শীতকাল বা সরস্বতীয় পূজার সময় প্রসাদে আমরা একটি বিশেষ সাদা রঙের, রসালো এবং মচমচে কন্দজাতীয় ফল দেখতে পাই, যা খেতে কিছুটা মিষ্টি আলুর মতো কিন্তু স্বাদে অনেকটা পানসে ও মিষ্টির সংমিশ্রণ। এটিই হলো শঙ্খমূল বা শাঁকালু (যাকে ইংরেজিতে Jicama বা Yam Bean বলা হয়)। বৈজ্ঞানিকভাবে Pachyrhizus erosus নামে পরিচিত এই মূলটি শুধুমাত্র সুস্বাদু নয়, বরং এর পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা অপরিসীম।
এই আর্টিকেলে আমরা শঙ্খমূলের পুষ্টিগুণ, ওষধি গুণাগুণ এবং মানবদেহের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে এর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শঙ্খমূল বা শাঁকালু কী?
শঙ্খমূল মূলত মেক্সিকান এবং মধ্য আমেরিকান অঞ্চলের উদ্ভিদ হলেও, এটি দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি মাটির নিচে হওয়া এক ধরণের কন্দ (Tuber)। এর ওপরের ত্বক খসখসে বাদামী রঙের এবং ভেতরে ধবধবে সাদা শাঁস থাকে। এর গঠন অনেকটা শালগমের মতো।
শঙ্খমূলের পুষ্টিগুণ (Nutritional Profile)
শঙ্খমূলকে ‘সুপারফুড’ বলা যেতে পারে কারণ এতে ক্যালোরি খুব কম কিন্তু পুষ্টির ঘনত্ব অনেক বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম শঙ্খমূলে নিচের পুষ্টি উপাদানগুলো থাকে:
-
জলীয় অংশ: ৮৫-৯০% (যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে)
-
ক্যালোরি: ৩৮-৪০ কিলোক্যালোরি (লো-ক্যালোরি ডায়েটের জন্য আদর্শ)
-
ফাইবার (আঁশ): ৪.৯ গ্রাম (প্রয়োজনীয় ইনুলিন ফাইবার সমৃদ্ধ)
-
ভিটামিন সি: ২০ মি.গ্রা. (দৈনিক চাহিদার প্রায় ৪০%)
-
পটাশিয়াম: ১৫০ মি.গ্রা.
-
অন্যান্য খনিজ: আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফোলেট, ম্যাঙ্গানিজ এবং তামা।
-
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: বিটা-ক্যারোটিন, সেলেনিয়াম এবং ভিটামিন-ই এর উপস্থিতি।
শঙ্খমূলের স্বাস্থ্য উপকারিতা
শঙ্খমূলের উপকারিতা নিয়ে নিচে বিষদভাবে আলোচনা করা হলো যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং সিস্টেমের সাথে সম্পর্কিত:
১. হজম শক্তি বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণ (Digestive Health)
শঙ্খমূলের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ডায়েটারি ফাইবার বা ভোজ্য আঁশ। বিশেষত এতে ‘ইনুলিন’ (Inulin) নামক এক ধরণের দ্রবণীয় ফাইবার থাকে।
-
কার্যকারিতা: ইনুলিন অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার (প্রোবায়োটিক) খাবার হিসেবে কাজ করে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
-
ফলাফল: এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে এবং বাউয়েল মুভমেন্ট (Bowel Movement) স্বাভাবিক রাখে।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বুস্ট করে (Immune System)
শঙ্খমূলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
-
সত্তা সম্পর্ক (Entity Relationship): শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) উৎপাদন বৃদ্ধি।
-
উপকারিতা: এটি শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায় এবং ফ্রি র্যাডিকেলের বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্যান্সার, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে।
৩. হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ (Heart Health)
হৃদযন্ত্রের সুস্থতায় শঙ্খমূল একটি অসাধারণ প্রাকৃতিক উপাদান।
-
পটাশিয়ামের ভূমিকা: এতে থাকা উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম রক্তনালীকে প্রসারিত করে (Vasodilation), যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) নিয়ন্ত্রণে থাকে।
-
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: শঙ্খমূলের ফাইবার রক্ত থেকে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করে, যা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
