🔒 গোপনীয়তার সাথে যৌন রোগের ফ্রি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন: — WhatsApp:          🔒 গোপনীয়তার সাথে যৌন রোগের ফ্রি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন: — WhatsApp:         
কুল্লিয়াতে তিব্ব – MCQ পরীক্ষা
কুল্লিয়াতে তিব্ব – MCQ পরীক্ষা

হাকীম মোঃ সুলতান মাহমুদ-এর পক্ষ থেকে আয়োজিত।

  • মোট প্রশ্ন ৫০টি, সময় ৪০ মিনিট; প্রশ্ন ও অপশন প্রতিবার এলোমেলো হবে।
  • সঠিক উত্তরে +১, ভুল উত্তরে −১, উত্তর না দিলে ০।
  • পরীক্ষা কঠিন; অপশনগুলো কাছাকাছি, সতর্ক থাকুন।
  • ফুলস্ক্রিন থেকে বের হলে, ট্যাব/অ্যাপ বদলালে বা স্ক্রিন ছাড়লে পরীক্ষা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হবে।
০/৫০40:00

প্রশ্ন – ০১: ইউনানী চিকিৎসকদের আমাদের দেশে কি নামে অভিহিত করা হয় এবং কেন?

Table of Contents

উত্তর: তিব্বে ইউনানী বা ইউনানী চিকিৎসা-বিজ্ঞান আমাদের দেশের সাধারণ লোকদের নিকট হাকীমী চিকিৎসা শাস্ত্র বলিয়াই পরিচিত। এই চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জনকারী চিকিৎসকদের বলা হয় ‘হাকীম’। ‘হাকীম’ শব্দটির উৎপত্তি ‘হিকমত’ হইতে। ‘হিকমত’ অর্থ সূক্ষ্ম জ্ঞান বা কৌশল। অতএব ‘হাকীম’ অর্থ সূক্ষ্ম বিষয়সমূহের জ্ঞানী ও কুশলী, অর্থাৎ চিকিৎসক।

প্রশ্ন – ০২: হাকীম এবং হাকিম শব্দদ্বয়ের উৎপত্তিগত মূল শব্দ কি কি? উক্ত শব্দদ্বয়ের মধ্যে ইউনানী চিকিৎসকদের জন্য কোনটি প্রযোজ্য এবং কেন?

উত্তর: হাকীম শব্দের উৎপত্তি হিকমত হইতে। হিকমত অর্থ সূক্ষ্ম জ্ঞান বা কৌশল। হাকিম শব্দের উৎপত্তি হুকুম হইতে। হুকুম অর্থ নির্দেশ। হাকিম অর্থ বিচারক। ইউনানী চিকিৎসকদের জন্য প্রযোজ্য হইল হাকীম শব্দটি, কেননা হাকীম শব্দের উৎপত্তি হিকমত হইতে। হিকমত অর্থ সূক্ষ্ম জ্ঞান বা কৌশল। অতএব, হাকীম অর্থ সূক্ষ্ম বিষয়সমূহের জ্ঞানী ও কুশলী অর্থাৎ চিকিৎসক। কারণ, চিকিৎসা-শাস্ত্র মূলতঃ অতি জটিল বিজ্ঞান।

প্রশ্ন – ০৩: আল-কানুন ফিত-তিব্ব এর গ্রন্থকারের পূর্ণ নাম লিখ।

উত্তর: আল-কানুন ফিত-তিব্ব এর গ্রন্থকারের পূর্ণ নাম হচ্ছে আবু আলী হোসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসান ইবনে আলী ইবনে সীনা।

প্রশ্ন – ০৪: “মূজযুল কানূন”-এর গ্রন্থকারের নাম কি?

উত্তর:“মূজযুল কানূন”-এর গ্রন্থকারের নাম হল আল্লামা আলাউদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনে আবিল হায্ম কারশী।

প্রশ্ন – ০৫: এলমে তিব্ব-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? আলোচনা কর।

উত্তর: এলমে তিব্ব-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: তিব্ব বা চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হইল স্বাস্থ্য বিদ্যমান থাকিলে উহা রক্ষা করা এবং মানব দেহকে রোগাক্রান্ত হইতে না দেওয়া। আর রোগ থাকিলে যথাসম্ভব উহার প্রতিকার করা।

প্রশ্ন – ০৬: এলমে তিব্ব-এর আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে আলোচনা কর।

উত্তর: এলমে তিব্ব-এর আলোচ্য বিষয়: তিব্ব বা চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হইল মানব দেহ। কারণ, মানব শরীরের স্বাস্থ্য ও রোগ-ব্যাধি লইয়াই চিকিৎসা শাস্ত্রে আলোচনা করা হয়।

প্রশ্ন – ০৭: এলমে তিব্ব বা চিকিৎসা বিদ্যা কাহাকে বলে? কয়টি ভাগে বিভক্ত ও কি কি? আলোচনা কর।

উত্তর: এলমে তিব্ব-এর পরিচয়: যে বিদ্যা শিক্ষা করিলে মানব-দেহের স্বাস্থ্য ও রোগ-ব্যাধির অবস্থা অবগত হওয়া যায় এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্যকে বহাল রাখা ও বিনষ্ট স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়, উহাকেই ‘এলমে তিব্ব’ বা চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে। এলমে তিব্ব-এর বিভাগ: এলমে তিব্ব-এর বিভাগসমূহকে নিম্নে ছক আকারে দেওয়া হলো:
এলমে তিব্ব-এর বিভাগ অন্তর্ভুক্ত বিষয়
নজরী (তত্ত্বীয়) ১. উমূরে তাবীইয়্যা (প্রাকৃতিক বিষয়সমূহ); ২. আহওয়ালে বদন (শারীরিক অবস্থাসমূহ); ৩. আসবাব (কারণসমূহ); ৪. আলামাত (লক্ষণসমূহ)
আমলী (ব্যবহারিক) ১. এলেম হেফজানে ছেহাত (স্বাস্থ্যরক্ষাবিধি); ২. এলমুল-এলাজ (চিকিৎসাবিধি)
 

প্রশ্ন – ০৮: কুল্লিয়াতে তিব্ব বা চিকিৎসার মূলনীতি বলিতে কি বুঝ? আলোচনা কর।

উত্তর: কুল্লিয়াতে তিব্ব:‘কুল্লিয়াত’ শব্দটি আরবী ‘কুল্লী’ শব্দের বহুবচন এবং ইহার উৎপত্তি ‘কুল’ শব্দ হইতে। ‘কুল’ অর্থ সমগ্র, ‘কুল্লী’ অর্থ সামগ্রিক। অতএব ‘কুল্লিয়াত’ অর্থ সামগ্রিক বিষয়াদি তথা মৌলিক বিষয়াদি। অর্থাৎ চিকিৎসা বিদ্যার যে অংশে মানব দেহের গঠন ও পরিচয়সহ চিকিৎসা শাস্ত্রের সামগ্রিক মৌলিক বিষয়াদি আলোচিত হয় তাহাই ‘কুল্লিয়াতে তিব্ব’।

প্রশ্ন – ০৯: উমূরে তাবীইয়্যা বা প্রাকৃতিক বিষয়সমূহের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা লিখ।

উত্তর: উমূরে তাবীইয়্যা-এর শাব্দিক সংজ্ঞা:‘উমূর’ অর্থ বিষয়সমূহ এবং ‘তাবীইয়্যা’ অর্থ স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক। ‘উমূর’ শব্দটি ‘আমর’-এর বহুবচন। আর ‘তাবীইয়্যা’ শব্দের উৎপত্তি তাবীআৎ হইতে। ‘তাবীআৎ’ শব্দের অর্থ প্রকৃতি। পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে মূল বস্তুসমূহ দ্বারা মানবদেহ গঠিত হয় এবং যেসব মৌলিক বিষয়বস্তুর উপর মানবের অস্তিত্ব নির্ভরশীল, সেগুলিকেই ‘উমূরে তাবীইয়্যা’ বা প্রাকৃতিক বিষয়সমূহ বলা হয়। গুরুত্ব: এইগুলির কোনো একটিকেও পরিত্যাগ করিলে মানবদেহ নাই বলিয়াই সাব্যস্ত হইবে।

প্রশ্ন – ১০: উমূরে তাবীইয়্যা কত প্রকার ও কি কি? ধারাবাহিকভাবে লিখ।

উত্তর: প্রকারভেদ:‘উমূরে তাবীইয়্যা’ তথা প্রাকৃতিক বিষয়সমূহ সংখ্যায় সাতটি। যথা: (১) ‘আরকান’ বা মৌলিক উপাদানসমূহ; (২) ‘মিযাজ’ বা প্রকৃতি তথা স্বভাব; (৩) ‘আখলাত’ বা ধাতুরসসমূহ; (৪) ‘আ’যা’ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ; (৫) ‘আরওয়াহ’ বা জীবনীশক্তিসমূহ; (৬) ‘কোওয়া’ বা শক্তিসমূহ; (৭) ‘আফআল’ বা ক্রিয়াসমূহ।

প্রশ্ন – ১১: আরকান বা মৌলিক উপাদান বলতে কি বুঝ?

উত্তর: আরকান বা মৌলিক উপাদান: মানবদেহে যে কয়টি মৌলিক উপাদান রহিয়াছে এবং যে উপাদানসমূহের কোনটিই আর কোনো মতে বিভক্ত হইতে পারে না বরং প্রত্যেকটিই একক সত্ত্বার অধিকারী, সেইগুলিকেই ‘আরকান’ বলে।

প্রশ্ন – ১২: আরকান কত প্রকার ও কি কি? মিযাজসহ লিখ।

উত্তর: প্রকারভেদ:‘আরকান’ বা মৌলিক উপাদানসমূহের সংখ্যা চারটি। যথা:
আরকান মিযাজ
‘নার’ বা ‘আতশ’ অর্থাৎ অগ্নি উষ্ণ ও শুষ্ক
‘হাওয়া’ বা ‘বাদ’ অর্থাৎ বায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র
‘মা’ বা ‘আব’ অর্থাৎ পানি শীতল ও আর্দ্র
‘আরদ’ বা ‘খাক’ অর্থাৎ মৃত্তিকা শীতল ও শুষ্ক
 

প্রশ্ন – ১৩: আরকানের গুরুত্ব আলোচনা কর।

উত্তর: আরকানের গুরুত্ব: শুধু মানবদেহ নয়, বরং সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রাণি, উদ্ভিদ ও জড় জাতীয় সব কিছুই মূলতঃ এই সমস্ত আরকান বা আনাছেরের দ্বারা গঠিত ও সৃষ্ট। এজন্য আরকানের গুরুত্ব সমধিক।

প্রশ্ন – ১৪: আরকানকে আজযায়ে আওয়ালিয়্যা বলা হয়েছে কেন?

