মানবসভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে অন্যতম একটি প্রভাবশালী ও বহুমুখী ভেষজ হলো গোক্ষুর (Gokshura)। উদ্ভিদবিদ্যায় এটি Tribulus terrestris নামে পরিচিত। বিশেষ করে পুরুষ ও নারী স্বাস্থ্য, বৃক্কের কর্মক্ষমতা এবং শরীরের পেশি গঠনে গোক্ষুর কাঁটার জনপ্রিয়তা অতুলনীয়। আজকের এই বিশদ নিবন্ধে আমরা গোক্ষুর কাটার রাসায়নিক গঠন থেকে শুরু করে খাওয়ার সঠিক নিয়ম এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গভীর আলোকপাত করব।
গোক্ষুর কাঁটা বা ট্রিবিউলাস টেরিস্ট্রিস আসলে কী?
গোক্ষুর একটি ক্ষুদ্রাকার লতানো ভেষজ উদ্ভিদ যা ক্যালট্রপ (Caltrop) পরিবারভুক্ত। এর ফলগুলোতে গরুর খুরের মতো আকার থাকায় এর সংস্কৃত নামকরণ করা হয়েছে— ‘গো’ (গরু) এবং ‘ক্ষুর’ (খুর)। বাংলায় এটি ‘গোক্ষুর’ বা ‘গোক্ষুরি’ নামে পরিচিত। এর পাতাগুলো অনেকটা পালকের মতো এবং ছোট ছোট সোনালী হলুদ রঙের ফুল ফোটে।
এই উদ্ভিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর কাঁটাযুক্ত ফল এবং এর মূল। গাছটির ছোট ফলগুলো এতটাই ধারালো যে এর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ‘Puncture Vine’, যা অনায়াসেই কোনো টায়ার ফুটো করতে সক্ষম। আধুনিক ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট হিসেবে এর কদর পশ্চিমা বিশ্বে বহুগুণ বেড়েছে এর বিশেষ টেস্টোস্টেরন বুস্টিং গুণের জন্য।
আয়ুর্বেদিক তত্ত্ব: রস, গুণ এবং বীর্য বিশ্লেষণ
প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী গোক্ষুরকে ‘ত্রিদোষ শমক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বিস্তারিত প্রোফাইল নিচে দেওয়া হলো:
-
রস (Taste): মধুর (মিষ্টি)।
-
গুণ (Quality): গুরু (ভারী) এবং স্নিগ্ধ (তৈলাক্ত)।
-
বীর্য (Potency): শীতলা (শীতল বা ঠান্ডা)।
-
বিপাক (Post-digestive effect): মধুর।
ত্রিদোষের ওপর প্রভাব:
১. বাত (Vata): এটি বাত দোষকে শান্ত করতে সাহায্য করে কারণ এটি একটি প্রাকৃতিক গ্রাউন্ডিং এজেন্ট।
২. পিত্ত (Pitta): এর শীতল গুণাবলি পিত্তজনিত যে কোনো সমস্যা বিশেষ করে রক্তাল্পতা বা প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমাতে অত্যন্ত কার্যকরী।
৩. কফ (Kapha): এর প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক (Diuretic) গুণের ফলে এটি শরীরে জমা থাকা বাড়তি তরল এবং আম (অজীর্ণ বর্জ্য) বের করে দিয়ে কফ দূর করে। তবে অত্যাধিক মাত্রায় সেবন কফকে উস্কে দিতে পারে কারণ এটি হজমে ভারী।
৩. গোক্ষুরের ফাইটো-কেমিক্যাল ও পুষ্টিমান (Semantic Depth)
গোক্ষুর কাটার ওপরে অনেক ল্যাবরেটরি রিসার্চ হয়েছে যেখানে বেশ কিছু জটিল ও শক্তিশালী যৌগের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই রাসায়নিক বিশ্লেষণই প্রমাণ করে যে এটি কেন শরীরের জন্য এত বেশি উপকারী।
-
স্টেরয়ডাল স্যাপোনিনস (Steroidal Saponins): এর মধ্যে বিশেষ করে প্রোডোডায়োসিন (Protodioscin) থাকে যা প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য দায়ী।
-
অ্যালকালয়েড (Alkaloids): এতে হারমান (Harman) এবং নরহারমান (Norharman) নামক উপাদান রয়েছে।
-
ফ্লেভোনয়েড (Flavonoids): এটি শরীরের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লেভেল বৃদ্ধি করে।
-
নাইট্রেট ও পটাশিয়াম সল্ট: উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম থাকার কারণে এটি একটি প্রাকৃতিক ও নিরাপদ মূত্রবর্ধক।
পুষ্টি উপাদান (প্রতি ১০০ গ্রামে আনুমানিক):
-
কার্বোহাইড্রেট: ১৫.৯ গ্রাম
-
প্রোটিন: ১.৩ গ্রাম
-
ক্যালরি: ৭৩.৪৮ কিলোক্যালরি
-
ভিটামিন সি: ১৪.২ মি.গ্রা.