৪. ওজন কমাতে শঙ্খমূলের ভূমিকা (Weight Management)
যারা ওজন কমাতে চান, তাদের ডায়েট চার্টে শঙ্খমূল একটি অপরিহার্য উপাদান হতে পারে।
-
লো গ্লাইসেমিক লোড: এতে ক্যালোরি খুব কম কিন্তু ফাইবার ও জলীয় অংশ বেশি। এটি খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি (Satiety) তৈরি হয়।
-
ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ: ক্ষুধা নিবারণকারী হরমোনকে প্রভাবিত করে এটি অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়।
৫. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী (Blood Sugar Control)
মিষ্টি স্বাদ হওয়া সত্ত্বেও শঙ্খমূলের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) তুলনামূলক কম।
-
ইনসুলিন সংবেদনশীলতা: এর ফাইবার রক্তে গ্লুকোজ শোষণের হার ধীর করে দেয়, ফলে খাওয়ার পর হঠাৎ করে ব্লাড সুগার স্পাইক (Spike) করে না। ইনসুলিন রেজিসট্যান্স কমাতে এটি সহায়ক।
৬. হাড়ের গঠন মজবুত করে (Bone Health)
শঙ্খমূলে অলিগোফ্রুক্টোজ ইনুলিন থাকে, যা শরীরে খনিজ শোষণ করার ক্ষমতা বাড়ায়।
-
মিনারেল শোষণ: এটি হাড়ের ক্ষয়রোধে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজ শোষণে সহায়তা করে, যা অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে কার্যকরী।
৭. ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি (Skin Care)
ভিটামিন সি কোলাজেন (Collagen) উৎপাদনে সহায়তা করে।
-
কার্যকারিতা: কোলাজেন ত্বকের নমনীয়তা ধরে রাখে এবং বলিরেখা পড়তে বাধা দেয়। শঙ্খমূলের জলীয় অংশ ত্বককে হাইড্রেটেড রাখে, ফলে ত্বক উজ্জ্বল দেখায়।
৮. হরমোনাল ভারসাম্য (Hormonal Balance)
মহিলাদের মেনোপজের সময় শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। শঙ্খমূলে ফাইটোইস্ট্রোজেন (Phytoestrogen) নামক উপাদান রয়েছে যা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মেনোপজ-কালীন সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৯. শঙ্খমূলের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের উপকারিতা
সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যের সাথে যৌন জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শঙ্খমূল বা শাঁকালু রক্ত সঞ্চালন, হরমোন নিয়ন্ত্রণ এবং স্ট্যামিনা ধরে রাখার মাধ্যমে যৌন স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি ও উদ্দীপনা (Improved Blood Circulation)
সুস্থ যৌন জীবনের জন্য যৌনাঙ্গ ও সারা শরীরে সঠিক রক্ত সঞ্চালন অত্যন্ত জরুরি।
-
কার্যকারিতা: শঙ্খমূলে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম এবং প্রাকৃতিক নাইট্রেট থাকে। এই উপাদানগুলো রক্তনালীকে প্রসারিত (Vasodilation) করতে সাহায্য করে।
-
ফলাফল: রক্তনালী প্রসারিত হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং প্রজনন অঙ্গে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, যা পুরুষদের ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা লিঙ্গোত্থান সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শুক্রাণুর গুণগত মান ও উর্বরতা বৃদ্ধি (Fertility & Sperm Health)
পুরুষ এবং মহিলা—উভয়ের প্রজনন ক্ষমতার জন্য শঙ্খমূলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানগুলো কার্যকর।
-
ফোলেট (Folate): শঙ্খমূলে ভালো মাত্রায় ফোলেট বা ভিটামিন বি-৯ থাকে, যা কোষ বিভাজনে সাহায্য করে এবং গর্ভধারণে ইচ্ছুক মহিলাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
-
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: এর ভিটামিন সি শুক্রাণুকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা ফ্রি র্যাডিকেলের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, যা শুক্রাণুর ঘনত্ব এবং গতিশীলতা (Motility) বাড়াতে সাহায্য করে।
শারীরিক শক্তি ও স্ট্যামিনা বৃদ্ধি (Energy & Stamina Boost)