উত্তর: আরকানকে আজযায়ে আওয়ালিয়্যা বলা হয়: মানবদেহের উপাদানসমূহকে পৃথক করা হইলে প্রথমেই তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সন্ধান পাওয়া যাইবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিভক্ত করিলে জানা যাইবে যে, এইগুলি মূলতঃ ‘আখলাত’ বা ধাতুরসের সাহায্যে গঠিত। অতঃপর ‘আখলাত’-কে বিভক্ত করা হইলে জানা যাইবে যে, এইগুলি মূলতঃ ‘আরকান’ হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। মোট কথা, সর্বশেষে ‘আরকান’-এর সন্ধান পাওয়া যাইবে এবং ‘আরকান’ যেহেতু ‘বসীত’ বা মৌলিক, সেহেতু ইহার বিভক্তি সম্ভব নয়। এ জন্যই আরকানকে ‘আজযায়ে আওয়ালিয়্যা’ বলা হইয়া থাকে।

প্রশ্ন – ১৫: ‘আরকান’কে আনাছের কেন বলা হয়?

উত্তর: ‘আরকান’কে আনাছের বলা হয়:‘আরকান’ অর্থ মৌলিক উপাদান এবং ‘আনাছের’ অর্থ মৌলিক পদার্থ। যেহেতু উভয়ের একই অর্থ এবং একই জিনিসকে নির্দেশ করে, তাই ‘আরকান’-কে ‘আনাছের’ বলা হয়।

প্রশ্ন – ১৬: মিযাজ বলিতে কি বুঝ? কত প্রকার ও কি কি? আলোচনা কর।

উত্তর: মিযাজ-এর সংজ্ঞা: মানবদেহের ভিন্ন-ভিন্ন স্বভাব বিশিষ্ট চারটি মূল উপাদানের সংমিশ্রণে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পরিণতিতে যে অবস্থার উদ্ভব হয়, উহাকেই ‘মিযাজ’ বা প্রকৃতি বলে। ইহা নির্ভর করে বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা, পরিমাণ ও কার্যকারিতার উপর। প্রকারভেদ: মিযাজ সর্বমোট নয় প্রকার। তবে মূলতঃ মিযাজ দুই প্রকার। যথা: (১) মো’তাদেল বা স্বাভাবিক এবং (২) গায়ের মো’তাদেল বা অস্বাভাবিক। মিযাজে গায়ের মো’তাদেল মোট আট প্রকার। তন্মধ্যে চারটি মুফরাদ বা একক এবং চারটি মুরাক্কাব বা যৌগিক। ‘মুফরাদ’ বা একক চারটি। যথা: (ক) ‘হার’ বা ‘গরম’ অর্থাৎ উষ্ণ; (খ) ‘বারেদ’ বা ‘সর্দ’ অর্থাৎ শীতল; (গ) ‘য়াবেস’ বা ‘খুশক’ অর্থাৎ শুষ্ক বা রুক্ষ এবং (ঘ) ‘রতব’ বা ‘তর’ অর্থাৎ আর্দ্র। ‘মুরাক্কাব’ বা যৌগিক চারটি। যথা: (ক) হার ও য়াবেস তথা উষ্ণ ও শুষ্ক; (খ) হার ও রতব তথা উষ্ণ ও আর্দ্র; (গ) বারেদ ও য়াবেস তথা শীতল ও শুষ্ক; এবং (ঘ) বারেদ ও রতব তথা শীতল ও আর্দ্র।

প্রশ্ন – ১৭: মিযাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ কি?

উত্তর: মিযাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ সংমিশ্রণ, একাধিক পদার্থের বা বস্তুর একত্র মিশ্রণ, মিলন।

প্রশ্ন – ১৮: রুতুবাৎ তথা আর্দ্রতা কত প্রকার ও কি কি? উদাহরণসহ আলোচনা কর।

উত্তর: প্রকারভেদ:‘রুতুবাৎ’ তথা আর্দ্রতা দুই প্রকারের হয়। যথা: (১) রুতুবতে আছলী তথা প্রকৃত আর্দ্রতা; (২) রুতুবতে আরেযী তথা বাহ্যিক আর্দ্রতা। উদাহরণ: (১) বৃক্ষের তরতাজা ডালে যে আর্দ্রতা থাকে তাহা আছলী বা প্রকৃত আর্দ্রতা; এবং (২) একটি শুকনা ডালকে পানিতে সিক্ত করিলে যে সিক্ততা বা আর্দ্রতা দেখা যায় তাহা আরেযী বা বাহ্যিক আর্দ্রতা।

প্রশ্ন – ১৯: শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে সর্বাধিক স্বাভাবিক প্রকৃতির অঙ্গের নাম লিখ।

উত্তর: শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে সর্বাধিক স্বাভাবিক প্রকৃতির অঙ্গ হইল হাতের তর্জনী আঙ্গুলির মাথার সম্মুখভাগের ত্বক।

প্রশ্ন – ২০: আখলাত বা ধাতুরস বলতে কি বুঝ?

উত্তর: আখলাত বা ধাতুরস:‘আখলাত’ শব্দটি আরবী ‘খিল্ত’ শব্দের বহুবচন। ইহার অভিধানগত অর্থ হইল মিশ্রণ অথবা মিশ্রিত বস্তু। শারীরিক রসের মধ্যে রক্ত, শ্লেষ্মা, পিত্ত ও অম্ল মিশ্রিত থাকে বলিয়াই উহাকে ‘আখলাত’ বলা হয়। এক কথায় ‘খিল্ত’ বা ‘আখলাত’-এর অর্থ করা যায় শারীরিক রস বা ধাতুরস।

প্রশ্ন – ২১: আখলাত কিভাবে সৃষ্টি হয়?

উত্তর: পাকস্থলী পাকের পর ভুক্ত খাদ্যদ্রব্যসমূহ গাঢ় বার্লির পানির মত এক প্রকার তরল পদার্থে রূপান্তরিত হয়, যাহাকে ‘কায়লুস’ তথা রস বলে। ইহার সারাংশ ‘উরূকে মাসারীকা’ অর্থাৎ সূক্ষ্ম রক্তনালীসমূহের মাধ্যমে যকৃতে পৌঁছার পর যকৃতে উহার দ্বিতীয় পাক হয়। এ পাককে বলে ‘হযমে কাবেদী’ বা যকৃতের পাক। ভুক্তদ্রব্য যকৃতে পরিপাক হইয়া চারি ভাগে বিভক্ত হইয়া যায়। উহার অধিকাংশ লালবর্ণের হয়, যাহাকে ‘দাম’ বা রক্ত বলা হয়। কিছু অংশ শ্বেতবর্ণের হয়, যাহাকে ‘বলগম’ বা শ্লেষ্মা বলা হয়। কিছু অংশ হলুদ বা পীতবর্ণের হয়, যাহাকে ‘ছফরা’ বা পিত্ত বলে। আর কিছু অংশ বিকৃত কালচে বর্ণের তলানিরূপে দেখা যায়, যাহাকে ‘সওদা’ বা অম্ল বলে। এই চারিটির প্রত্যেককেই এক একটি ‘খিল্ত’ অর্থাৎ রস বা ধাতুরস এবং এগুলির সমষ্টিকে ‘আখলাত’ বা ধাতুরসসমূহ বলে।

প্রশ্ন – ২২: ‘আখলাত’ সংখ্যায় কয়টি ও কি কি? মিযাজসহ লিখ।

উত্তর: আখলাতের সংখ্যা:‘আখলাত’ সংখ্যায় চারটি। যথা:
আখলাত মিযাজ
‘দাম’ বা ‘খুন’ অর্থাৎ রক্ত উষ্ণ ও আর্দ্র
‘বলগম’ অর্থাৎ শ্লেষ্মা বা কফ শীতল ও আর্দ্র
‘ছফরা’ বা পিত্ত উষ্ণ ও রুক্ষ
‘সওদা’ বা অম্ল শীতল ও রুক্ষ
 

প্রশ্ন – ২৩: হযম বা পাক কাহাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? তিব্বী নামসহ লিখ।

উত্তর: হযম বা পাক: আমরা যাহা কিছু খাই, উহা পাকস্থলীতে যাওয়ার পর হইতে সর্বশরীরে মিশ্রিত হওয়া পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে চারিটি অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। এই অবস্থাগুলিকে ‘হযম’ বা পাক বলে। প্রকারভেদ:‘হযম’ বা পাক চার ধরনের। নিচে এগুলোর তিব্বী নামসহ দেওয়া হলো: (১) হযমে মে’দী বা পাকস্থলীর পাক (২) হযমে কাবেদী বা যকৃতের পাক (৩) হযমে উরূকী বা শিরাসমূহের পাক (৪) হযমে উযবী বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্বন্ধীয় পাক

প্রশ্ন – ২৪: রক্তের মিযাজ ও সর্বপ্রধান উপকারিতা লিখ।

উত্তর: রক্তের মিযাজ: রক্তের মিযাজ বা প্রকৃতি হইল উষ্ণ ও আর্দ্র। প্রধান উপকারিতা: রক্তের সর্বপ্রধান উপকারিতা এই যে, উহা দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে প্রয়োজনীয় পথ্য ও খোরাক এবং প্রাণের উপকরণ সরবরাহ করিয়া থাকে। মূলতঃ দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্তের বদৌলতেই সজীব ও সক্রিয় থাকে।

প্রশ্ন – ২৫: স্বাভাবিক রক্তের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।

উত্তর: স্বাভাবিক রক্তের বৈশিষ্ট্য: স্বাভাবিক রক্তের বৈশিষ্ট্য চারিটি। যথা: (১) উহা টকটকে লাল বর্ণের হয়। (২) উহাতে কোনো রকমের দুর্গন্ধ থাকে না। (৩) উহার স্বাদ অনেকটা মিষ্ট হয়। এবং (৪) ‘কেওয়াম’ তথা ঘনত্বের দিক দিয়া উহা মো’তাদেল বা পরিমিত হয়; অর্থাৎ বেশি তরলও হয় না, আবার বেশি গাঢ়ও হয় না।

প্রশ্ন – ২৬: তাবায়ী খিল্ত-এর সংজ্ঞা দাও।

উত্তর: তাবায়ী খিল্ত: প্রত্যেকটি তাবায়ী খিল্ত তথা স্বাভাবিক ধাতুরসের সংজ্ঞা এই যে, উহা ‘কাবেদ’ বা ‘জিগর’ তথা যকৃতে উৎপন্ন হইবে এবং যে প্রয়োজনে উহার সৃষ্টি সেই প্রয়োজন পূরণে উহা যথেষ্ট হইবে। প্রত্যেকটি তাবায়ী খিল্তই এই সংজ্ঞার আওতাভুক্ত।

প্রশ্ন – ২৭: বলগম বা শ্লেষ্মা বলিতে কি বুঝ? অথবা রক্তের পর উত্তম ধাতুরস কি? মিযাজসহ লিখ।

উত্তর: বলগম বা শ্লেষ্মা: রক্তের পর উত্তম ধাতুরস হইল ‘বলগম’ তথা শ্লেষ্মা। মিযাজ: শ্লেষ্মার মিযাজ বা প্রকৃতি হইল ‘শীতল ও আর্দ্র’।

