নারী স্বাস্থ্য (Women’s Health) হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন একটি বিশেষায়িত শাখা, যা শুধুমাত্র নারীর প্রজননতন্ত্রের চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নারীর শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি সামগ্রিক রূপ। বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় দীর্ঘজীবী হলেও, তাদের অসুস্থতার হার এবং স্বাস্থ্যগত জটিলতা পুরুষদের তুলনায় ভিন্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে বেশি।
Table of Contents
Toggleবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, স্বাস্থ্য মানে কেবল রোগের অনুপস্থিতি নয়, বরং এটি হলো শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে ভালো থাকার একটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থা। এই নিবন্ধে আমরা নারীর জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের স্বাস্থ্যঝুঁকি, অ-প্রজননজনিত রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
নারী স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা ও ব্যাপ্তি
ঐতিহাসিকভাবে নারী স্বাস্থ্যকে শুধুমাত্র প্রজনন স্বাস্থ্য (Reproductive Health) বা সন্তান জন্মদানের সক্ষমতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হতো। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ‘পপুলেশন হেলথ’ (Population Health)-এর আওতায় নারী স্বাস্থ্যকে সংজ্ঞায়িত করছেন।
নারী স্বাস্থ্যের ব্যাপ্তি অনেক বিশাল। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
-
জৈবিক পার্থক্য (Biological Differences): ক্রোমোজোম (XX বনাম XY), হরমোনের ভিন্নতা এবং মেটাবলিজমের পার্থক্য।
-
সামাজিক নির্ধারক (Social Determinants): শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, লিঙ্গ বৈষম্য এবং পুষ্টির প্রাপ্যতা।
উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশে (যেমন বাংলাদেশ বা ভারত) নারীরা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি বাধার সম্মুখীন হন। নারীদের রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রায়ই “স্ট্যান্ডার্ড মেল পেশেন্ট” (Standard Male Patient) বা পুরুষদের শরীরের আদলে তৈরি চিকিৎসার মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, যা অনেক সময় নারীদের জন্য সঠিক ফলাফল দেয় না। তাই নারী স্বাস্থ্যকে “দ্য হেলথ অফ উইমেন” (The Health of Women) হিসেবে দেখা প্রয়োজন, যেখানে তাদের হৃদরোগ, অটোইমিউন রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো প্রজনন স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব পায়।
জীবনচক্র অনুযায়ী স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও করণীয়
নারীর জীবনের প্রতিটি ধাপে হরমোনের পরিবর্তন এবং সামাজিক অবস্থানের কারণে ভিন্ন ভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়। নিচে জীবনচক্রের চারটি প্রধান ধাপ নিয়ে আলোচনা করা হলো:
কৈশোর: ১০-১৯ বছর (Adolescence)
কৈশোর হলো নারীর স্বাস্থ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময়। এই সময়ে বয়ঃসন্ধিকাল (Puberty) শুরু হয় এবং শরীরে ব্যাপক হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে।
-
ঋতুস্রাব ও স্বাস্থ্যবিধি (Menstruation & Hygiene): দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড নিয়ে ব্যাপক কুসংস্কার বা পিরিয়ড স্টিগমা (Period Stigma) রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর স্যানিটারি ব্যবস্থা ব্যবহারের ফলে অনেক কিশোরী প্রজনন নালীর সংক্রমণে (RTI) ভোগে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রাপ্যতা এবং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এই বয়সের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
-
রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া (Anemia): ঋতুস্রাবের কারণে প্রতি মাসে শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে যায়। যদি খাদ্যে পর্যাপ্ত আয়রন না থাকে, তবে কিশোরীরা মারাত্মক আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতায় (Iron Deficiency Anemia) ভোগে। এটি তাদের মেধা বিকাশ এবং ভবিষ্যতের মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে।
-
পুষ্টিহীনতা (Malnutrition): অনেক পরিবারে এখনো ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কম পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি-এর অভাবে হাড়ের গঠন দুর্বল হয়ে যায়।
-