গোক্ষুর কাটার ৮টি বিস্ময়কর স্বাস্থ্য উপকারিতা
১) বৃক্ক বা কিডনির সুস্থতায় ও পাথরী রোধে (Anti-lithiasis Property)
কিডনিতে পাথরী হওয়া আজকের দিনে একটি ভয়াবহ সমস্যা। গোক্ষুর চূর্ণ শরীরে ক্যালসিয়াম অক্সালেটের জমা হওয়া রোধ করে। এটি লবণের নিঃসরণ এবং প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়ায় যার ফলে ছোট আকৃতির পাথরী প্রাকৃতিক পথেই অপসারিত হয়। আয়ুর্বেদে একে ‘অশ্মরী’ দূর করার জন্য শ্রেষ্ঠ ওষুধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
২) পুরুষ প্রজনন স্বাস্থ্য ও লিবিডো বৃদ্ধি (Sexual Health)
বহু মানুষ গোক্ষুর সেবন করেন প্রাকৃতিক সেক্স ড্রাইভ বৃদ্ধির জন্য। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত ২ মাস নির্দিষ্ট মাত্রায় গোক্ষুর সেবনে লিবিডো এবং আকাঙ্ক্ষা প্রায় ৮০% বৃদ্ধি পায়। এটি প্রজনন কোষের জীবনীশক্তি এবং চলাচলের সক্ষমতা (Motility) বাড়ায়। যদিও এর সরাসরি টেস্টোস্টেরন বৃদ্ধির দাবি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মাঝে মতভেদ রয়েছে, কিন্তু কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির দিকটি প্রমাণিত।
৩) পেশি গঠন এবং ব্যায়ামের স্ট্যামিনা বৃদ্ধিতে (Performance Enhancer)
যারা বডিবিল্ডিং করেন বা ভারী ব্যায়াম করেন, তাদের জন্য গোক্ষুর একটি অলৌকিক ভেষজ হতে পারে। ব্যায়ামের সময় শরীরে যে টিস্যু ড্যামেজ হয়, তা পুনরুদ্ধারে এবং অবায়বীয় কসরত (Anaerobic exercise performance) দীর্ঘ করতে এটি দারুণ কাজ করে। অনেক প্রোটিন পাউডার বা অ্যানাবোলিক স্ট্যাকের মূল উপাদান থাকে এই গোক্ষুর বা ট্রিবিউলাস।
৪) নারীদের মেনোপজ ও পিসিওএস ব্যবস্থাপনা (Women’s Health)
পিসিওএস (PCOS) আক্রান্ত নারীদের হরমোন ব্যালেন্স ঠিক রাখতে গোক্ষুর কাজ করে। এটি গর্ভাশয়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় এবং প্রস্রাবের নালী সংশ্লিষ্ট যে কোনো সংক্রামক ব্যাধি (UTI) নিরসন করে। মেনোপজ পরবর্তী সময়ে হট ফ্ল্যাশ ও ঘুমের সমস্যা কমাতেও এটি ফলদায়ক।
৫) রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও ডায়াবেটিস (Blood Sugar Regulation)
গবেষণায় দেখা গেছে গোক্ষুর রক্তে ‘আলফা-গ্লুকোসাইডেজ’ এবং ‘আলফা-অ্যামিলেজ’ এনজাইমকে বাধা দেয়, যার ফলে রক্তে হঠাত করে চিনির মাত্রা বাড়ে না। দীর্ঘমেয়াদী টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হতে পারে।
৬) হৃদরোগ প্রতিরোধে ভূমিকা (Cardiac Functions)