প্রশ্ন – ২৮: বলগম বা শ্লেষ্মার উপকারিতা লিখ।

উত্তর: বলগম বা শ্লেষ্মার উপকারিতা: শ্লেষ্মার উপকারিতা প্রধানতঃ তিনটি। যথা: (১) শ্লেষ্মার সর্বপ্রধান উপকারিতা এই যে, দেহে যখন উহার খোরাকের (তথা রক্তের) অভাব দেখা দেয়, তখন শ্লেষ্মা দ্রুত রক্তে রূপান্তরিত হইয়া দেহের প্রয়োজন পূরণ করে। (২) শ্লেষ্মা দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সিক্ত রাখে, যাহাতে নড়াচড়া ও ঘর্ষণের দরুণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শুষ্ক হইয়া না যায়। (৩) শ্লেষ্মার আর একটি উপকারিতা হইল এই যে, উহা মস্তিষ্ক প্রভৃতি শীতল ও আর্দ্র প্রকৃতির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খোরাকরূপে কাজ করিয়া থাকে।

প্রশ্ন – ২৯: স্বাদ অনুসারে বলগম গায়রে তাবায়ী বা বিকৃত শ্লেষ্মা প্রধানত কয়টি ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: স্বাদ অনুসারে বলগম গায়রে তাবায়ী বা বিকৃত শ্লেষ্মা চারি প্রকারের। যথা: (১) ‘বলগমে মালেহ’ বা লবণাক্ত শ্লেষ্মা। (২) ‘বলগমে হামেজ’ বা অম্ল বা টক আস্বাদযুক্ত শ্লেষ্মা। (৩) ‘বলগমে আফেছ’ বা কষায় স্বাদযুক্ত শ্লেষ্মা। (৪) ‘বলগমে মসীখ’ বা স্বাদহীন শ্লেষ্মা।

প্রশ্ন – ৩০: ঘনত্ব অনুসারে বলগম গায়রে তাবায়ী বা বিকৃত শ্লেষ্মা কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: ঘনত্ব অনুসারে বলগম গায়রে তাবায়ী বা বিকৃত শ্লেষ্মা চার প্রকার। যথা: (ক) ‘বলগমে মায়ী’ বা পানির মত শ্লেষ্মা। (খ) ‘বলগমে যুজাজী’ বা গলিত কাঁচের মত শ্লেষ্মা। (গ) ‘বলগমে মুখাতী’ বা নাকের পানির মত শ্লেষ্মা এবং (ঘ) ‘বলগমে জাছছী’ বা চুন-গোলার মত শ্লেষ্মা।

প্রশ্ন – ৩১: ছফরা বা পিত্তের উপকারিতা লিখ।

উত্তর: ছফরা বা পিত্তের উপকারিতা: ছফরা বা পিত্তের উপকারিতা প্রধানতঃ তিনটি। যথা: (১) পিত্তের সর্বপ্রধান উপকারিতা এই যে, ইহা রক্তকে লঘু করিয়া দেয় এবং সূক্ষ্ম রগসমূহ পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেয়। (২) পিত্ত ফুসফুস প্রভৃতি উষ্ণ ও রুক্ষ প্রকৃতির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খোরাকের অন্তর্ভুক্ত হইয়া থাকে। (৩) পিত্তের কিছু অংশ প্রয়োজনের সময় পিত্ত কোষ হইতে অন্ত্রনালীসমূহের মধ্যে গিয়ে পড়ে এবং অন্ত্রস্থিত আবর্জনা ও আঠাল শ্লেষ্মাকে ধুইয়া পরিষ্কার করিয়া দেয়। তাছাড়া পিত্তের একাংশ অন্ত্রসমূহে পৌঁছিয়া অন্ত্রে ও গুহ্যদ্বারের তন্ত্রীগুলোতে এমন বেগের সৃষ্টি করে, যদ্দরুন মলত্যাগ করার আবশ্যকতা অনুভব হয়।

প্রশ্ন – ৩২: ছফরায়ে গায়রে তাবায়ী কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: ছফরায়ে গায়রে তাবায়ী তথা বিকৃত পিত্ত প্রধানতঃ পাঁচ প্রকার। যথা: (ক) ছফরায়ে ছক্কা; (খ) ছফরায়ে মুয়া; (গ) ছফরায়ে মুহতারাক; (ঘ) ছফরায়ে কুররাসী; এবং (ঙ) ছফরায়ে যাঙ্গারী।

প্রশ্ন – ৩৩: শায়খ বু-আলী ইবনে সীনা কোন প্রকারের পিত্তকে বিষাক্ত পদার্থরূপে গণ্য করেছেন?

উত্তর: পিত্তের সকল প্রকারের মধ্যে ‘ছফরায়ে যাঙ্গারী’ তথা লৌহের ন্যায় বর্ণ-বিশিষ্ট পিত্ত সর্বাধিক তেজস্কর, উষ্ণ, নিকৃষ্ট ও মারাত্মক প্রকৃতির। এ জন্যই ইহাকে বিষের সহিত তুলনা করা হয়। শায়খ বু-আলী ইবনে সীনা বলেন, এ প্রকারের পিত্তকে বিষাক্ত পদার্থরূপে গণ্য করা হইয়া থাকে।

প্রশ্ন – ৩৪: সওদার উপকারিতাসমূহ লিখ।

উত্তর: সওদার উপকারিতা:‘সওদা’ তথা অম্লের উপকারিতা প্রধানতঃ তিনটি। যথা: (১) উহা রক্তকে গাঢ় করে; (২) উহা অস্থি-হাড় প্রভৃতি শীতল ও রুক্ষ প্রকৃতির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অন্যতম খোরাক হিসাবে ব্যয়িত হয়; এবং (৩) উহার কিয়দংশ প্রয়োজনের সময় পাকস্থলীর মুখের উপর গিয়া পড়ে, যাহার ফলে ক্ষুধার উদ্রেক হইয়া খাদ্য গ্রহণের বাসনা জাগ্রত হয়।

প্রশ্ন – ৩৫: আ’যা বা অঙ্গসমূহ কাহাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? উদাহরণসহ লিখ।

উত্তর: আ’যা বা অঙ্গসমূহের সংজ্ঞা: মানব দেহের যে যে অংশ উৎকৃষ্ট ও নির্দোষ আখলাত তথা ধাতুরস চতুষ্টয়ের পারস্পরিক মিশ্রণ ও সংযোজনের ফলে প্রাথমিকভাবে সৃষ্টি হয়, সেইগুলিকে আ’যা বা অঙ্গসমূহ বলে। প্রকারভেদ: আ’যা বা অঙ্গসমূহ দুই প্রকার হয়। যথা: (১) ‘মুফরাদ’ অর্থাৎ একক অঙ্গ; (২) ‘মুরাক্কাব’ অর্থাৎ যৌগিক অঙ্গ। (১) ‘উযভ মুফরাদ’-এর পরিচয় বা সংজ্ঞা: উহার একটি দৃষ্টিগোচর অংশের নাম ও পরিচয় এবং উক্ত অঙ্গের পূর্ণাঙ্গ অংশের নাম ও পরিচয় একই রূপ হয়। উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য হয় না। যেমন অস্থি বা হাড়, আ’ছাব বা স্নায়ুতন্ত্রীসমূহ ইত্যাদি। (২) ‘উযভ মুরাক্কাব’-এর পরিচয়: উহার একটি অংশের নাম ও পরিচয় আর উহার সমুদয় অংশের নাম ও পরিচয় একইরূপ হয় না, বরং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হয়। যেমন মুখমণ্ডল, হাত, পা ইত্যাদি।

প্রশ্ন – ৩৬: পাঁচটি একক ও পাঁচটি যৌগিক অঙ্গের নাম মিযাজসহ লিখ।

উত্তর: পাঁচটি একক অঙ্গ ও পাঁচটি যৌগিক অঙ্গের নাম মিযাজসহ নিচে দেওয়া হলো: পাঁচটি একক অঙ্গ:
পাঁচটি একক অঙ্গ মিযাজ
(১) জিল্দ বা ত্বক মো’তাদেল
(২) আয্ম বা হাড় শীতল ও শুষ্ক
(৩) শরাঈন বা ধমনীসমূহ উষ্ণ ও আর্দ্র
(৪) আওরেদাহ বা শিরাসমূহ উষ্ণ ও আর্দ্র
(৫) আ’ছাব বা স্নায়ুতন্ত্রীসমূহ শীতল ও শুষ্ক
  পাঁচটি যৌগিক অঙ্গ:
পাঁচটি যৌগিক অঙ্গ মিযাজ
(১) রিয়া বা ফুসফুস উষ্ণ ও শুষ্ক
(২) দেমাগ বা মস্তিষ্ক শীতল ও আর্দ্র
(৩) কাল্ব বা দিল তথা হৃদপিণ্ড উষ্ণ ও আর্দ্র
(৪) জিগর বা যকৃত উষ্ণ ও আর্দ্র
(৫) মে’দা বা পাকস্থলী শীতল ও আর্দ্র
 

প্রশ্ন – ৩৭: আ’যায়ে রঈসা বা প্রধান অঙ্গসমূহ কত প্রকার ও কি কি? সেবক অঙ্গসহ লিখ।

উত্তর: প্রকারভেদ: ‘বকায়ে শখ্স’ অর্থাৎ মানবের ব্যক্তি জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আ’যায়ে রঈসা বা প্রধান অঙ্গসমূহ তিনটি। যথা: (১) ‘কাল্ব’ বা দিল অর্থাৎ হৃদপিণ্ড; (২) ‘দেমাগ’ বা মস্তিষ্ক; (৩) ‘কাবেদ’ বা জিগর অর্থাৎ যকৃত। ‘বকায়ে নওয়’ অর্থাৎ মানব-বংশ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আ’যায়ে রঈসা বা প্রধান অঙ্গসমূহ চারটি। যথা: (১) দিল বা হৃদপিণ্ড; (২) দেমাগ বা মস্তিষ্ক; (৩) জিগর বা যকৃত এবং (৪) ‘খুছয়াতায়ন’ বা উভয় অণ্ডকোষ। সেবক অঙ্গ: নিচে আ’যায়ে রঈসার সেবক অঙ্গগুলো দেওয়া হলো:
আ’যায়ে রঈসা সেবক অঙ্গ
(১) দিল বা হৃদপিণ্ড শরাঈন বা ধমনীসমূহ
(২) দেমাগ বা মস্তিষ্ক আ’ছাব বা স্নায়ুতন্ত্রীসমূহ
(৩) জিগর বা যকৃত আওরেদাহ বা শিরাসমূহ
(৪) খুছয়াতায়ন বা উভয় অণ্ডকোষ ‘মাজরায়ে মনী’ তথা শুক্রবাহী নালী শুক্রের গন্তব্যস্থল অর্থাৎ জরায়ু পর্যন্ত অণ্ডকোষদ্বয়ের সেবা করিয়া থাকে।
 

প্রশ্ন – ৩৮: রূহ কাহাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? বাহকসহ লিখ।

