ইউনানি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ও প্রাণভোমরা শাখা হলো ‘ইলমুল আদভিয়া’ (Ilmul Advia বা Pharmacology)। আর এই শাখার মৌলিক নীতি ও সাধারণ তত্ত্বগুলো যে অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, তাকে ‘কুল্লিয়াতে আদভিয়া’ (Kulliyat-e-Advia বা General Principles of Pharmacology) বলা হয়।
কুল্লিয়াতে আদভিয়া পরিক্ষা প্রস্তুতি ১০০ মার্কের পূর্ণ সাজেশন প্রশ্ন
Table of Contents
Toggle১. কুল্লিয়াতে আদভিয়া কাহাকে বলে?
ভেষজবিজ্ঞানের যে অংশে ভেষজবিদ্যার সামগ্রিক মৌলিক বিষয়সমূহ আলোচিত হয়, তাকে কুল্লিয়াতে আদভিয়া তথা ভেষজবিজ্ঞানের মূলনীতি বলে। একে ‘উছুলে আদভিয়া’ নামেও অভিহিত করা হয়।
২. এলমুল আদভিয়া কাহাকে বলে ও কত প্রকার?
এলমুল আদভিয়ার অভিধানগত অর্থ ঔষধসমূহের জ্ঞান। আরবিতে ‘এলম’ অর্থ জ্ঞান এবং ‘দাওয়া’র বহুবচন ‘আদভিয়া’ অর্থ ঔষধসমূহ। এক কথায় ভেষজ তথা ঔষধি দ্রব্যাদি সম্পর্কিত বিভিন্নমুখী জ্ঞানকে এলমুল আদভিয়া বলা হয়।
ঔষধি দ্রব্যের পরিচয়, শ্রেণিবিন্যাস, গুণাগুণ, আময়িক (রোগে) প্রয়োগ এবং এতদসম্পর্কিত বিভিন্ন পরিভাষা এর অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজিতে একে Pharmacology এবং বাংলায় ঔষধবিজ্ঞান বা ভেষজবিজ্ঞান বলে। এলমুল আদভিয়া দুই ভাগে বিভক্ত। যথা-
১. এলমুল আদভিয়া মুফরাদাহ তথা ঔষধি দ্রব্যগুণবিজ্ঞান (Materia Medica): এতে মুফরাদ বা একক ঔষধ (Single drugs) নিয়ে আলোচনা করা হয়। একে ‘এলমুল মুফরাদাহ’ও বলে।
২. এলমুল আদভিয়া মুরাক্কাবাহ তথা ভেষজ নির্মাণবিজ্ঞান (Pharmaceutics): এতে মুরাক্কাব বা যৌগিক (Compound) ঔষধ তৈরির পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
৩. ত্রিবিধ মৌলিক সৃষ্টি কী?
পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত। যথা-
১. হায়ওয়ানাত অর্থাৎ চেতনশীল বা প্রাণীজাতীয় (Animate objects);
২. নাবাতাত অর্থাৎ উদ্ভিদ (Plants, Herbs); এবং
৩. জমাদাত অর্থাৎ অচেতন বা জড়জাতীয় (Inanimate objects)। এ জাতীয় বস্তুকে ‘মাদানিয়্যাত’ অর্থাৎ খনিজ দ্রব্য (Minerals)ও বলা হয়।
এই তিন প্রকার বস্তুকে একত্রে মাওয়ালীদে ছালাছাহ বা ত্রিবিধ মৌলিক সৃষ্টি বলে।
৪. যে সমস্ত বস্তু মানবদেহের পুষ্টিসাধন, স্বাস্থ্যরক্ষা ও রোগনিবারণে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর ক্রিয়া কত প্রকারে প্রকাশ পায়?
ক্রিয়া তিন প্রকারে প্রকাশ পায়। যথা-
১. বস্তুটির কৈফিয়্যত বা স্বভাবগত অবস্থা অনুসারে গঠিত ক্রিয়া। এরূপ ক্রিয়াবিশিষ্ট বস্তু দাওয়া বা ঔষধ হিসেবে পরিচিত।
২. বস্তুটির মাদ্দা বা মূল (স্থূল) পদার্থ অনুসারে গঠিত ক্রিয়া। এরূপ ক্রিয়াবিশিষ্ট বস্তু গেযা বা খাদ্য হিসেবে পরিচিত।
৩. বস্তুটির ছুরতে নওইয়্যা বা বিশেষ প্রজাতিগত আকৃতি-প্রকৃতি তথা খাছিয়্যত বা মৌলিক গুণবৈশিষ্ট্য অনুসারে ঘটিত ক্রিয়া। এরূপ ক্রিয়াবিশিষ্ট বস্তু যুল-খাছছাহ বা মৌলিক গুণবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বস্তু নামে অভিহিত হয়।
৫. দাওয়া বা ঔষধ কাহাকে বলে?
যে সমস্ত বস্তু বা পদার্থ সুস্থ শরীরে ব্যবহার করলে শরীরের স্বাভাবিক উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা— এই চারটি কৈফিয়্যত বা অবস্থার কোনো একটিকে প্রভাবিত করে তার আধিক্য ঘটায়, সেই বস্তু বা পদার্থকে দাওয়া বা ঔষধ বলে।
৬. দাওয়া কত প্রকার ও কী কী?
দাওয়া বা ঔষধ মূলত দুই প্রকার। যথা-
১. দাওয়ায়ে মুফরাদ বা একক ঔষধ (Single drug): যে ভেষজদ্রব্য অপর এক বা একাধিক ভেষজদ্রব্য বা কোনো সহযোগী উপাদানের সাথে মিশ্রিত হয়ে নতুন যৌগে রূপান্তরিত হয়নি, এমন প্রতিটি ভেষজদ্রব্যকেই দাওয়ায়ে মুফরাদ বা একক ঔষধ বলা হয়। যেমন- আমলা, গাওজবান, বনফশা, বাদিয়ান, পুদিনা— এগুলোর প্রত্যেকটি এক একটি মুফরাদ বা একক ঔষধ।
২. দাওয়ায়ে মুরাক্কাব বা যৌগিক ঔষধ (Compound drug): একাধিক ঔষধ পরস্পর মিশ্রিত হয়ে অথবা কোনো একটি একক ঔষধ অপর কোনো সহযোগী উপাদানের সাথে মিশ্রিত হয়ে যখন একটি নতুন যৌগে রূপান্তরিত হয়, তখন সেটাকে দাওয়ায়ে মুরাক্কাব বা যৌগিক ঔষধ বলা হয়। যেমন- জাওয়ারিশে আমলা, শরবতে বনফশা, আরকে বাদিয়ান ইত্যাদি।
৭. গেযা বা খাদ্য কাহাকে বলে?
যে বস্তু বা পদার্থ দেহাভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে ‘হারারতে গরীযী’ তথা স্বাভাবিক দেহতাপের প্রভাবে এমন ক্রিয়া প্রকাশ করে যে, বস্তুটি দেহের কৈফিয়্যত বা অবস্থার কোনো পরিবর্তন সাধন না করে বরং বিভিন্ন খিলত বা ধাতুরসে রূপান্তরিত হয়ে দেহের পোষণকার্য ও পুষ্টিসাধন করে, তাকে গেযা বা খাদ্য বলে।
৮. দাওয়া ও গেযার মধ্যে পার্থক্য কী?
গেযা: ১. দেহের কৈফিয়্যত বা অবস্থার কোনো পরিবর্তন করে না। ২. দেহের বিভিন্ন খিলত বা ধাতুরসে রূপান্তরিত হয়। ৩. ক্রিয়া হয় তার মাদ্দা বা স্থূল পদার্থের দ্বারা। ৪. গেযা দ্বারা শুধু দেহের পরিপোষণই সাধিত হয়; উষ্ণতা, শুষ্কতা ইত্যাদি অবস্থার পরিবর্তন হয় না। ৫. দেহের পোষণকার্য ও পুষ্টিসাধন করে।
দাওয়া: ১. দেহের কৈফিয়্যত বা অবস্থার কোনো একটিকে প্রভাবিত করে তার আধিক্য ঘটায়। ২. বিভিন্ন খিলত বা ধাতুরসে রূপান্তরিত হয় না। ৩. ক্রিয়া হয় তার কৈফিয়্যত বা অবস্থার দ্বারা। ৪. উষ্ণতা, শুষ্কতা ইত্যাদি অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। ৫. দেহের কোনো পোষণকার্য ও পুষ্টিসাধন করে না।
৯. যুল-খাছছাহ কাহাকে বলে? ইহা কত প্রকার ও কী কী?
যে বস্তু বা পদার্থের ক্রিয়া কৈফিয়্যত অথবা মাদ্দার দরুন হয় না, বরং তার ছুরতে নওইয়্যা (বিশেষ প্রজাতিগত আকৃতি-প্রকৃতি) ও খাছিয়্যত (নিজস্ব স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য)-এর দরুন হয় এবং যা ব্যবহার করলে নিজস্ব প্রজাতিগত গুণের প্রভাবে মানবদেহে পূর্বোক্ত চারটি অবস্থা (উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা, শুষ্কতা) ছাড়া অপর কোনো নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে যুল-খাছছাহ তথা মৌলিক গুণবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বা বিশেষ ক্রিয়াশীল বস্তু বলে।
যেমন- সাপ-বিচ্ছু প্রভৃতির দংশনের ক্রিয়া, যার ফলে এমনকি দংশিত ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে। এ ক্রিয়া উষ্ণতা-শীতলতা প্রভৃতি অবস্থার দরুন হয় না, স্থূল পদার্থের দরুনও হয় না। দংশনের ক্রিয়াকে যদি উষ্ণতা বা শীতলতার ফল ধরা হয়, তাহলে স্বীকার করতে হয় যে আগুন ও পানির দ্বারাও এরূপ ক্রিয়া ঘটবে— কেননা আগুনের চেয়ে উষ্ণ এবং পানির চেয়ে শীতল আর কিছু নেই। সুতরাং একে ঔষধের ক্রিয়া বলা যায় না; খাদ্যের ক্রিয়াও বলা যায় না, কারণ খাদ্য বিষ হতে পারে না। অতএব যার ক্রিয়া বিশেষ প্রজাতিগত আকৃতি-প্রকৃতি ও নিজস্ব স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণে হয়, তা-ই যুল-খাছছাহ।
যুল-খাছছাহ দুই প্রকার। যথা-
১. যুল-খাছছাহ মোওয়াফেকাহ (অনুকূল): যার ক্রিয়া মানবদেহের স্বভাব ও প্রকৃতির অনুকূল। যেমন- তিরইয়াক বা ফাদে যহর অর্থাৎ বিষনাশক দ্রব্যাদি।
২. যুল-খাছছাহ মোখালেফাহ (প্রতিকূল): যার ক্রিয়া মানবদেহের স্বভাব ও প্রকৃতির প্রতিকূল, অর্থাৎ যা প্রাণ সংহার করতে পারে। যেমন- সাম্ম বা যহর অর্থাৎ বিষ বা বিষাক্ত দ্রব্য।
১০. গেযায়ে দাওয়ায়ী ও দাওয়ায়ে গেযায়ী কাহাকে বলে?
কোনো কোনো বস্তু তার মাদ্দা (স্থূল পদার্থ) এবং কৈফিয়্যত (মিযাজ বা প্রকৃতিগত অবস্থা)— উভয়ের ভিত্তিতে ক্রিয়া করে। এরূপ বস্তুকে গেযায়ে দাওয়ায়ী তথা ঔষধি গুণবিশিষ্ট খাদ্য অথবা দাওয়ায়ে গেযায়ী তথা খাদ্যগুণবিশিষ্ট ঔষধ বলে।
যেমন- গেযায়ে দাওয়ায়ী: আশে জও (যব-সেদ্ধ পানি), কাহু (লেটুস) ইত্যাদি। দাওয়ায়ে গেযায়ী: পেঁয়াজ, লাহসুন (রসুন), তোখমে খরবুযা (খরমুজ-বীজ) ইত্যাদি।
১১. দাওয়ায়ে যুল-খাছছাহ কাহাকে বলে?
কোনো কোনো বস্তু তার কৈফিয়্যত (প্রকৃতিগত অবস্থা) এবং ছুরতে নওইয়্যা (বিশেষ প্রজাতিগত আকৃতি-প্রকৃতি) অথবা খাছিয়্যত (নিজস্ব স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য) — এই উভয়ের ভিত্তিতে ক্রিয়া করে। এরূপ বস্তুকে দাওয়ায়ে যুল-খাছছাহ তথা বিশেষ মৌলিক গুণবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ঔষধ বা বিশেষ ক্রিয়াশীল ঔষধ বলে। যেমন- জদওয়ার, উদ ছলীব ইত্যাদি।
১২. গেযায়ে যুল-খাছছাহ কাহাকে বলে?
কোনো কোনো বস্তু তার মাদ্দা (স্থূল পদার্থ) এবং ছুরতে নওইয়্যা বা খাছিয়্যত — এই উভয়ের ভিত্তিতে ক্রিয়া করে। এরূপ বস্তুকে গেযায়ে যুল-খাছছাহ তথা বিশেষ মৌলিক গুণবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন খাদ্য বলে। যেমন- সেব (আপেল) তার স্থূল পদার্থ দ্বারা দেহের পুষ্টিসাধন করে এবং তার বিশেষ প্রজাতিগত আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের দ্বারা মনে প্রফুল্লতা সঞ্চার করে।
১৩. গেযায়ে দাওয়ায়ী যুল-খাছছাহ কাহাকে বলে?
কোনো কোনো বস্তু তার মাদ্দা, কৈফিয়্যত এবং ছুরতে নওইয়্যা — এই তিনটির ভিত্তিতেই ক্রিয়া করে। এরূপ বস্তুকে গেযায়ে দাওয়ায়ী যুল-খাছছাহ তথা বিশেষ ক্রিয়াশীল ঔষধি খাদ্য বলে। যেমন- শরাব (মদ্য) তার স্থূল পদার্থ দ্বারা দেহের পুষ্টিসাধন করে, প্রকৃতিগত অবস্থার প্রভাবে দেহে উষ্ণতা সঞ্চার করে এবং বিশেষ আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে মনে প্রফুল্লতার সৃষ্টি করে। (উল্লেখ্য, ইসলামী শরীয়তে মদ্য হারাম; এটি কেবল পরিভাষা বোঝানোর উদাহরণ।)
১৪. দাওয়ায়ে গেযায়ী ও গেযায়ে দাওয়ায়ীর মধ্যে পার্থক্য কী?
যে বস্তুতে ঔষধি গুণ ও খাদ্যগুণ উভয়ই বিদ্যমান, অর্থাৎ যা প্রকৃতিগত অবস্থা অনুসারে যেমন ক্রিয়া করে তেমনি স্থূল পদার্থের ভিত্তিতেও ক্রিয়া করে, তা-ই দাওয়ায়ে গেযায়ী বা গেযায়ে দাওয়ায়ী। উভয়ের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে।
যে বস্তুতে খাদ্যগুণের চেয়ে ঔষধি গুণ প্রবল, তাকে দাওয়ায়ে গেযায়ী বলে। এ জাতীয় বস্তু প্রথমে প্রকৃতিগত অবস্থার প্রভাবে ক্রিয়া করে, পরে স্থূল পদার্থ ক্রিয়াশীল হয়; এর দ্বারা খিলত বা ধাতুরস সৃষ্টি হয় অল্প পরিমাণে।
পক্ষান্তরে যে বস্তুতে ঔষধি গুণের চেয়ে খাদ্যগুণ প্রবল, তাকে গেযায়ে দাওয়ায়ী বলে। এ জাতীয় বস্তু প্রথমে স্থূল পদার্থের প্রভাবে দেহের পুষ্টিসাধন করে, পরে প্রকৃতিগত অবস্থা ক্রিয়াশীল হয়; এর দ্বারা খিলত বা ধাতুরস সৃষ্টি হয় অপেক্ষাকৃত অধিক।
১৫. সাম্ম, সাম্মী ও মুতলক কী?
‘সাম্ম’ আরবি শব্দ, অর্থ বিষ; এর ফারসি প্রতিশব্দ ‘যহর’। সাম্ম থেকেই ‘সাম্মী’ শব্দ, যার অর্থ বিষাক্ত। ‘মুতলক’ আরবি শব্দ; অর্থ নিছক, কেবল, অবিমিশ্র।
১৬. সাম্মে মুতলক কাহাকে বলে?
যে বস্তু বা পদার্থ তার খাছিয়্যত ও ছুরতে নওইয়্যা অর্থাৎ নিজস্ব স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ প্রজাতিগত আকৃতি-প্রকৃতির মাধ্যমে প্রাণ সংহারক ক্রিয়া করে, তাকে সাম্মে মুতলক তথা নিছক বা অবিমিশ্র বিষ বলে।
আরও সহজে বললে— মানবদেহের স্বভাব ও প্রকৃতির প্রতিকূল যে বস্তু অতি দ্রুত এবং প্রতিকারের সুযোগ না দিয়েই হারারতে গরীযী (স্বাভাবিক দেহতাপ), কোওয়া (ইন্দ্রিয়বৃত্তি) ও আরওয়াহ (জীবনীশক্তি)-কে নিষ্ক্রিয় ও বিনষ্ট করে দেয়, তা-ই সাম্মে মুতলক। যেমন- মিঠাবিষ ও কালসাপের পিত্ত, যা তৎক্ষণাৎ প্রাণনাশ করে।
১৭. দাওয়ায়ে সাম্মী তথা বিষাক্ত ঔষধ কী?
যে ঔষধি বস্তু তার কৈফিয়্যত বা প্রকৃতিগত অবস্থার মাধ্যমে প্রাণঘাতী ক্রিয়া করে, তাকে দাওয়ায়ে সাম্মী তথা বিষাক্ত ঔষধ বলে। এর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বা মাত্রা প্রাণনাশক হয়ে থাকে। যেমন- নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত আফিম প্রাণঘাতী হতে পারে, যদি তার সাথে মুসলেহ অর্থাৎ বিষাক্ততা শোধনকারী কোনো দ্রব্য না থাকে। এককথায়, বিষাক্ত ঔষধ মানবদেহে প্রতিকূল ও ক্ষতিকর অবস্থার সৃষ্টি করলেও তার এ ক্রিয়া সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হয় না এবং প্রতিকারের সুযোগও থাকে। যেমন- ধুতুরা বীজ, আফিম, কুচিলা ইত্যাদি।
১৮. তিরইয়াক ও ফাদে যহর তথা বিষনাশক কী?
‘তিরইয়াক’ ও ‘ফাদে যহর’ একই অর্থবোধক। তিরইয়াক আরবি এবং ফাদে যহর ফারসি; উভয় শব্দের অর্থ বিষনাশক। তবে প্রথম শব্দটি সাধারণত মুরাক্কাব (যৌগিক) এবং দ্বিতীয়টি মুফরাদ (একক) ঔষধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
১৯. তিরইয়াক ও ফাদে যহর কাহাকে বলে?
যে ঔষধ রূহ বা জীবনীশক্তির সুস্থতা ও শক্তি এমনভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে যে, যাবতীয় বিষ প্রতিরোধে সক্ষম হয়, তা-ই তিরইয়াক বা ফাদে যহর। অন্যভাবে বললে, যে বস্তু মানবদেহে স্বাভাবিক দেহতাপ, ইন্দ্রিয়বৃত্তি ও জীবনীশক্তির রক্ষক ও সহায়করূপে ক্রিয়া করে ক্ষতিকর বিষাক্ত দ্রব্যের বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সাহায্য করে, তা-ই বিষনাশক।
ফাদে যহর হলো এমন একক ঔষধ, যার স্বভাবগত গুণবৈশিষ্ট্যের ফলে তা বিষের প্রতিক্রিয়া থেকে হৃদযন্ত্র ও রূহকে রক্ষা করে। কোনো কোনো ফাদে যহর খনিজ পদার্থ (বিভিন্ন ধরনের পাথর), আবার কোনোটি প্রাণীজ— যা বারশিঙ্গা হরিণ প্রভৃতির পেটে পাওয়া যায়।
পক্ষান্তরে তিরইয়াক এই একইরূপ ক্রিয়া সম্পাদনকারী সংমিশ্রিত বা যৌগিক ঔষধ। যেমন- তিরইয়াক আরবাআ, তিরইয়াকে ফারূক ইত্যাদি।
২০. ঔষধের মিযাজ বা প্রকৃতি কী?
একাধিক মৌলিক উপাদান যখন পরস্পর মিলিত হয়, তখন সেগুলোর পারস্পরিক সংমিশ্রণের প্রতিক্রিয়ায় উষ্ণতা ও শীতলতা অথবা শুষ্কতা ও আর্দ্রতা প্রভৃতি কৈফিয়্যত বা অবস্থার দিক দিয়ে প্রত্যেকটি উপাদানের নিজস্ব অবস্থার রূপান্তর ঘটে এবং তদস্থলে ভিন্ন ধরনের একটি নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই নতুন কৈফিয়্যত বা অবস্থাটি মূলত উপাদানসমূহের আনুপাতিক হার ও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ারই পরিণতি। এভাবে উদ্ভূত নতুন অবস্থাকেই মিযাজ তথা প্রকৃতি বলে।
২১. ক্রিয়ার ভিত্তিতে ঔষধ কত প্রকার ও কী কী?
মিযাজ বা কৈফিয়্যতের দিক দিয়ে অর্থাৎ তাছীর বা ক্রিয়ার ভিত্তিতে দাওয়া মূলত দুই প্রকার। যথা-
১. দাওয়ায়ে মু’তাদেল তথা পরিমিত প্রকৃতির ঔষধ;
২. দাওয়ায়ে গায়ের-মু’তাদেল তথা অপরিমিত প্রকৃতির ঔষধ।
দাওয়ায়ে গায়ের-মু’তাদেল আবার আট প্রকার। তন্মধ্যে প্রথম চারটি মুফরাদ (একক) এবং অবশিষ্ট চারটি মুরাক্কাব (মিশ্র)। যথা-
১. দাওয়ায়ে হার— উষ্ণ প্রকৃতির ঔষধ;
২. দাওয়ায়ে বারেদ— শীতল প্রকৃতির ঔষধ;
৩. দাওয়ায়ে রতব— আর্দ্র প্রকৃতির ঔষধ;
৪. দাওয়ায়ে ইয়াবেস— শুষ্ক প্রকৃতির ঔষধ;
৫. দাওয়ায়ে হার-রতব— উষ্ণ ও আর্দ্র প্রকৃতির ঔষধ;
৬. দাওয়ায়ে বারেদ-রতব— শীতল ও আর্দ্র প্রকৃতির ঔষধ;
৭. দাওয়ায়ে হার-ইয়াবেস— উষ্ণ ও শুষ্ক প্রকৃতির ঔষধ;
৮. দাওয়ায়ে বারেদ-ইয়াবেস— শীতল ও শুষ্ক প্রকৃতির ঔষধ।
২২. দাওয়ায়ে মু’তাদেল কাহাকে বলে?
যে ঔষধ কোনো মু’তাদেল মিযাজের (পরিমিত প্রকৃতির) মানুষের দেহে প্রবেশ করার পর হারারতে গরীযী তথা স্বাভাবিক দেহতাপের সংস্পর্শে এসে দেহের প্রকৃতিগত অবস্থায় কোনোরূপ অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না, তাকে দাওয়ায়ে মু’তাদেল বলা হয়। যেমন- ওন্নাব (উন্নাব), মিঠা বিহিফল, পরসিয়াওশান (হংসরাজ), সাপেস্তান (লসুড়া/বহুবার) ইত্যাদি।
২৩. দাওয়ায়ে গায়ের-মু’তাদেল কাহাকে বলে?
যে ঔষধ কোনো মু’তাদেল মিযাজের মানুষের দেহে প্রবেশ করার পর স্বাভাবিক দেহতাপের সংস্পর্শে এসে দেহের প্রকৃতিগত অবস্থায় কোনোরূপ অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তাকে দাওয়ায়ে গায়ের-মু’তাদেল তথা অপরিমিত প্রকৃতির ঔষধ বলা হয়।
২৪. দরজায়ে আদভিয়া তথা ঔষধের শ্রেণি-পর্যায় কয়টি ও কী কী?
ভেষজদ্রব্যের উষ্ণ, শীতল, আর্দ্র ও শুষ্ক প্রভৃতি গুণের ভিত্তিতে সকল ঔষধকে চারটি দরজা বা শ্রেণিতে এবং প্রত্যেকটি শ্রেণিকে আবার তিনটি মরতবা বা পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। গায়ের-মু’তাদেল ঔষধকে শক্তির ভিত্তিতে যে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে সেগুলো হলো-
১. দরজায়ে ওলা (আওয়াল) তথা প্রথম শ্রেণি;
২. দরজায়ে ছানিয়া (দুওয়াম) তথা দ্বিতীয় শ্রেণি;
৩. দরজায়ে ছালেছাহ (সুওয়াম) তথা তৃতীয় শ্রেণি;
৪. দরজায়ে রাবেআহ (চাহারুম) তথা চতুর্থ শ্রেণি।
সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ-
১. যে ঔষধ স্বাভাবিক মাত্রায় ব্যবহার করলে দেহের অবস্থায় যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তা বাহ্যিক অনুভূতির মাধ্যমে অনুভূত হয় না, সেটি প্রথম শ্রেণিভুক্ত। যেমন- তোখমে কাতান (তিসি) প্রথম শ্রেণির উষ্ণ; বর্গে বাঁস (বাঁশপাতা) প্রথম শ্রেণির শীতল। এ শ্রেণির ঔষধ স্বাভাবিক মাত্রার বেশি বা বারংবার ব্যবহারেও এমন সামান্য প্রতিক্রিয়া ঘটায় যা সহজে অনুভূত হয় না।
২. যে ঔষধ স্বাভাবিক মাত্রার অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করলে প্রতিক্রিয়া বাহ্যিক অনুভূতির মাধ্যমে অনুভূত হয়, কিন্তু শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর হয় না, সেটি দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত। যেমন- রায়হান (তুলসী) দ্বিতীয় শ্রেণির উষ্ণ; কাশনীয (ধনে) দ্বিতীয় শ্রেণির শীতল।
৩. যে ঔষধ স্বাভাবিক মাত্রার অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করলে প্রতিক্রিয়া অতি সহজেই অনুভূত হয় এবং শরীরের পক্ষে অনিষ্টকরও হয়, তবে মারাত্মকভাবে নয় (প্রাণনাশের আশঙ্কা নেই), সেটি তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত। যেমন- শীতরজ (চিতামূল) তৃতীয় শ্রেণির উষ্ণ; ছন্দল সফেদ (শ্বেতচন্দন) তৃতীয় শ্রেণির শীতল।
৪. যে ঔষধ যথাযথ শোধন ছাড়া বা নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত ব্যবহার করলে দেহে এমন প্রতিক্রিয়া ও অনিষ্ট সাধন করে যাতে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে, সেটি চতুর্থ শ্রেণিভুক্ত। এ ধরনের ঔষধ দাওয়ায়ে সাম্মী (বিষাক্ত ঔষধ) নামে অভিহিত এবং যথানিয়মে শোধন ব্যতীত ব্যবহারযোগ্য নয়। যেমন- শীরে মাদার (আকন্দের কষ) চতুর্থ শ্রেণির উষ্ণ; আফয়ূন (আফিম) চতুর্থ শ্রেণির শীতল।
প্রত্যেক দরজাকে আবার তিনটি মরতবা বা পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ক. মরতবায়ে আওয়াল (প্রথম পর্যায়); খ. মরতবায়ে আওসাৎ (মধ্যম পর্যায়); গ. মরতবায়ে আখের (শেষ পর্যায়)।
২৫. মিযাজের শ্রেণিভিত্তিক ভেষজদ্রব্যের উদাহরণ
প্রথম শ্রেণিতে উষ্ণ: নখুদ (ছোলা), শাহতারা (ক্ষেতপাপড়া), নীলকণ্ঠী, সরফুকা (বননীল/শরপুঙ্খ), সাগুদানা, এলওয়া (মুসাব্বর), শেকাকাই (বনরীঠা), চুবচীনী (চোপচিনি), সেম্বল (শিমুল), নায়শকর/গান্না (আখ), মুন্ডী (মুন্ডিরী), মুনাক্কা, তোখমে কাতান (তিসি), গাওজবান, বাদাম শিরীন (কাগজী বাদাম), চিলগোযা, সেব (আপেল), শালগম, কায়ফল (কটফল), শক্কর (চিনি), গেলু সবুজ (সবুজ গুলঞ্চ), আঞ্জীর (ডুমুর), গাভীর দুধের মাখন ইত্যাদি।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে উষ্ণ: তোখমে করফস, জাফরান, মুসতগী রূমী (রূমী মস্তকী), কুন্দুর, সোডা, নমক (লবণ), চিরতা, হুলবা (মেথি), উসতুখুদুস, মজেঠ (মঞ্জিষ্ঠা), আসারূন (সুগন্ধবালা), সা’দ কূফী (মুথা), নারমুশক (নাগেশ্বর), কাঁকী (বেরেলা), কাঁঠাল, শরীফা (আতা/শরীফা), বাদিয়ান (মৌরি), বাবুনা, খোরমা, সাতাওয়ার (শতমূলী) ইত্যাদি।
তৃতীয় শ্রেণিতে উষ্ণ: আজওয়াইন/নানখাহ (জোয়ান), আফতীমূন, বাহমান সুর্খ (লাল বামন), তুরবুদ (তেউড়ীমূল), পুদিনা, তাম্বাকু (তামাক), আদরক (আদা), সকমুনিয়া, সূরঞ্জান শিরীন, সাযজ হিন্দী (তেজপাতা), শীতরজ (চিতামূল), করণফুল (লবঙ্গ), মেশক (মৃগনাভি/কস্তুরী), শূনীয/কালৌঞ্জী (কালোজিরা), হাব্বুল-কুলথ (কুলথ কলাই), করঞ্জুয়া (নাটাকরঞ্জ), কিবরীত (গন্ধক), মুকিল (গুগ্গুল), ফিলফিল সিয়াহ (গোলমরিচ) ইত্যাদি।
চতুর্থ শ্রেণিতে উষ্ণ: ফরফিয়ূন, তুতিয়া (তুঁতে), হানযল/ইন্দ্রায়ণ (রাখালশসা), শীরে মাদার (আকন্দের কষ), হেলতীত (হিং), সাম্মুল-ফার/সংখিয়া (সেঁকোবিষ) ইত্যাদি।
প্রথম শ্রেণিতে শীতল: আনার শিরীন (মিঠা ডালিম), আমরূদ (পেয়ারা), আলুবোখারা, হালীলা (হরীতকী), বনফশা, বর্গে বাঁস (বাঁশপাতা), তমর হিন্দী (তেঁতুল), খোব্বাযী, দারুহরিদ্রা, কাসনী, মাজুফল, মারজান, মুগডাল, শাঈর/জও (যব), হালীলা সিয়াহ (জংলী হরীতকী), বতুম, নেশাস্তা গন্দুম (গমের শ্বেতসার), কাহরুবা, হুম্মায (চুকা পালং) ইত্যাদি।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে শীতল: আমলা (আমলকী), আনার তুরশ (টক ডালিম), আনজবার, বারতাঙ্গ, বিহিদানা, পালক (পালং), পোস্ত খাসখাস (পোস্তের ঢেঁড়ি), পেঠা (চালকুমড়া), তুরঞ্জ (গোঁড়া লেবু), তরবুয (তরমুজ), তোখমে কাসনী (কাসনী-বীজ), তোখমে কাহু (কাহু-বীজ), তোখমে খেয়ার (শসা-বীজ), খাসখাস সফেদ (পোস্তদানা), রসৌত (রসাঞ্জন), সিরীস (শিরীষ), সুম্মাক, ছন্দল সুর্খ (রক্তচন্দন), তাবাশীর/বংশলোচন, কাশনীয (ধনে), কদু দরায (লাউ), নীলুফার (শাপলা), নাশপাতি, মারওয়ারীদ (মুক্তা) ইত্যাদি।
তৃতীয় শ্রেণিতে শীতল: আজওয়াইন খোরাসানী (খোরাসানী জোয়ান), তোখমে খোরফা (বড় লুনিয়া-বীজ), দম্মুল-আখাওয়াইন (খুনখারাবি), সফেদা কাশগরী, কাফুর (কর্পূর), লাল শাক, নাবক (কুল/জাপানি বরই) ইত্যাদি।
চতুর্থ শ্রেণিতে শীতল: আফয়ূন (আফিম), আলমাস (হীরক), ধুতুরা, শোকরান, আজওয়াইন সিয়াহ (কালো জোয়ান) ইত্যাদি।
প্রথম শ্রেণিতে শুষ্ক: আমড়া, আবরেশম, আখরোট, সোনামুখী, আসলুস-সূস (যষ্টিমধু), আলসী (তিসি), বাবুনা, বীজবন্দ, বসফায়েজ, কুন্দুর, খারে খসক (গোক্ষুর), আদরক (আদা), খোরমা, জাফরান, বর্গে সানা (সোনাপাতা), আম্বর, কুন্দুক, কুরতুম (কুসুম), মুগাছ (মেদাকাঠ), নুকরা (রূপা) ইত্যাদি।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে শুষ্ক: আফসানতীন, উসতুখুদুস, অনন্তমূল, আনজবার, ইন্দরজৌ (ইন্দ্রযব), মাজুফল, বাদরঞ্জবুয়া, বাওবিরঙ্গ (বিড়ঙ্গ), বিসবাসা (জাউত্রী), সুম্বুলুত-তীব/বালছড় (জটামাংসী), ছা’তার ফারসী (শাতলা), মেশক, মুসতগী রূমী, সকমুনিয়া ইত্যাদি।
তৃতীয় শ্রেণিতে শুষ্ক: আনীসূন, তাম্বাকু (তামাক), ফিটকিরি, ওশবা, করণফুল (লবঙ্গ), যমররদ (পান্না) ইত্যাদি।
চতুর্থ শ্রেণিতে শুষ্ক: আফয়ূন (আফিম), আলমাস (হীরা), ধুতুরা, সংখিয়া (সেঁকোবিষ), জামালগোটা (জয়পাল) ইত্যাদি।
প্রথম শ্রেণিতে আর্দ্র: আমরূদ (পেয়ারা), আনার শিরীন (মিঠা ডালিম), আঙ্গুর পোখতা (পাকা আঙ্গুর), বনফশা, পালক (পালং), বেদমুশক (সুগন্ধি বেত), তুদরী, চিরঞ্জী (পিয়াল), চিলগোযা, খাশখাশ সফেদ (পোস্তদানা), খেজুর, কাসনী, গাওজবান, কিশমিশ, শালগম, শক্কর (চিনি), রওগনে যরদ (ঘি), আমলতাস/খিয়ারশম্বর (সোনালু), গোন্দ কাতিরা (কাতিরা গঁদ), সাগুদানা, রওগনে যয়তুন (অলিভ অয়েল) ইত্যাদি।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে আর্দ্র: ইসবগুল, আলুবোখারা, পাকা আম, কদু দরায (লাউ), গাজর, তোখমে খোরফা (বড় লুনিয়া-বীজ), খরবুযা (খরমুজ), নীলুফার (শাপলা), নায়শকর/গান্না (আখ), জফরাত/দহী (দধি), পটল, ক্ষীরা/শসা, শরীফা (আতাফল) ইত্যাদি।
তৃতীয় শ্রেণিতে আর্দ্র: সানতারা (কমলালেবু), সীমাব/পারদ (পারা), গাভীর দুধ, তরবুয (তরমুজ) ইত্যাদি।
মু’তাদেল (পরিমিত): ওন্নাব, পরসিয়াওশান (হংসরাজ), শীরে গাও (গোদুগ্ধ), সাপেস্তান (লসুড়া), টমেটো, তুরঞ্জবীন, মিঠা বিহিফল ইত্যাদি।
২৬. তরকীবের ভিত্তিতে ঔষধ কত প্রকার ও কী কী?
