান্নায় খেজুরের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার

খেজুর শুধু সরাসরি খাওয়ার জন্যই নয়, এটি বিভিন্ন রান্নায় প্রাকৃতিক মিষ্টি হিসেবে চমৎকার কাজ করে। খেজুর → এর একটি উপকরণ (Is an ingredient for) → মিল্কশেক, লাড্ডু। এর কিছু বৈচিত্র্যময় ব্যবহার নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • খেজুরের মিল্কশেক বা স্মুদি: দুধ, খেজুর এবং সামান্য বরফ একসঙ্গে ব্লেন্ড করে একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু মিল্কশেক তৈরি করা যায়। এর সাথে কলা বা পছন্দের কোনো বাদাম যোগ করলে স্বাদ আরও বাড়ে।
  • খেজুর ও বাদামের লাড্ডু: এটি একটি স্বাস্থ্যকর ও শক্তিবর্ধক নাস্তা। বীজ ফেলে দেওয়া খেজুরের সঙ্গে ভাজা বাদাম, ওটস ও সামান্য ঘি বা মধু মিশিয়ে পিষে ছোট ছোট বল বা লাড্ডু (Energy Ball) তৈরি করা হয়।
  • স্টাফড ডেটস: এটি একটি জনপ্রিয় ও ঝটপট তৈরি করার মতো খাবার। খেজুরের বীজ ফেলে দিয়ে তার ভেতরে পনির, কাঠবাদাম বা পেস্তা ভরে পরিবেশন করা হয়।
  • খেজুরের চাটনি: মিষ্টি ও টক স্বাদের এই চাটনি তেঁতুলের ক্বাথ, খেজুর ও বিভিন্ন মশলা দিয়ে তৈরি করা হয়, যা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা যায়। এছাড়া, চিনির স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে খেজুরের শরবত বা ডেট সিরাপ (Date Syrup) তৈরি করেও ব্যবহার করা যায়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. ডায়াবেটিস রোগীরা কি খেজুর খেতে পারবেন?

হ্যাঁ, ডায়াবেটিস রোগীরা পরিমিত পরিমাণে খেজুর খেতে পারবেন। খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাঝারি, যা ৪২ থেকে ৫৫ এর মধ্যে থাকে। এর উচ্চ ফাইবার উপাদান রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণে খেজুর খেলে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে বাড়ে না। তবে দিনে ১-৩টির বেশি না খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। 

২. প্রতিদিন কয়টি খেজুর খাওয়া উচিত?

সাধারণত একজন সুস্থ ব্যক্তি প্রতিদিন ২-৪টি খেজুর খেতে পারেন। এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, ফাইবার ও পুষ্টির জোগান দেয়। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাদের জন্য দিনে ২-৩টি খেজুরই যথেষ্ট। তবে শারীরিক অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে এর পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে। 

৩. খেজুর খেলে কি ওজন বাড়ে?

পরিমিত পরিমাণে খেলে খেজুর ওজন বাড়ায় না, বরং নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এর ফাইবার ক্ষুধা কমায়। তবে খেজুরে ক্যালরির পরিমাণ বেশি হওয়ায় (১০০ গ্রামে প্রায় ২৭৭ ক্যালরি) অতিরিক্ত খেলে তা শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে পারে এবং ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। যারা স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বাড়াতে চান, তাদের খাদ্যতালিকায় খেজুর একটি চমৎকার সংযোজন হতে পারে। 

৪. আজওয়া ও মেডজুল খেজুরের মধ্যে পার্থক্য কী?

আজওয়া এবং মেডজুল দুটি ভিন্ন জাতের জনপ্রিয় খেজুর। আজওয়া খেজুর সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে উৎপাদিত হয়, এটি আকারে ছোট ও কালো রঙের হয় এবং ঔষধি গুণের জন্য বিখ্যাত। এটিকে “নবী (সাঃ) এর খেজুর” বলা হয়। অন্যদিকে, মেডজুল খেজুর “খেজুরের রাজা” হিসেবে পরিচিত, যা আকারে অনেক বড়, নরম এবং ক্যারামেলের মতো মিষ্টি স্বাদের হয়। মেডজুল খেজুরের উৎপত্তিস্থল মূলত মরক্কো।

৫. খেজুরের রস কখন সংগ্রহ করা হয়?

বাংলাদেশে সাধারণত শীতকালে, অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। শীত বাড়ার সাথে সাথে রসের পরিমাণ ও মান বাড়ে, বিশেষ করে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। গাছিরা মূলত বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে গাছে মাটির হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেন এবং সকালে সেই রস সংগ্রহ করেন। 

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, খেজুর শুধু একটি সুস্বাদু ফল নয়, এটি পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং ঐতিহ্যের এক অসাধারণ সমন্বয়। এর সমৃদ্ধ ইতিহাস, ব্যাপক স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এটিকে একটি অনন্য ফলে পরিণত করেছে। আপনার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় খেজুরকে অন্তর্ভুক্ত করে এর অসামান্য সুবিধাগুলো উপভোগ করুন।

Shopping Cart
error: Content is protected !!
Scroll to Top