উত্তর: রূহ-এর সংজ্ঞা: চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায়, উৎকৃষ্ট ও নির্দোষ আখলাত বা ধাতুরসসমূহের অতি লঘু ও সূক্ষ্ম সারাংশ দ্বারা সৃষ্ট বাষ্প জাতীয় পদার্থকে ‘রূহ’ বা জীবনীশক্তি বলে। প্রকারভেদ: রূহ তিন প্রকার। যথা: (১) রূহে হায়ওয়ানী বা হৃদযান্ত্রিক রূহ; (২) রূহে তাবায়ী বা স্বাভাবিক রূহ; (৩) রূহে নফসানী বা মানসিক রূহ। নিচে এদের বাহকদের নাম দেওয়া হলো:
রূহ বাহক
(১) রূহে হায়ওয়ানী কুওয়তে হায়ওয়ানীর বাহক
(২) রূহে তাবায়ী কুওয়তে তাবায়ীর বাহক
(৩) রূহে নফসানী কুওয়তে নফসানীর বাহক
 

প্রশ্ন – ৩৯: রূহ সৃষ্টির রহস্য বর্ণনা কর।

উত্তর: রূহ সৃষ্টির রহস্য এই যে, রক্ত যখন হৃৎপিণ্ডের অভ্যন্তরে বামপার্শ্বে গিয়া পৌঁছে ও পাক হইতে থাকে তখন উক্ত রস সেখানে অত্যন্ত লঘু ও স্বচ্ছ হইয়া যায় এবং উহার একাংশ লঘু ও সূক্ষ্ম বাষ্পে রূপান্তরিত হয়। উহাই ‘রূহ’।

প্রশ্ন – ৪০: কোওয়া বা শক্তিসমূহ কাহাকে বলে? উহা কত প্রকার ও কি কি? কেন্দ্রস্থলসহ লিখ।

উত্তর: কোওয়ার পরিচয়: ইউনানী চিকিৎসা-বিজ্ঞানের পরিভাষায়, মানবদেহের ক্রিয়াসমূহ সম্পাদিত হওয়ার পশ্চাতে যেসব শক্তি ও ক্ষমতা কাজ করিয়া থাকে, সেগুলিকেই কোওয়া বলে। প্রকারভেদ: কোওয়া বা শক্তিসমূহ তিন প্রকার। যথা: (১) কোওয়ায়ে তাবায়ী বা স্বাভাবিক শক্তি; (২) কোওয়ায়ে নফসানী বা মানসিক শক্তি; (৩) কোওয়ায়ে হায়ওয়ানী বা হৃদ্যান্ত্রিক শক্তি। নিচে এদের কেন্দ্রস্থল উল্লেখ করা হলো:
কোওয়াহ কেন্দ্রস্থল
(১) কুওয়তে তাবায়ী কাবেদ বা জিগর
(২) কুওয়তে নফসানী দেমাগ বা মস্তিষ্ক
(৩) কুওয়তে হায়ওয়ানী কাল্ব বা হৃদপিণ্ড
 

প্রশ্ন – ৪১: সংবাদদাতা ও চরের ভূমিকা পালনকারী শক্তি কয়টি ও কি কি? প্রত্যেকটির তিব্বী ও বাংলা নাম লিখ।

উত্তর: সংবাদদাতা ও চরের ভূমিকা পালনকারী শক্তি পাঁচটি। যথা: ক. কুওয়তে বাছেরাহ বা দর্শনশক্তি খ. কুওয়তে সামেআহ বা শ্রবণশক্তি গ. কুওয়তে শাম্মাহ বা ঘ্রাণশক্তি ঘ. কুওয়তে যায়েকাহ বা আস্বাদনশক্তি ঙ. কুওয়তে লামেসাহ বা স্পর্শনশক্তি।

প্রশ্ন – ৪২: কোওয়ায়ে তানাসুলিয়্যা কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: যে স্বাভাবিক শক্তি মানব বংশ রক্ষার নিমিত্ত ব্যয়িত হয়, উহাকে কোওয়ায়ে তানাসুলিয়্যা তথা সন্তান উৎপাদন সম্পর্কিত শক্তি বলে। প্রকারভেদ: কোওয়ায়ে তানাসুলিয়্যা দুই প্রকার। যথা: (১) কুওয়তে মুওয়াল্লেদাহ তথা উৎপাদনকারী বা সৃষ্টিকারী শক্তি; (২) কুওয়তে মুছাওয়েরাহ বা আকৃতি গঠনকারী শক্তি।

প্রশ্ন – ৪৩: কোওয়াতে গাযিয়াহ বা দেহের পোষণকারী শক্তির সাহায্যকারী শক্তি কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: কোওয়াতে গাযিয়াহ বা দেহের পোষণকারী শক্তির সাহায্যকারী শক্তি চারটি। যথা: (ক) কুওয়তে জাযেবাহ বা শোষণকারী শক্তি অর্থাৎ ইহা উপকারী বস্তুকে শুষিয়া লয়। (খ) কুওয়তে মাসেকাহ বা ধারকশক্তি অর্থাৎ ইহা ভুক্ত খাদ্যদ্রব্যকে হযম বা পরিপাক না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট স্থানে ধরিয়া বা আটকাইয়া রাখে অর্থাৎ রক্ষা করে। (গ) কুওয়তে হাযেমাহ বা পরিপাকশক্তি অর্থাৎ ইহা ভুক্ত খাদ্যদ্রব্যকে হযম বা পরিপাক করে। (ঘ) কুওয়তে দাফেআহ বা নিক্ষেপকশক্তি অর্থাৎ ইহা ভুক্তদ্রব্যের পরিপাক হওয়ার পর উহার অবশিষ্ট অসার অংশকে নির্দিষ্ট স্থান হইতে বা দেহ হইতে বাহির করিয়া দেয়।

প্রশ্ন – ৪৪: কোওয়ায়ে নফসানী কত প্রকার ও কি কি? শ্রেণীবিন্যাস কর।

উত্তর: কোওয়ায়ে নফসানীর প্রকারভেদ নিম্নে ছক আকারে দেওয়া হলো: কোওয়ায়ে নফসানী বা মানসিক শক্তিসমূহ ১. মুহাররেকাহ বা ক্রিয়া শক্তি ক. শওকিয়্যা বা সাগ্রহ সৃষ্টিকারী খ. ফায়েলাহ বা কর্ম সম্পাদনকারী ২. মুদরেকাহ বা অনুভব শক্তি ক. কুওয়তে মুদরেকাহ বাতেনী বা অভ্যন্তরীণ অনুভব শক্তি: (১) হিস্সে মুশতারাক বা সাধারণ অনুভব শক্তি (২) খেয়াল বা ধারণা শক্তি (৩) ওয়াহম বা কল্পনা শক্তি (৪) হাফেযাহ বা স্মৃতি শক্তি (৫) মুতাছাররেফাহ বা বিশ্লেষণ শক্তি খ. কুওয়তে মুদরেকাহ জাহেরী বা বাহ্যিক অনুভব শক্তি: (১) কুওয়তে বাছেরাহ বা দর্শন শক্তি (২) কুওয়তে সামেআহ বা শ্রবণ শক্তি (৩) কুওয়তে শাম্মাহ বা ঘ্রাণ শক্তি (৪) কুওয়তে যায়েকাহ বা আস্বাদন শক্তি (৫) কুওয়তে লামেসাহ বা স্পর্শন শক্তি

প্রশ্ন – ৪৫: আফআল বা ক্রিয়াসমূহ কাহাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? উদাহরণসহ লিখ।

উত্তর: আফআল বা ক্রিয়াসমূহ:‘আফআল’ শব্দটি ‘ফে’ল’ শব্দের বহুবচন, যাহার অর্থ হইল ক্রিয়া, কাজ, কার্যক্রম, ভূমিকা বা সঞ্চালন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায়, দেহের বিভিন্ন কুওয়ত বা শক্তি দ্বারা যেসব ক্রিয়া সম্পাদিত হয়, সেগুলিকেই ‘আফআল’ বলে। প্রকারভেদ: আফআল দুই প্রকার। যথা: (১) আফআলে মুফরাদাহ তথা একক ক্রিয়াসমূহ; (২) আফআলে মুরাক্কাবাহ তথা যৌগিক ক্রিয়াসমূহ। আফআলে মুফরাদাহ-এর পরিচয়: যে ক্রিয়া একটি মাত্র শক্তি দ্বারা সম্পন্ন হয়, উহাকে ‘ফে’লে মুফরাদ’ বা একক ক্রিয়া বলে। উদাহরণ: গেযা বা ভুক্তদ্রব্যের শোষণ, ধারণ, হযম ও নিক্ষেপণ — এই ক্রিয়াসমূহের প্রত্যেকটি তৎসংশ্লিষ্ট একটি মাত্র শক্তি দ্বারাই সম্পন্ন হয়। আফআলে মুরাক্কাবাহ-এর পরিচয়: যে ক্রিয়া একাধিক শক্তি দ্বারা সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ যেই ক্রিয়া সম্পাদন করিতে দুই বা ততোধিক শক্তির প্রয়োজন হয়, উহাকে ‘ফে’লে মুরাক্কাব’ বা যৌগিক ক্রিয়া বলে। উদাহরণ:‘ইযদেরাদ’ তথা গলধঃকরণের ক্রিয়াটি সম্পন্ন হইতে দুইটি শক্তির প্রয়োজন হয়। প্রথমটি কোওয়াতে জাযেবাহ তাবীইয়্যা তথা স্বাভাবিক আকর্ষক শক্তি, দ্বিতীয়টি কোওয়াতে দাফেআহ এরাদিয়্যা তথা ইচ্ছাকৃত নিক্ষেপক শক্তি।

প্রশ্ন – ৪৬: কোওয়া এবং আফআলের মধ্যে সম্পর্ক বুঝিয়া লিখ।

উত্তর: কোওয়া এবং আফআলের মধ্যে সম্পর্ক: কোওয়া এবং আফআলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। নিচে তা বর্ণনা করা হলো: ‘কুওয়ত’ অর্থ শক্তি, ক্ষমতা ও বল-বীর্য এবং ‘আফআল’ অর্থ ক্রিয়া, কাজ, কার্যক্রম, ভূমিকা বা সঞ্চালন। অর্থাৎ কোওয়া বা শক্তিসমূহ এবং আফআল বা ক্রিয়াসমূহ উভয়ই একটি দ্বারা অন্যটির পরিচয় নির্দেশ করা হয়। কারণ, প্রত্যেকটি শক্তি একটি ক্রিয়ার উৎসমূল ও সূচনা-মাধ্যম স্বরূপ এবং প্রতিটি ক্রিয়া কোনো একটি কুওয়তের মাধ্যমেই সংঘটিত হইয়া থাকে। অতএব, বলা যায় যে, কোওয়া এবং আফআলের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান।

প্রশ্ন – ৪৭: গলধঃকরণের ক্রিয়া কয়টি শক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয় ও কি কি?