তরকীব (গঠন)-এর ভিত্তিতে ঔষধ দুই প্রকার। যথা-
১. দাওয়ায়ে মুফরাদুল-কোওয়া তথা একক ক্রিয়াশক্তিবিশিষ্ট উপাদানের ঔষধ;
২. দাওয়ায়ে মুরাক্কাবুল-কোওয়া তথা মিশ্র ক্রিয়াশক্তিবিশিষ্ট উপাদানের ঔষধ।
২৭. মুরাক্কাবুল-কোওয়া কাহাকে বলে?
যে ঔষধের আজযায়ে তরকীবিয়্যা তথা গঠন-উপাদানসমূহে মিযাজে আওয়ালী (প্রাথমিক প্রকৃতি) বিদ্যমান থাকে, ইউনানী চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষায় সে ঔষধকে মুরাক্কাবুল-কোওয়া বলে। এর অভিধানগত অর্থ মিশ্র ক্রিয়াশক্তিবিশিষ্ট। এ জাতীয় ঔষধ এমন বিবিধ উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত, যেগুলো নিজস্ব পৃথক মিযাজ, প্রকৃতি ও ক্রিয়াশক্তির অধিকারী; অর্থাৎ একাধিক কুওয়ত ও একাধিক জওহরের সমবায়ে গঠিত হওয়ায় এর বিভিন্ন গঠন-উপাদানের শক্তি ও ক্রিয়া বিভিন্নরূপ হয়ে থাকে। যেমন- কোনো ভেষজের একটি সক্রিয় সারাংশ হয়তো শিরাসমূহের সংকোচক, অথচ অপর একটি সক্রিয় সারাংশ বিপরীত ক্রিয়াশক্তির অধিকারী, অর্থাৎ শিরাসমূহের উন্মুক্তকারক।
২৮. ভেষজদ্রব্যের গঠন-উপাদান কী কী?
উদ্ভিদজাত, প্রাণীজ ও খনিজ প্রায় সকল ভেষজদ্রব্যই মুরাক্কাবুল-কোওয়া। এসব দ্রব্যে কমবেশি বিভিন্ন ক্রিয়াশক্তিবিশিষ্ট নিম্নোক্ত আজযায়ে তরকীবিয়্যা পাওয়া যায়-
১. অম্ল ও টক জাতীয় পদার্থ: উদ্ভিদজাত ভেষজে পাওয়া যায়। যেমন- লেবু, তেঁতুল, করমচা। আরবিতে একে হামেজাত বলে (হামেজ অর্থ অম্ল)।
২. লবণ ও ক্ষার জাতীয় পদার্থ: উদ্ভিদ পুড়িয়ে ছাই করে আহরিত হয়; খনিজ উপাদান থেকেও পাওয়া যায়। যেমন- মূলার লবণ, যবক্ষার। আরবিতে মিলহিয়্যাত এবং ফারসিতে নমকিয়্যাত বলে (মিলহ ও নমক অর্থ লবণ)।
৩. শর্করা জাতীয় পদার্থ: উদ্ভিদজাত ভেষজ থেকে আহরিত, স্বাদে মিষ্ট। যেমন- ইক্ষু। আরবিতে সুক্কার, ফারসিতে শক্কর।
৪. আমিষ জাতীয় পদার্থ: প্রাণীজ ও উদ্ভিদজাত ভেষজে পাওয়া যায়। যেমন- মাংস, দুধ, ডিম, ডাল, গম, ভুট্টা। আরবিতে লাহমিয়্যাত বা মাওয়াদে লাহমী।
৫. গঁদ বা আঠা জাতীয় পদার্থ: উদ্ভিদজাত; চটচটে এবং সহজেই পানিতে দ্রবণীয়। যেমন- ছমগ আরবী (আরবি গাম), গোন্দ কাতীরা। আরবিতে ছমগিয়্যাত, ফারসিতে গোন্দ।
৬. রাল বা শুকনো গাম (রজন) জাতীয় পদার্থ: উদ্ভিদজাত ভেষজ থেকে আহরিত; মূলত গঁদ জাতীয় হলেও চটচটে নয়, পানিতে অদ্রবণীয় কিন্তু অ্যালকোহলে দ্রবণীয়। যেমন- ধূপ ইত্যাদি।
৭. তেল জাতীয় পদার্থ: প্রাণীজ ও উদ্ভিদজাত ভেষজে পাওয়া যায়। যেমন- কড-লিভার তেল, মোম-তেল, সরিষার তেল, তিসির তেল। আরবিতে দুহনিয়্যাত (দুহন ও রওগন উভয়ের অর্থ তেল)। শহম বা চর্বি জাতীয় পদার্থও এর অন্তর্ভুক্ত।
৮. কাষ্ঠ জাতীয় পদার্থ: উদ্ভিদের মূল, শাখা-প্রশাখা ও পাতায় পাওয়া যায়। আরবিতে খশবী মাওয়াদ (খশব অর্থ কাঠ)।
৯. রঞ্জক পদার্থ: এর উপস্থিতিই উদ্ভিদের পাতাকে সবুজ, ফুলকে লাল-নীল-জাফরানি বা হলুদ এবং বানরলাঠিকে কৃষ্ণবর্ণ করে।
১০. গাঁজন সৃষ্টিকারক পদার্থ: খামির সৃষ্টিতে সহায়ক। যেমন- গুলে ধাওয়া (ধাইফুল) আসব শ্রেণির ঔষধে গাঁজন তরান্বিত করে। আরবিতে খামেরাত।
১১. ক্রিয়াশীল সারাংশ: যেমন- জওহরে কুচলা, জওহরে আফয়ূন, সত্তে পুদিনা, সত্তে আজওয়াইন। আরবিতে একে জওহরে ফা’আল বলে।
২৯. তরকীবে তাবায়ী ও তরকীবে সুন্নায়ী কাহাকে বলে?
১. তরকীবে তাবায়ী (প্রাকৃতিক/কুদরতী গঠন): যে গঠনে মানুষের কোনো হাত নেই, নিছক প্রকৃতিরই দান। এ জাতীয় ঔষধের বিবিধ ক্রিয়াশক্তিসম্পন্ন উপাদান ভেষজদ্রব্যটিতে প্রাকৃতিকভাবেই বিদ্যমান থাকে। যেমন- দুধ মূলত আমিষ ও তেল জাতীয় উপাদানে গঠিত এবং প্রতিটি উপাদান পৃথক ক্রিয়াশক্তিসম্পন্ন, অথচ এগুলো প্রকৃতিগতভাবেই দুধে বিদ্যমান। অথবা গোলাপ ফুল— একাধারে লঘু ও দ্রুত সংক্রমণশীল এবং গুরুভার উপাদানে গঠিত বলে উষ্ণতা ও শীতলতার বিপরীতমুখী ক্রিয়া প্রকাশ করে; এসব উপাদানও প্রাকৃতিক।
২. তরকীবে সুন্নায়ী (কারিগরী/মাছনূয়ী/কৃত্রিম গঠন): যে গঠনে মানুষের কলাকৌশল ও দক্ষতার হাত রয়েছে। মানুষ তার সৃজনশৈলী প্রয়োগ করে বিভিন্ন ক্রিয়াশক্তিসম্পন্ন উপাদান মিশিয়ে এ জাতীয় ঔষধ তৈরি করে। যেমন- হাতে তৈরি তিরইয়াক (বিষনাশক ঔষধ)।
৩০. মুসতাহকাম ও গায়ের-মুসতাহকাম কাহাকে বলে?
‘মুসতাহকাম’ আরবি ‘এসতেহকাম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত; এসতেহকাম অর্থ দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব। সুতরাং মুসতাহকাম অর্থ দৃঢ় বা স্থায়ী— যে ঔষধের উপাদানসমূহ দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকে এবং সহজে বিনষ্ট বা বিচ্ছিন্ন হয় না (যেমন- অধিকাংশ খনিজ ও ধাতব দ্রব্য)। এর বিপরীত গায়ের-মুসতাহকাম অর্থ অদৃঢ় বা স্থায়িত্বহীন— যে ঔষধের উপাদান সহজেই বিনষ্ট, রূপান্তরিত বা উবে যায় (যেমন- তাজা ফল, ফুল ও সুগন্ধি উদ্ভিদ)।
৩১. ভেষজদ্রব্যের ক্রিয়াশীল সারাংশ কী কী?
রাসায়নিক বিশ্লেষণে ভেষজদ্রব্যে সাত প্রকার ক্রিয়াশীল সারাংশ পাওয়া যায়-
১. Alkaloids তথা উপক্ষার: একটি দ্রব্যে বহুবিধ উপক্ষার থাকে এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এগুলো পৃথক করা যায়। যেমন- সর্পগন্ধায় এ পর্যন্ত ২৫টি উপক্ষার আবিষ্কৃত হয়েছে, যার অন্যতম ডঃ সলিমুজ্জামান ছিদ্দিকী কর্তৃক আবিষ্কৃত Ajmaline (হাকীম আজমল খানের নামে নামকরণ)। ভেষজদ্রব্য থেকে বিশ্লেষিত এসব উপক্ষারই আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক ঔষধের মূল সক্রিয় উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২. Glucosides/Glycosides তথা শর্করাক্ষার।
৩. Sterols— প্রাক-হরমোন হিসেবে গণ্য, হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে।
৪. Terpenes তথা বিশেষ তেল জাতীয় পদার্থ।
৫. Flavonoids তথা সুগন্ধি/রঞ্জক জাতীয় পদার্থ।
৬. Resins তথা শুকনো গাম জাতীয় পদার্থ।
৭. Saponins তথা ফেনা বা পিচ্ছিল জাতীয় পদার্থ।
৩২. তাছীরাতে আদভিয়া তথা ঔষধের ক্রিয়া কাহাকে বলে?
মানবদেহে সুস্থ বা রুগ্ণ অবস্থায় বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগের প্রতিক্রিয়ায় যে সব পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, সেগুলোকেই তাছীরাতে আদভিয়া বা আফআলে আদভিয়া তথা ঔষধের ক্রিয়া বলে।
৩৩. ঔষধের ত্বরিৎ ও গৌণ ক্রিয়া কাহাকে বলে?
ত্বরিৎ ক্রিয়া (তাছীরে আওয়ালী): কোনো কোনো ভেষজদ্রব্য দেহে প্রয়োগ করা মাত্র গঠন-প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তন বা রূপান্তর ছাড়াই তার ক্রিয়া প্রকাশ করে। যেমন- তেজাব (অ্যাসিড)-এর দগ্ধকরণ ক্রিয়া।
গৌণ ক্রিয়া (তাছীরে ছানভী): কোনো কোনো ভেষজদ্রব্য দেহে প্রয়োগের পর প্রথমে গঠন-প্রকৃতিতে পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে, অতঃপর ক্রিয়া প্রকাশ করে। যেমন- কোনো কোনো অম্ল জাতীয় পদার্থ রক্তে প্রবেশের পর লবণে রূপান্তরিত হয়ে বৃক্কে বিভিন্ন ক্রিয়া ঘটায়।
৩৪. ঔষধের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ক্রিয়া কাহাকে বলে?
অভ্যন্তরীণভাবে (সেবনের মাধ্যমে) প্রয়োগে ঔষধের যে ক্রিয়া হয়, তা দাখেলী তাছীর তথা অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া। যেমন- শাপলা ফুলের রস সেবনে দেহের উষ্ণতা নিবারণ হয় ও শীতলতা সঞ্চারিত হয়।
বাহ্যিকভাবে প্রয়োগে ঔষধের যে ক্রিয়া হয়, তা খারেজী তাছীর তথা বাহ্যিক ক্রিয়া। যেমন- তেল ইত্যাদির মালিশ (লোমকূপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে ক্রিয়া করে) অথবা দেহের কোনো স্থানে প্রদাহ, ফোলা, ফোড়া ইত্যাদিতে ঔষধি প্রলেপ লাগানো।
৩৫. ঔষধের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ক্রিয়ার পার্থক্য কী?
অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রয়োগে ক্রিয়ার ভিত্তিতে ভেষজদ্রব্য কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত-
১. কোনো কোনো ভেষজের ক্রিয়া কেবল বাহ্যিক প্রয়োগে প্রকাশ পায়। যেমন- পেঁয়াজের প্রলেপ দেহের কোথাও লাগালে জ্বালা-যন্ত্রণা, এমনকি ক্ষতেরও সৃষ্টি করতে পারে; অথচ পেঁয়াজ খেলে এমন ক্ষতিকর ক্রিয়া হয় না। কারণ খাদ্যের সাথে বা দেহাভ্যন্তরের বিভিন্ন রসের সাথে মিশে পেঁয়াজের ক্ষতিকর শক্তি নষ্ট হয়; আবার স্বাভাবিক দেহতাপও তাকে পরিপাক করে বিক্ষিপ্ত করে ফেলে। বহির্ভাগে এমন কোনো রস নেই বলে ক্ষয়কারক উপাদান পূর্ণমাত্রায় ক্রিয়াশীল হতে পারে।
২. কোনো কোনো ভেষজের ক্রিয়া কেবল অভ্যন্তরীণ প্রয়োগে প্রকাশ পায়। যেমন- সফেদা কাশগরীর অভ্যন্তরীণ প্রয়োগ প্রাণসংহারক হতে পারে, অথচ বাহ্যিক প্রলেপে ক্ষতি হয় না। এতে যে গাঢ় মলিন উপাদান রয়েছে, তার কারণে বাহ্যিক প্রয়োগে ক্ষতিকর অংশ সংকীর্ণ লোমকূপ দিয়ে অতিক্রম করতে পারে না।
৩. অনেক ভেষজের ক্রিয়া অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয়ভাবে একরূপ। যেমন- পানির শীতলতা; অথবা শাপলা ফুল (গুলে নীলুফর) সেবনে যেমন উষ্ণতা নিবারণ হয়, প্রলেপ হিসেবেও তেমনি শীতলতা সঞ্চার করে।
৪. কোনো কোনো ভেষজ আবার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রয়োগে ভিন্ন, এমনকি বিপরীতধর্মী ক্রিয়া ঘটায়। যেমন- কপি, মূলা বা মসুর ডাল বাহ্যিক প্রলেপে দ্রাবক ও অপরিপক্ব রসকে পক্ব করে, কিন্তু খেলে সংকোচক ক্রিয়া করে। তেমনি কাশনীয (ধনে) প্রলেপ হিসেবে ফোলা, ফোড়া ও আক্রান্ত স্থানের কাঠিন্য দ্রবীভূত করে, কিন্তু সেবনে দেহরসকে অধিক গাঢ় ও শীতল করে। এর কারণ, ধনে দুটি বিপরীতধর্মী উপাদানের সংমিশ্রণ— একটি উষ্ণ, লঘু ও দ্রাবক; অপরটি মলিনতা-সঞ্চারক, শীতলকারক ও গাঢ়। বাহ্যিক প্রয়োগে গাঢ় অংশটি লোমকূপ দিয়ে অতিক্রম করে না, কিন্তু উষ্ণ ও লঘু অংশ অতিক্রম করে ক্রিয়া করে। অভ্যন্তরীণ প্রয়োগে স্বাভাবিক দেহতাপ লঘু ও দ্রাবক উপাদানকে দ্রবীভূত ও বিক্ষিপ্ত করে ফেলে, ফলে কেবল শীতল ও গাঢ় অংশের ক্রিয়াই অবশিষ্ট থাকে।
৩৬. মাত্রার পার্থক্যে ঔষধের ক্রিয়ার পার্থক্য কী?
কোনো কোনো ভেষজ অল্পমাত্রায় একরূপ এবং অধিক মাত্রায় অন্যরূপ ক্রিয়া করে। যেমন- কাফুর (কর্পূর) অল্পমাত্রায় যৌনশক্তিবর্ধক, কিন্তু অধিক মাত্রায় যৌনশক্তি দুর্বলকারক। অথবা রেওয়ান্দ চীনী (রেউচিনি) অল্পমাত্রায় পাকস্থলীর কার্যক্ষমতাবর্ধক, কিন্তু অধিক মাত্রায় মুসহেল তথা রেচক।
৩৭. একক ঔষধের বিপরীতধর্মী ক্রিয়া কীরূপ?
কোনো কোনো ভেষজদ্রব্যে পরস্পরবিপরীত ক্রিয়াশক্তিসম্পন্ন উপাদান থাকে বলে তার দ্বারা বিপরীতমুখী ক্রিয়া প্রকাশ পায়। যেমন- রেউচিনি বেশি মাত্রায় সেবনে প্রথমে রেচন (দাস্ত) হয়, পরবর্তীতে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়।
একই ঔষধে দুটি বিপরীত ক্রিয়া প্রকাশ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, একটি উপাদানই দুই বিপরীত ক্রিয়াশক্তির অধিকারী; কারণ একই উপাদানের একই সঙ্গে উষ্ণ ও শীতল হওয়া অসম্ভব। বরং ভেষজের ভিন্ন ভিন্ন গঠন-উপাদানে বিপরীতধর্মী ক্রিয়াশক্তি থাকে, যার একটির ক্রিয়া আগে ও অপরটির ক্রিয়া পরে প্রকাশ পায়। যেমন- রেউচিনির মুসহেল (রেচক) অংশটি প্রথমে ক্রিয়া ঘটায় এবং তারপর কোষ্ঠকাঠিন্যকারক (সংকোচক) অংশটি ক্রিয়া প্রকাশ করে।
৩৮. কেয়াস বা অনুমান ও তাজরেবাহ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা কাহাকে বলে?
কেয়াস (অনুমান): কোনো বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে তত্ত্বগত যুক্তিভিত্তিক অনুমান ও ধারণা। ইউনানী ভেষজবিজ্ঞানের পরিভাষায় স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ, ক্রিয়া ও রূপান্তরে দ্রুততা বা দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদির মাধ্যমে ভেষজের মিযাজ, স্বভাব, গুণ ও ক্রিয়া সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসাকে কেয়াস বলে। যেমন- তিক্ত ও কড়া স্বাদ দ্বারা উষ্ণতা এবং কষায় ও টক স্বাদ দ্বারা শীতলতার প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
তাজরেবাহ (পরীক্ষা-নিরীক্ষা): বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কোনো বস্তু সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন। ভেষজের ক্ষেত্রে অনুমানের যৌক্তিকতা প্রমাণের লক্ষ্যে দেহে প্রয়োগ করে যে যাচাই করা হয়, তাই তাজরেবাহ। যেমন- কেয়াস কোনো ভেষজের শীতল প্রকৃতির লক্ষণ প্রকাশ করেছে; বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে সেই অনুমান সঠিক কি না যাচাই করার পদক্ষেপই তাজরেবাহ।
৩৯. কেয়াস বনাম তাজরেবাহ
১. তাজরেবাহর মাধ্যমে ঔষধের ক্রিয়া ও কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়; কেয়াসের ভিত্তিতে কোনোভাবেই নিশ্চিত হওয়া যায় না।
২. গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চিকিৎসক ও অচিকিৎসক উভয় শ্রেণির লোকের জন্য উন্মুক্ত (ঔষধ-গবেষণা পদ্ধতির যথাযথ জ্ঞান থাকলেই যথেষ্ট); কিন্তু কেয়াস কেবল অভিজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য নির্দিষ্ট।
৩. বাস্তব পরীক্ষার সাহায্যে ঔষধের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় প্রকার ক্রিয়া ও গুণবৈশিষ্ট্য জানা যায়; কেয়াসের উপর নির্ভর করে কেবল তত্ত্বভিত্তিক ক্রিয়া সম্পর্কেই ধারণা পাওয়া যায়।
৪০. ঔষধের কেয়াসের সূত্রসমূহ কী কী?
কোনো ঔষধের প্রকৃতি ও গুণ-শক্তি সম্পর্কে অনুমান বা ধারণা লাভের জন্য নির্দেশক সূত্র হিসেবে গণ্য লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- ১. যায়েকাহ/মাযাহ (স্বাদ); ২. রায়েহা/বূ (গন্ধ); ৩. লওন/রং (বর্ণ); ৪. কেওয়াম (ঘনত্ব); ৫. অন্যান্য তাবায়ী ও কীমিয়াজী (প্রাকৃত রাসায়নিক) বৈশিষ্ট্য।
৪১. ঔষধের গবেষণামূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সতর্কতা কী কী?
ক. পরীক্ষণীয় ঔষধের স্বাদ ও গন্ধ পরখ করে দেখা উচিত। গন্ধ বা স্বাদ খারাপ ও অস্বস্তিকর হলে তাতে ক্ষতিকর উপাদান থাকাই স্বাভাবিক; এমতাবস্থায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয়। কারণ কোনো কোনো ঔষধ অতি অল্প মাত্রায় এমনকি চেখে দেখলেও মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
খ. যে সব জীবজন্তুর মিযাজ মানুষের কাছাকাছি (যেমন- বানর, গিনিপিগ, ইঁদুর), প্রথমে তাদের উপর প্রয়োগ করে ক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কয়েকবার যাচাইয়ের মাধ্যমে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তবেই অল্প মাত্রায় মানবদেহে প্রয়োগ করা যায়।
গ. জীবজন্তুর উপর পরীক্ষার পর মানুষের উপর পরীক্ষার জন্য সবল, স্বাস্থ্যবান, হৃষ্টপুষ্ট ও বয়স্ক ব্যক্তি নির্বাচন করতে হবে। শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ ও দুর্বল ব্যক্তির উপর কোনো নতুন ঔষধের প্রাথমিক পরীক্ষা করা মোটেই উচিত নয়।
৪২. ভেষজদ্রব্য সংগ্রহের নীতিমালা কী?
ক. ফুল ও পাতা: নিজস্ব রং-রূপে পুরোপুরি পরিপূর্ণতা লাভ করলেই সংগ্রহের সঠিক সময়; ছায়ায় শুকিয়ে ব্যবহার করা হয়। ছায়ায় পর্যাপ্ত তাপ না থাকলে সরাসরি রোদেও শুকানো যায়।
খ. ফল ও বীজ: ফল সম্পূর্ণ পেকে যাওয়ার পর, তবে বিবর্ণ ও সংকুচিত হতে শুরু করার আগেই সংগ্রহ করে যথারীতি শুকাতে হয়।
গ. মূল ও শিকড়: সাধারণত হেমন্তের শেষে বা শীতের প্রারম্ভে, ফল ধরার আগেই সংগ্রহ করে শুকাতে হয়।
ঘ. ডাল-পালা ও ছাল: গাছ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর, তবে মরে শুকিয়ে যাওয়ার আগে সংগ্রহ করে যথারীতি শুকিয়ে নেওয়া হয়।
ঙ. লতা-গুল্ম: পূর্ণরূপে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাজা অবস্থায় সযত্নে তুলে এনে শুকিয়ে নেওয়া হয়।
চ. গঁদ বা আঠা: ভোরে সূর্যোদয়ের পূর্বে অথবা সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের পরে; গাছের গা থেকে শুকিয়ে আপনা-আপনি খসে পড়ার আগেই সংগ্রহ করতে হয়।
ছ. প্রাণীজ ভেষজ: কখনো পূর্ণবয়স্ক প্রাণী থেকে, কখনো বাচ্চা প্রাণী থেকে সংগ্রহ করা হয়। যেমন- পনীর-মায়া উটের সদ্যপ্রসূত বাচ্চা থেকে সংগৃহীত হয়। বয়স্ক মোরগের তুলনায় বাচ্চা মোরগের ঝোল অধিক লঘুপাক; পক্ষান্তরে অন্ত্রশূল (পেটব্যথা) রোগে বৃদ্ধ মোরগের ঝোল উপকারী।
৪৩. ভেষজদ্রব্য সংরক্ষণের পদ্ধতি কী?