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হার্টের ধমনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গোক্ষুরে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমূহ কার্ডিয়াক মাসল বা হার্টের পেশিকে মজবুত করে এবং শরীরের অপ্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড (NEFA) এর পরিমাণ কমিয়ে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি কমায়।
৭) ত্বকের উজ্জ্বলতা ও ব্রণের সমস্যা (Dermatology)
প্রদাহরোধী বা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণের জন্য গোক্ষুর ত্বকের ক্ষত ও অ্যালার্জি রোধ করে। চোখের নিচের কালি (Dark circles) এবং ব্রণের ব্যথা প্রশমিত করতে এর পেস্ট অত্যন্ত জনপ্রিয়।
৮) মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি
গোক্ষুর চূর্ণ স্নায়ু উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখে মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। বয়সের কারণে যারা অ্যালঝেইমার রোগে ভোগেন তাদের জন্যও এটি থেরাপি হিসেবে কাজ করে।
গোক্ষুর কাটা খাওয়ার সঠিক নিয়ম
ভেষজ চিকিৎসা বিজ্ঞানে ওষুধের গুণ নির্ভর করে আপনি সেটি কিভাবে ও কখন সেবন করছেন তার ওপর। গোক্ষুর সাধারণত কয়েকটি রূপে পাওয়া যায়:
১. গোক্ষুর চূর্ণ (Gokshura Powder):
এটি সবচেয়ে কার্যকরী ও সরাসরি মাধ্যম।
-
মাত্রা: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৩ গ্রাম থেকে ৫ গ্রাম চূর্ণ।
-
সেবনবিধি: সকালে নাস্তা বা রাতে ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে গরম দুধ বা পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়া সবচেয়ে উত্তম।
-
প্রাক-ভেষজ উপাদান: মধুর সাথে মিশিয়ে খেলে এটি ইমিউনিটি বৃদ্ধিতে এবং দ্রুত ফলাফল দিতে সাহায্য করে।
২. গোক্ষুর ক্বাথ বা ডেকোকশন (Gokshura Kwatha):
কিডনি স্টোনের সমস্যা থাকলে ক্বাথ তৈরি করে খাওয়া বেশি লাভজনক।
-
তৈরির নিয়ম: ৬-১২ গ্রাম শুকনো গোক্ষুর ফলের চূর্ণ বা আস্ত কাটা ২ গ্লাস পানিতে মিশিয়ে জ্বাল দিতে থাকুন। পানি কমে ১/৪ গ্লাস (অর্থাৎ এক কাপের অর্ধেক) হয়ে এলে সেটি ছেঁকে নিন।
-
সেবন: প্রতিদিন খালি পেটে হালকা কুসুম গরম অবস্থায় সকালে এটি সেবন করুন।
৩. ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট:
আধুনিক ব্যস্ত জীবনে এটি সবচেয়ে সুবিধাজনক। প্রতিদিন ৫০০০-৩০০০ মিলিগ্রাম মাত্রার দুটি ট্যাবলেট চিকিৎসকের পরামর্শে গ্রহণ করা যেতে পারে।
৪. ভেষজ সমন্বয় (Herb Synergy):
উন্নত ফলাফল পেতে অনেকেই অশ্বগন্ধার চূর্ণ এবং গোক্ষুর চূর্ণ সমপরিমাণে নিয়ে খান। এটি শারীরিক সক্ষমতা ও ক্লান্তি দূরীকরণে বিশ্বের অন্যতম সেরা ঘরোয়া উপায় হিসেবে স্বীকৃত।
বিশেষ সতর্কতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