উত্তর: গলধঃকরণের ক্রিয়াসমূহ:‘ইযদেরাদ’ তথা গলধঃকরণের ক্রিয়াটি সম্পন্ন হইতে দুইটি শক্তির প্রয়োজন হয়। প্রথমটি ‘কুওয়তে জাযেবাহ তাবীইয়্যা’ তথা স্বাভাবিক আকর্ষক শক্তি, যাহা মে’দা তথা পাকস্থলী ও মারী তথা অন্ননালীতে বিদ্যমান থাকে এবং আপন স্বাভাবিক আকর্ষণ শক্তি দ্বারা খাদ্যের লোকমাকে টানিয়া লয়। দ্বিতীয়টি ‘কুওয়তে দাফেআহ এরাদিয়্যা’ তথা ইচ্ছাকৃত নিক্ষেপক শক্তি, যাহা কণ্ঠনালির মাংসপেশীতে বিদ্যমান থাকে এবং মানুষ নিজের ইচ্ছাক্রমে খাদ্যের লোকমাকে পাকস্থলীর দিকে ঠেলিয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই শক্তিকে কাজে লাগায়। ফলে এই দুইটি শক্তির মধ্যে যে কোনো একটি দুর্বল হইয়া গেলে গলধঃকরণ করা দুষ্কর হইয়া পড়ে।

প্রশ্ন – ৪৮: ক্ষুধা অনুভব ও আহার গ্রহণের ক্রিয়া কয়টি শক্তি দ্বারা সম্পন্ন হয়?

উত্তর: ক্ষুধা অনুভব ও আহার গ্রহণের ক্রিয়াসমূহ: ক্ষুধা অনুভব ও আহার গ্রহণের ক্রিয়াটি দুইটি শক্তি দ্বারা সম্পন্ন হয়। প্রথমটি আকর্ষণ শক্তি। দ্বিতীয়টি ‘ফমে মে’দাহ’ বা পাকস্থলীর মুখের অনুভব শক্তি। ইহার প্রমাণ এই যে, দেহের যতই খাদ্যের প্রয়োজন হউক না কেন, পাকস্থলীর মুখের অনুভব শক্তি নষ্ট হইয়া গেলে ক্ষুধা বা খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছা জাগ্রত হয় না।

প্রশ্ন – ৪৯: ভুক্তদ্রব্যের একস্থান থেকে অন্যত্র সঞ্চালন ক্রিয়া কয়টি শক্তি দ্বারা সম্পন্ন হয়?

উত্তর: ভুক্তদ্রব্যের সঞ্চালন শক্তি: ভুক্তদ্রব্যের একস্থান হইতে অন্যত্র সঞ্চালন ক্রিয়াও দুইটি শক্তি দ্বারা সম্পন্ন হয়। প্রথমটি হইল, যেই অঙ্গ হইতে ভুক্তদ্রব্য পৃথক হইতেছে ঐ অঙ্গের নিক্ষেপক শক্তি। দ্বিতীয়টি হইল, যেই অঙ্গে যাইতেছে উহার আকর্ষণকারী বা শোষণকারী শক্তি।

প্রশ্ন – ৫০: মলমূত্র নিঃসরণের ক্রিয়া কয়টি শক্তি দ্বারা সম্পূর্ণ হয় ও শক্তিগুলো কি কি?

উত্তর: মলমূত্র নিঃসরণের ক্রিয়া: দেহের অসার পদার্থের মল-মূত্ররূপে নিঃসরণ ক্রিয়াটিও দুইটি শক্তি দ্বারাই সম্পন্ন হয়। প্রথমটি হইল নিক্ষেপক শক্তি এবং দ্বিতীয়টি হইল আকর্ষণ বা শোষণ শক্তি।

প্রশ্ন – ৫১: আহওয়ালে বদন বা শারীরিক অবস্থাসমূহ বলতে কি বুঝ?

উত্তর: আহওয়ালে বদন:‘আহওয়াল’ শব্দটি ‘হাল’ শব্দের বহুবচন। ‘হাল’ অর্থ অবস্থা আর ‘বদন’ অর্থ শরীর বা দেহ। ‘আহওয়াল’ আর ‘হালাত’ একই অর্থবোধক। ‘হালাত’ শব্দটি ‘হালত’-এর বহুবচন। ইহার অর্থও অবস্থা। অতএব, ‘আহওয়ালে বদন’ অথবা ‘হালাতে বদন’ উভয়ের অর্থ শারীরিক অবস্থাসমূহ।

প্রশ্ন – ৫২: হাকীম জালীনূস-এর মতে ‘আহওয়ালে বদন’ কয়টি ও কি কি?

উত্তর: আহওয়ালে বদনের সংখ্যা: হাকীম জালীনূস-এর মতে, আহওয়ালে বদন বা শারীরিক অবস্থাসমূহ তিনটি। যথা: (১) ‘ছেহাত’ অর্থাৎ সুস্থ অবস্থা বা স্বাস্থ্য; (২) ‘মরজ’ অর্থাৎ অসুস্থ অবস্থা বা রোগ; (৩) ‘লা-ছেহাত ও লা-মরজ’ অথবা ‘হালতে মুতাওয়াসসেতাহ’ অর্থাৎ না স্বাস্থ্য না রোগ বা মধ্যবর্তী অবস্থা।

প্রশ্ন – ৫৩: ‘ছেহাত’ ও ‘মরজ’-এর সংজ্ঞা লিখ।

উত্তর: ‘ছেহাত’: হাকীম জালীনূস-এর মতে, ‘ছেহাত’ অর্থাৎ সুস্থতা বা স্বাস্থ্য এমন শারীরিক অবস্থার নাম, যাহার বর্তমানে মানব-দেহ ‘মিযাজ’ বা ‘প্রকৃতি’ ও ‘তরকীব’ বা গঠন প্রণালীর দিক দিয়া এইরূপ দশায় থাকে যে, দেহের ‘আফআল’ তথা ক্রিয়াসমূহের সবগুলিই সম্পূর্ণরূপে সঠিক, স্বাভাবিক ও নিয়মিতভাবে সম্পন্ন হইতে থাকে। ‘মরজ’: শায়খুর রঈস বু-আলী ইবনে সীনা বলিয়াছেন, ‘মরজ’ হইল মানবদেহের এমন অস্বাভাবিক অবস্থা যাহা দ্বারা দেহের ক্রিয়ায় ‘বিয্যাত’ তথা স্বগতভাবে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি হয় এবং এই অসুবিধা পরোক্ষভাবে নহে, বরং প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন – ৫৪: স্বাস্থ্য হইতে রোগ পর্যন্ত দেহের অবস্থা কয় পর্যায়ের হয়ে থাকে ও কি কি? উল্লেখ কর।

উত্তর: স্বাস্থ্য হইতে রোগ পর্যন্ত দেহের অবস্থা ছয় পর্যায়ের হইয়া থাকে। যথা: (ক) দেহ সম্পূর্ণরূপে সুস্থ; (খ) দেহ সম্পূর্ণরূপে সুস্থ নহে; (গ) দেহ সম্পূর্ণরূপে রুগ্নও নহে, সম্পূর্ণরূপে সুস্থও নহে; (ঘ) দেহ রোগকে অনায়াসে গ্রহণ করিতে প্রস্তুত; (ঙ) দেহে সামান্যরূপে রোগ বিদ্যমান; (চ) দেহ সম্পূর্ণরূপে অসুস্থ বা রুগ্ন।

প্রশ্ন – ৫৫: মরজ বা রোগের প্রকার লিখ। একক রোগ কত প্রকার উল্লেখ কর।

উত্তর: প্রকারভেদ: মরজ বা রোগ ২ ধরনের। যথা: (১) মরজে মুফরাদ বা একক রোগ; (২) মরজে মুরাক্কাব বা যৌগিক রোগ। আমরাজে মুফরাদাহ বা একক রোগের প্রকার:‘আমরাজে মুফরাদাহ’ তথা একক রোগসমূহ তিন প্রকারের হইয়া থাকে। যথা: (১) সূয়ে মিযাজ বা মিযাজের দোষগত রোগ। যে রোগ একক অঙ্গসমূহে আক্রমণ করে তাকে সূয়ে মিযাজের রোগ বলে। (২) আমরাজে তরকীব অর্থাৎ গঠন-কাঠামোগত রোগসমূহ। যে রোগ যৌগিক অঙ্গসমূহে আক্রমণ করে তাকে আমরাজে তরকীব বলে। (৩) আমরাজে তাফাররুকে ইত্তেছাল অর্থাৎ সংযোগের বিচ্ছিন্নতাজনিত রোগ। যে রোগ একক ও যৌগিক উভয় ধরনের অঙ্গে আক্রমণ করে সেই সমস্ত রোগকে আমরাজে তাফাররুকে ইত্তেছাল বলে।

প্রশ্ন – ৫৬: আমরাজে তরকীব কত প্রকার ও কি কি? উল্লেখ কর।

উত্তর: আমরাজে তরকীব চার প্রকার। যথা: (১) আমরাজে খিল্কত বা অঙ্গের গঠনাকৃতিগত রোগসমূহ; (২) আমরাজে মেকদার বা অঙ্গের পরিমাপগত রোগসমূহ; (৩) আমরাজে আদদ বা অঙ্গের সংখ্যাগত রোগসমূহ এবং (৪) আমরাজে ওয়াযয় বা অঙ্গের বিন্যাসগত রোগসমূহ।

প্রশ্ন – ৫৭: আমরাজে খিল্কতের প্রকারসমূহ লিখ।

উত্তর: প্রকারভেদ: আমরাজে খিল্কত বা অঙ্গের গঠনাকৃতিগত রোগসমূহ চার প্রকার হয়ে থাকে। যথা: (ক) আমরাজে শাক্ল বা অঙ্গের আকৃতিগত রোগসমূহ; (খ) আমরাজে মাজারী বা অঙ্গের পথসমূহের ত্রুটিগত রোগসমূহ; (গ) আমরাজে তাযাভীফ তথা অঙ্গের গর্ত বা শূন্যস্থানসমূহের ত্রুটিগত রোগসমূহ; (ঘ) আমরাজে সুতূহ তথা অঙ্গের স্তরসমূহের ত্রুটিগত রোগসমূহ।

প্রশ্ন – ৫৮: মরজে আছলী ও মরজে শেরকী কাকে বলে? লিখ।

উত্তর: মরজে আছলী:‘মরজে আছলী’ তথা মৌলিক রোগ বলা হয় এমন রোগকে যাহা কোনো অঙ্গে মৌলিকভাবে সৃষ্টি হয়, অর্থাৎ ঐ রোগের উৎপত্তি অপর কোনো অঙ্গের রোগের দরুণ হয় নাই — এই মৌলিক রোগটি অপর কোনো রোগের সৃষ্টি করুক বা না করুক। তাকে মরজে আছলী বলে। মরজে শেরকী:‘মরজে শেরকী’ বলা হয় এমন রোগকে, যাহা অপর কোনো রোগের দরুণই কোনো অঙ্গে সৃষ্টি হয়। অন্য কথায় বলিতে গেলে, যেই রোগ অপর কোনো রোগের কারণে উদ্ভূত হয়, তাহাই ‘মরজে শেরকী’।

প্রশ্ন – ৫৯: মরজে আছলী ও মরজে শেরকী একত্রে অবস্থান করিলে কিভাবে চিকিৎসা দিতে হয়? বুঝাইয়া লিখ।