ভেষজদ্রব্যের তাহাফফুয (সযত্ন সংরক্ষণ)-এর জন্য নিম্নোক্ত নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন, যাতে বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ, রূপ নষ্ট হয়ে কার্যকারিতা না হারায়-
১. যে সমস্ত ভেষজের সুগন্ধি উপাদান উড়ে যায় (সত্তে পুদিনা, সত্তে আজওয়াইন, কর্পূর, জাফরান, মেশক, আম্বর ইত্যাদি), সেগুলো কাঁচের শিশিতে মুখবন্ধ করে নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে এবং বাতাসের সংস্পর্শ থেকে বাঁচাতে হবে।
২. লতা-গুল্ম জাতীয় ভেষজ কাঁচের পাত্রে বা পরিষ্কার টিনের কৌটায় মুখবন্ধ করে রাখতে হবে, যাতে গন্ধ উড়ে গিয়ে শক্তি ও কার্যকারিতা হ্রাস না পায়। যেমন- পুদিনা, জটামাংসী, গুলে সুর্খ ইত্যাদি।
৩. একটি ভেষজকে অপর ভেষজের সাথে একত্রে এক পাত্রে বন্ধ করে রাখা মোটেই উচিত নয়।
৪. আর্দ্রতা ভেষজ নষ্ট ও বিকৃত করতে সহায়ক; তাই আর্দ্রতা ও সিক্ততা থেকে বাঁচিয়ে রাখা আবশ্যক।
৫. কাপড় বা চটের বস্তায় রাখলে বিশেষত লঘু উপাদানবিশিষ্ট সুগন্ধি ভেষজের গুণ হ্রাস পেতে পারে; কারণ সূক্ষ্ম ছিদ্রপথে সুগন্ধি উপাদান ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং বায়ুর আর্দ্রতাও বস্তার ভেতরে পৌঁছায়।
৬. মধু বা যথাযথ ঘনত্বের চিনির শিরায় রাখলে অধিকাংশ ভেষজ অবিকৃত ও পচনমুক্ত থাকে। কাঁচা ও টাটকা ফল এবং প্রাণীজ বস্তু মধুতে ভিজিয়ে রাখলে বহুদিন নিরাপদ থাকে। মগজ জাতীয় দ্রব্য ঘিয়ে ভেজে শুকনো কাঁচের পাত্রে মুখবন্ধ করে রাখলেও বহুদিন নষ্ট হয় না।
৭. তরল ও আধা-তরল ভেষজ দীর্ঘদিন ধাতব পাত্রে রাখা সমীচীন নয়; ধাতুর বিক্রিয়ায় ভেষজ নষ্ট এমনকি বিষে পরিণত হতে পারে। তাই আরক, শরবত, সেকাঞ্জাবীন, রওগন ইত্যাদি তরল এবং মা’জুন, জাওয়ারিশ, লউক, খামীরা, গুলকন্দ, মোরব্বা ইত্যাদি আধা-কঠিন ও আধা-তরল ঔষধ পরিচ্ছন্ন কাঁচের শিশি, বোতল বা বয়ামে মুখবন্ধ করে রাখা বাঞ্ছনীয়।
৪৪. উদ্ভিদ ভেষজ কত প্রকার?
গাছ-গাছড়া ও লতা-গুল্ম থেকে প্রাপ্ত উদ্ভিদ ভেষজ এগারো প্রকার। যথা-
১. গঁদ বা আঠা: আরবিতে ছমগ, ফারসিতে গোন্দ।
২. নিংড়ানো রস: পাতা, ছাল ইত্যাদি থেকে নিংড়ানো রস, যা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ঘনীভূত করা হয়।
৩. কুঁড়ি ও ফুল: আরবিতে কুঁড়িকে যহরা ও প্রস্ফুটিত ফুলকে ফুক্কাহ এবং ফারসিতে যথাক্রমে শেগুফা ও গুল বলে।
৪. পাতা: আরবিতে ওয়ারাক, ফারসিতে বর্গ।
৫. উদ্ভিদ-নিঃসৃত দুধ: নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ঘনীভূত করা হয়; আরবিতে লবন, ফারসিতে শীর বলে। বিষাক্ত প্রকৃতির উদ্ভিদ-দুধের জন্য আলাদা পরিভাষা ব্যবহৃত হয়।
৬. তেল: আরবিতে দুহন, ফারসিতে রওগন।
৭. ফল: আরবিতে ছমর, ফারসিতে মেওয়া।
৮. বীচি, বীজ বা দানা: আরবিতে বযর, ফারসিতে তোখম।
৯. ডাল-পালা: আরবিতে আজান, ফারসিতে শাখ।
১০. মূল বা শিকড় এবং দাড়ি বা ঝুল: আরবিতে যথাক্রমে আছল ও লেহইয়া, ফারসিতে বেখ ও রীশ।
১১. খোসা ও ছাল: আরবিতে কিশর, ফারসিতে পোস্ত।
৪৫. বিকল্প ভেষজ কাহাকে বলে? এর আবশ্যকতা বর্ণনা করুন এবং উদাহরণ দিন।
অনেক সময় বিশেষ কারণে একটি ভেষজদ্রব্যের পরিবর্তে অপর একটি ভেষজদ্রব্য নির্বাচন ও ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়, যা মূল দ্রব্যের অনুরূপ বা কাছাকাছি গুণবৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতার অধিকারী। মূল ভেষজের এই স্থলবর্তী ভেষজই দাওয়ায়ে বদল তথা বিকল্প ভেষজ।
আবশ্যকতা: ১. সকল ভেষজ সর্বত্র বা বছরের সব মৌসুমে উৎপন্ন হয় না; সরবরাহের অভাবে প্রয়োজনের সময় কোনো ভেষজ না পাওয়া গেলে গুণ ও কার্যকারিতায় সামঞ্জস্যপূর্ণ সহজলভ্য বিকল্প সমস্যার সমাধান করে। ২. রোগীর জন্য উপযুক্ত ভেষজের মূল্য অনেক বেশি হলে এবং রোগী তা বহনে অক্ষম হলে অপেক্ষাকৃত স্বল্পমূল্যের অনুরূপ বিকল্প ব্যবহার করা যায়। ৩. নির্দিষ্ট ভেষজটি কোনো রোগীর জন্য অন্য কোনো দিক দিয়ে ক্ষতিকর হবে বলে আশঙ্কা থাকলে সেটির পরিবর্তে অনুরূপ গুণবিশিষ্ট এমন বিকল্প ব্যবহার করা যায়, যাতে সেই ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
বিকল্প ভেষজের উদাহরণ (মূল ভেষজ → বিকল্প):
১. আকরকরহা → ক. দরূনজ আকরবী সমপরিমাণ; খ. পুদিনা (না’না’) দেড়গুণ।
২. আফতীমূন → ক. অম্লরসের রেচক হিসেবে তুরবুদ সমপরিমাণ; খ. হাশা এক-তৃতীয়াংশ।
৩. আফসানতীন → ক. দেরমানা তুর্কী; খ. প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ও পাকস্থলীর শক্তিবর্ধনে আসারূন সমপরিমাণ।
৪. ঈরসা → ক. দেহের পানি নিষ্কাশনের জন্য মাজরিযুন এক-তৃতীয়াংশ এবং তৎসহ উটের দুধ ১০০ মিলিলিটার।
৫. উদবলসান → ক. সলীখা পাঁচগুণ। ৬. কাকনাজ → ক. মৌচাকের মোম সমপরিমাণ। ৭. গারীকুন → ক. বযরুল-বস্ত।
৮. জদওয়ার → ক. শ্লেষ্মা ও অম্লরস নিঃসারণের জন্য তুরবুদ সমপরিমাণ; খ. আফতীমূন এক-তৃতীয়াংশ।
৯. দরূনজ আকরবী → ক. যরম্বাদ তিনগুণ। ১০. করকরুন → ক. আস্ত্রীর গাছের দুধ।
১১. ফিলফিল (দরায/নোয়া) → ক. জরায়ুতে সঞ্চিত বায়ু নিবারণের জন্য যরম্বাদ সমপরিমাণ; খ. করণফুল (লবঙ্গ) দুই-তৃতীয়াংশ।
১২. বরনজাসুফ → ক. মলমে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কবুতরের বিষ্ঠা; খ. হেলতীত (হিং)।
১৩. বসফায়েজ → ক. শীতল প্রকৃতির ব্যথা-বেদনা ও গেঁটেবাতে নারমুশক সমপরিমাণ; খ. সূরঞ্জান শিরীন দুই-তৃতীয়াংশ; গ. খোসা ছাড়ানো কুরতুম-বীজ অর্ধেক।
১৪. বাদরঞ্জবুয়া → ক. শীতল প্রকৃতির মস্তিষ্ক রোগে বাবুনা সমপরিমাণ।
১৫. মারওয়ারীদ/লু’লু (মুক্তা) → ক. অম্লরস নিঃসারণে আফতীমূন দেড়গুণ; খ. লবণ সমপরিমাণ।
১৬. মুর/মুর মক্কী → ক. হৃদযন্ত্রের প্রফুল্লকারক ও শক্তিবর্ধক হিসেবে আবরেশম সমপরিমাণ; খ. তুরঞ্জ (গোঁড়া লেবু)-এর তাজা খোসা।
১৭. যরম্বাদ → ক. ছদফ (ঝিনুক)-এর মিহি চূর্ণ দ্বিগুণ; খ. ফিলফিল সিয়াহ (গোলমরিচ) অর্ধেক।
১৮. যরাওয়ান্দ তভীল → ক. শীতরজ হিন্দী।
১৯. যরাওয়ান্দ মুদাহরাজ → ক. দরূনজ আকরবী দেড়গুণ; খ. কাসনী জংলী দুই-তৃতীয়াংশ; গ. তুরঞ্জ-বীজ অর্ধেক।
২০. রওগন বলসান → ক. যরম্বাদ সমপরিমাণ; খ. বিসবাসা দুই-তৃতীয়াংশ; গ. কুস্ত অর্ধেক।
২১. তৈলজাতীয় ভেষজ (বিকল্পরূপে) → ক. রওগন কেওড়া; খ. রওগন নারজীল (নারিকেল তেল) অর্ধেক; গ. রওগন যয়তুন (পুরনো) এক-চতুর্থাংশ।
২২. শাকাকুল মিছরী → ক. বযীদান। ২৩. সাকবীনজ → ক. বীরূযা।
২৪. সূরঞ্জান → ক. গেঁটেবাতে মেহেদী পাতা সমপরিমাণ; খ. মুকিল (গুগ্গুল) অর্ধেক।
৪৬. ভেষজের ক্ষতিকর দিক সংশোধনে কী অবলম্বন করতে হয়?
ভেষজদ্রব্যের ক্ষতিকর দিক সংশোধনের জন্য অবস্থাভেদে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হয়। যেমন-
১. ভেষজটিকে হালকা আগুনের তাপে ভেজে নেওয়া, আগুনে পুড়িয়ে নেওয়া, বিশেষ পদ্ধতিতে শোধন করা কিংবা গরম বা ঠান্ডা করে নেওয়ার মাধ্যমে তার মিযাজগত অবস্থার পরিবর্তন সাধন।
২. প্রয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন করা। যেমন- কোনো ঔষধ মুখে সেবন করলে রোগীর বমি বা পাকস্থলীতে অস্বস্তি ও অস্থিরতা দেখা দেয়, অথচ পিচকারীর (ডুশ/ইনজেকশন জাতীয় পদ্ধতির) সাহায্যে প্রয়োগ করলে তেমনটি হয় না।
৩. ভেষজটির সাথে এমন কোনো বিশেষ ভেষজ বা অনুপান যোগ করা, যা সেটির ক্ষতিকর দিক সংশোধন করে। এ ধরনের ভেষজকে দাওয়ায়ে মুসলেহ তথা সংশোধক ভেষজ বলা হয়।
কছীফ — নিবিড়, গুরু, ঘন; যে ঔষধ গঠনে ফাঁপা নয় (বিপরীত: লতীফ)। যেমন- আকীক, যমররদ, যারাওয়ান্দ।
জামেদ — কঠিন, অতরল, জমাট; যা তরল নয় বরং জমাট বাঁধা। যেমন- মোম, চর্বি, গেরুমাটি, ছমগ আরবী।
দাবেক — আঠাল, চটচটে; আঠালো হওয়ায় যা দেহ বা অঙ্গের উপর এঁটে যায়। যেমন- ছমগ আরবী, মধু, লাক্ষা।
দুহনী — তৈলাক্ত; যাতে তৈল জাতীয় বস্তু রয়েছে। যেমন- মগযে বাদাম শিরীন (কাগজী বাদামের শাঁস)।
নবীজ — পোক্ত, পাকা; যা আপন বৈশিষ্ট্যে পূর্ণাঙ্গ ও ব্যবহারের যথার্থ উপযোগী। যেমন- পাকা ফল। শব্দটি কেবল প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
নাশেফ — রসশোষক, বিশোষক; যা আর্দ্রতা শুষে নেয়। যেমন- চুন, সঙ্গজরাহত, শুকনো সুপারি।
ফজ্জ — কাঁচা, অপক্ব; যা আপন বৈশিষ্ট্যে পূর্ণাঙ্গ নয়। যেমন- অপক্ব ফল, যা এখনো খাওয়ার উপযোগী হয়নি।
মুতাবাখখের — বাষ্পবিশিষ্ট; যার মূল পদার্থ জলীয়, ফলে তাপের সংস্পর্শে জলীয় অংশ বাষ্পাকারে উঠে যায়। যেমন- সুরা।
যায়েব — গলনশীল; তাপে গলে যায়, কিন্তু আর্দ্রতা বস্তুর শুষ্কতার সাথে এমনভাবে যুক্ত থাকে যে বাষ্প হয়ে উড়ে যায় না। যেমন- তামা, স্বর্ণ।
লতীফ — কোমল, লঘু; ক্রিয়ার সময় যে ঔষধ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। যেমন- দারচিনি, জাফরান। লতাফত বলতে ঘনত্বের তরলতাকেই বোঝায়— কোথাও ক্রিয়ার দিক দিয়ে (যেমন- সুরা), কোথাও শক্তির দিক দিয়ে (যেমন- দারচিনি)।
লাযেজ — চটচটে; আঠালোভাব ও শুষ্কতার দরুন যা অঙ্গ হতে সহজে বিচ্ছিন্ন হয় না। যেমন- খোব্বাযী, মসুর, শিরীষ, গঁদ।
লোআবী — পিচ্ছিল-আঠালো; তরল পদার্থে ভেজালে যার অংশ পৃথক হয়ে সমগ্র পদার্থ আঠালো হয়ে যায়। যেমন- টাটকা বিহিদানা, খেতমী।
সায়েল — প্রবাহী; শক্ত জিনিসের উপর রাখলে যার অংশ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে (সাইয়াল/মায়েয)। যেমন- মীআ সায়েলাহ, ঘি, টাটকা মাখন।
হশ — ভঙ্গুর, পলকা; সামান্য স্পর্শেই ভেঙে টুকরো হয়ে যায়। যেমন- উৎকৃষ্ট গারীকুন, উৎকৃষ্ট মুসাব্বর।
বাক্কাল — ক্ষয়কারক; তেজস্ক্রিয়তা ও দ্রাবকশক্তির আধিক্যে মাংসে ক্ষত সৃষ্টি করে মাংস গলিয়ে কমিয়ে দেয়। যেমন- যঙ্গার, চুন, হরিতাল, সিন্দুর, তুঁতে।
কাবেয — সংকোচক, ধারক; সংকোচক শক্তির দ্বারা অঙ্গের আশপাশের তরল রস জমিয়ে দেয় বা শিরা-উপশিরা সংকুচিত করে। যেমন- তাবাশীর, গুলে আনার, মাজুফল, আফিম, জামুন (জামবীজ), ছোলা।
আছের — কষায়কারক, রস নিংড়ানোকারক; কষায় শক্তির বলে অঙ্গ সংকুচিত করে তরল পদার্থ নিংড়ে বের করে। যেমন- হরীতকী, আমলকী, ডালিমের ছাল, জামবীজ।
কাতেল — প্রাণসংহারক; সংহারক ক্ষমতার বলে রূহ বা জীবনীশক্তি বিনাশ করে। যেমন- আফিম, সাম্মুল-ফার, কুচিলা, ধুতুরা।
কাতেলে জারাসীম — জীবাণুনাশক। যেমন- সত্তে পুদিনা, সত্তে আজওয়াইন, তামাক, পারদ।
কাতেলে দীদান — ক্রিমিনাশক। যেমন- বাওবিরঙ্গ, কামীলা, দেরমানা তুর্কী, আতাফল গাছের কচি পাতা, পলাশপাপড়া, নিমছাল, কালোজিরা। প্রকারভেদ- ১. আম্আ (আন্ত্রিক ক্রিমিনাশক): বাওবিরঙ্গ, পলাশপাপড়া, কামীলা; ২. নমল (সুতাক্রিমিনাশক): তার্পিন তেল, পুদিনা, আফসানতীন; ৩. হাইয়াত (কেঁচোক্রিমিনাশক): কামীলা, বাওবিরঙ্গ, শালগম; ৪. হাব্বুল-কারা (ফিতাক্রিমিনাশক): ডালিম গাছের ছাল, সরখস, ওশবা।
কাভী — দাহক, দগ্ধকারক; প্রচণ্ড উষ্ণতা ও তেজস্ক্রিয়তায় রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতস্থানের উপরিত্বক ঝলসে দেয়। যেমন- সফেদা, আদা, রসুন, তেজাব, রাই সরিষা।
কাশের — খোসা বা ছাল উত্তোলক; পরিষ্কারকরণ ক্ষমতায় অঙ্গের অসার পদার্থ ও মলিন আবরণ ছাড়িয়ে উজ্জ্বল করে। যেমন- যারাওয়ান্দ, কারাবা, কুস্ত।
কাসেরে রিয়াহ — বায়ুনাশক; উষ্ণতার দরুন পাকস্থলী-অন্ত্রের বায়ু লঘু করে নিঃসরণ করে। যেমন- বিট লবণ, বিসবাসা, মৌরি, পুদিনা, জোয়ান, জিরা, তেজপাতা, গোলমরিচ, নিশাদল।
খাতেম — ক্ষতনিঃশেষক; ক্ষত শুকিয়ে মুখে দাগ স্থাপন করে। যেমন- তুতিয়া, ছদফ সোখতা (পোড়া ঝিনুক), মুসাব্বর।
গাসসাল — ধৌতকারক; তরলতা ও প্রবাহ শক্তির বলে অঙ্গের স্তরভাগ থেকে পদার্থ ধুয়ে পরিষ্কার করে। যেমন- পানি, আশে জও, মধুমিশ্রিত পানি, জিংক লোশন, বোরিক লোশন।
জালী/মুজাল্লী — উজ্জ্বলকারক, পরিষ্কারক; ক্ষারধর্মিতার দরুন লোমকূপ বা ত্বকের উপরিভাগ থেকে আঠালো রস ও ময়লা কেচে পরিষ্কার করে। যেমন- মধু, শোরা, লবণ, মিছরি, হরিতাল, ফিটকিরি, সিরকা, রীঠা, নিশাদল।
দাফেয়ে কায় — বমন নিবারক; রসপদার্থ ও বিশেষত পিত্তরসের উত্তেজনা প্রশমিত করে বমি বা বমিভাব দূর করে। যেমন- লেবু, আলুবোখারা, তুরঞ্জ, তেঁতুল।
দাফেয়ে খোমার — নেশা নিবারক; বাষ্প-উর্ধ্বারোহণ প্রতিরোধ করে মাদকতা দূর করে। যেমন- তেঁতুল, আলুবোখারা, টক ডালিম, লেবুর রস, আরকে গুলাব, গোলাপের ঘ্রাণ।
দাফেয়ে ছফরা — পিত্তনাশক; অতিরিক্ত পিত্ত বের করে দেয়। যেমন- গুলে বনফশা, আলুবোখারা, পুরনো তেঁতুল, পালং শাক।
দাফেয়ে তাআফ্ফুন — পচননিবারক; সঞ্চিত দূষিত পদার্থ সংশোধন করে পচন রোধ করে। যেমন- পারদ, ফিটকিরি, নিমপাতা, কর্পূর।
দাফেয়ে হুম্মা — জ্বরনিবারক; জ্বরের অতিরিক্ত তাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। যেমন- খাকসী, চিরতা, গোলমরিচ, গেলু (গুলঞ্চ), শুঁঠ, জায়ফল, আবরেশম।
দাফেয়ে তাশান্নুজ — খিঁচুনি নিবারক; স্নায়ু ও মাংসপেশীর খিঁচুনি রোধ করে। যেমন- উদ ছলীব, হিং, কুস্ত, কায়ফল, জুন্দবেদস্তর; হাঁপানির টানে ধুতুরা পাতার সিগারেট, হিং।
দাফেয়ে যিয়াবীতুস — বহুমূত্র নিবারক; রক্তে ও মূত্রে শর্করার পরিমাণ হ্রাস করে। যেমন- গুড়মার বুটি, জামের বীজ, সত্তে গেলু (গুলঞ্চের শ্বেতসার), সালাজীত, তাবাশীর।
দাফেয়ে সুমুম — বিষনাশক; বিষক্রিয়া দূর করে। যেমন- মুর মক্কী, যহর মোহরা, লেবু।
দাফেয়ে হুমুযাত — অম্লনাশক; পাকস্থলী-অন্ত্রের অম্লতা হ্রাস করে স্বাভাবিক করে। যেমন- গুলে নীলুফর, যহর মোহরা, সঙ্গজরাহত, সোহাগা, যষ্টিমধু।
নাফফাখ — বায়ুসঞ্চারক; বায়ু সঞ্চার করে পেট ফাঁপা, পেট ডাকা ও ব্যথা সৃষ্টি করে। যেমন- কপি, ঢেঁড়শ।
মানেয়ে আরক — ঘামরোধক; স্নায়ুসমূহকে প্রভাবিত করে অতিরিক্ত ঘাম রোধ করে। যেমন- আজওয়াইন খোরাসানী, মাজুফল, ধুতুরা।
মানেয়ে উফুনাত — পচনরোধক; ক্ষত বা পচনশীল দ্রব্যের পচনক্রিয়া রোধ করে। যেমন- পুদিনা, লবণ, মধু, বরফ, অ্যালকোহল।
মানেয়ে নওবত — পালা রোধক; জ্বরের মূল কারণ দূর করে পালাজ্বরের পুনরাক্রমণ রোধ করে। যেমন- করঞ্জুয়া, আতীস, গেলু, তুলসী পাতা।
মানেয়ে রুআফ — নাকের রক্তক্ষরণ রোধক। যেমন- বুসবুদ, আনজবার, বারতাঙ্গ, দম্মুল-আখাওয়াইন, কাহরুবা, কর্পূর।
মুআত্তের — সুগন্ধিকারক; সুবাস ও রুচির উদ্দেশ্যে বা বিশ্রী গন্ধ দূর করতে ঔষধে মেশানো হয়। যেমন- গুলাব, সুম্বুলুত-তীব, খুলাঞ্জান, তালিশপত্র, শ্বেতচন্দন।
মুআত্তেশ — পিপাসাকারক; উষ্ণতা, শুষ্কতা ও তেজস্ক্রিয়তার দরুন পিপাসা সৃষ্টি করে। যেমন- মাছ, মাংস, ছোলা, মরিচ, লবণ, রৌদ্রে চলাফেরা।
মুআত্তেস — হাঁচিকারক; তেজস্ক্রিয়তায় নাসারন্ধ্রে জ্বালা-সুড়সুড়ি সৃষ্টি করে হাঁচি আনে এবং মস্তিষ্কের অসার শ্লেষ্মা বের করে। যেমন- তামাক, নাকছিকনী, গোলমরিচ, নিশাদল।
মুআদ্দেলাতে খুন — রক্ত পরিমিতকারক (মুছাফ্ফীয়ে খুন— রক্ত পরিষ্কারকও বলা হয়); রক্তকে অপরিমিত অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনে। যেমন- আফতীমূন, শীশম, রক্তচন্দন, শাহতারা, বাকায়েন (ঘোড়ানিম), কাসনী, কাকমাচী, বসফায়েজ, নিমছাল, চোপচিনি, সরফুকা, ওশবা।
মুআদ্দেলাতে ছফরা — পিত্ত পরিমিতকারক। যেমন- ইসবগুল, বিহিদানা, তোখমে কলা, কাসনী, তোখমে খোরফা, ধনে, গুলে বনফশা, গুলে নীলুফর।
মুআদ্দেলাতে বলগম — শ্লেষ্মা পরিমিতকারক। যেমন- আনীসূন, আঞ্জীর, বাদিয়ান, বরনজাসুফ, পরসিয়াওশান, সুম্বুলুত-তীব, গুলে সুর্খ, মুনাক্কা, তোখমে খেতমী, তোখমে খোব্বাযী।
মুআদ্দেলাতে সওদা — অম্ল (সওদা) পরিমিতকারক। যেমন- যষ্টিমধু, আফতীমূন, উসতুখুদুস, শাহতারা, বাদরঞ্জবুয়া।
মুআফফেন — পচনকারক; অস্বাভাবিক উষ্ণতার প্রভাবে অঙ্গ বা রূহের মিযাজ বিকৃত করে রসপদার্থ পচিয়ে দেয়। যেমন- হরিতাল।
মুআররেক — ঘর্মকারক; উষ্ণতা বা কোমলতার গুণে দেহাভ্যন্তরের আবদ্ধ রস লোমকূপ দিয়ে নির্গত করে। যেমন- শোরা কলমী, খাকসী, মূলা, চা, কফি, তামাক, উষ্ণ প্রকৃতির মূত্রকারক দ্রব্য, গরম কাপড় পরিধান।
মুআযযেমে কযীব — লিঙ্গবর্ধক; পুষ্টিকারক গুণের মাধ্যমে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে বৃদ্ধি করে। যেমন- আকরকরহা, লবঙ্গ, জায়ফল, দারচিনি, যয়তুনের তেল।
মুওয়াল্লেদে খুন — রক্ত উৎপাদক। যেমন- ফওলাদ (লৌহ), লৌহ উপাদানবিশিষ্ট ফল, মুরগির বাচ্চা।
মুওয়াল্লেদে মনী — শুক্র উৎপাদক; অধিক খাদ্যগুণ বা অতিরিক্ত গাঢ় রস (রুতুবতে ফুযলিয়্যা) থাকায় শুক্র বৃদ্ধি করে। যেমন- কাগজী বাদাম, পেস্তা, চিলগোযা, খোরমা, কাঁচা পেঁয়াজ, ছোলা, তিসি, দুধ, সূরঞ্জান শিরীন, বাহমান, বযীদান, শতমূলী, ইন্দ্রযব, মাখনা, শালগম, গাজর, নারিকেল, জাফরান, হাঁসের মাংস, ভুনা মোরগ।
মুওয়াল্লেদে লবন — দুগ্ধ উৎপাদক; রক্ত সৃষ্টির মাধ্যমে বা গাঢ় রস বৃদ্ধি করে স্তনে দুধের উৎপাদন বাড়ায়। যেমন- জিরা, মৌরি, মুছলী সিয়াহ ও সফেদ, সাদা তিল, শতমূলী, আরবি গদ, কাতিরা গঁদ, আলু, তুদরী, শাকাকুল, দুধ।
মুওয়াসসেখে কুরূহ — ক্ষত মলিনকারক; আর্দ্র ঔষধ, যা ক্ষতের আর্দ্রতা বাড়িয়ে ক্ষত শুকাতে বাধা দেয়। যেমন- তেল জাতীয় দ্রব্য।
মুকাত্তে’ — কর্তনকারক; অঙ্গে লেগে থাকা গাঢ় আঠালো পদার্থকে কেটে ক্ষুদ্র টুকরো করে বিচ্ছিন্ন করে। এ ঔষধ কোমল ও দ্রুত সংক্রমণশীল। যেমন- সিরকা, রাই সরিষা, সেকাঞ্জাবীন।
মুকাওভীয়ে আ’ছাব — স্নায়ু সবলকারক। যেমন- মেথি, মুগাছ, কুচিলা, কুস্ত, জুন্দবেদস্তর, আসারূন, জওশীর, খোরমা, জদওয়ার।
মুকাওভীয়ে উমুমী — সাধারণ বলকারক; অধিক আমিষ বা খাদ্যপ্রাণযুক্ত হওয়ায় দেহে সাধারণ বল বৃদ্ধি করে। যেমন- মাছ, মাংস, ডাল, ফল, দুধ।
মুকাওভীয়ে আমআ — অন্ত্র সবলকারক; পরিপাকশক্তি সবল করে অন্ত্রনালী সক্রিয় করে। যেমন- আমলকী, আনারদানা, মুসতগী, গুলে সুর্খ, হালীলা (হরীতকী)।
মুকাওভীয়ে আসনান ও লিছা — দাঁত ও মাড়ি সবলকারক। যেমন- তামাক ভস্ম, হলুদ, কড়ি, ফিটকিরি, লোবান, জিরা, গোলমরিচ, আকরকরহা, নাগরমুথা, মসুর, সঙ্গজরাহত, তালিশপত্র, বকুলের ছাল।
মুকাওভীয়ে কলব — হৃদযন্ত্র সবলকারক; সংকোচন ও সম্প্রসারণগত গতি সঠিক রেখে হৃদযন্ত্র সবল করে। যেমন- গাজর, আঙ্গুর, কেওড়া, মেশক, জাফরান, যহর মোহরা, আকীক, মারজান (প্রবাল), ইয়াকূত, আনার, পেয়ারা, আমলকী, আম্বর, চন্দন, গাওজবান, মুক্তা, নীলুফর, ছদফ, বাহমান, এলাচ, জটামাংসী, নাগরমুথা, জুন্দবেদস্তর, বাদরঞ্জবুয়া।
মুকাওভীয়ে কাবেদ — যকৃৎ সবলকারক; মিযাজের পরিমিতি ও কোমলতার গুণে যকৃৎ সবল করে। যেমন- জায়ফল, কাসনী, মুনাক্কা, লবঙ্গ, পেস্তা, মুসতগী, সকমুনিয়া, রেউচিনি, তেজপাতা, গাফেছ, দারচিনি, কালোজিরা, তোখমে কাসুস, এলাচ।
মুকাওভীয়ে কুলিয়া — বৃক্ক সবলকারক। যেমন- চিলগোযা, ফুন্দুক, খরমুজ-বীজের শাঁস, শসা ও কাঁকুড়-বীজের শাঁস, গাজর-বীজ, পেস্তা।
মুকাওভীয়ে তেহাল — প্লীহা সবলকারক। যেমন- রাই সরিষা, জামের সিরকা, পেঁপে।
মুকাওভীয়ে দিমাগ — মস্তিষ্ক ও মানসিক শক্তিবর্ধক; মানসিক দুর্বলতা দূর করে। যেমন- কাগজী বাদামের শাঁস, পেস্তা, আখরোট, চালকুমড়া ও তরমুজ-বীজের শাঁস, উসতুখুদুস, ধনে, আমলকী, হরীতকী, পোস্তদানা, চন্দন, জাফরান, মোরগের মাংস, মুক্তা, গোলাপ, নাগরমুথা, শুঁঠ, জটামাংসী, বাদরঞ্জবুয়া, মেশক, আম্বর, লবঙ্গ, কিশমিশ।
মুকাওভীয়ে বছর — দৃষ্টিশক্তি বর্ধক। যেমন- তাজা মৌরির রস, আমলকী, জাফরান, বহেড়া, বিভিন্ন পাখির পিত্তরস, রূপার শলাকা, পোড়ানো রেশমগুটি, সুপক্ব পেঁয়াজ, সুর্মা ইসফাহানী, লবঙ্গ, গোলমরিচ, কাগজী বাদাম, আকীক, হরীতকী, ভৃঙ্গরাজ, মুন্ডী, মুর মক্কী, খাঁটি মধু, ঝিনুক-ভস্ম।
মুকাওভীয়ে বাহ/মুবাহহী — যৌনশক্তি বর্ধক, কামোদ্দীপক; কোনো ঔষধ গাঢ় রস সঞ্চার ও উষ্ণতার গুণে সরাসরি, কোনোটি আনুষঙ্গিক ত্রুটি দূর করে পরোক্ষভাবে যৌনক্ষমতা বাড়ায়। যেমন- শালগম, গাজর, পেঁয়াজ, মূলা, ফুন্দুক, বাদাম শিরীন, খোরমা, চিরঞ্জী, পেস্তা, চিলগোযা, ছা’লাব মিছরী, খুলাঞ্জান, বাহমান (লাল ও সাদা), গোক্ষুর, মুছলী সিয়াহ ও সফেদ, শিমুল মূল, সাদা তিল, আকরকরহা, পেঁয়াজ-বীজ, গাজর-বীজ, শুঁঠ, পোস্তদানা, ইন্দ্রযব, মেশক, আম্বর, দারচিনি, চড়ুইয়ের মাংস, চিংড়ি মাছ, মোরগের মাংস ও ডিম, কবুতরের মাংস, ঘি।
মুকাওভীয়ে মাছানা — মূত্রাশয় সবলকারক; কার্যক্ষমতা ও ধারণক্ষমতা বাড়ায়। যেমন- কুন্দুর, সুম্বুলুত, যমররদ, তিল।
মুকাওভীয়ে মেদা — পাকস্থলী সবলকারক; কার্যক্ষমতা ও পরিপাকশক্তি সবল করে। যেমন- চিরতা, আমলকী, গোলাপ ফুল, পুদিনা, দারচিনি, নাগরমুথা, জোয়ান, লবঙ্গ, এলাচ, তেজপাতা, হরীতকী, আনারদানা, কালোজিরা, তোখমা, জায়ফল, জাম, দই, আনীসূন, তুরঞ্জের খোসা, সঙ্গদানা মুরগ, আগর, শুঁঠ, বেলগিরী, পেঁপে।