প্রকৃতি প্রদত্ত ওষুধ হওয়া সত্ত্বেও এর নির্দিষ্ট কিছু সতর্কতা রয়েছে:
১. গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মাতা: ভ্রূণের ওপর এর প্রভাব এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি, তাই এই সময়ে এটি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
২. প্রস্টেট ক্যান্সার: যেহেতু এটি প্রস্টেটের ওজন সামান্য বাড়াতে পারে, তাই যাদের ইতিপূর্বে প্রস্টেটের কোনো ম্যালিগন্যান্সি (ক্যান্সার) আছে তাদের সাবধান থাকা উচিত।
৩. অস্ত্রোপচার: গোক্ষুর রক্তে গ্লুকোজ লেভেলের পরিবর্তন ঘটায়। তাই যে কোনো সার্জারি বা অস্ত্রোপচারের অন্তত ২ সপ্তাহ আগে থেকে এর ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।
৪. ঔষধের মিথস্ক্রিয়া: যদি আপনি উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের জন্য অ্যালোপ্যাথি ঔষধ খান, তবে গোক্ষুর সেবনের আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তারকে জানান, কারণ এটি ঐ ওষুধের প্রভাব বাড়িয়ে গ্লুকোজ বা প্রেসার খুব বেশি কমিয়ে দিতে পারে।
গোক্ষুর সম্পর্কে কিছু প্রচলিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: গোক্ষুর কি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়?
উত্তর: না। আসলে এর মূত্রবর্ধক গুণের জন্য এটি বাড়তি পানি শরীর থেকে বের করে দেয়, যা উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ক্ষেত্রে বরং সাহায্য করতে পারে।
প্রশ্ন ২: খালি পেটে কি গোক্ষুর খাওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, আয়ুর্বেদিক ঔষধ সাধারণত খালি পেটে বেশি শোষিত হয়। সকালে খালি পেটে মধুর সাথে গোক্ষুর চূর্ণ সেবন খুব জনপ্রিয় একটি প্রাচীন নিয়ম।
প্রশ্ন ৩: কতদিন পর্যন্ত গোক্ষুর খাওয়া নিরাপদ?
উত্তর: এটি সাধারণত দীর্ঘকাল ব্যবহার করা যায়, তবে টানা ৯০ দিন বা ৩ মাস ব্যবহারের পর এক মাসের জন্য বিরতি নেওয়া সবচেয়ে উত্তম এবং স্বাস্থ্যসম্মত নিয়ম।
উপসংহার
গোক্ষুর বা গোক্ষুর কাঁটা প্রকৃতি থেকে পাওয়া এক বিস্ময়কর দান। আপনার কিডনির সুরক্ষা থেকে শুরু করে পুরুষত্বের হীনম্মন্যতা দূর করতে—এই ভেষজের বহুমুখিতা সত্যি অভাবনীয়। তবে সব সময় মনে রাখবেন, সঠিক উৎস থেকে বিশুদ্ধ চূর্ণ সংগ্রহ করা এবং অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে মাত্রার বেশি সেবন না করাটাই প্রকৃত সুস্থতার চাবিকাঠি। নিজের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় প্রাচীন আয়ুর্বেদের এই উপাদানটি যুক্ত করার মাধ্যমে আপনি ফিরে পেতে পারেন এক উদ্দীপনাময় জীবন।
লেখক: হেকিম সুলতান মাহমুদ
খুলনা আয়ুর্বেদ মেডিকেল কলেজ