উত্তর: চিকিৎসা পদ্ধতি:‘মরজে আছলী’ ও ‘মরজে শেরকী’ একত্রে অবস্থান করিলে প্রথমে মূল রোগের চিকিৎসা করিতে হইবে। অবশ্য যদি মূল রোগ অপেক্ষা ‘মরজে শেরকী’ সবল ও সক্রিয় হয়, তাহলে প্রথমে ‘মরজে শেরকী’র চিকিৎসা দিতে হইবে। তার পাশাপাশি ‘মরজে আছলী’ বা মূল রোগেরও চিকিৎসা করিতে হইবে। উদাহরণ: জ্বর হইল ‘মরজে আছলী’। জ্বরের কারণে সৃষ্ট মাথাব্যথা হইল ‘মরজে শেরকী’। জ্বরের তুলনায় যদি মাথাব্যথা তীব্র হয়, তবে প্রথমে মাথাব্যথার চিকিৎসা করিতে হইবে এবং তার সাথে সাথে জ্বরের চিকিৎসাও করিতে হইবে।

প্রশ্ন – ৬০: ‘আওকাতে মরজ’ বা রোগের কাল পর্যায় কয়টি ও কি কি? তিব্বী নামসহ লিখ।

উত্তর: সংখ্যা:‘আওকাতে মরজ’ বা রোগের কাল পর্যায় চারটি। নিম্নে এগুলোর তিব্বী নামসমূহ দেওয়া হলো:
আওকাতে মরজ তিব্বী নাম
সূচনাকাল ওয়াক্তে এবতেদা
বৃদ্ধিকাল ওয়াক্তে তাযায়ুদ
চরমকাল ওয়াক্তে এন্তেহা
উপশমকাল ওয়াক্তে এহেতাত
 

প্রশ্ন – ৬১: মানবদেহের অবস্থার জন্য কারণসমূহ কয়টি ও কি কি? লিখ।

উত্তর: মানবদেহের তিনটি অবস্থা অর্থাৎ স্বাস্থ্য, রোগ, না স্বাস্থ্য না রোগ — এ তিনটি অবস্থার জন্য ‘আসবাব’ তথা কারণসমূহ তিনটি হইয়া থাকে। যথা: (১) সববে বাদী বা বাহ্যিক কারণ; (২) সববে ওয়াছেল বা সংযুক্ত কারণ এবং (৩) সববে সাবেক বা পূর্বতন কারণ। সববে বাদী: যে কোনো অবস্থার কারণ যদি শারীরিক না হয়, অর্থাৎ উক্ত কারণটি দেহের সহিত সম্পর্কহীন এবং খিল্ত অথবা মিযাজের বিকৃতি বা পরিবর্তনজনিত না হয়, তবে উহাই সববে বাদী। যেমন — সূর্যতাপ, বায়ুর শীতলতা, ক্রোধ ও ভয়-ভীতি ইত্যাদি। সববে ওয়াছেল: কারণটি যদি দৈহিক বা দেহের সহিত সম্পর্কিত হয় এবং মিযাজের পরিবর্তন বা খিল্তের বিকৃতিজনিত হয়, আর উহা অপর কোনো মাধ্যম ব্যতীতই কোনো একটি অবস্থার সৃষ্টি করে, তবে উহাকে সববে ওয়াছেল বা সংযুক্ত কারণ বলে। যেমন — আখলাত বা শারীরিক রসের পচনের দরুণ জ্বরের উদ্ভব হয়। সববে সাবেক: কারণটি যদি দেহের সহিত সম্পর্কিত হয় কিন্তু উহা সরাসরিভাবে নহে বরং অপর কোনো মাধ্যমে যে কোনো একটি অবস্থার সৃষ্টি করে, তবে উহাকে সববে সাবেক বা পূর্বতন কারণ বলে। যেমন — ‘এমতেলা’ অর্থাৎ দেহের কোনো অঙ্গ দূষিত পদার্থ দ্বারা পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট পচনের দরুণ জ্বর হওয়া। দূষিত পদার্থের পচন হইল সববে সাবেক। পচনের দরুণ জ্বর হইল সববে ওয়াছেল।

প্রশ্ন – ৬২: মানবদেহের অবস্থার পরিবর্তন সাধনকারী অথবা স্থিতিশীলতা সম্পাদনকারী কারণসমূহ কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: মানবদেহের অবস্থায় পরিবর্তন সাধনকারী অথবা স্থিতিশীলতা সম্পাদনকারী ‘আসবাব’ বা কারণসমূহ মূলতঃ দুই প্রকার। যথা: (১) আসবাবে জরূরী বা অপরিহার্য কারণসমূহ। (২) আসবাবে গায়রে জরূরী বা অনাবশ্যকীয় কারণসমূহ। আসবাবে জরূরী: মানুষ সারা জীবনের মধ্যে কখনও যে সব কারণ হইতে রেহাই পায় না, বরং যেগুলি জীবন রক্ষার জন্য একেবারে অপরিহার্য, সেইগুলিকে আসবাবে জরূরী বলে। আসবাবে গায়রে জরূরী: এগুলি ‘আসবাবে জরূরী’র সম্পূর্ণ বিপরীত। এইগুলো জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য নয়। এগুলো আবার দুই ধরনের। যথা: (ক) যাহা স্বভাবের বিপরীতধর্মী ও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিকর। যেমন — বিষ ইত্যাদি। (খ) যাহা স্বভাবের বিপরীতধর্মী নয় বা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিকর নয়। যেমন — ঔষধ ইত্যাদি।

প্রশ্ন – ৬৩: ‘আসবাবে জরূরী’ বলিতে কি বুঝ?

উত্তর: আসবাবে জরূরী: জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেসব কারণ বা উপকরণ ব্যতীত মানুষের গত্যন্তর নাই এবং যেগুলি ব্যতীত প্রাণধারণই সম্ভব নয়, সেইসব কারণগুলিকে ‘আসবাবে জরূরী’ তথা অপরিহার্য কারণসমূহ বলে। আরবীতে ‘আসবাবে সিত্তাহ জরূরিয়্যা’ বলা হয়।

প্রশ্ন – ৬৪: যে সমস্ত কারণ বা উপকরণ ব্যতীত জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের গত্যন্তর নাই, সে সমস্ত কারণসমূহ কয়টি ও কি কি?

উত্তর: কারণসমূহের সংখ্যা: যে সমস্ত কারণ বা উপকরণ ব্যতীত জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের গত্যন্তর নাই, সে সমস্ত কারণসমূহ ছয়টি। যথা: (১) ‘হাওয়ায়ে মুহীত’ তথা আমাদের চতুষ্পার্শ্বস্থ বায়ু; (২) ‘মাকূল’ ও ‘মশরূব’ তথা খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যাদি; (৩) ‘বদনী হরকত ও সুকুন’ তথা দৈহিক সঞ্চালন ও স্থিতি; (৪) ‘নফসানী হরকত ও সুকুন’ তথা মানসিক সক্রিয়তা ও বিশ্রাম; (৫) ‘নওম ও য়াক্যাহ’ তথা নিদ্রা ও জাগরণ; (৬) ‘এস্তেফরাগ ও এহতেবাস’ তথা নিঃসরণ ও অবরোধ অর্থাৎ প্রস্রাব-পায়খানা প্রভৃতির সাহায্যে দেহের অসার পদার্থের নিঃসরণ ও দেহাভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় পদার্থের অবরোধ।

প্রশ্ন – ৬৫: উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ লিখ।

উত্তর: উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ নিম্নরূপ: মুসাখখেনাত বা উষ্ণতা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ নিম্নরূপ: (১) মধ্যম পর্যায়ের ‘হরকত’ তথা চলাফেরা ও দেহ সঞ্চালন অথবা ব্যায়াম; (২) উষ্ণ প্রকৃতির খাদ্য অনধিক পরিমাণে গ্রহণ; (৩) উষ্ণ প্রকৃতির ঔষধসমূহের অনধিক পরিমাণে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রয়োগ; (৪) মো’তাদেল তথা পরিমিত খাদ্য; (৫) ‘উফুনাত’ অর্থাৎ দেহে মওয়াদের পচন; এবং (৬) ‘তাকাছুফ’ অর্থাৎ দেহের লোমকূপসমূহ রুদ্ধ হইয়া যাওয়া। মুবারেদাত বা শীতলতা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ নিম্নরূপ: (১) উষ্ণতা সৃষ্টিকারী বস্তুসমূহের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার; (২) দৈহিক রসের অথবা খাদ্যের অপরিপক্কতা; এবং (৩) শীতল প্রকৃতির খাদ্যের অথবা ঔষধের অভ্যন্তরীণ কিংবা বাহ্যিক ব্যবহার। মুরাত্তেবাত বা আর্দ্রতা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ নিম্নরূপ: ১. আর্দ্র প্রকৃতির জিনিসের খাদ্য বা ঔষধরূপে অভ্যন্তরীণ অথবা বাহ্যিক প্রয়োগ। ২. আর্দ্র প্রকৃতির গোসল। ৩. আরাম ও আলস্য। ৪. অধিক ভোজন। ৫. শক্তি ক্ষয়কারী কারণসমূহ। ৬. দেহ হইতে শুষ্কতা সৃষ্টিকারী খিল্ত বা রসের নির্গমন। মুজাফফাত বা শুষ্কতা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ নিম্নরূপ: ১. প্রচুর পরিমাণে দৈহিক রস ক্ষয়কারী জিনিসের অভ্যন্তরীণ অথবা বাহ্যিক প্রয়োগ। ২. কোনো অঙ্গের খোরাক আটকাইয়া রাখা। ৩. শুষ্কতা সৃষ্টিকারী জিনিসের অভ্যন্তরীণ অথবা বাহ্যিক ব্যবহার।

প্রশ্ন – ৬৬: দাম বা রক্ত, বলগম বা শ্লেষ্মা, ছফরা বা পিত্ত ও সওদা বা অম্ল প্রাধান্যের লক্ষণাদি উল্লেখ কর।

উত্তর: রক্ত প্রাধান্যের লক্ষণাদি: রক্ত প্রভাবিত মিযাজের লক্ষণাদি নিম্নরূপ হইবে: (১) শরীরে অধিক ভারবোধ; (২) দেহের রক্তিম বর্ণ; (৩) দেহের খিচুনীভাব; এবং (৪) দেহ ফুলিয়া উঠা। বলগম বা শ্লেষ্মা প্রাধান্যের লক্ষণাদি: (১)–(৩) নং লক্ষণ মূল স্ক্যানে অনুপস্থিত (৪) শরীরে অধিক ভারবোধ হয়। ছফরা বা পিত্ত প্রাধান্যের লক্ষণাদি: (১) সূচের মত খোঁচা; (২) কোনো মোটা বস্তুর মত খোঁচা এবং (৩) দেহে সামান্য ভারবোধ। সওদা বা অম্ল প্রাধান্যের লক্ষণাদি: অম্লরস প্রভাবিত মিযাজের লক্ষণাদি নিম্নরূপ: (১) দেহে শুষ্কতা ও রুক্ষতা সুস্পষ্ট থাকে। (২) নিদ্রা কম হয়। এবং (৩) শরীর ভার ভার লাগে, তবে অধিক নহে।

প্রশ্ন – ৬৭: নব্য বা নাড়ীর সংজ্ঞা দাও। অথবা নব্য বা নাড়ীর পরিচয় লিখ।

উত্তর: নব্য বা নাড়ীর সংজ্ঞা: নব্য হইল ধমনীসমূহের সেই বিশেষ হরকত বা স্পন্দনের নাম, যাহাতে ধমনীসমূহের ‘ওয়ায্’ বা বিন্যাস পরিবর্তিত হইতে থাকে, অর্থাৎ ধমনীসমূহ সম্প্রসারিত ও সঙ্কুচিত হইতে থাকে।

প্রশ্ন – ৬৮: নাড়ীর স্পন্দনের উদ্দেশ্য বা কাজ কি?