মুকাওভীয়ে রেহেম — জরায়ু সবলকারক; জরায়ুর পেশী ও স্নায়ুতন্তু সবল করে। যেমন- নারিকেলের শাঁস, পেস্তা, সিংঘারা (পানিফল), আরবি গদ।
মুকাওভীয়ে শা’র — চুলের শক্তিবর্ধক। যেমন- আমলকী, মেথি, ভৃঙ্গরাজ, খেতমী, নারিকেল তেল।
মুতফিয়ে এলতেহাব — দাহ বা যন্ত্রণা প্রতিরোধক; কোনো যন্ত্রণাদায়ক পদার্থকে বাষ্পে পরিণত করে বের করে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োগ করা হয়। যেমন- রাই সরিষা, জামালগোটা, পুদিনা, লাল মরিচ।
মুকাররেহ — ক্ষতকারক; দেহের কোনো স্থানের আসল রসকে নিঃশেষ করে দূষিত পদার্থকে সেখানে টেনে এনে ক্ষত সৃষ্টি করে। যেমন- ভেলাগোটা, চুন, শীরে মাদার, হরিতাল, রসুন, পেঁয়াজ, চিতামূল, সাম্মুল-ফার, যঙ্গার, কবুতরের বিষ্ঠা।
মুকাল্লেলে লবন — দুগ্ধ হ্রাসকারক; শুষ্কতার প্রভাবে স্তনে দুধের উৎপাদন ও প্রবাহ কমায়। যেমন- আজওয়াইন খোরাসানী, আফিম, মাজুফল, গুলনার (আনারের ফুল), বংশলোচন, কর্পূর।
মুকী — বমনকারক; যা বমনের উদ্রেক করে পাকস্থলী থেকে রসপদার্থ বা বস্তু মুখ দিয়ে নির্গত করে। যেমন- কাঁচা মূলাপাতা, মূলা-বীজ, মেথি, লবণ, ফিটকিরি, গরম পানি।
মুখরেজে জনীন — গর্ভপাতকারক বা প্রসবসহায়ক; জরায়ুর পেশী ও স্নায়ুতন্তু সংকুচিত ও সক্রিয় করে। যেমন- বানরলাঠির খোসা, তিসি, কালোজিরা, বাঁশপাতা, কড়া জোলাপ। (এসব বিষয় কেবল পরিভাষা হিসেবে উল্লিখিত; অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া ব্যবহার নিষিদ্ধ।)
মুখরেজে দীদান — ক্রিমি নিষ্কাশক; পাকস্থলী বা অন্ত্র থেকে ক্রিমি বের করে বা সেখানে ক্রিমির অবস্থান অসম্ভব করে। যেমন- সকমুনিয়া, কামীলা, পলাশপাপড়া, রেউচিনির ঘনীভূত রস, ভেরেন্ডার তেল।
মুখরেজে লোআবে দহন — মুখের লালা নিঃসারক; লালা ঝরিয়ে মুখ পরিষ্কার করে। যেমন- তুঁতে, ফিটকিরি, গোলমরিচ, লবঙ্গ, কচি পেয়ারা পাতা, কুলগাছের কচি পাতা।
মুখাদ্দের — চেতনানাশক, অসাড়কারক; অনুভূতিশীল রূহ বা অঙ্গকে মানসিক প্রতিক্রিয়া গ্রহণে অক্ষম করে সাময়িক চেতনা নাশ করে। যেমন- আফিম, লুফফাহ (বেলাডোনা), কাহু-বীজ।
মুখাররেশ — অস্থিরতা ও চুলকানিকারক; দেহ-মনে অস্থিরতা বা চুলকানি জাগায়। যেমন- রাই সরিষা, রসুন, পেঁয়াজ, বেগুন।
মুখাশশেন — অসমতলকারক; অঙ্গের উপরের স্তর মসৃণতার পর অমসৃণ করে দেয় (তীব্র সংকোচন, শুষ্কতা বা তেজস্ক্রিয়তার গুণে)। যেমন- রাই সরিষা, মাখনা, ভেলাগোটা, তেঁতুল-বীচি, জাম-বীচি, আমের আঁটি, সত্তে পুদিনা (মেনথল), সত্তে আজওয়াইন (থাইমল)।
মুগরী — আসঞ্জক; শুষ্ক আঠালো রসবিশিষ্ট যা শিরা, লোমকূপ বা অন্ত্রনালীর মুখে আটকে তা রুদ্ধ করে। যেমন- ভাজা তুলসী-বীজ, সাপেস্তান, খেতমী, ডিমের শ্বেতাংশ, ঢেঁড়শ, বিহিদানা।
মুগাল্লিযে মনী — শুক্র ঘনকারী; অতিরিক্ত রসপদার্থের দরুন শুক্রকে গাঢ় করে। যেমন- ভুনা মাংস, গুরুপাক তরকারি, বাহমান, তুদরী, সিংঘাড়া, মুছলী সফেদ, তালমাখনা, ইসবগুলের ভুসি, শিমুলমূল, তেঁতুল-বীচির শাঁস, মিছরি, শতমূলী, সালাজীত, পদ্মবীজ।
মুসলেহ — সংশোধক; অপর ঔষধের অনিষ্টকর গুণ বা খারাপ স্বাদ সংশোধন করে। যেমন- সোনাপাতা সেবনে বমিভাব বা অন্ত্রে কামড়ভাব হতে পারে বলে তার সাথে গোলাপ ফুল বা মৌরি যোগ করা হয়।
মুছাদ্দে’ — মাথাব্যথা সৃষ্টিকারক; পাকস্থলীতে উর্ধ্বমুখী বাষ্প সৃষ্টি করে, অথবা তেজস্ক্রিয় গন্ধ বা উষ্ণতার দরুন মাথাব্যথা ঘটায়। যেমন- খোরমা, লোবান, মূলা, বেগুন, মসুর, হিং।
মুছাফ্ফীয়ে খুন — রক্ত পরিষ্কারক; দূষিত বা বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কার করে রক্ত স্বাভাবিক করে। যেমন- ওশবা, নিমপাতা, নিমছাল, মেহেদী পাতা, গন্ধক, চন্দন, শাহতারা, সরফুকা, চোপচিনি, চিরতা, আফতীমূন, মুন্ডী, ওন্নাব।
মুছাল্লেব — শক্তকারক; শীতলতা, শুষ্কতা ও গাঢ়ত্বের গুণে অঙ্গ বা পদার্থকে শক্ত ও কঠিন করে। যেমন- কর্পূর, গেলে আরমানী (গেরুমাটি), আনারের খোসা, অশ্বগন্ধা।
মুজাদ্দেদ — দেহশক্তি পুনরুদ্ধারকারক; বার্ধক্যজনিত বা রোগপরবর্তী দুর্বলতায় বল পুনর্বহাল করে। যেমন- মেশক, আম্বর, মুক্তা, জুন্দবেদস্তর, ডিমের কুসুম।
মুজাফফেফ — শুষ্ককারক; দ্রাবক শক্তিতে রস দ্রবীভূত করে অঙ্গে শুষ্কতা সৃষ্টি করে। যেমন- আকন্দপাতা, সুপারি, ফিটকিরি, মুসাব্বর, আনারের খোসা, হালগুন-আস (ধারক), মাজুফল।
মুজাম্মেদ — জমাটকারক; শীতলতা ও সংকোচন শক্তির প্রভাবে প্রবহমান রসপদার্থকে গাঢ় ও কঠিন করে। যেমন- কাতীরা, নেশাস্তা, গেরুমাটি, আজওয়াইন খোরাসানী, মোম, আরবি গদ।
মুতফী — উষ্ণতা নিবারক; অধিক শীতলতা ও আর্দ্রতার প্রভাবে উষ্ণতা ও জ্বালা-যন্ত্রণা নিবারণ করে। যেমন- কর্পূর, কাহু, নীলুফর, কাসনী, আলুবোখারা, পালংশাক, শসার পানি, লাউয়ের রস, বরফ।
মুতাইয়েবে দহন — মুখ সুগন্ধিকারক; দুর্গন্ধ নাশ করে মুখ সুরভিত করে। যেমন- লবঙ্গ, তালিশপত্র, খুলাঞ্জান, শ্বেতচন্দন, গুলাব।
মুদাম্মেল — ক্ষতসারক; শুষ্ক প্রকৃতির ঔষধ, যা ক্ষতের দুই পাশের রস আঠালো করে দিয়ে ক্ষত মিলিয়ে শুকিয়ে দেয়। যেমন- দম্মুল-আখাওয়াইন, সঙ্গজরাহত, গেরুমাটি, সফেদা কাশগরী।
মুদির — প্রবাহক, তরল পদার্থ নিঃসারক; দেহের রসপদার্থ মূত্র ইত্যাদির মাধ্যমে বের করে। যেমন- মৌরি, খরমুজ-বীজ, শোরা, যবক্ষার, জিরা, মূলা, কাসনী-বীজ, আমলতাস, গোক্ষুর, কাবাবচীনী, জোয়ান, জাফরান, পুদিনা, করফস-বীজ।
মুদিররে বওল — মূত্র নিঃসারক; উষ্ণতা বা শীতলতার প্রভাবে মূত্রনালী দিয়ে পদার্থ বের করে। শীতল প্রকৃতির: তোখমে খোরফা, লাউ-শসা-তরমুজের পানি, লেবুর রস, শোরা, গোক্ষুর। উষ্ণ প্রকৃতির: গাজর-বীজ, পরসিয়াওশান, আনীসূন, আমলতাস, গুলফা-বীজ, মৌরি, কাবাবচীনী, তেজপাতা, জাফরান, জোয়ান, পুদিনা, কালোজিরা, আগর।
মুদিররে লবন — দুগ্ধ প্রবাহক; স্তনে দুধ বৃদ্ধি করে বা অতি গাঢ় দুধ তরল করে প্রবাহ বাড়ায়। যেমন- জিরা, মৌরি, মুছলী, সাদা তিল, শতমূলী, আরবি গদ, আলু, শাকাকুল, দুধ।
মুদিররে হায়েজ — রজঃস্রাবকারক; কোমলতা ও উষ্ণতার প্রভাবে জমাট রক্ত নিঃসরণযোগ্য করে এবং ঋতুস্রাব কম হলে (রক্তশূন্যতা কারণ না হলে) তা খোলাসা করে। যেমন- তেজপাতা, পরসিয়াওশান, কাবাবচীনী, কালোজিরা, জাফরান, বাবুনা, পুদিনা, বানরলাঠির খোসা, নাগরমুথা, করফস-বীজ, মুসাব্বর, জোয়ান, চিতামূল।
মুনযেজ — পক্বকারক; বিকৃত খিলত বা পদার্থের ঘনত্ব পরিমিত পর্যায়ে এনে নিঃসরণযোগ্য করে (অতি গাঢ় হলে তরল, অতি তরল হলে গাঢ় করে)। এ জাতীয় ঔষধ বেশিরভাগই উষ্ণ প্রকৃতির। প্রকারভেদ- মুনযেজাতে ছফরা (পিত্ত পক্বকারক): ওন্নাব, গুলে সুর্খ, নীলুফর, বনফশা, শাহতারা, কাসনী-মূল, কাকমাচী, সেকাঞ্জাবীন, মুকিল, মৌরি, যষ্টিমধু, আলুবোখারা; মুনযেজাতে বলগম (শ্লেষ্মা পক্বকারক): খোব্বাযী-বীজ, খেতমী-বীজ, কাসনী, মৌরি, যষ্টিমধু, গাওজবান, গোলাপ, তিসি, সেকাঞ্জাবীন; মুনযেজাতে সওদা (অম্লরস পক্বকারক): ওন্নাব, সাপেস্তান, গাওজবান, যষ্টিমধু, বাদরঞ্জবুয়া, রক্তচন্দন, সরফুকা, মুন্ডী, হালীলা সিয়াহ, আফতীমূন; মুনযেজাতে আওরাম (প্রদাহ বা স্ফীতি পক্বকারক): আঞ্জীর, ঈরসা, পেঁয়াজ, তিসি, মেথি-বীজ, জদওয়ার, জাফরান, মুসাব্বর।
মুনাওয়েম — নিদ্রাকারক; স্নায়ু শীতল-শান্ত করে এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের গতি কমিয়ে ঘুম আনে। যেমন- পোস্তদানা, কাহু, জাফরান, কাঁচা ধনে, তুলসী।
মুনাক্কীয়ে দিমাগ — মস্তিষ্ক পরিষ্কারক; মস্তিষ্কের অসার ও দূষিত পদার্থ বের করে ভারমুক্ত করে। যেমন- উসতুখুদুস, আফসানতীন, বাদরঞ্জবুয়া, হালীলা, আফতীমূন, বসফায়েজ।
মুনাফফেছে বলগম — শ্লেষ্মা নিঃসারক; ফুসফুসের শ্লেষ্মা কাশির মাধ্যমে বের হওয়ার উপযোগী করে। যেমন- খেতমী-বীজ, যষ্টিমধু, গাওজবান, ঈরসা, তিসি, সাপেস্তান, ওন্নাব, মধু, আবরেশম।
মুনাফফেখ — বায়ুসঞ্চারক; বায়ু সঞ্চার করে পেট ফাঁপা, পেট ডাকা ও ব্যথা সৃষ্টি করে। যেমন- কপি, লুবিয়া, ঢেঁড়শ।
মুনাফফেত — ফোস্কা সৃষ্টিকারক; তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ত্বকে ফোস্কা ফেলে। যেমন- ভেলাগোটা, শীরে মাদার, তেলেনী পোকা।
মুনাফফেয — প্রবাহক, বাহক; অপর কোনো ঔষধের সাথে মিলিত হয়ে সেটিকে দ্রুত উদ্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়। যেমন- জাফরান হৃদযন্ত্রের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষধের ক্রিয়াকে দ্রুত হৃদযন্ত্র অবধি পৌঁছে দেয়।
মুনাশশেফ/নাশেফ — বিশোষক; তরল রসকে নিজের দিকে শুষে শুকিয়ে দেয়। যেমন- চুন, সঙ্গজরাহত, শুকনো সুপারি, সাদা সুর্মা পাথর।
মুফজেজ — অপক্বকারক; শীতলতা ও শুষ্কতার প্রভাবে খাদ্য ও ধাতুরসের স্বাভাবিক দেহতাপ ও উদ্ভূত উষ্ণতা নষ্ট করে খাদ্যকে অপরিপাক অবস্থায় কাঁচা রেখে দেয়। যেমন- ইসবগুল।
মুফাজজেরে ওয়াবম — প্রদাহনাশক, ফোড়া-ফাটানোকারক; উষ্ণতা ও তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ফোড়া, ফোলা, স্ফীতি পাকিয়ে গলিয়ে দেয়। যেমন- জংলী পেঁয়াজ, কবুতরের বিষ্ঠা, হরিতাল, সফেদা কাশগরী, হীরাকষ, চুন, সোহাগা।
মুফাততেত — বিচূর্ণকারক; খিলত বা ধাতুরসের জমাট অংশ ভেঙে ছোট টুকরোয় পরিণত করে। যেমন- হাজরুল-ইয়াহূদ পাথরিকে চূর্ণ করে।
মুফাততেতে হাছাত — পাথরি চূর্ণকারক; মূত্রস্থলী, বৃক্ক বা পিত্তকোষের পাথরি টুকরো করে বা দ্রবীভূত করে বের করে দেয়। যেমন- হাজরুল-ইয়াহূদ, সঙ্গ-সরেমাহী, আকরব সোখতা, খরমুজ-বীজ, পরসিয়াওশান, গোক্ষুর, মৌরি, কৃষ্ণছোলা, যবক্ষার, নাগরমুথা, পাথরকুচি পাতা, শোরা কলমী।
মুফাততেহ — উন্মুক্তকারক, প্রতিবন্ধকতা অপসারক; অন্ত্রনালী বা দেহাভ্যন্তরের যেকোনো নালী, শিরা-উপশিরার প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে পথ উন্মুক্ত করে। যেমন- করফস-বীজ, আনীসূন, শুঁঠ, জাফরান, জোয়ান, জটামাংসী, আফসানতীন, উসতুখুদুস।
মুফাররেহ — প্রফুল্লকারক; কোমলতার গুণে মনে প্রফুল্লতা ও সজীবতা সঞ্চার করে, অবসাদ-আলস্য দূর করে, হৃদযন্ত্রে শক্তি যোগায়। যেমন- এলাচ, দারচিনি, সেব, পেস্তা, তোখমা, জাফরান, শ্বেতচন্দন, কর্পূর, মেশক, আবরেশম, আনার, আমলকী, পেয়ারা, গোলাপ, কেওড়া ফুল, আম্বর, আগর, লবঙ্গ, শাপলা ফুল।
মুফাশশী — বিক্ষিপ্তকারক, বায়ুনাশক; উষ্ণতার প্রভাবে সঞ্চিত বায়ু বিক্ষিপ্ত করে নিঃসরণযোগ্য করে। যেমন- আনীসূন, জিরা, জোয়ান, আদা, হিং, জাওশীর।
মুবাশ্বেখ — বায়ুসঞ্চারক; বায়ু ও খারাপ রসপদার্থ সৃষ্টি করে মিযাজ বিগড়ে দেয়, অনেক সময় হালকা জ্বরও আনে। যেমন- অড়হর, ঢেঁড়শ।
মুবাছছের — ফুসকুড়ি সৃষ্টিকারক; অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তায় ত্বকে ফুসকুড়ি সৃষ্টি করে। যেমন- সাম্মুল-ফার, শীরে মাদার, পেঁয়াজ, লবঙ্গ।
মুবাররেদ — শীতলকারক; অধিক শীতলতা গুণে শীতলতা সঞ্চার করে এবং উষ্ণতা ও জ্বালা-যন্ত্রণা উপশম করে। যেমন- কর্পূর, কাহু, নীলুফর, চন্দন, বরফ।
মুমবেতে লাহম — মাংস উৎপাদক (মুলাহহেমও বলা হয়); যা ক্ষতস্থানে উপনীত রক্ত জমিয়ে মাংসে রূপান্তরিত করে। এর শুষ্কতা গুণ মুদাম্মেলের তুলনায় কম। যেমন- গেলে আরমানী।
মুমবেতে শা’র — চুল উৎপাদক; যা চুল গজায়। যেমন- রওগনে আমলা, রওগনে বয়যা-মুরগ (মুরগির ডিমের তেল)।
মুমসেক — ধারক, বীর্যস্তম্ভক; শুষ্কতা ও লঘু উষ্ণতার দরুন বীর্য আটকে রাখে এবং দ্রুত স্খলন হতে দেয় না। যেমন- আফিম, জায়ফল, গুগ্গুল, ধুতুরা-বীজ, লবঙ্গ, খোরাসানী জোয়ান, কস্তুরী, দারচিনি, গোলমরিচ, শুঁঠ, জাফরান, কুচিলা।
মুযয়েফে নুখা — সুষুম্নাকাণ্ড দুর্বলকারক; মেরুদণ্ডের স্নায়ুরজ্জুর কার্যক্ষমতা হ্রাস করে। যেমন- ভাং, আফিম, কর্পূর।
মুযয়েফে বাহ — যৌনক্ষমতা হ্রাসকারক; নিজস্ব বিশেষ গুণে যৌনক্ষমতা বা স্পৃহা হ্রাস বা বিনষ্ট করে। যেমন- কর্পূর, ধনে, কাসনী, কাহু, শাপলা, লেবু, তেঁতুল, আলুবোখারা, খোরাসানী জোয়ান।
মুযয়েফে রেহেম — জরায়ু দুর্বলকারক। যেমন- তেঁতুল, আলুবোখারা, কর্পূর, আফিম।
মুযাইয়েক — সংকোচক, সংকীর্ণকারক; সংকোচক গুণের দরুন স্ত্রীলোকের যোনিপথ সংকুচিত করে। যেমন- মাজুফল, ডালিমের ছাল, বকুলের ছালের ডুশ, মধুর সাথে কর্পূরের প্রলেপ।
মুযেররাতে আমআ — অন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- উশনা, আনীসূন, বাওবিরঙ্গ, তুরবুদ, সকমুনিয়া, তেজপাতা, আম্বর, ছোট এলাচ, লবঙ্গ, কামীলা, জিরা।
মুযেররাতে উনছায়াইন — অণ্ডকোষের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- বযীদান, শসা-বীজ, তিসি, জওশীর, মেথি, ফরফিয়ূন।
মুযেররাতে কলব — হৃদযন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর; হৃদযন্ত্র দুর্বল করে বা স্বাভাবিক ক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়। যেমন- তামাক, সকমুনিয়া, হলুদ।
মুযেররাতে কাবেদ — যকৃতের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- শীতল পানি, আঞ্জীর, ঈরসা, মূলা-বীজ, হিং, খোরমা, সিরকা, সূরঞ্জান, সাপেস্তান, মুসাব্বর, মুকিল, জংলী হরীতকী।
মুযেররাতে কুলিয়া — বৃক্কের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- তেজপাতা, যষ্টিমধু, তেলাকুচা মূল, খোরফা-বীজ, মূলা-বীজ, জটামাংসী, লবঙ্গ, সাদা গোলমরিচ, প্রবাল।
মুযেররাতে ছদর — বক্ষদেশের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- সেব, বসফায়েজ, লৌহমল, খুলাঞ্জান, সুপারি, মাজুফল।
মুযেররাতে তেহাল — প্লীহার পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- যষ্টিমধু, আমলকী, পরসিয়াওশান, তরমুজ-বীজ, কাসনী-বীজ, তেঁতুল, খোরফা-বীজ, গেলে আরমানী, গাফেছ, গাওজবান।
মুযেররাতে দন্দান ও লিছা — দাঁত ও মাড়ির পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- বরফের পানি, বরফ, ক্ষার জাতীয় পানি, টক দ্রব্য, মূলা, সোহাগা, পেঁয়াজ।
মুযেররাতে দিমাগ — মস্তিষ্কের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- আলুবোখারা, গোঁড়া লেবু, রতনজোত, কুল, তামাক, হিং।
মুযেররাতে বছর — দৃষ্টিশক্তির পক্ষে অনিষ্টকর। যেমন- তিসি, গুলফা-বীজ, সুদাব, কাহু, পেঁয়াজ, মসুর, লবণ, জোয়ান, অতিরিক্ত যৌনক্রিয়া, রোদে ঘোরা, অতিরিক্ত গরম দ্রব্য ভক্ষণ।
মুযেররাতে বাহ — যৌনশক্তির পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- কর্পূর, টক ডালিম, আলুবোখারা, ঘোল, আফিম, পোস্তদানা, শাপলা-বীজ, গুলফা-বীজ, রেউচিনি, সিরকা, মসুর, কাহু, কাসনী, কাকমাচী।
মুযেররাতে মাছানা — মূত্রস্থলীর পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- পেঁয়াজ-বীজ, তেলাকুচা মূল, হালিম-বীজ, দারচিনি, তেজপাতা, যব, কাকমাচী, নাগেশ্বর, কাকনাজ।
মুযেররাতে মেদা — পাকস্থলীর পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- গরম পানি, ঈরসা, আবরেশম, মিঠা ও টক ডালিম, আঙ্গুর, আঞ্জীর, তিসি, বিহিদানা, গরু-ছাগলের মগজ।
মুযেররাতে রিয়া — ফুসফুসের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন- তামাক, আসারূন, পেঁয়াজ-বীজ, কাসনী-বীজ, খরমুজ-বীজ, জায়ফল, তেজপাতা, শাহতারা, ফিটকিরি, চিতামূল, জিরা, মুকিল।
মুরাক্কেক — তরলকারক; উষ্ণতা ও আর্দ্রতার দরুন আখলাত বা ধাতুরস অধিক পাতলা করে। যেমন- মধু, সিরকা, চিনি, আরকে পুদিনা।
মুরাখখী — শিথিলকারক; উষ্ণতা ও আর্দ্রতার প্রভাবে মলিন ত্বক নরম ও শিথিল করে লোমকূপ প্রশস্ত করে, ফলে অসার পদার্থ সহজে বের হয়। যেমন- তিসি, রওগনে গুল, গরম পানি, গুলফা।
মুরাততেব — আর্দ্রতাকারক; আর্দ্র হওয়ার দরুন অঙ্গের শুষ্কতা দূর করে সিক্ত করে। যেমন- কদু, কদুর তেল, কাগজী বাদাম, তরমুজ, খেজুর, ইসবগুল, গরুর দুধ, মুছলী, কাতিরা গঁদ, শসা, কাঁকুড়।
মুলাইয়েন — নরমকারক, কোষ্ঠ পরিষ্কারক; পরিমিত উষ্ণতা ও আর্দ্রতার প্রভাবে পেট নরম করে কোষ্ঠ পরিষ্কার করে। যেমন- গুলকন্দ, আরকে বাদিয়ান, পালং শাক, মূলা, বাঁধাকপি, আমের রস, করলা, কিশমিশ, মোরব্বায়ে হালীলা, রওগনে বাদাম, ছাগলের দুধ, তেঁতুল, গুড়, মধু, যষ্টিমধু, আলুবোখারা।
মুলাইয়েনাতে আওরাম — ফোলা-ফোড়া নরমকারক; পরিমিত উষ্ণতা ও আর্দ্রতার গুণে ফোড়া নরম করে ফাটার উপযোগী করে। যেমন- জোয়ান, ইসবগুল, নাখুনা, বাবুনা, তিসি, খেতমী।
মুলাত্তেফ — কোমলকারক, লঘুকারক; গাঢ় ধাতুরস নরম ও তরল করে নিষ্ক্রমণের উপযোগী করে। যেমন- বিসবাসা, দারচিনি, কাকমাচী, আকরকরহা, আনীসূন, মৌরি, নাগরমুথা, হিসপ (যুফা), আঞ্জীর, ইক্ষুরস, গোলমরিচ, বাবুনা, ওন্নাব, শুঁঠ, জিরা, শোরা, পেঁয়াজ।
মুলাযযেয — তৃপ্তিকর, আনন্দজনক; সঙ্গমকালে বাহ্যিকভাবে ব্যবহারে অধিকতর তৃপ্তি ও আনন্দ দেয়। যেমন- লবঙ্গ, দারচিনি, আকরকরহা, শুঁঠ, মুনাক্কা, মোরগের পিত্ত, সর্বপ্রকার আতর, পারদ, জাফরান, কর্পূর, কবুতরের বিষ্ঠা, মধুমিশ্রিত সোহাগা।
মুশাহহী/মুশতাহী — ক্ষুধাবর্ধক; খাবার গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষুধা সৃষ্টি করে। যেমন- পীচফল, লেবুর রস, কুচিলা, শুঁঠ, জিরা, গোলমরিচ, জোয়ান, পুদিনা, খুলাঞ্জান, এলাচ, উটের দুধ, জাম্বুরার খোসা, মুসতগী, ঠান্ডা পানি।
মুসহেল — রেচক, জোলাপকারক; দেহের শিরা-উপশিরা বা অঙ্গের অসার পদার্থ অন্ত্রনালীর দিকে ধাবিত করে মলের সাথে নির্গত করায়। প্রকারভেদ- মুসহেলাতে ছফরা (পিত্ত নিঃসারক): আলুবোখারা, পুরনো তেঁতুল, গুলে বনফশা, আফসানতীন, সোনাপাতা, মুসাব্বর, সোনালু, শাহতারা, গোলাপ; মুসহেলাতে বলগম (শ্লেষ্মা নিঃসারক): গারীকূন, তেউড়ীমূল, এসপন্দ, শুঁঠ, কালোজিরা, ভেরেন্ডার তেল, শোধিত জয়পাল, রেউচিনি, গুগ্গুল, রাখালশসার মজ্জা; মুসহেলাতে সওদা (অম্লরস নিঃসারক): উসতুখুদুস, সোনাপাতা, মুসাব্বর, আফতীমূন, শোধিত জয়পাল, গুড়, আমলকী, তোখমা, জংলী হরীতকী, গাওজবান।
মুসাক্কেন — শান্তকারক, বেদনানাশক; ধাতুরসের উষ্ণতা ও উত্তেজনা প্রশমিত করে স্নায়ু অনুভূতিহীন করে ফলে বেদনা অনুভূত হয় না। যেমন- আফিম, হাঁসের চর্বি, তামাক, মুরগির ডিমের শ্বেতাংশ, নেশাস্তা, কাতিরা, বাবলা, ধনে, খোরাসানী জোয়ান। প্রকারভেদ- মুসাক্কেনে আ’ছাব (স্নায়ুর শান্তকারক): উসরুল, পোস্ত, আফিম, লুফফা; মুসাক্কেনে আলম (বেদনানাশক): কাহু-বীজ, পোস্তের ঢেঁড়ি, খোরাসানী জোয়ান, তিসি, সূরঞ্জান, আনীসূন, আফিম; মুসাক্কেনে উমুমী (সাধারণ শান্তকারক): সুরা, খোরাসানী জোয়ান; মুসাক্কেনে মকামী (স্থানিক শান্তকারক): স্থানীয় প্রয়োগে স্নায়ু শান্ত ও অবশ করে বেদনা প্রশমন করে— আফিম, হাঁসের চর্বি, ডিমের শ্বেতাংশ; মুসাক্কেনে কলব (হৃদযন্ত্রের শান্তকারক): ইয়াকূত, মুক্তা, মেশক, আম্বর, জাফরান; মুসাক্কেনে তানাফ্ফুস (শ্বাস-প্রশ্বাসের শান্তকারক): আফিম, বেলাডোনা, ধুতুরা, কাহু-বীজ, পোস্তদানা, জদওয়ার; মুসাক্কেনে ছু’আল (কাশি নিবারক): আদা, মধু, হিসপ, গুলে বনফশা, বাসক পাতা।
মুসাক্কেনে হারারাত — উষ্ণতা প্রশমক; শীতলতা ও আর্দ্রতার গুণে দেহের উষ্ণতা প্রশমিত করে। যেমন- আনারসের রস, কাহু-বীজ, শসা-বীজ, আরকে গুলাব।
মুসক্কের — মাদক, মাতালকারক; স্নায়ু শিথিল করে অনুভূতি ভোঁতা করে এবং নেশা ও মত্ততা আনে। যেমন- সুরা, ধুতুরা, বেলাডোনা, ভাং, মহুয়া।
মুসাখখেন — উষ্ণকারক; দেহে উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। যেমন- গোলমরিচ, মধু, লবঙ্গ, রসুন, পেঁয়াজ, হিং।
মুসাদ্দেদ — প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারক; মলিনতা, আঠালোভাব বা শুষ্কতার দরুন লোমকূপ ও অন্যান্য পথে বাধা সৃষ্টি করে। যেমন- আফিম, পোস্তদানা, জোয়ান, কাঁচা কলা, তেঁতুল-বীজ।
মুসাম্মেন — স্থূলকারক, মেদবর্ধক; অধিক গাঢ় রসপদার্থযুক্ত ও পুষ্টিকর হওয়ার দরুন অধিক রক্ত ও চর্বি উৎপাদনে দেহ পুষ্ট ও মেদবহুল করে। যেমন- চাল, মাখন, দুধ, আম, কলা, পোস্তদানা, খোরমা।
মুসাহ্হের — অনিদ্রাকারক; স্নায়ু উত্তপ্ত করে রূহের প্রবাহ সহজতর করে এবং মানসিক রক্তপ্রবাহ সতেজ করে জাগরণ বা অনিদ্রার কারণ ঘটায়। যেমন- কফি, চা, জাফরান, সিরকা, গোলমরিচ, লবণ, লবঙ্গ, পুদিনা, কর্পূর ও কস্তুরীর ঘ্রাণ গ্রহণ।
মুহররেকে কাবেদ — যকৃৎ সতেজকারক; পরিমিত উষ্ণতার গুণে যকৃতের ক্রিয়া সতেজ করে। যেমন- গুলে গাফেছ, লবঙ্গ, মুসতগী, দারচিনি, মুনাক্কা, জাফরান।
মুহররেকে দাওরানে খুন — রক্তপ্রবাহ সতেজকারক; রক্তপ্রবাহ সতেজ করে স্বাভাবিক গতি বহাল রাখে। যেমন- কর্পূর, সুরা।
মুহররেকে নুখা — সুষুম্নাকাণ্ডের উদ্দীপক; মেরুদণ্ডের স্নায়ু জাগ্রত ও উদ্দীপিত করে ক্রিয়া সতেজ করে। যেমন- নৌশাদল আযারাকী (কুচিলা জাতীয় উদ্দীপক)।