যৌন মিলনের জন্য পর্যাপ্ত শারীরিক শক্তির প্রয়োজন। শঙ্খমূল ক্লান্তি দূর করে এনার্জি লেভেল বাড়ায়।
-
শর্করা: এতে যে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা থাকে, তা জটিল প্রকৃতির (Complex Carb)। ফলে এটি ধীর গতিতে হজম হয় এবং শরীরে দীর্ঘক্ষণ শক্তি বা স্ট্যামিনা বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা মিলনের সময় দ্রুত ক্লান্ত হওয়া রোধ করে।
হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা (Hormonal Balance)
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা লিবিডো বা যৌন আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দেয়।
-
ফাইটোইস্ট্রোজেন: শঙ্খমূলে উদ্ভিজ্জ হরমোন বা ফাইটোইস্ট্রোজেন থাকে, যা বিশেষত মহিলাদের মেনোপজকালীন হরমোন ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মুড সুইং বা মেজাজ খিটখিটে হওয়া কমাতে সাহায্য করে।
-
ম্যাগনেসিয়াম: এতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে এবং মানসিক চাপ কমায়। স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কম থাকলে যৌন আকাঙ্ক্ষা (Libido) স্বাভাবিক থাকে।
শঙ্খমূলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সতর্কতা
যদিও শঙ্খমূল খুবই উপকারী, তবুও কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি:
-
বিষাক্ত অংশ: শঙ্খমূল বা শাঁকালুর কন্দটি খাওয়ার উপযোগী হলেও এর পাতা, কাণ্ড, ফুল এবং বীজ অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে ‘রোটেনন’ (Rotenone) নামক প্রাকৃতিক কীটনাশক উপাদান থাকে, যা খেলে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
-
অতিরিক্ত ফাইবার: যাদের পেটে গ্যাস বা ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রোম (IBS) আছে, তারা অতিরিক্ত শঙ্খমূল খেলে পেট ফাঁপা বা বদহজমের সমস্যায় পড়তে পারেন।
শঙ্খমূল খাওয়ার সঠিক নিয়ম ও ব্যবহার
শঙ্খমূল কাঁচা এবং রান্না—উভয় ভাবেই খাওয়া যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এটি কাঁচা খাওয়ার প্রচলনই বেশি।
-
কাঁচা খাওয়া: খোসা ছাড়িয়ে ছোট টুকরো করে সামান্য বিট নুন, চাট মসলা এবং লেবুর রস মিশিয়ে সালাদ হিসেবে খাওয়া সেরা।
-
ফ্রুট সালাদ: আপেল, পেয়ারা এবং আনারসের সাথে মিশিয়ে পুষ্টিকর মিক্সড ফ্রুট সালাদ তৈরি করা যায়।
-
রান্না: মেক্সিকো বা দক্ষিণ আমেরিকায় এটি স্যুপ, স্টির-ফ্রাই বা সবজি হিসেবেও রান্না করে খাওয়া হয়। রান্নার পরেও এর মচমচে ভাব বজায় থাকে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শঙ্খমূলের উপকারিতা শুধুমাত্র একটি ঋতুভিত্তিক ফল হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং প্রয়োজনীয় খনিজের এক সমৃদ্ধ উৎস। হজমশক্তি বৃদ্ধি থেকে শুরু করে হার্টের সুরক্ষা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ—সর্বক্ষেত্রে এই শ্বেতশুভ্র কন্দটির জুড়ি মেলা ভার। তবে এর পুষ্টিগুণ পুরোপুরি পেতে শুধুমাত্র এর মূল বা কন্দ অংশটিই গ্রহণ করা উচিত এবং পাতা বা বীজ এড়িয়ে চলা উচিত।
শীতকালীন বা বসন্তের ডায়েট চার্টে শাঁকালু বা শঙ্খমূল যুক্ত করে আপনিও সুস্থ ও সবল থাকার পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ডায়াবেটিস রোগীরা কি শাঁকালু খেতে পারেন?
উত্তর: হ্যাঁ, পারেন। শাঁকালুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম এবং এতে প্রচুর ফাইবার আছে, যা রক্তে সুগারের মাত্রা হঠাৎ বাড়তে দেয় না। তবে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই শ্রেয়।
২. শঙ্খমূল কি ওজন বাড়ায়?
উত্তর: না, বরং এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। এতে ক্যালোরি কম এবং ফাইবার ও জল বেশি থাকায় এটি মেদ কমাতে সহায়ক।
৩. শাঁকালুর বীজ কি খাওয়া যায়?
উত্তর: একদমই না। শাঁকালুর বীজ এবং পাতায় বিষাক্ত উপাদান থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