উত্তর: নাড়ীর স্পন্দনের উদ্দেশ্য বা কাজ: শীতল বায়ুর মাধ্যমে রূহ-এর শীতলতা সাধন; এবং রূহ-এর অসার উষ্ণ বাষ্প নিষ্ক্রান্তকরণ অর্থাৎ রূহকে পরিমিত পর্যায়ে আনয়ন করা।

প্রশ্ন – ৬৯: নাড়ীর বৈশিষ্ট্যসমূহ কয়টি ও কি কি?

উত্তর: নাড়ীর বৈশিষ্ট্যসমূহ: যেই সমস্ত বিষয়ের মাধ্যমে নাড়ীর অবস্থা তথা শরীরের অবস্থা অবগত হওয়া যায়, তাহার সংখ্যা মোট দশটি। যথা: (১) মেকদার বা পরিমাণ; (২) কৈফিয়াতে করয় বা নাড়ির ঠোক্করের অবস্থা; (৩) যমানায়ে হরকত বা স্পন্দনের সময়কাল; (৪) কেওয়ামে আলাহ বা নাড়ীর যন্ত্র তথা ধমনী গাত্রের ঘনত্বের অবস্থা; (৫) যমানায়ে সুকুন বা বিরামের সময়কাল; (৬) মলমসে আলাহ বা ধমনী-গাত্রের স্পর্শজনিত অবস্থা; (৭) রূতূবতে নব্য বা নাড়ীর মধ্যস্থ রস অর্থাৎ ধমনীর অভ্যন্তরভাগ রসপূর্ণ, না শূন্য; (৮) এন্তেওয়া ও এখতেলাফ বা নাড়ীর অবস্থায় সামঞ্জস্য ও বিভিন্নতা; (৯) নেযাম ও আদমে নেযাম বা নাড়ীর বিভিন্নতার অবস্থায় শৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলাহীনতা; (১০) ওয়াযন বা তুলনামূলক বিচার তথা ভারসাম্য।

প্রশ্ন – ৭০: মেকদার বা পরিমাণের দিক থেকে নব্য কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: মেকদার বা পরিমাণের দিক থেকে নব্য নয় প্রকার। যথা: (ক) নব্যে তাভীল বা দীর্ঘ নাড়ী; (খ) নব্যে ক্বাছীর বা হ্রস্ব নাড়ী; (গ) মো’তাদেল অর্থাৎ দৈর্ঘ্য ও হ্রস্বতার মধ্যবর্তী পরিমিত নাড়ী; (ঘ) নব্যে আরীয বা প্রশস্ত নাড়ী; (ঙ) নব্যে দাইয়েক বা সংকীর্ণ নাড়ী; (চ) মো’তাদেল অর্থাৎ প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার মধ্যবর্তী পরিমিত নাড়ী; (ছ) নব্যে মুশরেফ বা উচ্চ নাড়ী; (জ) নব্যে মুনখাফে বা গভীর নাড়ী; (ঝ) মো’তাদেল অর্থাৎ উচ্চতা ও গভীরতার মধ্যবর্তী পরিমিত নাড়ী।

প্রশ্ন – ৭১: বওল বা মূত্র কি?

উত্তর: বওল বা মূত্র: মূত্র হইল সেই তরল অসার পদার্থ, যাহা উভয় গুর্দা বা বৃক্ক হইতে চুয়াইয়া মূত্র প্রবাহী শিরাদ্বয়ের মাধ্যমে মূত্রাধারে সমবেত হয় এবং সেখান হইতে মূত্রনালীর পথে নিঃসৃত হইয়া যায়।

প্রশ্ন – ৭২: কারূরাহ বলিতে কি বুঝ?

উত্তর: যে পাত্রে বা শিশিতে মূত্র রাখিয়া মূত্র পরীক্ষা করা হয়, হাকীমী পরিভাষায় উহাকে ‘কারূরাহ’ বলে। এজন্য হাকীমগণ পরীক্ষার জন্য আনীত মূত্রকেও ‘কারূরাহ’ বলিয়াই অভিহিত করিয়া থাকেন।

প্রশ্ন – ৭৩: মূত্রের পরীক্ষণীয় বিষয়সমূহ কয়টি ও কি কি?

উত্তর: মূত্রের পরীক্ষণীয় বিষয়সমূহ: মূত্রের পরীক্ষণীয় বিষয়সমূহের সংখ্যা ৭টি। যথা: (১) ‘লওন’ বা বর্ণ; (২) ‘কেওয়াম’ বা ঘনত্ব; (৩) ‘ছাফা ও কদূরত’ বা স্বচ্ছতা ও অস্বচ্ছতা; (৪) ‘রায়েহা’ বা গন্ধ; (৫) ‘যবদ’ বা ফেনা; (৬) ‘রুসূব’ বা তলানি; এবং (৭) ‘মেকদার’ বা পরিমাণ।

প্রশ্ন – ৭৪: মূত্রের মৌলিক বর্ণ কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: মূত্রের মৌলিক বর্ণ পাঁচ প্রকার। যথা: (১) ‘আছফর’ বা হলুদ বর্ণ; (২) ‘আহমর’ বা লালবর্ণ; (৩) ‘আখযর’ বা সবুজবর্ণ; (৪) ‘আসওয়াদ’ বা কৃষ্ণবর্ণ; এবং (৫) ‘আবয়ায’ বা শ্বেত বর্ণ।

প্রশ্ন – ৭৫: হলুদ বর্ণের মূত্র কয় পর্যায়ে বিভক্ত ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: হলুদ বর্ণের মূত্র নিম্নোক্ত ছয় পর্যায়ে বিভক্ত। যথা: (ক) ‘তিবনী’ বা ভুসি জাতীয় বর্ণ; (খ) ‘উৎরুজী’ বা গোঁড়া নেবুর ছালের মত বর্ণ; (গ) ‘আশকর’ বা লালমিশ্রিত হলুদবর্ণ; (ঘ) ‘নারঞ্জী’ বা কমলালেবুর মত বর্ণ; (ঙ) ‘নারী’ বা অগ্নি বর্ণ; (চ) ‘আহমর নাছেয়’ বা হলুদ মিশ্রিত উজ্জ্বল লালবর্ণ অথবা যাফরানী বর্ণ।

প্রশ্ন – ৭৬: লাল বর্ণের মূত্র কয় পর্যায়ের হইয়া থাকে ও কি কি?

উত্তর: পর্যায় সংখ্যা: লাল বর্ণের মূত্র নিম্নোক্ত চার পর্যায়ের হইয়া থাকে। যথা: (ক) ‘আছহাব’ বা শ্বেতমিশ্রিত লালবর্ণ, অর্থাৎ পেঁয়াজী বর্ণ। (খ) ‘ওয়ার্দী’ বা গোলাপী বর্ণ। (গ) ‘আহমর কানী’ বা গাঢ় লাল বর্ণ। (ঘ) ‘আহমর আকতম’ বা কৃষ্ণবর্ণ সদৃশ অত্যাধিক গাঢ় লাল বর্ণ।

প্রশ্ন – ৭৮: পক্ষাঘাত ও শোথ উভয়টি শীতল প্রকৃতির রোগ হওয়া সত্ত্বেও লালবর্ণের প্রস্রাব হওয়ার কারণ কি?

উত্তর: অবশ্য কোনো কোনো সময় শীতলতার বর্তমানেও প্রস্রাব লাল হয়। যেমন — ‘ফালেজ’ বা পক্ষাঘাত (Paralysis) রোগে এবং ‘সূউল-কিনইয়া’ বা খাদ্যভাণ্ডারের বৈকল্য রোগে প্রস্রাব লাল হইয়া থাকে। এই ধরনের রোগে প্রস্রাব লালবর্ণ হয় এজন্য যে, পানি হইতে রক্ত অল্প পরিমাণে পৃথক হয়। অপরদিকে বৃক্ক ও মূত্রাধার প্রভৃতি মূত্রযন্ত্রাদির পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানে ব্যথা-বেদনা হইলেও প্রস্রাব লালবর্ণ হইয়া যায়। যেমন — ‘কূলঞ্জ’ বা অন্ত্রশূল বেদনা (Colic) রোগে প্রস্রাব লালবর্ণ হইয়া থাকে।

প্রশ্ন – ৭৯: স্বাভাবিক মূত্রের বর্ণ কেমন?

উত্তর: স্বাভাবিক মূত্রের বর্ণ: স্বাভাবিক মূত্রের বর্ণ হলো ‘উৎরুজী’ বা গোঁড়া নেবুর ছালের মত বর্ণ। গোঁড়া নেবু অথবা কাগজী লেবু পক্ক হইলে উহার ছাল যেরূপ হয়, সেইরূপ বর্ণের মূত্রই ‘বওলে উৎরুজী’। ঘাস ভিজানো পানি অপেক্ষা এই বর্ণ কিঞ্চিতধিক গাঢ় হলুদ এবং মধ্যম প্রকৃতির উষ্ণতা ও সুস্থতার লক্ষণ।

প্রশ্ন – ৮০: প্রস্রাবের খারাপ ধরনের রুসূব বা তলানী কত প্রকার ও কি কি?

উত্তর: প্রকারভেদ: প্রস্রাবের খারাপ ধরনের রুসূব সাত প্রকার। যথা: (১) ‘আঙ্কর’ বা কিছুটা লালিমাযুক্ত হলুদবর্ণের রুসূব; (২) ‘কামেদ’ বা নীলবর্ণের রুসূব; (৩) ‘আসওয়াদ’ বা কৃষ্ণবর্ণের রুসূব; (৪) ‘নুখালী’ বা ভুসি-সদৃশ রুসূব; (৫) ‘কিশরী’ বা ছিলকা-সদৃশ রুসূব; (৬) ‘খররাতী’ বা বাঁদা-করা কাঠের টুকরা-সদৃশ রুসূব; এবং (৭) ‘ছফায়েহী’ বা চওড়া কাগজখণ্ড-সদৃশ রুসূব।

প্রশ্ন – ৮১: বরাজ বা মল কি?