মুহররেকে বাহ — কামোদ্দীপক; গাঢ় রস সৃষ্টিকারক, বায়ুসঞ্চারক ও উষ্ণকারক গুণে সরাসরি যৌনস্পৃহা বাড়ায়। যেমন- গাজর, পেস্তা, কাগজী বাদাম, আখরোট, পেঁয়াজ, ফুলকপি, ছা’লাব মিছরী, শাকাকুল, বাহমান, চিংড়ি মাছ, মোরগের মাংস, মুরগির ডিম, কবুতরের মাংস।
মুহতালিমাতে রদিয়্যাহ — বিক্ষিপ্ত স্বপ্নদর্শক; উর্ধ্বমুখী বায়ু সঞ্চার করে মস্তিষ্ক উৎপীড়িত করে, ফলে নিদ্রায় আজেবাজে স্বপ্ন দেখা যায়। যেমন- অতিরিক্ত মদ্যপান, কাঁচা পেঁয়াজ, আলু, বেগুন, কপি, মসুর।
মুহাল্লেল — স্রাবক, দ্রাবক; পদার্থকে বাষ্পে পরিণত হওয়ার উপযোগী করে এবং নিজস্ব দ্রাবক-শক্তি ও উষ্ণতায় অঙ্গের আঠালো রস বাষ্প করে পরিষ্কার করে। যেমন- জুন্দবেদস্তর, নাখুনা, খেতমী, তিসি, কাকমাচী, হলুদ, বানরলাঠির শাঁস, দারচিনি, জাফরান।
মুহাল্লেলে আওরাম — প্রদাহনাশক, ফোলা প্রশমক। যেমন- কাসনী-মূল, নাগদমনী, তিসি, ছা’তার ফারসী।
মুহাল্লেলে রিয়াহ — বায়ুনাশক; উষ্ণতার দরুন পাকস্থলী-অন্ত্রের বায়ু লঘু করে নিঃসরণ করে। যেমন- জটামাংসী, হিং, আদা, শুঁঠ, বিট লবণ, বিসবাসা, মৌরি, পুদিনা, জোয়ান, জিরা, তেজপাতা।
যিদ্দে আলকালী — ক্ষার বিরোধী; ক্ষারীয় ভাব পরিমিত ও স্বাভাবিক করে। যেমন- ডালিম-বীজ, সঙ্গজরাহত, খাবার সোডা।
যিদ্দে হুমুযাত — অম্লবিরোধী; অম্লতা হ্রাস করে স্বাভাবিক করে। যেমন- সোহাগা, নিশাদল, যবক্ষার, গুলে নীলুফর।
রাদে’ — বিকর্ষক, ফেরতদানকারী; অসার পদার্থের আগমন ও সমাবেশ ঘটতে দেয় না। যেমন- গুলে আনার, কাকমাচী, ইসবগুল, সুপারি, ধনে, খেতমী, তিসি, গেরুমাটি, বানরলাঠি, গুগ্গুল, রীঠা, কালোজিরা, সিরকা, চন্দন।
হাক্কাক — চুলকানিকারক; উষ্ণতা ও তেজস্ক্রিয়তার দরুন উচ্ছৃঙ্খল ধাতুরসকে ত্বকের লোমকূপের দিকে টেনে এনে চুলকানি সৃষ্টি করে, তবে ক্ষত সৃষ্টি করে না। যেমন- জলধনে, মুশকদানা (লতাকস্তুরী), বহুমুখীর পাতা, ঢেঁড়শ পাতা।
হাযেম — পাচক, জীর্ণকারক; ভুক্ত খাদ্য দ্রুত পরিপাকে সহায়তা করে। উল্লেখ্য, দেহের স্বাভাবিক তাপ (হারারতে গরীযী)-ই মূলত পরিপাককারী; পাচক ঔষধ কেবল সেই শক্তির সহায়ক, তাই পাচক ঔষধ শীতল প্রকৃতির হতে পারে না। যেমন- জোয়ান, বিসবাসা, মধু, জামের সিরকা, গুড়, আদা, দারচিনি, বিট লবণ।
হাবেস — রোধক; সংকোচন ও শুষ্কতা-শক্তির দরুন মল, মূত্র, ঘাম, রক্ত ইত্যাদি রসপদার্থের নিঃসরণ ও প্রবাহ রোধ করে। যেমন- কাহরুবা, দম্মুল-আখাওয়াইন, আফিম, গেরুমাটি, সঙ্গজরাহত, সুম্মাক, বংশলোচন, যহর মোহরা, আমের আঁটি, জাম-বীজ, ফিটকিরি। প্রকারভেদ- হাবেসে আরক (ঘর্মরোধক): ফিটকিরি; হাবেসে ইসহাল (দাস্তরোধক): বংশলোচন, গেরুমাটি, সঙ্গজরাহত, আফিম, সুম্মাক, জায়ফল, আমের আঁটি; হাবেসে খুন (রক্তরোধক): কাহরুবা, খুনখারাবি, মুসতগী, দূর্বাঘাস, কাগজভস্ম; হাবেসে বওল (মূত্ররোধক): তিল, ডালিম-ফুল।
হাল্লাক — লোমনাশক, কেশনাশক; চুল ও লোম মূল থেকে দুর্বল করে উপড়ে ফেলে। যেমন- চুন, হরিতাল, সফেদা কাশগরী।
আধুনিক ঔষধী পরিভাষা ও দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদের পরিচয়
ANAESTHETIC — অ্যানেসথেটিক (অবেদক)
অ্যানেসথেটিক অর্থ অনুভূতিনাশক বা অবেদক। যে ঔষধ প্রয়োগে সারা দেহের বা দেহের নির্দিষ্ট কোনো অংশের অনুভূতি সাময়িকভাবে লোপ পায়, তাকে অ্যানেসথেটিক বলে। অস্ত্রোপচার, দাঁত তোলা ও বেদনাদায়ক অন্যান্য চিকিৎসায় এর ব্যবহার সর্বাধিক। ইউনানী পরিভাষা মুখাদ্দির। এটি প্রধানত দুই প্রকার—
১. জেনারেল অ্যানেসথেটিক (সর্বাঙ্গীণ অবেদক): রোগীকে সম্পূর্ণ অচেতন করে। যেমন— ইথার, হ্যালোথেন, থায়োপেন্টোন সোডিয়াম, কেটামিন হাইড্রোক্লোরাইড।
২. লোকাল অ্যানেসথেটিক (স্থানীয় অবেদক): চেতনা ঠিক রেখে শুধু নির্দিষ্ট স্থানকে অসাড় করে। যেমন— লিগনোকেইন (লিডোকেইন) হাইড্রোক্লোরাইড, প্রোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড, বুপিভাকেইন।
ANALGESIC — এনালজেসিক (বেদনানাশক)
এনালজেসিক অর্থ বেদনানাশক। যে ঔষধ মস্তিষ্কের অনুভূতি কেন্দ্রের উপর প্রভাব বিস্তার করে ব্যথা উপশম করে, অথচ রোগীর জ্ঞান, অনুভূতি বা স্বাভাবিক চেতনায় ব্যাঘাত ঘটায় না, তাকে এনালজেসিক বলে। শরীরের যেখানেই ব্যথার উৎপত্তি হোক, পেরিফেরাল সোমাটিক নার্ভ ও অটোনোমিক নার্ভ তা মস্তিষ্কের সেনসরি এরিয়ায় (অনুভূতি কেন্দ্রে) পৌঁছে দেয় এবং তখনই ব্যথা অনুভূত হয়। এনালজেসিক ঔষধ ব্যথার ঐ কেন্দ্রের উপর নিস্তেজ ক্রিয়া সাধনের মাধ্যমে বেদনাবোধহীনতা সৃষ্টি করে। ইউনানী পরিভাষা মুসাক্কিনে আলাম। এনালজেসিক ঔষধকে সাধারণত কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন—
১. Opiate Analgesic অর্থাৎ আফিমজাতীয় বেদনানাশক ঔষধ। এ জাতীয় ঔষধের মধ্যে সচরাচর ব্যবহৃত—
ক) মরফিন সালফেট খ) কোডিন হাইড্রোক্লোরাইড গ) কোডিন সালফেট
২. Non-opiate Addicting Analgesic অর্থাৎ আফিম-বহির্ভূত, অথচ অভ্যাস সৃষ্টিকারী (নেশাজাতীয়) বেদনানাশক ঔষধ। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ক) পেথিডিন হাইড্রোক্লোরাইড খ) মিথাডন হাইড্রোক্লোরাইড
৩. Analgesic and Antipyretic অর্থাৎ যে ঔষধে একই সঙ্গে ব্যথা প্রশমন ও জ্বর বা উত্তাপ উপশম—এই দুই কার্যকারিতাই পাওয়া যায়। এ জাতীয় ঔষধের ব্যবহারই সর্বাধিক। যেমন— প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম।
ANTACID — এন্টাসিড (অম্লনাশক)
এন্টাসিড অর্থ অম্লনাশক বা অম্লতা উপশমকারক। যে ঔষধ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পাকস্থলীর রস বা গ্যাস্ট্রিক জুসের অন্যতম উপাদান হাইড্রোক্লোরিক এসিডের অম্লতা কমিয়ে আনে, তাকে এন্টাসিড বলে। এন্টাসিড চিকিৎসার প্রকৃত উদ্দেশ্য গ্যাস্ট্রিক জুসের অম্লত্ব পি-এইচ ৪ থেকে ৫ এর মধ্যে রাখা। ইউনানী পরিভাষায় একে দাফেয়ে হুমুজাত বা কাসিরে হুমুজাত বলে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এন্টাসিড—
ক) অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইড জেল খ) ম্যাগনেসিয়াম ট্রাইসিলিকেট গ) ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোক্সাইড ঘ) ম্যাগনেসিয়াম কার্বোনেট ঙ) অ্যালুমিনিয়াম ফসফেট চ) ক্যালসিয়াম কার্বোনেট
ANTHELMINTIC — এ্যানথেলমিন্টিক (ক্রিমিনাশক)
এ্যানথেলমিন্টিক অর্থ ক্রিমিনাশক। যে ঔষধ পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে ক্রিমি বিতাড়ন করে, তাকে এ্যানথেলমিন্টিক বলে। শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা পেশীতে অবস্থানরত ক্রিমির উপর কার্যকর ঔষধও এ নামেই পরিচিত। ক্রিমিনাশক ঔষধ দুইভাবে কাজ করে—সংহার ও নিষ্কাশন। যে ঔষধ ক্রিমি বিনষ্ট করে বা ক্রিমির জীবনচক্রে ছেদ ঘটায়, তাকে ভারমিসাইড বলে; এর ইউনানী পরিভাষা কাতিলে দীদান। পক্ষান্তরে যে ঔষধ ক্রিমিকে অবশ বা অচল করে মলের সঙ্গে বের করে দেয়, তাকে ভারমিফিউজ বলে; এর ইউনানী পরিভাষা মুখরিজে দীদান। এ্যানথেলমিন্টিক ঔষধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ক) পাইপেরাজিন সাইট্রেট খ) পাইপেরাজিন অ্যাডিপেট গ) পাইপেরাজিন ফসফেট ঘ) বেফেনিয়াম হাইড্রোক্সিনাফথোয়েট ঙ) ডাইইথাইলকার্বামাজিন সাইট্রেট চ) অ্যালবেনডাজল ছ) মেবেনডাজল
ANTIBIOTICS — এন্টিবায়োটিক
এন্টিবায়োটিক অর্থ জীবন-বিরোধী। এ জাতীয় ঔষধ রোগজীবাণুর জীবনবিরোধী, অর্থাৎ জীবাণু ধ্বংসকারী বলে এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। এন্টিবায়োটিক অল্প মাত্রায় জীবাণুর বিস্তার রোধ করে এবং পর্যাপ্ত মাত্রায় জীবাণু বিনাশ করে। রোগজীবাণুর উপর কার্যক্ষমতার ভিত্তিতে একে কয়েক শ্রেণীতে ভাগ করা যায়—
১. ব্রড স্পেকট্রাম এন্টিবায়োটিক অর্থাৎ বিস্তৃত পরিসরে কার্যকর। এগুলো গ্রাম-পজিটিভ ও গ্রাম-নেগেটিভ উভয় প্রকার ব্যাকটেরিয়া এবং রিকেটশিয়া, সিটাকোসিস জীবাণু, কিছু প্রোটোজোয়া প্রভৃতির উপর কার্যকর (সাধারণ ভাইরাসের উপর নয়)। উল্লেখযোগ্য— ক) টেট্রাসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড খ) অক্সিটেট্রাসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড গ) ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড ঘ) ক্লোরামফেনিকল
২. ন্যারো স্পেকট্রাম এন্টিবায়োটিক অর্থাৎ সীমিত পরিসরে কার্যকর। এগুলো সকল রোগজীবাণুর উপর কার্যকর নয়; কোনোটি গ্রাম-পজিটিভ এবং কোনোটি গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুর উপর কাজ করে। গ্রাম-পজিটিভ জীবাণুর উপর কার্যকর— ক) বেনজিল পেনিসিলিন খ) বেনজাথিন পেনিসিলিন গ) প্রোকেইন পেনিসিলিন ঘ) পেনিসিলিন-ভি পটাসিয়াম ঙ) এরিথ্রোমাইসিন চ) ওলিয়ান্ডোমাইসিন
পক্ষান্তরে গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুর উপর কার্যকর— ক) জেন্টামাইসিন সালফেট খ) নিওমাইসিন গ) ক্যানামাইসিন
ANTIDOTE — এন্টিডোট (বিষক্রিয়ানাশক)
এন্টিডোট অর্থ বিষক্রিয়ানাশক। যে ঔষধ কীটনাশক, রাসায়নিক পদার্থ বা অতিরিক্ত ব্যবহৃত ঔষধের বিষক্রিয়া নাশ বা লাঘব করে, তাকে এন্টিডোট বলে। আফিম প্রভৃতি নেশাজাতীয় ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহারে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার প্রতিকারের জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ঔষধও এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ইউনানী পরিভাষা তিরইয়াক বা দাফেয়ে সুমূম। এন্টিডোট ও ড্রাগ এন্টাগোনিস্ট জাতীয় ঔষধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ক) নিকেথামাইড (বারবিচুরেট বিষক্রিয়ায় শ্বাসকেন্দ্র উদ্দীপক) খ) ডাইমারক্যাপ্রল (ধাতব বিষে) গ) ন্যালরফিন হাইড্রোব্রোমাইড (আফিমজাতীয় বিষে) ঘ) সোডিয়াম থায়োসালফেট (সায়ানাইড বিষে) ঙ) অ্যাট্রোপিন সালফেট (অর্গানোফসফেট কীটনাশক বিষে)
ANTIHISTAMINE — এন্টিহিস্টামিন
এন্টিহিস্টামিন অর্থ হিস্টামিন বিক্রিয়া প্রতিরোধক। যে ঔষধ হিস্টামিনকে নিয়ন্ত্রণ করে দেহের অভ্যন্তরে হিস্টামিনের প্রতিক্রিয়া হ্রাস বা বিলুপ্ত করে, তাকে এন্টিহিস্টামিন বলে। হিস্টামিন শরীরের টিস্যুতে উপস্থিত একটি রাসায়নিক যৌগ। প্রভাবক উপাদান বা কারণে দেহকলা থেকে অতিরিক্ত হিস্টামিন নিঃসৃত হলে এলার্জিক প্রতিক্রিয়াসহ হাঁপানি, প্রদাহ, চুলকানি, চোখ-মুখ লাল হওয়া, সর্দি ঝরা, হে-ফিভার প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। এন্টিহিস্টামিন ঔষধ হিস্টামিন বিক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এসব উপসর্গ লাঘব বা বিলোপ করে। উল্লেখযোগ্য ঔষধ—
ক) প্রোমেথাজিন হাইড্রোক্লোরাইড খ) প্রোমেথাজিন থিওক্লেট গ) ক্লোরফেনিরামিন মেলিয়েট ঘ) ডাইফেনহাইড্রামিন হাইড্রোক্লোরাইড ঙ) সাইপ্রোহেপ্টাডিন হাইড্রোক্লোরাইড চ) সেটিরিজিন ছ) লোরাটাডিন
ANTIPYRETIC — এন্টিপাইরেটিক (জ্বরনাশক)
এন্টিপাইরেটিক অর্থ জ্বরনাশক বা তাপনাশক। যে ঔষধ দেহের বর্ধিত তাপমাত্রাকে স্বাভাবিক মাত্রায় নামিয়ে আনে, তাকে এন্টিপাইরেটিক বলে। এটি মস্তিষ্কের তাপ-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে কাজ করে এবং ঘামের মাধ্যমে দেহের তাপ নির্গমনে সাহায্য করে। ইউনানী পরিভাষা দাফেয়ে হুম্মা। যেমন— প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন।
ANTISEPTIC and DISINFECTANT — এন্টিসেপ্টিক ও ডিসইনফেকট্যান্ট
এন্টিসেপ্টিক অর্থ পচননিবারক বা পচনরোধক। যে ঔষধ বা রাসায়নিক পদার্থ রোগজীবাণু ধ্বংস বা এর বিস্তার রোধের মাধ্যমে পচন নিবারণ করে (জীবিত টিস্যুতে ব্যবহারযোগ্য), তাকে এন্টিসেপ্টিক বলে। ইউনানী পরিভাষা মানেয়ে উফুনাত। ডিসইনফেকট্যান্ট অর্থ সংক্রমণ রোধক। যে পদার্থ সংক্রামক রোগজীবাণু ধ্বংস করে সংক্রমণ রোধ করে বা জড়বস্তুকে জীবাণুমুক্ত করে, তাকে ডিসইনফেকট্যান্ট বলে। ইউনানী পরিভাষা দাফেয়ে উফুনাত। উল্লেখযোগ্য ঔষধ—
ক) ক্লোরহেক্সিডিন গ্লুকোনেট সলিউশন খ) ক্লোরোজাইলেনল গ) হ্যালাজোন ঘ) জেনশিয়ান ভায়োলেট ঙ) হেক্সাক্লোরোফেন চ) আইওডিন ছ) পটাসিয়াম পারমাঙ্গানেট জ) ক্রেসল
ANTITOXIN — এন্টিটক্সিন
এন্টিটক্সিনের অভিধানগত অর্থ প্রতিবিষ। কোনো রোগের বিষক্রিয়া প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত বিষক্রিয়া-প্রতিরোধক সিরামকে এন্টিটক্সিন বলে। যেমন কোনো জন্তুর দেহে নির্দিষ্ট রোগের জীবাণু বা বিষপদার্থ (টক্সিন) প্রয়োগ করে, কিছুদিন পর সেই জন্তুর দেহ থেকে সংগৃহীত সিরাম—যা ঐ জীবাণুর সংক্রমণক্রিয়া বা বিষপদার্থের বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবিষ হিসেবে কাজ করে। যেমন— এন্টিডিপথেরিয়া সিরাম, এন্টিটিটেনাস সিরাম (ATS), এন্টিগ্যাংগ্রিন সিরাম, এন্টিভেনম সিরাম (সাপের বিষের প্রতিষেধক) ইত্যাদি।
CARMINATIVES — কারমিনেটিভ (বায়ুনিঃসারক)
কারমিনেটিভ অর্থ বায়ুনিঃসারক। যে ঔষধ পাকস্থলী ও অন্ত্রের পেশী শিথিল করে এবং পাকস্থলীতে জমে থাকা ঘনীভূত বায়ুকে লঘু করে নিঃসরণে সাহায্য করে, তাকে কারমিনেটিভ বলে। এটি পাকস্থলীতে ক্রিয়াশীল ঔষধ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ইউনানী পরিভাষা কাসিরে রিয়াহ। এ জাতীয় ঔষধের মধ্যে রয়েছে—
ক) ভোলাটাইল অয়েল (যেমন— মৌরি, এলাচ, পিপারমিন্ট তেল) খ) ইথার-অ্যালকোহল গ) কার্বন ডাইঅক্সাইড ওয়াটার ঘ) সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ঙ) পটাসিয়াম বাইকার্বোনেট
DIURETICS — ডাইউরেটিক (মূত্রবর্ধক)
ডাইউরেটিক অর্থ মূত্রবর্ধক। যে ঔষধ বৃক্কের (কিডনির) মাধ্যমে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেহ থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ নিঃসরণে সাহায্য করে, তাকে ডাইউরেটিক বলে। ডাইউরেটিক ঔষধ দেহের শোথ (ফোলা) ও জলোদর উপশম করে। ইউনানী পরিভাষা মুদির্রে বাওল। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঔষধ—
ক) ফিউরোসেমাইড খ) বেনড্রোফ্লুমেথিয়াজাইড গ) অ্যাসিটাজোলামাইড ঘ) স্পাইরোনোল্যাকটন
HYPNOTIC, SEDATIVE AND TRANQUILIZER — নিদ্রাকারক, স্নায়ুশান্তকারক ও প্রশান্তকারক
হিপনোটিক অর্থ গভীর নিদ্রাকারক। যে ঔষধ রোগীর প্রধান স্নায়ুকান্ডকে নিস্তেজ করে নিদ্রা আনয়ন করে, তাকে হিপনোটিক বলে। ইউনানী পরিভাষা মুনাওয়িম অথবা মুসাব্বিত। সেডেটিভ অর্থ নিস্তেজকারক বা অস্থিরতা প্রশমক। যে ঔষধ ঘুম সৃষ্টি না করে রোগীর স্নায়বিক উত্তেজনা কমিয়ে ক্লেশকর অস্থিরতা ও উদ্বেগ প্রশমিত করে, তাকে সেডেটিভ বলে। ইউনানী পরিভাষা মুসাক্কিন। ট্রাংকুইলাইজার অর্থ প্রশান্তকারক। এটি স্নায়ুকান্ডের উপর কাজ করে এবং প্রধানত মানসিক রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। উল্লেখযোগ্য ঔষধ—
ক) ফেনোবারবিটোন খ) ডায়াজিপাম গ) ক্লোরপ্রোমাজিন হাইড্রোক্লোরাইড ঘ) অ্যামিট্রিপটিলিন হাইড্রোক্লোরাইড ঙ) নরট্রিপটিলিন হাইড্রোক্লোরাইড চ) হ্যালোপেরিডল ছ) প্রোক্লোরপেরাজিন মেলিয়েট জ) ফ্লুফেনাজিন ডেকানোয়েট
এর মধ্যে খ, গ, চ, ছ ও জ মূলত ট্রাংকুইলাইজার শ্রেণীর; ঘ ও ঙ বিষণ্নতানাশক (এন্টিডিপ্রেসেন্ট)। আর ফেনিটয়েন সোডিয়াম ও ইথোসাক্সিমাইড খিঁচুনি বা মৃগীরোধী (এন্টিকনভালসেন্ট) ঔষধ।
LAXATIVE / PURGATIVE — ল্যাক্সেটিভ / পারগেটিভ
ল্যাক্সেটিভ অর্থ মল নরমকারক; যে ঔষধ স্বাভাবিকভাবে কোষ্ঠ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, তাকে ল্যাক্সেটিভ বলে। ইউনানী পরিভাষা মুলাইয়িন। পারগেটিভ হলো তীব্র ক্রিয়াসম্পন্ন বিরেচক, যা অন্ত্রকে দ্রুত সঞ্চালিত করে পাতলা পায়খানা ঘটায়; ইউনানী পরিভাষা মুসহিল। ক্রিয়ার ধরন অনুযায়ী এগুলো কয়েক প্রকার—
১. বাল্ক ল্যাক্সেটিভ: মলের আয়তন বাড়ায়। যেমন— ইসবগুল, মিথাইলসেলুলোজ।
২. স্যালাইন ল্যাক্সেটিভ: অন্ত্রে পানি ধরে রাখে। যেমন— ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোক্সাইড।
৩. স্টিমুল্যান্ট ল্যাক্সেটিভ: অন্ত্রের সঞ্চালন বাড়ায়। যেমন— বিসাকোডিল, সেনা, ক্যাস্টর অয়েল (এরন্ড তেল)।
৪. লুব্রিক্যান্ট ও অসমোটিক: মল পিচ্ছিল বা নরম করে। যেমন— লিকুইড প্যারাফিন, ল্যাক্টুলোজ।
SULPHONAMIDES — সালফোনামাইড
সালফোনামাইড হলো সালফার-ঘটিত রাসায়নিক যৌগের একটি শ্রেণী। এ জাতীয় ঔষধ জীবাণুর প্রয়োজনীয় ফলিক এসিড তৈরিতে বাধা দিয়ে জীবাণুর বংশবৃদ্ধি রোধ করে। মূত্রনালী, শ্বাসনালী ও অন্ত্রের সংক্রমণে এগুলো ব্যবহৃত হয়। উল্লেখযোগ্য— সালফাডায়াজিন, সালফামিথক্সাজল, সালফাসিটামাইড এবং ট্রাইমেথোপ্রিমের সাথে মিশ্রিত কো-ট্রাইমক্সাজল।
VITAMIN — ভিটামিন (খাদ্যপ্রাণ)
ভিটামিন অর্থ খাদ্যপ্রাণ। বিভিন্ন উদ্ভিদে, খাদ্যবস্তুতে ও পশু-পাখির দেহে বিদ্যমান কতকগুলো জৈব উপাদানের নাম ভিটামিন, যা মানুষ ও প্রাণীর সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ভিটামিনের ইউনানী নাম হায়াতীন। খাদ্যে যে উপাদানের অভাব হলে দেহের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং শরীর রোগপ্রবণ ও অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাকেই ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ বলা হয়। দেহের টিস্যুতে জৈবিক কার্য সম্পাদনে ভিটামিনের সক্রিয় তৎপরতা অপরিহার্য। ভিটামিনের অভাবে ধীরে ধীরে অভাবজনিত লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। ভিটামিন প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—
১. পানিতে দ্রবণীয়: ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স (বি-১, বি-২, বি-৬, বি-১২ ইত্যাদি) ও ভিটামিন সি।
২. চর্বিতে দ্রবণীয়: ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে।
অভাবজনিত রোগ ও ফলপ্রদ ব্যবহার— ভিটামিন এ: রাতকানা, চোখের শুষ্কতা। বি-১: বেরিবেরি। বি-২: ঠোঁট ও জিহ্বার ঘা। বি-৬: স্নায়ুর দুর্বলতা। বি-১২: রক্তশূন্যতা। সি: স্কার্ভি, মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ। ডি: রিকেট্স, হাড়ের দুর্বলতা। ই: প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস। কে: রক্ত জমাট বাঁধতে বিলম্ব।
কতিপয় দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদের পরিচয় ও গুণ
অর্জুন
নামভেদ: আরবী নাম— লিসানুল ইনসান। বাংলা ও হিন্দি নাম— অর্জুন। ইংরেজি নাম— Arjun। বৈজ্ঞানিক নাম— Terminalia arjuna।
পরিচয়: ২৫–২৬ মিটার বা ৮০–৮৫ ফুট উচ্চতার বৃক্ষ। পাতা গোলাকৃতি, পরস্পরের বিপরীতে সজ্জিত, দেখতে অনেকটা মানুষের জিহ্বার মতো। শীতে পাতা ঝরে যায় এবং বসন্তের আগমনে নতুন পাতায় সজ্জিত হয়। ফুল হলুদ বর্ণের, বসন্তে ফোটে। ফল ছোট কামরাঙ্গার মতো দেখতে, বাইরে হালকা রঙের কিন্তু ভেতরে লালচে। গাছের ছাল সাদাটে। প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, বার্মা, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন অঞ্চল।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, হৃদযন্ত্রের শক্তিবর্ধক, পচন ও রক্ত রোধক, ক্ষতসারক, ভগ্নস্থানের সংযোজক, প্রমেহ নিবারক।
মাত্রা: ছাল-চূর্ণ ১–৩ গ্রাম। কাথের জন্য ছাল ১০–১২ গ্রাম। ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য। সংশোধক: দুধ, মধু, ঘি। ব্যবহার্য অংশ: প্রধানত ছাল; কদাচিৎ পাতা ও ফল।
অশোক
নামভেদ: ইউনানী নাম— শামশাদ দেশী। বাংলা ও হিন্দি নাম— অশোক। সংস্কৃত নাম— হেমপুষ্প, অশোক। ইংরেজি নাম— Asoka। বৈজ্ঞানিক নাম— Saraca indica (Saraca asoca)।
পরিচয়: উঁচু বৃক্ষ। পাতা দেখতে আমপাতার মতো, তবে অপেক্ষাকৃত লম্বা। পাতাগুলো প্রতিটি বোঁটায় মুখোমুখি সজ্জিত থাকে এবং প্রতি বোঁটায় সাধারণত দশটি করে পাতা থাকে। থোকা থোকা জর্দা-লাল বর্ণের ফুল ফোটে। ফল পাকলে কালচে দেখায়। স্বাদ তিক্ত।
মিযাজ: শীতল ও শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, ধারক ও রক্তরোধক। রক্তপ্রদর ও অতিরিক্ত ঋতুস্রাব নিবারক। জরায়ুর নানাবিধ রোগে এটি কার্যকর ঔষধ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। অর্শজনিত আমাশয়ে এর ফুলের শিরা ফলপ্রদ।
মাত্রা: ছাল-চূর্ণ ২–৩ গ্রাম। ছালের ঘনীভূত রস ২০–৬০ ফোঁটা। ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির লোকদের জন্য। সংশোধক: মধু। ব্যবহার্য অংশ: প্রধানত ছাল; কদাচিৎ ফল ও বীজ।
আকনাদি / ফরীদ বুটি
নামভেদ: ইউনানী নাম— ফরীদ বুটি। বাংলা নাম— আকনাদি। স্থানীয় নাম— অঞ্চলভেদে মক্কা, মুহানী লতা প্রভৃতি। সংস্কৃত নাম— পাঠা। বৈজ্ঞানিক নাম— Cissampelos pareira।
পরিচিতি: দড়ির মতো লতা। সাধারণত ঝোপ-ঝাড়ে জন্মে। পাতা তিন কোণাকৃতির, তবে কোণগুলো গোল; দেখতে অনেকটা আরবী পাঁচ (৫) সংখ্যার মতো। রং সবুজ। প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সর্বত্র, বার্মা ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল।
মিযাজ: তৃতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক; মতান্তরে শীতল ও আর্দ্র। ক্রিয়া/গুণ: ক্রিমিনাশক, গর্ভপাতকারক, পচনরোধক। এর পাতা কচলে পানিতে মিশ্রিত করলে পানি গাঢ় হয়ে যায়। কথিত আছে, খ্যাতনামা সাধক শায়খ ফরীদ এই পানি দিয়ে ক্ষুধা নিবৃত্ত করতেন।
মাত্রা: ২–৩ গ্রাম। ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য; গর্ভবতীদের জন্য নিষিদ্ধ। সংশোধক: মাউল-আসল বা মধু-মিশ্রিত পানি। ব্যবহার্য অংশ: মূল, লতা ও পাতা।
আপাং / চিরচিট্টা
নামভেদ: হিন্দি নাম— চিচিড়া, চিরচিটা। বাংলা নাম— আপাং। স্থানীয় নাম— উইৎলেঙ্গা। সংস্কৃত নাম— অপামার্গ। ইংরেজি নাম— Rough Chaff Tree। বৈজ্ঞানিক নাম— Achyranthes aspera।
পরিচিতি: পতিত জমি, গোরস্থান, খানা-খন্দ ও মাঠ-ময়দানে জন্মানো এক ধরনের ছোট গাছ, যা জমির উর্বরতা অনুযায়ী ১–২ ফুট উচ্চতার হয়। এটি আপনা-আপনি জন্মায়। গাছের কয়েকটি পাতলা শাখা হয় এবং তাতে ছোট ছোট খাঁজকাটা পাতা থাকে। লালচে-সাদা ফুলের ছড়া হয়; এগুলো পথচারীর কাপড়ে সূক্ষ্ম কাঁটার মতো বিঁধে যায়। প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ ও ভারত।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: মূত্রকারক, প্রদাহনাশক, দ্রাবক, শ্লেষ্মা নিঃসারক, রক্ত পরিষ্কারক। শোথ, কাশি, হাঁপানি, অর্শ ও খোস-পাঁচড়ায় এর কাথ উপকারী। এর দাঁতন মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।
মাত্রা: ৫–৭ গ্রাম। ক্ষার/লবণ ২৫০–৫০০ মিলিগ্রাম। ক্ষতিকর: গর্ভপাত ঘটাতে পারে। সংশোধক: গোলমরিচ, মধু। ব্যবহার্য অংশ: মূলসহ সমস্ত অংশ। গাছ পুড়িয়ে ছাই থেকে ক্ষার/লবণ সংগ্রহ করা হয়।
আমরুল / তেপাত্তী
নামভেদ: হিন্দি নাম— তেপাত্তা। বাংলা নাম— আমরুল। সংস্কৃত নাম— চাঙ্গেরী। ইংরেজি নাম— Indian Sorrel। বৈজ্ঞানিক নাম— Oxalis corniculata।
পরিচিতি: খুব ছোট ও কোমল উদ্ভিদ, সাধারণত আর্দ্র স্থানে জন্মায়। প্রত্যেক ডাঁটায় তিনটি করে পাতা থাকে, মনে হয় যেন প্রতিটি পাতা তিন ভাগে বিভক্ত। স্বাদে সামান্য টক। প্রাপ্তিস্থান: উপমহাদেশের সর্বত্র আর্দ্র স্থানে উৎপন্ন হয়। আমাদের দেশে সাধারণত ধানক্ষেতে আগাছা হিসেবে জন্মায়।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও আর্দ্র। ক্রিয়া/গুণ: পিত্তপ্রশমক, মূত্রকারক, পাকস্থলী ও যকৃতের শক্তিবর্ধক। পাণ্ডুরোগে বিশেষ বলপ্রদ। দেহের উষ্ণতা প্রশমন করে।
মাত্রা: ৭–১২ গ্রাম। ক্ষতিকর: অতিরিক্ত সেবনে শ্লেষ্মা বৃদ্ধি করতে পারে। সংশোধক: গরম মশলা। ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
আমলকী / আমলা
নামভেদ: আরবী নাম— আমলাজ। ফারসী নাম— আমলা। হিন্দি নাম— আওলা। সংস্কৃত নাম— শ্রীফল, অমৃতফল, আমলক। ইংরেজি নাম— Emblic Myrobalan। বৈজ্ঞানিক নাম— Phyllanthus emblica (Emblica officinalis)।
পরিচিতি: সুপরিচিত ফল। ঝোপের মতো চারদিকে প্রসারিত শাখা-প্রশাখার গাছ। পাতা তেঁতুল গাছের পাতার মতো, তবে আরও ছোট। ফল ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের হয়; বিশেষত কলম-চারায় রোপিত গাছের ফল বেশ বড় ও পুষ্ট হয়। স্বাদে কষায় ও টক। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ থাকে বলে এর যথেষ্ট কদর। এর মোরব্বা বেশ সুস্বাদু। প্রাপ্তিস্থান: উপমহাদেশের সর্বত্র উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চল।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, রক্তরোধক ও প্রফুল্লকারক। কাঁচা অবস্থায় কিছুটা মূত্রকারক ও কোষ্ঠ পরিষ্কারক। তৃষ্ণা, বমিভাব ও প্রদর নিবারক। আমাশয়ে উপকারী ও হজমকারক। হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধক। আমলকীর রস বা চূর্ণ চিনিসহ অম্লপিত্তে ফলপ্রসূ। রক্তক্ষরণেও উপকারী। অধিক অগ্নিতাপে আমলকীর ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয়। আমলকী থেকে তৈরি তেল চুলের পুষ্টিসাধক ও মস্তিষ্ক শীতলকারক।
মাত্রা: ৩–৫ গ্রাম। তাজা ফল ১০–১২ গ্রাম। ক্ষতিকর: অন্ত্রে সংকোচন (কষার) সৃষ্টি করে। সংশোধক: মধু, কাগজী বাদামের তেল। ব্যবহার্য অংশ: ফল (বীজ ছাড়া)।
একমেলা / আকরকরাহ দেশী
নামভেদ: ইউনানী নাম— আকরকরাহ দেশী। বাংলা নাম— একমেলা। বৈজ্ঞানিক নাম— Spilanthes acmella।
পরিচিতি: এক প্রকার লতা-উদ্ভিদের মূল বা শিকড়। মুখে দিলে পিঁপড়ার কামড়ের ন্যায় যন্ত্রণা অনুভূত হয়। গাছটি দেখতে বাবুনা গাছের মতো, প্রায় কালো বর্ণের। স্বাদে তেজস্কর ও তিক্ত এবং সামান্য দুর্গন্ধযুক্ত। প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: মস্তিষ্কের দূষিত পদার্থ পরিষ্কারক ও প্রতিবন্ধকতা অপসারক। দাঁতের ব্যথা, পক্ষাঘাত ও বুকের ব্যথা নিবারক। ঋতুস্রাবকারক।
মাত্রা: ২–৩ গ্রাম। ক্ষতিকর: ফুসফুসের জন্য। সংশোধক: কাতীরা, গোলমরিচ, শুঁঠ। ব্যবহার্য অংশ: মূল।
ওলটকম্বল / উলটকম্বল
নামভেদ: আরবী নাম— শাজারাতুন নিসওয়ান। বাংলা নাম— ওলটকম্বল। হিন্দি নাম— উলটকম্বল। সংস্কৃত নাম— পীবরী। ইংরেজি নাম— Devil’s Cotton। বৈজ্ঞানিক নাম— Abroma augusta।
পরিচিতি: প্রায় ২ মিটার বা ৫–৭ ফুট উচ্চতার বৃক্ষ। পাতার উপরপৃষ্ঠ রোঁয়াবিশিষ্ট। ডাঁটা ও ছাল পানিতে কচলালে পিচ্ছিল আঠালো রস সৃষ্টি হয়। ফুল কালচে-লাল বর্ণের। ফল পাকলে কালো হয়; ফলের ভেতর অসংখ্য রোঁয়া ও কালিজিরার মতো বহু বীজ থাকে। প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর প্রদেশের উষ্ণ অঞ্চল।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: যোনিরোগ, প্রদর ও রজঃদুষ্টি নিবারক। অর্শ প্রশমক। প্রস্রাবের জ্বালা নিবারক। জরায়ুর স্থানচ্যুতি ঘটলে মূল বিশেষ হিতকর।
মাত্রা: শুষ্ক ছাল ২–৪ গ্রাম। তাজা ছাল ৪–৮ গ্রাম। তাজা মূলের রস ৩ মিলিলিটার। মূলের নির্যাস ১–২ ড্রাম। ক্ষতিকর: গর্ভাবস্থায় সেবন নিষেধ। ব্যবহার্য অংশ: ছাল ও মূল।
কইওকড়া / কাঁচড়াঘাস / বুকুন বুটি
নামভেদ: ফারসী নাম— বুকুম। হিন্দি নাম— বুকুন বুটি। বাংলা নাম— কাঁচড়াঘাস, কইওকড়া। সংস্কৃত নাম— মৎস্যগন্ধা। ইংরেজি নাম— Purple Lippia। বৈজ্ঞানিক নাম— Phyla nodiflora (Lippia nodiflora)।
পরিচিতি: মাটিতে বিস্তৃত লতাজাতীয় উদ্ভিদ। এর ডালগুলো চিকন ও পাতলা। পাতা ছোট ছোট ডিম্বাকৃতির, পাতার প্রান্ত চোখা। ডালের প্রত্যেক গিরায় বেগুনি রঙের একটি করে ছোট ফুল হয় এবং এতে মাছের মতো গন্ধ পাওয়া যায়। স্বাদে কষায় ও তিক্ত। প্রাপ্তিস্থান: খাল-বিল-নদীর পাড়ে ও অন্যান্য আর্দ্র অঞ্চলে।
মিযাজ: শীতল ও শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, মূত্রকারক, শান্তিকারক, রক্তপরিষ্কারক, অর্শ নিবারক। শ্লেষ্মাজনিত জ্বরে হিতকারক। মূত্রথলির পাথর নিঃসারক। রক্তার্শে উৎকৃষ্ট ঔষধ। প্রদরেও উপকারী।
মাত্রা: ১০–৩০ গ্রাম। ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির রোগে। সংশোধক: গোলমরিচ, মধু। ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
কদম
নামভেদ: বাংলা নাম— কদম। সংস্কৃত নাম— কদম্ব। বৈজ্ঞানিক নাম— Neolamarckia cadamba (Anthocephalus chinensis; Nauclea kadamba)।
পরিচিতি: সুপরিচিত বৃক্ষ। বর্ষার প্রারম্ভে এর গোলাকার হলুদ বর্ণের ফুল সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাতা লম্বায় ৯–১১ ইঞ্চি ও চওড়ায় ৩–৫ ইঞ্চি হয়। গাছ সরল হলেও উচ্চতায় প্রায় ৫০–৬০ ফুট হয়। প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ ও ভারত।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও শুষ্ক। ক্রিয়া/গুণ: পিত্তজনিত দাহনাশক, শোথ প্রশমক, ক্রিমিনাশক; কেঁচো ক্রিমিতে বিশেষ ফলপ্রদ। প্রবাদ আছে— “ক্রিমি যদি সারাতে চাও, কদম পাতার রস খাও।”
মাত্রা: ৩–৫ গ্রাম। ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির রোগে। সংশোধক: মধু, গোলমরিচ। ব্যবহার্য অংশ: ফুল ও পাতা।
কন্টকারী / কাটাই খুদ
নামভেদ: উর্দু নাম- কাটাই খুদ। হিন্দী নাম- কটেলী খুদ। বাংলা নাম- কন্টকারী; কন্টিকারী। ইংরেজী নাম- Wild Egg Plant। বৈজ্ঞানিক নাম- Solanum xanthocarpum।
পরিচিতি: কন্টকপূর্ণ লতানো উদ্ভিদ বিশেষ, যা জমিনে বিস্তৃত হয়। পাতা বেগুন গাছের পাতার মতো। ডালে ও পাতায় হলুদবর্ণের চিকন চিকন কাঁটা থাকে। ফুল বেগুন-ফুলের মতো। ফল তিতবেগুনের ন্যায় ছোট ও গোল। ফলের বীজও অনেকটা বেগুন-বীজের মতোই। স্বাদে কটু।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সর্বত্র, ভারতের বিভিন্ন আর্দ্র অঞ্চল।
মিযাজ: তৃতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: শ্লেষ্মা নিঃসারক, রক্ত পরিষ্কারক, ক্রিমিনাশক, সন্ধি-বেদনায় ফলপ্রদ। এর মূলের জোশান্দা (কাথ) পিপুল ও মধুসহ কাশি ও হাঁপানিতে উপকারী। জরায়ুর ত্রুটি সারক; সিফিলিসেও উপকারী। পোক্ত হয়ে হলুদবর্ণ হয়ে গেছে এমন গোটা উদ্ভিদ ছায়ায় শুকিয়ে মিহি চূর্ণ করে নস্যের মতো নাকে টানলে অর্ধ-মাথাব্যথা ও সাধারণ মাথাব্যথায় বিশেষ উপকার হয়। হাঁচির মাধ্যমে শ্লেষ্মা-পদার্থ নিষ্ক্রান্ত হয়ে মাথা হালকা হয়ে যায়।
মাত্রা: চূর্ণ ১-২ গ্রাম। কাথে ৫-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: শীতল ও আর্দ্র দ্রব্যাদি, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: মূলসহ সমগ্র উদ্ভিদ।
কবরী / কনীর
নামভেদ: আরবী নাম- দিফলী; সাম্মুল-হিমার। ফারসী নাম- খরযহরা। উর্দু নাম- কনীর। বাংলা নাম- কবরী। ইংরেজী নাম- Oleander। বৈজ্ঞানিক নাম- Nerium indicum।
পরিচিতি: ২-৪ গজ উঁচু সুদৃশ্য বৃক্ষ বিশেষ। পাতা সরু ও লম্বা- প্রস্থে ১ ইঞ্চি ও দৈর্ঘ্যে ৯ ইঞ্চি পর্যন্ত; পাতার উল্টো পিঠ খসখসে ও অমসৃণ। ফুলের বর্ণের দিক দিয়ে এটি ৪ প্রকার: লাল, কাল, সাদা ও হলুদ। তবে আমাদের দেশে সাধারণতঃ লাল ও সাদা- এ দু’প্রকার দেখা যায়। এর ফল দেখতে অদ্ভুত আকৃতির হয়। ফল পাকলে ফেটে গিয়ে গাবের বিচির মতো লম্বাকৃতির বীজ বের হয়। এ গাছের তাজা ছাল কাটলে হলুদবর্ণের আঠাল দুধ বের হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সর্বত্র, পাকিস্তানের সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশ, আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল।
মিযাজ: তৃতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: দ্রাবক, শুদ্ধকারক, উজ্জ্বলকারক, যৌনশক্তি বর্ধক। এটি বিষাক্ত ঔষধের পর্যায়ভুক্ত এবং তাই সাধারণতঃ বাহ্যিক ব্যবহারে মলম, মালিশ ইত্যাদিতেই ব্যবহৃত হয়। এর অভ্যন্তরীণ প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বিপজ্জনক। বিশেষতঃ এর বীজ প্রাণসংহারক বিষ।
মাত্রা: সেবনের মাত্রা নির্ধারিত নয়; কেবল বাহ্যিক ব্যবহার্য।
ক্ষতিকর: বক্ষ ও ফুসফুসের জন্য।
সংশোধক: তেল, ঘি, টাটকা পনীর।
ব্যবহার্য অংশ: মূল, পাতা ও ফল (শুধু বাহ্যিক ব্যবহারে)।
কাকমাচী / মাকো
নামভেদ: ফারসী নাম- মাকো; মাকোহ্। আরবী নাম- এনাবুছ ছা’লাব। সংস্কৃত ও বাংলা নাম- কাকমাচী। ইংরেজী নাম- Black Nightshade। বৈজ্ঞানিক নাম- Solanum nigrum।
পরিচিতি: এক থেকে দু’হাত পর্যন্ত উচ্চতার এ গাছটি ঝোপ-ঝাড়ে অযত্নেই হয়ে থাকে। দেখতে বেগুন গাছের মতো, তবে পাতা অপেক্ষাকৃত ছোট ও কোমল। পাতার বর্ণ কালচে সবুজ। ফল, ফুল তিতবেগুনের মতো দেখতে, তবে অপেক্ষাকৃত ছোট। ফুল সাদা। কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে হলুদাভ লাল। স্বাদে কাঁচা ফল তিক্ত, পাকা ফল মিষ্টি।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সর্বত্র। তাছাড়া ভারত, পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক, সোমালিয়া প্রভৃতি দেশ।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে শীতল ও শুষ্ক। মতান্তরে প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: প্রদাহ নাশক, দ্রাবক, ধাতুরসের পরিমিতকারক, মূত্রকারক, উষ্ণতা প্রশমক, অসার পদার্থের বিকর্ষক। যকৃত প্রদাহ, পাকস্থলীর প্রদাহ ও শোথে বিশেষ ফলপ্রদ। গোটা গাছের রস জ্বাল দিয়ে ফেটে গেলে ছেঁকে নিয়ে খাওয়ালে যকৃত প্রদাহ ও জন্ডিসে খুবই উপকার হয়। তাছাড়া অর্শ, জ্বর ও বমি নিবারক এবং কণ্ঠস্বর পরিষ্কারক।
মাত্রা: শুষ্ক ফল ৫-৭ গ্রাম। তাজা পাতার রস ৫০-৬০ মিলিলিটার।
ক্ষতিকর: মূত্রথলির রোগে।
সংশোধক: মধু।
ব্যবহার্য অংশ: ফল, পাতা, ক্ষেত্রবিশেষে সমগ্র উদ্ভিদ।
কাঠগোলাপ / গুলে আচিন
নামভেদ: ফারসী নাম- গুলাচীন; গুলে আচিন। হিন্দী নাম- ওলাপ্পী। বাংলা নাম- কাঠগোলাপ। ইংরেজী নাম- Temple Tree। বৈজ্ঞানিক নাম- Plumeria acuminata।
পরিচিতি: গাছ বেশ বড় হয়। পাতা দেখতে আমপাতার মতো, তবে অপেক্ষাকৃত বড় ও মোটা। গাছের পাতা, শাখা ইত্যাদি ভাঙ্গলে দুধের মতো কষ নির্গত হয়। ফুল হলুদ আভাযুক্ত সাদা অথবা লাল এবং সুগন্ধি হয়। মাজার, মন্দির ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ গাছ অধিক দেখা যায়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত ও চীন।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: বাহ্যিকভাবে প্রলেপ ফুলা ও ব্যথা কমায়। অভ্যন্তরীণ প্রয়োগে রক্ত পরিষ্কারক ও প্রতিবন্ধকতা অপসারক। মূলের ছাল কড়া রেচক। পাতা ও শাখা হতে নির্গত দুধ সদৃশ কষ অল্প পরিমাণে চার-পাঁচটি ভাজা চালে ভিজিয়ে খেলে দাস্ত হয়ে যায়। বেশী দাস্ত হলে ঘোল পানে তা বন্ধ হয়। গাছের ছাল সেদ্ধ করে খাওয়ালে রক্তদুষ্টি, সিফিলিস, গণোরিয়া প্রভৃতি রোগে উপকার হয়।
মাত্রা: ছাল ৩-৫ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: শীতল ও আর্দ্র দ্রব্যাদি, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা ও ছাল।
কালকেশী / ভৃঙ্গরাজ
নামভেদ: হিন্দী নাম- ভাংরা; ভাংরা সিয়াহ। বাংলা নাম- কালকেশী; ভৃঙ্গরাজ; কেশরাজ। ইংরেজী নাম- False Daisy। বৈজ্ঞানিক নাম- Eclipta alba।
পরিচিতি: অতি পরিচিত উদ্ভিদ বিশেষ। এর উচ্চতা ৪-১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। পাতার বোঁটা সরল ও ছোট এবং পাতার কিনার খাঁজ কাটা। কাণ্ডে ছোট ছোট রোঁয়া থাকে। ফুল সাদা, নীল ও লাল- এই তিন প্রকারের হয়। কাল ফুলের ভৃঙ্গরাজ কিছুটা দুর্লভ। বীজ কাল বর্ণের। গ্রাম বাংলায় মেয়ে-শিশুরা ভৃঙ্গরাজ ফুলকে নাকফুল বানিয়ে খেলা করে থাকে। স্বাদে তীক্ষ্ণ ও কটু।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সর্বত্র আর্দ্র স্থানে, বিশেষতঃ ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচুর হয়। ভারতের তামিলনাড়ু ও পাঞ্জাব অঞ্চলে হয়।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: যৌনশক্তি বর্ধক, দৃষ্টিশক্তি বর্ধক, দ্রাবক, দন্তের দৃঢ়তাকারক, যকৃত রোগে বিশেষতঃ যকৃতের শুষ্কতায় বিশেষ উপকারী। এর রস সহযোগে তৈরী তেল চুল দীর্ঘ ও কাল করে।
মাত্রা: পাতা ৫-৭ গ্রাম। বীজ ১-৩ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: গোলমরিচ, আদা, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
কালমেঘ / জিগার বুটি
নামভেদ: হিন্দী নাম- জিগার বুটি; মহাতিতা। সংস্কৃত নাম- কালমেঘ। বাংলা নাম- কালমেঘ। ইংরেজী নাম- Creat। বৈজ্ঞানিক নাম- Andrographis paniculata।
পরিচিতি: বর্ষজীবী গুল্ম বিশেষ। ১-৩ ফুট উচ্চতার এ উদ্ভিদের কাণ্ড চৌকোণাকার হয়। সরল পাতা, ছোট বোঁটা। ২-৩ ইঞ্চি লম্বা পাতা জালি-সদৃশ শিরা-বিন্যাসযুক্ত। দু’ওষ্ঠবিশিষ্ট ফুলের আকৃতি খুব ছোট। ক্যাপসুলের মতো লম্বাটে ফল, যাতে ১২টি বীজ থাকে। বর্ষার শেষ হতে শীতের আমেজ থাকা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ফুল ও ফল হয়। স্বাদে অত্যন্ত তিক্ত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সর্বত্র, তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে অধিক হয়। ভারতে লক্ষ্ণৌ হতে আসাম পর্যন্ত সমতল এলাকায়ও হয়।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: রক্ত পরিষ্কারক, পাকস্থলী ও যকৃতের শক্তিবর্ধক, রেচক, ক্রিমিনাশক, ধাতুরসের পরিমিতকারক। জ্বর ও শিশুরোগে ফলপ্রদ।
মাত্রা: ৫-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: কোমরের জন্য।
সংশোধক: আনীসূন।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ, বিশেষত পাতা।
কুকশিয়া / কাকরোন্দা / কুকুরমুতা
নামভেদ: আরবী নাম- কুমাফীতুন। হিন্দী নাম- কাকরোন্দা। বাংলা নাম- কুকশিয়া; কুকুন্দর। ইংরেজী নাম- Dog Bush। বৈজ্ঞানিক নাম- Celsia coromandeliana।
পরিচিতি: দু’ আড়াই ফুট উচ্চতার দুর্গন্ধময় উদ্ভিদ বিশেষ। এর পাতা পুরু রোঁয়াপূর্ণ, দেখতে কাসনী পাতার মতো। পুরু রোঁয়ার কারণেই উদ্ভিদটি সবুজাভ সাদা দেখায়। শীতের শেষ ভাগে এতে হলুদ বর্ণের ফুল ফোটে। ফুল প্রস্ফুটিত হওয়ার পর তাতে তুলার মতো চিকন আঁশ দেখা যায়। এ প্রজাতির অন্যান্য উদ্ভিদের মতো এতেও কর্পূরের অংশ পাওয়া যায়। বীজ সরু এবং কালো। স্বাদে কটু।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ প্রায় সর্বত্রই কবরস্থান, খানা-খন্দ ও আখ ক্ষেতে শীতকালে জন্মায়।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: দ্রাবক, ক্রিমিনাশক এবং জ্বর, রক্তদোষ ও শ্লেষ্মা নিবারক। অর্শ রোগে ফলপ্রদ। একটি গোটা উদ্ভিদ পিষে রস নিংড়ে নিয়ে তাতে গোলমরিচ-চূর্ণ মিশিয়ে পান করা রক্ত-অর্শে উপকারী। এর তাজা পাতার রস চক্ষু-প্রদাহে উপকারী। রসে তুলা ভিজিয়ে শিশুর মলদ্বারে কিছু সময় রাখলে সুতা (গুঁড়া) ক্রিমি ধ্বংস হয়।
মাত্রা: পাতার রস ১০-১২ মিলিলিটার।
ক্ষতিকর: ফুসফুস ও কণ্ঠরোগের জন্য।
সংশোধক: গোলমরিচ ও মধু।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, ক্ষেত্রবিশেষে সমগ্র উদ্ভিদ।
কৃষ্ণ তুলসী / রায়হান
নামভেদ: আরবী নাম- রায়হান। ফারসী নাম- শাহসাফরাম। বাংলা নাম- কৃষ্ণতুলসী। ইংরেজী নাম- Holy Basil। বৈজ্ঞানিক নাম- Ocimum sanctum।
পরিচিতি: মরিচ গাছ-সদৃশ ২-৩ ফুট উঁচু গাছ বিশেষ। কাণ্ড সরল, শাখা-প্রশাখা বিপরীতমুখী। অমসৃণ পাতার চারিদিক খাঁজকাটা। শীতে ফুল ও বীজ হয়। কৃষ্ণতুলসী ও তুলসীর মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নাই। কৃষ্ণতুলসীর পাতা-কাণ্ড সবই প্রায় লালবর্ণের। চমৎকার সুগন্ধিযুক্ত ফুল নীলাভ অথবা কৃষ্ণাভ লাল, যা কাল গুচ্ছে হয়। বীজ ছোট, লম্বাটে ও কাল, যা পানির সংস্পর্শে ফুলে যায় এবং পানি ঘন আঠাল হয়।
প্রাপ্তিস্থান: উপমহাদেশের সর্বত্র, তবে বাংলাদেশ ও ভারতে বেশী হয়। আফ্রিকাতেও পাওয়া যায়।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুষ্ক। মতান্তরে পরিমিত স্বভাবের।
ক্রিয়া/গুণ: সমগ্র উদ্ভিদ শ্লেষ্মা নিঃসারক ও পাকস্থলীর শক্তিবর্ধক। পাতা জ্বর নিবারক ও সর্দি-কাশি প্রশমক। বীজ পিচ্ছিলকারক, কোমলকারক, দ্রাবক, ফুলা নাশক। এর পাতায় জীবাণু নাশের গুণও বিদ্যমান। বক্ষবেদনা ও হাঁপানিতে ফলপ্রদ।
মাত্রা: তাজা পাতা ও মূল ৩-৪ গ্রাম। শুষ্ক পাতা ৫০০ মিলিগ্রাম-১.৫ গ্রাম। রস ৫-১০ মিলিলিটার। বীজ ৫-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: শীতল ও আর্দ্র দ্রব্যাদি, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, মূল ও বীজ।
গুলঞ্চ / গেলু
নামভেদ: ফারসী নাম- গেলু। হিন্দী নাম- গুরুচ। সংস্কৃত নাম- গুরুচী। বাংলা নাম- গুলঞ্চ; গুড়ুচী। ইংরেজী নাম- Moon Creeper; Bile Killer। বৈজ্ঞানিক নাম- Tinospora cordifolia।
পরিচিতি: একপ্রকার দীর্ঘ লতা উদ্ভিদ, যা অন্য গাছকে ভর করে বেড়ে ওঠে। পাতা দেখতে হৃদপিণ্ড আকৃতির। কাণ্ডে পদ্ম কাঁটার মতো গুটি থাকে। ছালের বর্ণ সবুজ, ভেতরে সাদা শাঁস মটরদানার মতো। গ্রীষ্মে ফুল ও শীতে ফল হয়। ফল পাকলে লাল বর্ণের দেখায়। স্বাদে খুব তিক্ত। গুলঞ্চ থেকে আহরিত শ্বেতসারকে ইউনানী পরিভাষায় সত্তে গেলু বলে। নিম গাছে বেড়ে ওঠা গুলঞ্চের কার্যকারিতা অধিক বলে বিবেচিত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সর্বত্র।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক। মতান্তরে শীতল ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, মূত্রকারক, সকল প্রকার জ্বর প্রশমক, পিত্ত প্রশমক, দাহনাশক, জীবাণু নাশক। জন্ডিস, মূত্রকৃচ্ছতা, প্রমেহ, গেঁটেবাত, শ্বাসকষ্ট, ক্রিমি ও বমিরোগে উপকারী।