উত্তর: বরায বা মল হইল ভুক্ত খাদ্যদ্রব্যের সেই গাঢ় অসার পদার্থ, যাহা পাকস্থলী ও অন্ত্রনালীসমূহে পরিপাকের পর সরলান্ত্র হইয়া মলনালি পথে নির্গত হয়।

প্রশ্ন – ৮২: মল তরল হওয়ার কারণগুলি লিখ।

উত্তর: মল তরল হওয়ার কারণ: মল তরল হওয়ার কারণসমূহ নিম্নরূপ: (ক) পরিপাক শক্তির দুর্বলতার দরুণ মল তরল হইয়া থাকে। (খ) পাকস্থলী ও যকৃতের মধ্যে সংযোগ সাধনকারী ‘মাসারীকা’ নামক সূক্ষ্ম শিরাসমূহে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হইলেও মল তরল হইয়া যায়। (গ) পাকস্থলী ও যকৃতের মধ্যবর্তী পূর্বোক্ত সূক্ষ্ম শিরাসমূহের শোষণকারী শক্তি দুর্বল হইলেও মল তরল হয়। (ঘ) ‘নযলাহ’ বা সর্দির কারণেও মল তরল হইয়া যায়। (ঙ) এমন কোনো খাদ্যের কারণেও মল তরল হইয়া পড়ে, যাহা ভুক্তদ্রব্যকে পিচ্ছিল করিয়া দ্রুত নিষ্কাশনোপযোগী করিয়া দেয়।

প্রশ্ন – ৮৩: মল শুষ্ক হওয়ার কারণগুলি লিখ।

উত্তর: মল নিম্নোক্ত কারণে শুষ্ক হয়। যথা: (ক) পরিশ্রম ইত্যাদির দরুণ দৈহিক রসসমূহ ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া যায় বলিয়া মল শুষ্ক হইতে পারে। (খ) উষ্ণতার আধিক্যের দরুণও মল শুষ্ক হইয়া থাকে; বিশেষতঃ যদি বৃক্কদ্বয় ও যকৃতে অধিক উষ্ণতার সৃষ্টি হয়। (গ) শুষ্ক প্রকৃতির খাদ্য গ্রহণের ফলেও মল শুষ্ক হয়। (ঘ) অতিরিক্ত প্রস্রাব হইলেও মল শুষ্ক হয়।

প্রশ্ন – ৮৪: সর্বোৎকৃষ্ট ও সঠিক পরিমিত ধরনের মলের লক্ষণসমূহ লিখ।

উত্তর: লক্ষণসমূহ: সর্বোৎকৃষ্ট ও সঠিক পরিমিত ধরনের মলের লক্ষণসমূহ নিম্নরূপ: (ক) মল অনায়াসে ও সহজে নির্গত হইবে; (খ) উহার সকল অংশই একরূপ হইবে (অর্থাৎ কোনো অংশ তরল আর কোনো অংশ গাঢ় এইরূপ হইবে না); (গ) উহা হাল্কা অগ্নিবর্ণ (হলুদ বর্ণ) হইবে; (ঘ) উহার ‘কেওয়াম’ বা ঘনত্ব হইবে পরিমিত ধরনের — বেশি শক্ত বা কঠিনও হইবে না, অধিক তরলও হইবে না; (ঙ) উহার পরিমাণ হইবে যথোপযুক্ত মাত্রার — খুব বেশিও নহে, আবার একেবারে অল্পও নহে; (চ) উহা যথাযথ ও পরিমিত সময়ে নির্গত হইবে (অর্থাৎ ভুক্ত খাদ্যদ্রব্যের পরিপাক হওয়ার পর যথোপযুক্ত সময়ে নির্গত হইবে — খাদ্য গ্রহণের পর সঙ্গে সঙ্গেই নির্গত হইবে না, আবার দীর্ঘ সময় পরেও না); (ছ) উহার গন্ধ হইবে পরিমিত পর্যায়ের — উহাতে অত্যধিক দুর্গন্ধ থাকিবে না, আবার একেবারে গন্ধহীনও হইবে না; (জ) উহা নির্গত হওয়ার সময় পেটের ভিতরে (বায়ু সঞ্চয়জনিত) কোনোরূপ ‘করাকের’ বা গড়গড় শব্দ এবং বাহিরের দিকে ‘বকাবেক’ বা চটচটে শব্দ হইবে না; এবং (ঝ) উহাতে ফেনাও থাকিবে না।

প্রশ্ন – ৮৫: ঋতু সম্পর্কিত মূলনীতি অনুযায়ী ২টি ঋতুর মূলনীতি আলোচনা কর।

উত্তর: ঋতু সম্পর্কিত মূলনীতি অনুযায়ী গ্রীষ্ম ও হেমন্ত ঋতুর মূলনীতি নিম্নে আলোচনা করা হলো। গ্রীষ্ম ঋতুর মূলনীতি: গ্রীষ্ম ঋতুতে আরাম ও বিশ্রাম গ্রহণ করা এবং ছায়ায় থাকা উচিত। ডালিম সংযুক্ত খাদ্য এবং এই ধরনের অন্যান্য পিত্ত প্রশমক ও উষ্ণতা নিবারক (অর্থাৎ শীতল প্রকৃতির) জিনিস খাওয়া উচিত। উষ্ণতা ও শুষ্কতা সৃষ্টিকারী সকল জিনিসই পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। গ্রীষ্মকালে খাদ্যের পরিমাণ কমাইয়া দিয়া আলুবোখারা, শসা, তরমুজ প্রভৃতি রসাল ফলমূলই অধিক পরিমাণে খাওয়া সঙ্গত। এই ঋতুতে কাতানের পুরাতন কাপড় পরিধান করা উচিত। হেমন্ত ঋতুর মূলনীতি: হেমন্ত ঋতুতে এমন প্রতিটি জিনিস পরিহার করিয়া চলা উচিত যাহা শরীরে শুষ্কতার সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত যৌনসঙ্গম আর ঠান্ডা পানিতে গোসল করা হইতেও বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। এ সময় ঠান্ডা পানি পান করাও উচিত নহে। হেমন্তকালে মাথা খোলা রাখা এবং রসাল ফলমূল খাওয়াও সঙ্গত নহে। এ সময় বমন করিলে জ্বর হয়। এই ঋতুতে ভোরের শীতলতা আর দ্বিপ্রহরের তাপও বর্জনীয়।

প্রশ্ন – ৮৬: চিকিৎসা পদ্ধতি কয় প্রকার ও কি কি? নিজের ভাষায় আলোচনা কর।

উত্তর: প্রকারভেদ: চিকিৎসা পদ্ধতি তিন প্রকার। যথা: (১) ‘এলাজ বিত্ তদবীর’ তথা পথ্য ও ব্যায়াম ইত্যাদি ক্ষেত্রে কৌশল বা উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে চিকিৎসা; (২) ‘এলাজ বিদ্-দাওয়া’ তথা ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা; (৩) ‘এলাজ বিল্-য়াদ’ বা ‘আমলে য়াদ’ তথা শল্য চিকিৎসা বা হস্তপ্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা। নিচে পদ্ধতি বা প্রকারগুলির আলোচনা করা হলো: এলাজ বিত্-তদবীর: তদবীর বলিতে বিনষ্ট স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের মানসে ছয়টি অপরিহার্য কারণের মধ্যে রদবদল বা সামঞ্জস্য বিধান করাকেই বুঝায়। ছয়টি অপরিহার্য কারণের মধ্যে হেরফের করা এবং ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা করা মিযাজগত অবস্থার দিক দিয়া প্রায় একই ধরনের হইয়া থাকে। অর্থাৎ ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা করিতে গিয়া যেমন বিপরীত স্বভাবের ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, একইভাবে ছয়টি অপরিহার্য কারণের মধ্যে হেরফের করার ক্ষেত্রেও সেই একই নীতি অবলম্বন করা হইয়া থাকে। এলাজ বিদ্-দাওয়া: ইউনানী চিকিৎসা-বিজ্ঞান মতে চিকিৎসার অন্যতম প্রধান নীতি হইল শীতলতা, উষ্ণতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতার দিক দিয়া রোগী ও রোগের যে অবস্থা, উহার ঠিক বিপরীতধর্মী ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা করা। ইহারই নাম ‘এলাজ বিয্যিদ্দ’ বা বিপরীতধর্মী ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা। এলাজ বিল্-য়াদ: উত্তপ্ত লৌহ দ্বারা দহন, রক্তমোক্ষণ, বাটির মত যন্ত্রের সাহায্যে রক্ত বাহির করা ইত্যাদি বিষয়াদি হস্তপ্রয়োগ (সার্জারী) বা এলাজ বিল্-য়াদ-এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন – ৮৭: বমনের উপকারিতা ও বমন আধিক্যের ক্ষতি আলোচনা কর।

উত্তর: বমনের উপকারিতা: বমনের উপকারিতাসমূহ নিম্নে প্রদান করা হইল: (১) বমন পাকস্থলীকে পরিষ্কার ও সবল করে; (২) বমন দৃষ্টি শক্তিকে সতেজ করে; (৩) বমন মাথার ভার লাঘব করে; (৪) বৃক্ক ও মূত্রাধারের ক্ষত নিবারণে বমন সহায়তা করে; (৫) কুষ্ঠ, শোথ, পক্ষাঘাত ও অঙ্গকম্পনের ন্যায় পুরাতন ও দীর্ঘস্থায়ী রোগসমূহে সুফলদায়ক; (৬) বমন পাণ্ডু রোগেও উপকারী। বমনাধিক্যের ক্ষতি: বমনাধিক্যের ক্ষতি নিচে বর্ণনা করা হইল: (১) বমনাধিক্য পাকস্থলীর পক্ষে ক্ষতিকর। (২) অধিক বমন পাকস্থলীকে অসার পদার্থ গ্রহণের উপযোগী করিয়া দেয়। (৩) বমনাধিক্য দাঁতের পক্ষেও ক্ষতিকর এবং বিশেষতঃ টক বমন দন্তপাটির পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। (৪) দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণ শক্তির পক্ষেও বমন ক্ষতিকর। (৫) বমনে অনেক সময় হয়তো কোনো রগও ফাটিয়া যায়।

প্রশ্ন – ৮৮: রক্তমোক্ষণ পদ্ধতির উদ্দেশ্যগুলি আলোচনা কর।

উত্তর: রক্তমোক্ষণ পদ্ধতির উদ্দেশ্য: রক্তমোক্ষণ পদ্ধতি দ্বারা কার্যকরভাবে যেসব উদ্দেশ্য সাধিত হইতে পারে, সেগুলি হইতেছে: (ক) রক্তাধিক্যজনিত উপসর্গসমূহের প্রতিকার ও উচ্চ রক্তচাপ প্রশমন; (খ) রক্তে অসার পদার্থের সমাবেশ ও বিষাক্ততার প্রতিরোধ; (গ) দেহের বিভিন্ন অংশ হইতে অসার পদার্থের নিঃসারণ; (ঘ) দেহ মধ্যে সজীব উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার উদ্দীপন এবং (ঙ) মিযাজের উষ্ণতাজনিত পদার্থগত দোষের সংশোধন।
হেকিম সুলতান
লেখক সম্পর্কে

হেকিম সুলতান

BUMS, খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Scroll to Top