মাত্রা: কাণ্ড ১০-২৫ গ্রাম। রস ২০-৩৫ গ্রাম। সত্তে গেলু ৫০০ মিলিগ্রাম-১ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: শীতল ও আর্দ্র দ্রব্যাদি, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ। এটি তাজা ব্যবহার করাই নিয়ম। রস শুকিয়ে গেলে কার্যকারিতা থাকে না। তবে এর শ্বেতসার দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য থাকে।
ঘুমশাক / চৌপাতিয়া
নামভেদ: হিন্দী নাম- চৌপাতিয়া। বাংলা নাম- ঘুমশাক। বৈজ্ঞানিক নাম- Marsilea quadrifolia।
পরিচিতি: একপ্রকার শাক জাতীয় উদ্ভিদ। শাখা-প্রশাখাহীন এ উদ্ভিদের পাতা মেথী পাতার মতো, তবে অপেক্ষাকৃত সবুজ। পাতা খুবই কোমল। স্বাদে সামান্য টক। এটি আমরুল শাকেরই প্রজাতিভুক্ত। আমরুল শাকের প্রত্যেক ডাঁটায় তিনটি করে পাতা থাকে, পক্ষান্তরে ঘুমশাকে চারটি পাতা থাকে। এজন্যই এর নাম চৌপাতিয়া।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সর্বত্র জলাশয়ের পাশে আর্দ্র পরিবেশে আপনা-আপনি জন্মায়।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও আর্দ্র।
ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, উষ্ণতা নিবারক, ব্যথা প্রশমক, যকৃতের উষ্ণতা নিবারক ও বলকারক।
মাত্রা: রস ৩০-৬০ মিলিলিটার।
ক্ষতিকর: গেঁটেবাত রোগে।
সংশোধক: চিনি, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা।
ঘৃতকুমারী / ঘিকোয়ার
নামভেদ: হিন্দী নাম- ঘিকোয়ার। সংস্কৃত নাম- ঘৃতকাঞ্চন; ঘৃতকমল। বাংলা নাম- ঘৃতকুমারী। আরবী নাম- ছুবারা। ফারসী নাম- ফায়করা। ইংরেজী নাম- Aloe Plant। বৈজ্ঞানিক নাম- Aloe indica।
পরিচিতি: এ গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদটি এক-দেড় হাত বা তারও বেশী উঁচু হয়। পাতা লম্বা ও মোটা, গোড়া হতে মাথার দিকে ক্রমশঃ সরু, পাতার কিনার কাঁটার মতো। পাতার অভ্যন্তরে মাংসল, পিচ্ছিল, রসালো পদার্থ থাকে। উৎকট তিক্ত স্বাদের এই রসালো পদার্থ বের করে শুকিয়ে ঘনীভূত করে নিলেই মুসাব্বর তৈরী হয়। এটি গৃহপ্রাঙ্গণে টবেও চাষ করা যায়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সর্বত্র এবং আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রভৃতি দেশে উৎপন্ন হয়।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: পাকস্থলীর শক্তি বর্ধক, রেচক, প্রদাহ নাশক, হজমকারক, ক্ষুধা বর্ধক, যৌনশক্তি বর্ধক, প্লীহা প্রদাহে ফলপ্রদ।
মাত্রা: মজ্জা ৭-১২ গ্রাম।
ক্ষতিকর: অন্ত্রসমূহের জন্য।
সংশোধক: কাতীরা, গোলাপ-ফুল, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: পাতার ভেতরের রসপদার্থ অর্থাৎ মজ্জা।
ঘোড়ানিম / বাকায়েন
নামভেদ: আরবী নাম- বান। ফারসী নাম- আযাদ দরখত। উর্দু ও হিন্দী নাম- বাকায়েন। সংস্কৃত নাম- মহানিম্ব। বাংলা নাম- ঘোড়ানিম। ইংরেজী নাম- Persian Lilac। বৈজ্ঞানিক নাম- Melia azedarach; Melia sempervirens।
পরিচিতি: বহুল পরিচিত বৃক্ষ। এর পাতা, ফুল ও ফল নিমেরই অনুরূপ, তবে ফলের ভেতরটা চার অংশে বিভক্ত এবং প্রত্যেক অংশে একটি করে বীজ থাকে। বীজের উপরিভাগে কালচে বর্ণের আবরণের মতো থাকে, কিন্তু ভেতরের শাঁস হয় সাদা। সাধারণতঃ এই শাঁসই ঔষধ হিসাবে অধিক ব্যবহৃত হয়। পাতা সবুজবর্ণ, ফুল হলুদবর্ণ। স্বাদে তিক্ত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, বার্মা ও ইরান।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: রক্ত পরিষ্কারক, ব্যথা প্রশমক, অর্শ নিবারক, ক্ষত শুষ্ককারক, পুরনো জ্বর নিবারক ও জীবাণু নাশক। পাকা ফল অর্ধকুটা করে পানিতে সেদ্ধ করার পর ঐ পানি দিয়ে মাথা ধুলে চুল দীর্ঘ হয় এবং মাথায় উকুন হয় না। (সতর্কতা: ফল ও বীজ অতিরিক্ত মাত্রায় বিষাক্ত।)
মাত্রা: ছাল ৭-১২ গ্রাম। বীজের শাঁস ২৫০-৫০০ মিলিগ্রাম।
ক্ষতিকর: পাকস্থলী ও যকৃতের জন্য।
সংশোধক: আনীসূন ও মৌরি।
ব্যবহার্য অংশ: ছাল, পাতা, ফল।
থানকুনি
নামভেদ: হিন্দী নাম- মাণ্ডুকপর্ণী। বাংলা নাম- থানকুনি; খুলকুড়ি। ইংরেজী নাম- Indian Pennywort। বৈজ্ঞানিক নাম- Centella asiatica।
পরিচিতি: বহুল পরিচিত ছোট্ট লতা উদ্ভিদ বিশেষ। পাতা বৃত্তাকার, এক-দেড় ইঞ্চির মতো। পাতার কিনার সামান্য খাঁজকাটা। গোড়া হতে সরু সরু শাখা বের হয় এবং প্রত্যেক শাখার মাথায় একটি করে পাতা থাকে। এরই আরেক প্রকারের নাম ব্রাহ্মী (Bacopa monnieri)। ব্রাহ্মী আর থানকুনি দেখতে প্রায় একইরূপ, তবে ব্রাহ্মীর পাতা অপেক্ষাকৃত ছোট ও খুবই পাতলা হয়। ক্রিয়া ও গুণের দিক দিয়েও দু’টি প্রায় একইরূপ, তবে ব্রাহ্মী সামান্য অধিক গুণসম্পন্ন। উভয় প্রকারেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লালাভ ফুল হয়। বীজ শক্ত ও চ্যাপ্টা। শীতের শেষে ও বসন্তকালে ফুল ও ফল হয়। এর তাজা বা শুকনো পাতা ও কাণ্ডে রয়েছে মেডিকেসিক এসিড, এশিয়াটিকোসাইড এবং ব্রাহ্মোসাইড।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সর্বত্র আর্দ্র অঞ্চলে।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও আর্দ্র।
ক্রিয়া/গুণ: পেট নরমকারক, হজমকারক, স্নায়ুশক্তি বর্ধক, স্মৃতিশক্তি বর্ধক, মূত্রকারক। আমাশয়, বিশেষ করে এমিবাজনিত আমাশয়ে ব্যবহার করা হয়। চর্মরোগে, প্রস্রাব বৃদ্ধিকারক হিসাবে এবং কুষ্ঠের ক্ষত চিকিৎসায় অনুপান হিসেবে ব্যবহৃত। খিঁচুনিবিরোধী হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এর এশিয়াটিকোসাইড নামের গ্লাইকোসাইডটির এম. লেপ্রি (M. leprae) জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। ১% মলম হিসেবে কাটা ক্ষত নিরাময় ও ত্বক জোড়া লাগাতে দ্রুত কার্যকর।
মাত্রা: শুষ্ক পাতা-কাণ্ড ৫০০ মিলিগ্রাম-১ গ্রাম দৈনিক। তাজা উদ্ভিদের রস ১.৫-৩ মিলিলিটার।
ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: মধু, গোলমরিচ।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
দুধিয়া / দুধী / হাজারদানী
নামভেদ: আরবী নাম- সুসফন্দ। ফারসী নাম- শীরক। হিন্দী নাম- দুধী; হাজারদানী। বাংলা নাম- দুধিয়া। ইংরেজী নাম- Australian Asthma Weed। বৈজ্ঞানিক নাম- Euphorbia hirta।
পরিচিতি: একটি ছোট্ট উদ্ভিদ, যা সাধারণতঃ উষ্ণ আবহাওয়ায় শক্ত কঙ্করময় স্থানে জন্মায়। বসন্তে ও বর্ষায় প্রচুর হয়। মাটির সাথে প্রায় লেগে থাকে। পাতা ডিম্বাকৃতির ছোট ছোট, সবুজাভ লালবর্ণের। শাখা-প্রশাখা সরু ও কোমল। পাতা ও কাণ্ড ভাঙ্গলে দুধের মতো কষ বের হয়। এর আরো দুটি প্রকার আছে। একটি ৮-১০ ইঞ্চি উঁচু হয়, পাতাও হয় অপেক্ষাকৃত বড়; এর মাথায় পাতার গোল ছাতার মতো হয়। এটিকে দুধী কালাঁ বলে। আরেক প্রকারের নাম মেন্ডা শিঙ্গী; এটি মোটা লতাবিশিষ্ট, পাতা পান পাতার মতো, শাখা-প্রশাখা অনেক। তবে দুধিয়াই ঔষধ হিসাবে অধিক ব্যবহৃত হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সর্বত্র।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে শীতল ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: স্নায়ুসমূহের উদ্দীপক, সংকোচক, শান্তকারক, রক্ত পরিষ্কারক। গণোরিয়া, অতিরিক্ত ঋতুস্রাব, রক্ত-অর্শ, প্রমেহ ও শ্বেতপ্রদরে কার্যকর। এর অপেক্ষাকৃত বড় প্রকারটি হাঁপানি ও পুরনো কাশিতে ফলপ্রদ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
মাত্রা: ৩-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: ফুসফুসের জন্য।
সংশোধক: মধু এবং শীতল ও আর্দ্র দ্রব্যাদি।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
দূর্বা / দূব
নামভেদ: আরবী নাম- ওব। ফারসী নাম- মারগ। হিন্দী নাম- দূব। বাংলা নাম- দূর্বা; দূর্বাঘাস। ইংরেজী নাম- Couch Grass। বৈজ্ঞানিক নাম- Cynodon dactylon।
পরিচিতি: বহুল পরিচিত ঘাস। ঘোড়া সাগ্রহে এ ঘাস খেয়ে থাকে, গরু-ছাগলও তাই। মাঠে-ময়দানে, ঘর-বাড়ীর আনাচে-কানাচে আপনা-আপনিই জন্মায়। এর পাতা সরু, লম্বা, মসৃণ ও সবুজবর্ণ হয়। মাটির নীচে এর গুচ্ছমূল থাকে।
প্রাপ্তিস্থান: সর্বত্রই আর্দ্র স্থানে হয়।
মিযাজ: শীতল, তবে প্রায় পরিমিত।
ক্রিয়া/গুণ: উষ্ণতা নিবারক, দ্রাবক, সংকোচক, রক্ত রোধক, মূত্রকারক। শ্লেষ্মা, রক্ত ও পিত্তের বিকৃতি নিবারণ করে। এর রস নাক-মুখের রক্তক্ষরণ ও কাটা স্থানের রক্তপাত দ্রুত রোধ করে। প্রদাহ ও ফুলা নিবারক। বিষনাশক।
মাত্রা: ৭-১২ গ্রাম।
ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির লোকদের পাকস্থলীর জন্য।
সংশোধক: গোলমরিচ, মধু ও মিছরি।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
দেবকাঞ্চন / কাঞ্চন / কাচনাল
নামভেদ: হিন্দী নাম- কাচনাল; কাচনার। বাংলা নাম- কাঞ্চন; দেবকাঞ্চন। ইংরেজী নাম- Mountain Ebony। বৈজ্ঞানিক নাম- Bauhinia racemosa; Bauhinia purpurea।
পরিচিতি: তুত গাছের সমান গাছ। পাতা প্রায় গোলাকার, মাথার দিকে সমান দু’ভাগে চেরা থাকে, দেখতে উটের পায়ের ছাপের মতো। পাতার উপর দিকে সরু রোঁয়া থাকে, কিন্তু নীচের দিক পরিষ্কার হয়। বর্ষার প্রথম ভাগে ফুল ও ফল হয়। ফুল লাল-বেগুনী, পাতা সবুজ। গাছের ছাল গাঢ় ছাইবর্ণ। ফল প্রায় ৭-৮ ইঞ্চি লম্বা ও চ্যাপ্টা। প্রতিটি ফলের ভিতর ৫ থেকে ১২টি বীজ থাকে। ফুল সুস্বাদু, কিন্তু ফল স্বাদে তিক্ত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে শীতল ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, রক্ত রোধক, রক্ত পরিষ্কারক, ধারক। রক্ত-অর্শ ও অতিরিক্ত ঋতুস্রাবে ফলপ্রদ। উচ্চ রক্তচাপে হিতকর। অন্ত্রসমূহের শক্তিবর্ধক। ক্রিমিনাশক। অভ্যন্তরীণ ক্ষতসারক। ফুলের পুলটিস দ্রুত ফোঁড়া পাকিয়ে দেয়। অপ্রস্ফুটিত ফুল সবজি হিসাবে খাওয়া হয়।
মাত্রা: ৫-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: বায়ু সঞ্চারক ও গুরুপাক।
সংশোধক: গরম মশলা।
ব্যবহার্য অংশ: ছাল, পাতা, ফুল।
নাগেশ্বর / নারমুশক / নাগীসর
নামভেদ: ফারসী নাম- নারমুশক। সংস্কৃত নাম- নাগকেশর। হিন্দী নাম- নাগীসর। বাংলা নাম- নাগেশ্বর; নাগকেশর। ইংরেজী নাম- Iron Wood Tree। বৈজ্ঞানিক নাম- Mesua ferrea।
পরিচিতি: এটি ধীর গতিতে বাড়ে এমন একটি বড় গাছ। পাতা সরু, লম্বাটে ও সাদা আভাযুক্ত চকচকে। এ গাছে অসংখ্য ফুল হয়। ফুল অনেকটা লবঙ্গের মতো, তবে এই ফুলের কলির মুখ লবঙ্গের কলির মতো বন্ধ থাকে না, বরং খোলা থাকে। এই ফুলের কলিকেই নাগকেশর বলা হয়। ফুলের বর্ণ কালচে লাল, স্বাদে সুমিষ্ট ও সুঘ্রাণবিশিষ্ট। এ থেকে আতরও নিষ্কাশন করা হয়। এ গাছের কাঠ লোহার মতো অত্যন্ত মজবুত হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারতের তামিলনাড়ু ও আন্দামান, মালাবার ও বার্মার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর জন্মে।
মিযাজ: তৃতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: প্রশান্তকারক, হৃদযন্ত্রের শক্তিবর্ধক, যৌনশক্তির উদ্দীপক, অর্শ নিবারক, ক্রিমি নিঃসারক, চুলকানি নিবারক, যকৃত ও পাকস্থলীর শক্তিবর্ধক, শীতল প্রকৃতির লোকদের জন্য বলকারক। রক্ত পরিষ্কারক। ৯ গ্রাম ফুল রাত্রে পানিতে ভিজিয়ে রেখে ভোরে ছেঁকে নিয়ে সামান্য মিছরি বা মধুসহ পানিটুকু পান করলে কয়েকদিনেই রক্ত-অর্শ নিবারণ হয়। এক-দেড় গ্রাম ফুলের চূর্ণ দিনে ১-২ বার ঘোল বা দধি-মিশ্রিত পানি সহযোগে সেবন করলেও একই উপকার হয়।
মাত্রা: ১-৩ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: শীতল ও আর্দ্র প্রকৃতির দ্রব্যাদি এবং মধু।
ব্যবহার্য অংশ: ফুল।
নিসিন্দা / সাম্ভালু
নামভেদ: আরবী নাম- আছলক। ফারসী নাম- পাঞ্জাংগুশত। হিন্দী নাম- সাম্ভালু। বাংলা নাম- নিসিন্দা। ইংরেজী নাম- Negundo। বৈজ্ঞানিক নাম- Vitex negundo (নীলপুষ্প); Vitex trifolia (সাদাপুষ্প)।
পরিচিতি: সুপরিচিত গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, উচ্চতায় ৩-৪ গজের মতো। তিন ফলকবিশিষ্ট যৌগিক পাতা, দেখতে অনেকটা অড়হর গাছের পাতার অনুরূপ। পাতার উপরের পিঠ সবুজবর্ণ, নীচের পিঠ ফিকে সবুজ। ফুল নীলবর্ণ বা নীলাভ বেগুনী অথবা নীলাভ সাদা। বীজ দেখতে গোলমরিচ সদৃশ, তবে আকারে ক্ষুদ্র। বীজের রং কাল অথবা সাদা।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, দ্রাবক, লঘুকারক, ব্যথা প্রশমক। এর পাতার প্রলেপ ব্যথা প্রশমক হিসাবে বহুল ব্যবহৃত। সম্প্রতি গবেষণায় সন্ধিবাতে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। এর বীজ শুক্র শুষ্ককারক ও যৌনবাসনা হ্রাসকারক।
মাত্রা: ১.৫-৪.৫ গ্রাম। বীজ ২-৩ গ্রাম।
ক্ষতিকর: বৃক্কের জন্য। তাছাড়া মাথাব্যথার উদ্রেক করে।
সংশোধক: বাবলা-গঁদ, কাতীরা-গঁদ।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, বীজ।
পাথরকুচি / পাথরফোড়ী
নামভেদ: আরবী নাম- কাসেরুল-হাজার। ফারসী নাম- বর্গ আজুবা। হিন্দী/উর্দু নাম- পাথরফোড়ী; পাথরচটা। বাংলা নাম- পাথরকুচি। বৈজ্ঞানিক নাম- Coleus amboinicus; Bryophyllum calycinum।
পরিচিতি: এক থেকে তিন ফুট পর্যন্ত উঁচু এ উদ্ভিদের গোড়া হতে একাধিক শাখা বের হয় এবং সেগুলো তুলার মতো কোমল ছোট ছোট কলি দ্বারা পূর্ণ থাকে, তাতে ছোট ছোট কাল বীজও হয়। এ উদ্ভিদের পাতা বেশ পুরু ও রসালো এবং কিনারা খাঁজকাটা। পাতা ভাঁজ করলে ভেঙ্গে যায়। পাতার খাঁজকাটা অংশ হতে নতুন চারা জন্ম নেয়। বসন্তকালে মোচার বর্ণের থোকা থোকা ফুল ফোটে। স্থানভেদে এ উদ্ভিদের আকার-আকৃতি বিভিন্নরূপ হয়। টবেই এর চাষ বেশী হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, বার্মা, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: মূত্রকারক, পাথরি চূর্ণকারক। গণোরিয়ায়ও ফলপ্রদ। এর ৪/৫টি পাতা ধুয়ে ৫টি গোলমরিচসহ পাটায় পিষে ছেঁকে নিয়ে সামান্য মিছরি বা চিনি যোগ করে ভোরে কিছুদিন সেবন করলে বৃক্ক ও মূত্রথলির ছোট ছোট পাথর ধীরে ধীরে গলে নিষ্কাশিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন সেবনে এ উপকার পাওয়া যায়।
মাত্রা: পাতা ৭-১২ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: শীতল ও আর্দ্র দ্রব্যাদি, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা।
পুনর্ণবা / বিসখাপরা
নামভেদ: আরবী নাম- হিন্দকুকা। ফারসী নাম- দেও এসপস্ত। হিন্দী নাম- বিসখাপরা; নওয়াহ। বাংলা নাম- পুনর্ণবা। ইংরেজী নাম- Spreading Hogweed। বৈজ্ঞানিক নাম- Trianthema portulacastrum (সাদা পুনর্ণবা); Boerhavia diffusa (রক্ত পুনর্ণবা)।
পরিচিতি: জমিনে বিস্তৃত ছোট ছোট পাতাবিশিষ্ট লতা-উদ্ভিদ বিশেষ। সাদা-সবুজ ও লালচে-সবুজ- এই দু’বর্ণের হয়। পাতার কিনার অমসৃণ। বসন্তকালে বেগুনী রংয়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুল ফোটে। ঐ ফুলে কালো বর্ণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজ হয়। পাতা চিবালে জিহ্বায় ঝাঁঝ বোধ হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ প্রায় সর্বত্রই বর্ষায় এবং চৈত্র-বৈশাখে প্রাচীন ভগ্নস্তূপে ও আর্দ্র স্থানে প্রচুর হয়।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: মূত্রকারক, ঋতুস্রাব বর্ধক, প্রদাহ ও ফুলা নাশক, শ্লেষ্মা নিঃসারক, প্রতিবন্ধকতা অপসারক। শোথ, জন্ডিস, মূত্রকৃচ্ছতা ও জ্বরে বিশেষ ফলপ্রদ। তাজা পুনর্ণবার রস সমপরিমাণ রওগনে যয়তুন (জলপাই তেল) সহ জ্বাল দিয়ে পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর ঐ তেলে ১০% জাফরান দ্রবীভূত করে নিয়ে মালিশ করলে বাতের ব্যথায় এবং বাতে গিঁট শক্ত হয়ে যাওয়ায় বিশেষ উপকারী। বীজ যৌনশক্তি বর্ধক।
মাত্রা: পাতা ৪-১২ গ্রাম। বীজ ২-৩ গ্রাম। তাজা রস ৫-১০ মিলিলিটার।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য। মাথাব্যথার উদ্রেক করতে পারে।
সংশোধক: ধনে, কাসনী, কাতীরা, চিনি, শীতল প্রকৃতির সবজি।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
বকুল / মূলসরী
নামভেদ: হিন্দী নাম- মূলসরী। বাংলা নাম- বকুল। ইংরেজী নাম- Spanish Cherry; Bullet Wood। বৈজ্ঞানিক নাম- Mimusops elengi।
পরিচিতি: সুপরিচিত বড় বৃক্ষ বিশেষ। পাতা জাম পাতার মতো, একটু ছোট ও গাঢ় সবুজবর্ণ। ফুল ছোট ছোট তারার আকৃতিবিশিষ্ট, চন্দনবর্ণ ও সুবাসিত। শুকিয়ে যাওয়ার পরও ফুলে সুবাস থাকে। ফুলের মাঝখানে ছিদ্রের মতো থাকে। ফল ছোট্ট বরই-সদৃশ, পাকলে পিচ্ছিল ও মিষ্টি লাগে। ফলের ভেতর তুলনামূলক বড় বীজ হয়। বীজের অভ্যন্তরের শাঁস দুর্গন্ধময় ও স্বাদে তিক্ত।
প্রাপ্তিস্থান: প্রায় সর্বত্রই বাগানে হয়। তবে বাংলাদেশ, বার্মা ও দক্ষিণ ভারতের বন-জঙ্গলে আপনা-আপনিই জন্মায়।
মিযাজ: ফুল উষ্ণ ও শুষ্ক; ফল শীতল ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: ফুল প্রশান্তকারক, আনন্দবর্ধক ও হৃদযন্ত্রের শক্তিবর্ধক। ছাল ও ফল সংকোচক, ধারক ও শুষ্ককারক। কাঁচা ফল চিবালে নড়া দাঁত শক্ত হয়ে বসে যায়। ছালের কাথ দ্বারা কুলি করলে দাঁত নড়া ও মাড়ীর দুর্বলতায় উপকারী। ছালের চূর্ণ শ্বেতপ্রদর ও শুক্রতারল্য নিবারণ করে। পাতা সর্পবিষে উপকারী বলে প্রচলিত।
মাত্রা: ৩-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: বায়ু উৎপাদক ও মল রোধক।
সংশোধক: তেল-জাতীয় পদার্থ, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: ছাল, পাতা, ফুল, ফল ও বীজ।
বট / বরগদ
নামভেদ: আরবী নাম- যাতুয-যওয়ায়েব। ফারসী নাম- দরখতে রেশা। উর্দু নাম- বরগদ। হিন্দী নাম- বোহড়; বড়ুহ। বাংলা নাম- বট। ইংরেজী নাম- Banyan Tree। বৈজ্ঞানিক নাম- Ficus bengalensis।
পরিচিতি: বট বৃক্ষ একটি বহুল পরিচিত, প্রায় সহস্র বর্ষজীবী সুবৃহৎ বৃক্ষ। এর শাখা-প্রশাখা চারিদিকে সুবিস্তৃত হওয়ায় রোদে ক্লান্ত পথিক এর নীচে সুশীতল ছায়া লাভ করে। বটগাছের শাখা-প্রশাখা থেকে দড়ির মতো লম্বা ঝুরি নেমে আসে, যা প্রায়শঃ মাটিতে গেঁথে যায়। একে রীশে বরগদ অর্থাৎ বট বৃক্ষের দাড়ি বা ঝুরি বলে। পাতার বোঁটা ভাঙ্গলে অথবা ছাল কাটলে এক প্রকারের রস বের হয়। একে শীরে বরগদ অর্থাৎ বট গাছের দুধ বলে। বটের পাতা কাঁঠাল পাতার মতো, তবে অপেক্ষাকৃত মসৃণ। বটের দুধ শরীরে লাগলে কাল দাগ পড়ে যায় এবং বাতাসের সংস্পর্শে এ দুধ রাবারের মতো জমে যায়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সর্বত্র মাঠে-ময়দানে ও উন্মুক্ত প্রান্তরে জন্মায় এবং প্রায় হাজার বছর বেঁচে থাকে।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে শীতল ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক ও শুষ্ককারক। বটের তাজা দুধে তুলা ভিজিয়ে লাগালে ফোঁড়া দমন করে বা ফোঁড়া হয়ে গেলে গলিয়ে দেয়। পায়ের ফাটায়ও বটের দুধ ফলপ্রদ। বটের দুধ, ফুলের কলি ও দাড়ি শুক্রতারল্য, দ্রুত বীর্যস্খলন, শুক্রমেহ ও অতিরিক্ত স্বপ্নদোষে কার্যকর। বটের দাড়ির ৫-৬ গ্রাম চূর্ণ সমপরিমাণ চিনি মিশ্রিত করে এক গ্লাস দুধসহ স্বামী-স্ত্রী উভয়ে কিছুদিন সেবন করলে গর্ভসঞ্চারে সহায়ক হয়। বটের চিকন দাড়ির প্রলেপ স্তনের শিথিলতায় ফলপ্রসূ। পাতা-ভস্ম ক্ষত শুষ্ককারক।
মাত্রা: কলি ৩-৫ গ্রাম। দাড়ি ৫-১০ গ্রাম। দুধ ২-৩ ফোঁটা।
ক্ষতিকর: পাকস্থলী ও অন্ত্রনালীর জন্য।
সংশোধক: মধু, চিনি, কাতীরা।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, কলি, দাড়ি ও দুধ।
বনধনে / মিছরীদানা
নামভেদ: হিন্দী নাম- মিছরীদানা। বাংলা নাম- বনধনে। ইংরেজী নাম- Sweet Broomweed। বৈজ্ঞানিক নাম- Scoparia dulcis।
পরিচিতি: এক-দেড় ফুট উঁচু উদ্ভিদ। ছোট ছোট পাতার কিনার খাঁজকাটা। পাতার বোঁটার কাছে ধনিয়ার মতো ছোট ছোট ফল ধরে, এতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজ হয়। চড়ুই পাখী সানন্দে এই ফল খায়। পাতা স্বাদে মিষ্ট। এজন্য এর নামকরণ মিছরীদানা।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: হুপিং কফ, জ্বর, দাস্ত ও বমি নিবারক।
মাত্রা: ৩-৫ গ্রাম।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: শীতল ও আর্দ্র দ্রব্যাদি, মধু।
ব্যবহার্য অংশ: ফল, বীজ, মূল, পাতা।
বহেড়া / বালীলা
নামভেদ: আরবী নাম- বলীলজ। উর্দু নাম- বলীলা। ফারসী নাম- বলেলা। হিন্দী নাম- বহেড়া। সংস্কৃত নাম- বিভীতক। বাংলা নাম- বহেড়া; বয়ড়া। ইংরেজী নাম- Beleric Myrobalan। বৈজ্ঞানিক নাম- Terminalia bellerica।
পরিচিতি: বহেড়া গাছ ৮০ হতে ১০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ৪/৫ হাজার ফুট বা তারও বেশী উঁচু পার্বত্যাঞ্চলে এ মূল্যবান বৃক্ষ অধিক জন্মায়। বৃহদাকৃতির মাজুফলের সমান বা আরো কিছুটা বড়, প্রায় গোলাকৃতির ফল হয়। হলুদাভ-ছাইবর্ণের ফলগুলো লোমাবৃত থাকে। পাতা দেখতে অনেকটা কাঠবাদামের পাতার মতো। কচি পাতা তাম্রবর্ণ, পূর্ণাঙ্গ পাতা ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা ডিম্বাকৃতির হয়। ফাল্গুন মাসে পাতা ঝরে গিয়ে চৈত্র মাসে নতুন পাতা গজায়। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে ফুল ফোটে এবং শীতের সূচনায় ফল হয়। স্বাদে কষায় ও বিস্বাদ। বহেড়া ত্রিফলার অন্যতম একটি।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: সংকোচক, তবে কাঁচা ফল কোষ্ঠ পরিষ্কারক। অম্লরস জাতীয় অসার পদার্থ নিঃসারক। পাকস্থলীর শক্তিবর্ধক, ক্ষুধা ও রুচিবর্ধক। মাথাব্যথা, অর্শ ও পুরনো দাস্তে উপকারী। মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধক। দৃষ্টিক্ষীণতায় ফলপ্রসূ। সৈন্ধব লবণ, গোলমরিচ ও মাখনসহ স্বরভঙ্গে উপকারী।
মাত্রা: ৫-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: অন্ত্রনালীর সংকোচক।
সংশোধক: মধু, চিনি, মৌরি।
ব্যবহার্য অংশ: ফলের খোসা।
বাসক / আডুসা
নামভেদ: উর্দু নাম- আডুসা। হিন্দী নাম- বাঁসা। বাংলা নাম- বাসক। ইংরেজী নাম- Vasaka। বৈজ্ঞানিক নাম- Adhatoda vasica।
পরিচিতি: বহু শাখাবিশিষ্ট গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। শাখা গাঁটযুক্ত এবং প্রতিটি গিঁটে দু’টি করে পাতা থাকে। পাতা দেখতে আমপাতার মতো, তবে অপেক্ষাকৃত কোমল। বসন্তকালে পাতার বোঁটার কাছে গিঁটে সুন্দর গুচ্ছাকারে ফুল হয়। পাতার গন্ধ অনেকটা আদা পাতার মতো বলে গ্রাম বাংলার অনেক অঞ্চলে এটি আদাবাসক নামেও পরিচিত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সর্বত্র, ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল ও পাকিস্তানের পাঞ্জাব।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক। ফুল প্রথম শ্রেণীতে শীতল।
ক্রিয়া/গুণ: জীবাণু নাশক, শ্লেষ্মা নিঃসারক, খিঁচুনি নিবারক, রক্ত রোধক, জ্বর নিবারক ও হাঁপানি প্রশমক। শুকনো পাতার ধোঁয়া গ্রহণে হাঁপানির উপশম হয়। তাজা পাতার রস মধুসহ নাকের রক্তক্ষরণে উপকারী। এর ফুল দিয়ে তৈরী গুলকন্দ শ্বাসকষ্টে ও কাশিতে ফলপ্রদ।
মাত্রা: শুকনো পাতা ও ছালের চূর্ণ ২-৩ গ্রাম। তাজা পাতা ও ছালের জোশান্দা (কাথ) ৫-১০ গ্রাম।
ক্ষতিকর: যৌনশক্তির জন্য।
সংশোধক: মধু ও গোলমরিচ।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, ফুল, ছাল ও মূল।
ভূঁই আমলা
নামভেদ: হিন্দী নাম- ভূঁই আমলা; পাতাল-আমলা; জড়-আমলা। বাংলা নাম- ভূঁই আমলা; ভূম্যামলকী। ইংরেজী নাম- Stone Breaker। বৈজ্ঞানিক নাম- Phyllanthus niruri।
পরিচিতি: প্রায় এক হাত উঁচু উদ্ভিদ বিশেষ। এর পাতা দেখতে আমলকির পাতার মতো। পাতার নীচে ছোট ছোট দানার মতো থাকে এবং এই দানার চারিদিকে আমলকির মতোই রেখা থাকে। আর্দ্র স্থানে এই উদ্ভিদ আপনা-আপনিই জন্মায়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যাঞ্চল ও তামিলনাড়ু।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: প্রতিবন্ধকতা অপসারক, মূত্রকারক ও শীতলকারক। জন্ডিস, গণোরিয়া ও মূত্র-প্রদাহে বিশেষ হিতকর।
মাত্রা: তাজা উদ্ভিদ ২০-২৫ গ্রাম। শুষ্ক পাতা বা মূল চূর্ণ ২-৩ গ্রাম।
ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: মধু, গোলমরিচ।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
ভেরেণ্ডা / বেদ আঞ্জীর
নামভেদ: আরবী নাম- খিরওয়ায়। ফারসী নাম- বেদ আঞ্জীর। হিন্দী নাম- এরণ্ড। বাংলা নাম- এরণ্ড; ভেরেণ্ডা; ভেরেন্ডা। ইংরেজী নাম- Castor Plant; Palma Christi। বৈজ্ঞানিক নাম- Ricinus communis।
পরিচিতি: মধ্যম আকারের অর্থাৎ ৮-১২ ফুট উচ্চতার কোমল বৃক্ষ বিশেষ। পাতা আকারে বড়, দেখতে হাতের পাঞ্জার মতো। কন্টকযুক্ত গুচ্ছে গোলাকার ফল ধরে। ফলের ভিতর বীজ হয়, দেখতে জয়পালের মতো, তিন ফলকবিশিষ্ট। বীজের খোসা ছাড়িয়ে নিলে মসৃণ ধরনের শাঁস পাওয়া যায়। বীজের খোসা ও শাঁসে Ricin নামক একপ্রকারের মারাত্মক বিষ পাওয়া যায়। কিন্তু বীজ থেকে নিষ্কাশিত তেলে এই বিষ থাকে না। এই তেল ক্যাস্টর অয়েল নামে পরিচিত ও চিকিৎসকদের নিকট সমাদৃত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: শ্লেষ্মা নিঃসারক এবং সকল শীতল প্রকৃতির রোগে হিতকর। পেটকে নরম করে, দূষিত পদার্থ দ্রবণ করে। কুলঞ্জ (কলিক বেদনা), শোথ, হাঁপানি, কাশি, পক্ষাঘাত ও মুখের পক্ষাঘাতে ফলপ্রদ। ঋতুস্রাব বর্ধক, ফোলা নাশক, ব্যথা-বেদনা প্রশমক। এর বীজের তেল কড়া রেচক এবং সাধারণতঃ দুই-তিন ঘন্টার মধ্যেই কাজ করে। (সতর্কতা: বীজ সরাসরি সেবন নিষিদ্ধ।)
মাত্রা: পাতা ৭-১২ গ্রাম। তেল ২৫-৫০ গ্রাম।
ক্ষতিকর: পাকস্থলীর জন্য।
সংশোধক: মুসতগী, কাতীরা।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, বীজের তেল।
মনসা / থোহর / যক্কুম
নামভেদ: আরবী নাম- যক্কুম। উর্দু নাম- থোহর। হিন্দী নাম- সেহুণ্ড। বাংলা নাম- মনসা; মনসাসীজ। সংস্কৃত নাম- সেহুণ্ড; স্নুহী। ইংরেজী নাম- Milk Hedge Plant; Dog’s Tongue। বৈজ্ঞানিক নাম- Euphorbia neriifolia।
পরিচিতি: বহুল পরিচিত উদ্ভিদ বিশেষ। এটি কয়েক প্রকারের হয়। এর পাতা ও শাখায় কাঁটা থাকে। পাতা ও ডাল ভাঙ্গলে দুধের মতো কষ বের হয়। স্বাদে অত্যন্ত কটু। এর এক প্রকারের বাংলা নাম ফণিমনসা।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান।
মিযাজ: তৃতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: এর পাতা বাহ্যিক প্রয়োগে দ্রাবক, ফোলা নাশক। এর দুধ সিফিলিস ও বাতবেদনায় বাহ্যিক ব্যবহারে রক্তিমকারক ও ক্ষতকারক। অশ্বরোগে ব্যবহৃত হয়, তবে ক্ষতকারক; এজন্য অতি সাবধানে ব্যবহার করতে হয়।
মাত্রা: দুধ এক ফোঁটা পর্যন্ত (বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে)।
ক্ষতিকর: উষ্ণ প্রকৃতির লোকের জন্য।
সংশোধক: বকরির দুধ, গরুর দুধ।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, দুধ।
মেদা কাঠ / মুগাছ
নামভেদ: আরবী নাম- মুগাছ; মুগাছ বাগদাদী। উর্দু ও হিন্দী নাম- মেদা লাকড়ী। বাংলা নাম- মেদা কাঠ। ইংরেজী নাম- Wild Pomegranate। বৈজ্ঞানিক নাম- Litsea chinensis; Litsea sebifera।
পরিচিতি: মধ্যমাকৃতির বৃক্ষ বিশেষ, যার ছাল খুব পুরু ও মোটা কাঠের মতো। পাতা, ছাল ইত্যাদি পানিতে সিদ্ধ করলে একটু লালচে বর্ণ ও পিচ্ছিল হয়। পাতায় এক ধরনের সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায়, যা অনেকটা জামরুল ফলের গন্ধের মতো। গ্রাম বাংলায় এ বৃক্ষ পিপলজাঙ্গী ও মেন্দা গাছ নামে পরিচিত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাব।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও প্রথম শ্রেণীতে শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: কোমলকারক, দ্রাবক, সংকোচক, বলবর্ধক, স্নায়ুসমূহের সতেজকারক, যৌনশক্তি বর্ধক, বাতের ব্যথা ও সন্ধি-বেদনায় ফলপ্রদ।
মাত্রা: ৩-৫ গ্রাম।
ক্ষতিকর: মূত্রথলির রোগের জন্য।
সংশোধক: মধু।
ব্যবহার্য অংশ: ছাল, পাতা।
লজ্জাবতী / লাজওয়ান্তী
নামভেদ: উর্দু নাম- লাজওয়ান্তী। হিন্দী নাম- লজালু; ছুইমুই। বাংলা নাম- লজ্জাবতী। ইংরেজী নাম- Humble Plant; Sensitive Plant। বৈজ্ঞানিক নাম- Mimosa pudica।
পরিচিতি: বহুল পরিচিত গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এর পাতা পক্ষল যৌগিক অর্থাৎ পাখীর পালকের ন্যায়, যার ডাঁটায় দুইটি করে পাতা সাজানো থাকে। কোন কিছুর স্পর্শে পাতা গুটিয়ে যায়। এজন্যই এর নাম লজ্জাবতী। এতে বেগুনী-লাল ফুল হয়। ফল প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা, প্রতিটি ফলে ৩-৫টি বীজ হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ব্রাজিল।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে শীতল ও আর্দ্র।
ক্রিয়া/গুণ: দ্রাবক, উজ্জ্বলকারক, রক্ত পরিষ্কারক, ঋতুস্রাবকারক, প্রদর ও অর্শ রোগে ফলপ্রদ। এর পাতার রস নালী ঘা ও পুরানো ক্ষতসারক।
মাত্রা: ৩-৫ গ্রাম।
ক্ষতিকর: বৃক্ক ও প্লীহার জন্য।
সংশোধক: মধু, গোলমরিচ।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
লতাকস্তুরী / মুশকদানা
নামভেদ: উর্দু নাম- মুশকদানা। বাংলা নাম- লতাকস্তুরী; কস্তুরী-ঢেঁড়স। ইংরেজী নাম- Musk Seeds। বৈজ্ঞানিক নাম- Abelmoschus moschatus।
পরিচিতি: ঢেঁড়শ গাছের মতো গাছ এবং এর ফলও দেখতে ঢেঁড়শের মতোই, তবে ফলের বীজ মসুর-সদৃশ, ছোট ও সুগন্ধিযুক্ত, কালচে ছাইবর্ণ।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারতের দাক্ষিণাত্য।
মিযাজ: দ্বিতীয় শ্রেণীতে শীতল ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: এর বীজ সংকোচক, শান্তকারক, বায়ু নিঃসারক, খিঁচুনি নিবারক। স্নায়বিক দুর্বলতা, হিস্টিরিয়া, মৃগী, হাঁপানি ও শুক্রমেহে ফলপ্রদ। এর পাতা ও মূল পানিসহ পিষে চিনি মিশ্রিত করে সেবনে গণোরিয়া ও শুক্রতারল্যে উপকার হয়।
মাত্রা: বীজ ২-৩ গ্রাম।
ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: মধু, গোলমরিচ।
ব্যবহার্য অংশ: বীজ, পাতা ও মূল।
লুচিপাতা
নামভেদ: বাংলা নাম- লুচিপাতা। ইংরেজী নাম- Shiny Bush। বৈজ্ঞানিক নাম- Peperomia pellucida।
পরিচিতি: বিরুৎ শ্রেণীর ছোট উদ্ভিদ বিশেষ। এক ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। এর সরু কাণ্ড ও শাখা একেবারে স্বচ্ছবর্ণের এবং ভিতরে ফাঁপা নলের মতো। পাতা দেখতে পিপুল গাছের পাতা-সদৃশ, তবে ছোট। ফল দেখতে হুবহু পিপুলের মতো, তবে সরু। গোটা উদ্ভিদই পানিপূর্ণ।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের আর্দ্র অঞ্চল।
মিযাজ: শীতল ও আর্দ্র।
ক্রিয়া/গুণ: শীতলকারক, শান্তকারক, মূত্রকারক। মূত্রকৃচ্ছতা, প্রস্রাবে জ্বালা-যন্ত্রণা এবং বৃক্ক ও মূত্রথলির পাথরীতে ফলপ্রসূ।
মাত্রা: ১০-১৫ গ্রাম।
ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: মধু, গোলমরিচ।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র উদ্ভিদ।
শজিনা / সাহাঞ্জনা
নামভেদ: উর্দু নাম- সাহাঞ্জনা। বাংলা নাম- শজিনা; সজনে; সাজনা। ইংরেজী নাম- Horse Radish Tree; Drumstick Tree। বৈজ্ঞানিক নাম- Moringa oleifera।
পরিচিতি: বহুল পরিচিত বৃক্ষ বিশেষ। কম-বেশী ৩০ ফুটের মতো উঁচু এ গাছের ডাল-পালা খুব নরম হয়। পাতা ত্রিপক্ষল যৌগিক। একটির বিপরীতে আরেকটি- এরূপ চার থেকে সাত জোড়া ছোট ছোট পাতা থাকে। ফুল সাদা ও লাল- দুই প্রকারের। ফল প্রায় এক ফুট লম্বা ও আঙ্গুল সমান পুরু হয় এবং তাতে বেশ কিছু ত্রিকোণাকৃতি বীজ থাকে। বছরে দুই-তিনবার ফুল ও ফল ধরে। শজিনা ফল তরকারি হিসাবে বহুল ব্যবহৃত। এ গাছের কাণ্ড থেকে বাবলা-গঁদের ন্যায় আঠা নির্গত হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, বার্মা, শ্রীলঙ্কা।
মিযাজ: তৃতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: ব্যথা নিবারক, শ্লেষ্মাজনিত রোগসমূহে হিতকর, ক্ষুধা বর্ধক, বায়ু নিঃসারক, মূত্রকারক, হজমকারক। সিরকায় তৈরী শজিনা ফলের আচার সন্ধিব্যথা, কোমরের ব্যথা, পক্ষাঘাত ইত্যাদিতে উপকারী। শজিনা গাছের তাজা মূলের রস দুধসহ সেবনে অভ্যন্তরীণ প্রদাহ, প্লীহাবৃদ্ধি, আহারে অরুচি, হাঁপানি, গেঁটেবাত প্রভৃতিতে ফলপ্রদ। ফুল কামশক্তি বর্ধক। বৃক্ক ও মূত্রথলির পাথরীতেও উপকারী।
মাত্রা: বীজ ১ গ্রাম, আচার ১২ গ্রাম, তাজা মূলের রস ৫-১০ মিলিলিটার।
ক্ষতিকর: গর্ভপাত ঘটাতে পারে।
সংশোধক: গোলমরিচ।
ব্যবহার্য অংশ: মূল, ছাল, পাতা, ফুল, বীজ ও আঠা।
শতমূলী / সাতওয়ার
নামভেদ: উর্দু ও হিন্দী নাম- সাতওয়ার। বাংলা নাম- শতমূলী; শতাবরী। ইংরেজী নাম- Asparagus। বৈজ্ঞানিক নাম- Asparagus racemosus।
পরিচিতি: লতা জাতীয় উদ্ভিদ বিশেষ, দেখতে ঝাউ-এর মতো। অপর কোন গাছ বা দড়ি ইত্যাদিতে ভর করে আঁকাবাঁকা হয়ে বেড়ে ওঠা এ উদ্ভিদের পাতার গোড়ার দিকে ছোট তীক্ষ্ণ কাঁটা থাকে। শোভা বর্ধক এই লতা-উদ্ভিদের আজকাল বাগান-বিলাসীদের নিকট যথেষ্ট কদর। এর গোড়ায় এক গুচ্ছ মূল থাকে। এই মূলগুলোই শতমূল বা শতমূলী নামে পরিচিত। প্রতিটি মূলের ভিতর একটি সরু কাঠির মতো থাকে। মূল স্বাদে মিষ্টি। পুরু ও সাদা মূল উত্তম বলে বিবেচিত হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও আর্দ্র।
ক্রিয়া/গুণ: বলবর্ধক, শুক্র ঘনকারক, যৌনশক্তি বর্ধক, দুধ বর্ধক, শুক্রমেহে উপকারী। তাজা মূলের রস দুধসহ গণোরিয়ায় উপকারী।
মাত্রা: ৭-১২ গ্রাম।
ক্ষতিকর: বায়ু উৎপাদক, গুরুপাক।
সংশোধক: মিছরি, চিনি।
ব্যবহার্য অংশ: মূল।
সর্পগন্ধা / উমরোপ / ছোটী চাঁদ
নামভেদ: উর্দু নাম- উমরোপ। হিন্দী নাম- ছোটী চন্দন। বাংলা নাম- সর্পগন্ধা; ছোট চাঁদ। ইংরেজী নাম- Rauwolfia। বৈজ্ঞানিক নাম- Rauwolfia serpentina।
পরিচিতি: দেড়-দু’হাত উঁচু এই উদ্ভিদের পাতা আমপাতা-সদৃশ। শাখায় বৃত্তাকারে তিনটি করে পাতা সজ্জিত থাকে। কলি লাল, প্রস্ফুটিত ফুল সাদাটে লাল। ফল-বীজ আকারে রতিদানা বা কুঁচের মতো, তবে কাল এবং জোড়ায় জোড়ায় থাকে। পাকা বীজ দেখতে সাপের চোখের মতো। ফুল ভাঙ্গলে কাঁচা তেঁতুলের মতো গন্ধ পাওয়া যায়। স্বাদে তিক্ত। হাকীম আজমল খানের তত্ত্বাবধানে রসায়ন-বিজ্ঞানী ডঃ সলিমুজ্জামান ছিদ্দিকী এ উদ্ভিদের উপর গবেষণা করে প্রথম উপক্ষার আজমালিন বের করেন, যা উচ্চ রক্তচাপের কার্যকর ঔষধ হিসাবে পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত ও সমাদৃত হয়। পরবর্তীতে এ থেকে আরও বহু ঔষধি ক্রিয়াসম্পন্ন উপক্ষার পাওয়া গেছে।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও উত্তরাঞ্চল, ভারতের আসাম ও হিমালয়ের পাদদেশ, ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও মালয়েশিয়ার বনাঞ্চলে আপনা-আপনি জন্মায়।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: শান্তকারক, নিদ্রাকারক। উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, উন্মাদ, হিস্টিরিয়া রোগে কার্যকর, স্নায়ুসমূহের উত্তেজনা প্রশমক। অল্পমাত্রায় ২-৩ সপ্তাহ সেবনে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে। হৈ-চৈ করে এমন উন্মাদ রোগীর জন্যও খুবই উপকারী। (চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সেবনীয়।)
মাত্রা: দৈনিক ২০০ মিলিগ্রাম, বিভক্ত মাত্রায়।
ক্ষতিকর: গর্ভাবস্থা, মানসিক বিষণ্ণতা ও গ্রহণী-ক্ষতের রোগীদের জন্য।
সংশোধক: মনাক্কা।
ব্যবহার্য অংশ: মূল, মূলের ছাল।
সোনালু / আমলতাস
নামভেদ: আরবী নাম- আমলতাস। ফারসী নাম- খেয়ারশাম্বর। সংস্কৃত নাম- স্বর্ণভূষণ। বাংলা নাম- সোনালু; সোন্দাল; বানরলাঠি; বান্দর লাঠি। ইংরেজী নাম- Purging Cassia; Golden Shower। বৈজ্ঞানিক নাম- Cassia fistula।
পরিচিতি: মাঝারি আকারের ও সোনালী আভাযুক্ত সুদৃশ্য বৃক্ষ বিশেষ। এতে এক হতে দু’ফুট লম্বা লাঠির মতো দেখতে ফল ধরে, যা কাঁচা অবস্থায় সবুজ দেখায়, কিন্তু পাকলে কালচে লাল হয়ে যায়। পাকা ফলের ভেতর থেকে পয়সা-আকৃতির আবরণযুক্ত কৃষ্ণবর্ণ গাঢ় রস বা মজ্জা পাওয়া যায়। এগুলোকে মগয আমলতাস বা মগযে ফুলুসে খেয়ারশাম্বর বলে। মজ্জা স্বাদে মিষ্ট, তবে দুর্গন্ধযুক্ত। এ গাছে স্বর্ণাভ হলুদ বর্ণের ফুল হয়।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাব, পাকিস্তানের পাঞ্জাব। হিমালয়ের পাদদেশে ৩ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতার এলাকায় অধিক হয়।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও আর্দ্র। মতান্তরে পরিমিত।
ক্রিয়া/গুণ: ফলের মজ্জা উৎকৃষ্ট রেচক, সহজে অসার পদার্থ নিষ্কাশন করে। (গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়।) ফলের খোসা ঋতুস্রাবকারক ও দ্রুত প্রসবকারক। পাতা ও ফুল কোষ্ঠ পরিষ্কারক, দ্রাবক ও ফোলা উপশমকারক। শাক হিসাবে পাতা ও ফুলের ব্যবহার প্রচলিত।
মাত্রা: মজ্জা ২৫-৫০ গ্রাম। ফলের খোসা ৫-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: অন্ত্রে মোচড় সৃষ্টি করে।
সংশোধক: মুসতগী, আনীসূন, রওগনে বাদাম, ঘি।
ব্যবহার্য অংশ: ফলের মজ্জা, ফলের খোসা, পাতা, ফুল।
স্বর্ণলতা / আফতিমূন হিন্দী
নামভেদ: আরবী নাম- আফতিমূন হিন্দী। উর্দু নাম- আকাসবেল। হিন্দী নাম- আকাশবেল; অমরলতা। বাংলা নাম- স্বর্ণলতা; শূন্যলতা। ইংরেজী নাম- Dodder; Cuscuta। বৈজ্ঞানিক নাম- Cuscuta epithymum।
পরিচিতি: হলুদ সোনালী বর্ণের পরজীবী সরু লতা বিশেষ। অন্য গাছের ডাল-পাতায় পেঁচিয়ে থাকে। যে গাছে এ লতা হয় সে গাছকে ধীরে ধীরে শুকিয়ে দেয়। এ লতায় পাতা হয় না, মূলও থাকে না। ইউরোপীয় দেশে উৎপন্ন স্বর্ণলতাকে আকাসবেল বেলায়েতী বা আফতিমূন বেলায়েতী বলে। এর ছোট ছোট বীজ তোখমে কুছুছ নামে পরিচিত।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল, পাকিস্তানের পাঞ্জাব।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে উষ্ণ ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: দ্রাবক, ফোলা নিবারক, প্রতিবন্ধকতা অপসারক, ব্যথা প্রশমক, কোমলকারক। সেকাঞ্জাবীনসহ পিত্তরস নিঃসারক। দেহের দূষিত পদার্থ নিষ্কাশন করে রক্ত পরিষ্কার করে। মূত্র ও ঋতুস্রাবকারক।
মাত্রা: ৫-৭ গ্রাম।
ক্ষতিকর: ফুসফুসের জন্য।
সংশোধক: কাতীরা, কাসনী, সেকাঞ্জাবীন।
ব্যবহার্য অংশ: সমগ্র লতা, বীজ।
হরীতকী / হালীলা
নামভেদ: আরবী নাম- হলীলজ। ফারসী নাম- হলেলা। উর্দু নাম- হালীলা। হিন্দী নাম- হর্রে; হরড়। বাংলা নাম- হরীতকী। ইংরেজী নাম- Chebulic Myrobalan। বৈজ্ঞানিক নাম- Terminalia chebula।
পরিচিতি: সুপরিচিত ঔষধি ফল বিশেষ। এর গাছ পার্বত্যাঞ্চলে অধিক জন্মে, তবে বন-জঙ্গলেও প্রচুর হয়। গাছের পাতা কচি অবস্থায় লালচে দেখায় ও লোমযুক্ত থাকে, পরে পর্যায়ক্রমে লোমবিহীন হয়ে পড়ে। ফল সাধারণতঃ ডিম্বাকৃতি; হলুদ, কালচে হলুদ, কাল অথবা ছাইবর্ণ। কচি অবস্থায় বীচি হওয়ার পূর্বেই ফল ঝরে পড়লে সেটা শুকিয়ে কাল হয়ে যায়। একে হালীলা সিয়াহ তথা কালো হরীতকী বা জঙ্গী হরীতকী বলে। পরিপক্ক ফলকে হালীলা যর্দ বা হলুদ হরীতকী বলে। আর ফল খুবই বেড়ে গিয়ে বেশ মোটা হলে সেটা হালীলা কাবুলী বা কাবুলী হরীতকী নামে পরিচিত হয়। সাধারণতঃ পার্বত্যাঞ্চলে এ ধরনের হরীতকী হয়ে থাকে। আয়ুর্বেদ মতে আকার-আকৃতি ভেদে সাত প্রকারের হরীতকীর কথা বলা হয়েছে। স্বাদে কষায়। সুপরিচিত ত্রিফলার একটি ফল হরীতকী।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারতের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল।
মিযাজ: প্রথম শ্রেণীতে শীতল ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: শ্লেষ্মা-পিত্ত-অম্লরসের নিঃসারক, মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধক, চোখের জ্যোতি বর্ধক, রসশোষক, পাকস্থলী ও যকৃতের শক্তিবর্ধক। অগ্নিতাপে ভেজে নিলে এটি মল সংকোচক হয়ে যায়। অর্শ রোগজনিত কোষ্ঠকাঠিন্যে হরীতকী খুব উপকারী।
মাত্রা: জোশান্দায় ৫-৭ গ্রাম, চূর্ণ আকারে ২-৩ গ্রাম।
ক্ষতিকর: শীতল প্রকৃতির লোকদের জন্য।
সংশোধক: মধু, মৌরি।
ব্যবহার্য অংশ: ফলের খোসা।
হলুদ / হলদী
নামভেদ: আরবী নাম- উরূকুছ-ছুফর। ফারসী নাম- চুব যদ; যদচুব। হিন্দী নাম- হলদী। ইংরেজী নাম- Turmeric। বৈজ্ঞানিক নাম- Curcuma longa।
পরিচিতি: বর্ষজীবী বীরুৎজাতীয় উদ্ভিদ। কন্দ লম্বা, চক্র ও গোলাকার গাঁটযুক্ত এবং অভ্যন্তর ভাগ পীতবর্ণ। হলুদের পাতা সবুজ বর্ণ ও লম্বাকৃতি। শুকনো হলে হালকা হরিদ্রাবর্ণ ধারণ করে। পুষ্পদণ্ড ৪-৬ ইঞ্চি লম্বা। বর্ষার প্রারম্ভে ফুল হয়। ফুল ফিকে সবুজ ও হরিদ্রা বর্ণের। সাধারণতঃ পাতা শুকিয়ে গেলে হলুদ সংগ্রহ করা হয়। যে হলুদ টাটকা, অল্প আঁশযুক্ত ও উজ্জ্বলবর্ণবিশিষ্ট, ধরে নিতে হবে এ ধরনের হলুদ উৎকৃষ্ট।
প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান।
মিযাজ: তৃতীয় শ্রেণীতে উষ্ণ ও শুষ্ক।
ক্রিয়া/গুণ: দ্রাবক, ব্যথা প্রশমক, রক্ত পরিষ্কারক, বর্ণ উজ্জ্বলকারক, শ্লেষ্মা নিঃসারক, যকৃতের প্রতিবন্ধকতা অপসারক, জীবাণু নাশক, মূত্রকারক, ক্রিমিনাশক। আঘাত ও মচকানোতে চুনসহ হলুদের প্রলেপ চমৎকার কাজ করে। জ্বলন্ত অঙ্গারে হলুদ-চূর্ণ ছেড়ে দিলে যে ধোঁয়া হয় সে ধোঁয়া নাকে টানলে বদ্ধ সর্দি খুলে যায়; এ ধোঁয়া হিস্টিরিয়ায়ও ফলপ্রসূ। হলুদের প্রলেপ মুখমণ্ডলের বর্ণ উজ্জ্বল করে, মুখের দাগও দূর করে।
মাত্রা: ১-৩ গ্রাম।
ক্ষতিকর: হৃদযন্ত্রের জন্য।
সংশোধক: লেবুর রস, জামুরার রস।
ব্যবহার্য অংশ: কন্দ।