এইচপিভি টিকা (HPV Vaccine): জরায়ু-মুখ ক্যান্সার (Cervical Cancer) প্রতিরোধের জন্য ৯-১৪ বছর বয়সের মধ্যে কিশোরীদের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রজনন বয়স: ২০-৪৫ বছর (Reproductive Age)
এটি নারীর জীবনের সবচেয়ে কর্মচঞ্চল সময়, যেখানে ক্যারিয়ার, পরিবার এবং সন্তান জন্মদানের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে হয়।
-
গর্ভাবস্থা ও প্রসব (Pregnancy & Childbirth): নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা এই সময়ের প্রধান লক্ষ্য। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes) এবং উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি-এক্লাম্পসিয়া (Preeclampsia) মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।
-
পিসিওএস (PCOS): পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম বর্তমান সময়ে নারীদের হরমোনজনিত প্রধান সমস্যা। অনিয়মিত পিরিয়ড, অবাঞ্ছিত লোম এবং ওজন বৃদ্ধি এর লক্ষণ। এটি দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
-
এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis): এটি একটি যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা যেখানে জরায়ুর ভেতরের টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়। এটি তীব্র ব্যথা এবং বন্ধ্যাত্ব (Infertility)-এর অন্যতম প্রধান কারণ।
-
বন্ধ্যাত্ব ও মানসিক চাপ: সন্তান ধারণে অক্ষমতা অনেক নারীর জন্য তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন আইভিএফ (IVF) এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
মধ্যবয়স ও রজঃনিবৃত্তি: ৪৫-৬০ বছর (Mid-life & Menopause)
নারীর জীবনে এটি একটি বড় পরিবর্তনের সময়। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে মেনোপজ (Menopause) বা স্থায়ীভাবে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়।
-
ইস্ট্রোজেনের অভাব: মেনোপজের ফলে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদন কমে যায়। এর ফলে হট ফ্লাশ (Hot flashes), রাতে ঘাম হওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং যোনিপথের শুষ্কতা দেখা দেয়।
-
হরমোন থেরাপি (HRT): মেনোপজের লক্ষণগুলো প্রশমিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নেওয়া যেতে পারে, তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে।
-
ক্যান্সার স্ক্রিনিং: এই বয়সে স্তন ক্যান্সার এবং জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি (Mammography) এবং প্যাপ স্মিয়ার (Pap Smear) টেস্ট করা জীবন রক্ষাকারী হতে পারে।
বার্ধক্য: ৬০+ বছর (Elderly Women)
বার্ধক্যে নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশিদিন বাঁচলেও, তাদের জীবনযাত্রার মান বা কোয়ালিটি অফ লাইফ (Quality of Life) প্রায়ই নিম্নমানের হয়।
-
অস্টিওপরোসিস (Osteoporosis): মেনোপজের পর হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত কমতে থাকে, ফলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। সামান্য আঘাতেই হিপ ফ্র্যাকচার বা মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
-
হৃদরোগ (Cardiovascular Disease): মেনোপজের আগে হরমোন নারীদের হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু বার্ধক্যে নারীদের হৃদরোগে মৃত্যুর হার পুরুষদের সমান বা বেশি হয়ে যায়।
-
ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স (Dementia & Alzheimer’s): পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নারীরা আলঝেইমার্স রোগে বেশি আক্রান্ত হন। এর একটি কারণ হতে পারে তাদের দীর্ঘায়ু।
-
একাকীত্ব ও অবহেলা: বার্ধক্যে অনেক নারী বিধবা হন এবং অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়।
প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য
নারীর সামগ্রিক সুস্থতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তার প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য। এটি শুধুমাত্র সন্তান জন্মদানের সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং নিরাপদ যৌনজীবন এবং নিজের শরীরের ওপর নারীর অধিকারের বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত।
পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভনিরোধক (Family Planning & Contraceptives)
নিজের ইচ্ছানুযায়ী সন্তান নেওয়া বা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নারীর ক্ষমতায়নের চাবিকাঠি। সঠিক গর্ভনিরোধক (যেমন—পিল, কনডম, আইইউডি) ব্যবহার নারীদের অপরিকল্পিত গর্ভধারণ থেকে রক্ষা করে। অপরিকল্পিত গর্ভধারণ প্রায়ই অনিরাপদ গর্ভপাত (Unsafe Abortion)-এর দিকে ঠেলে দেয়, যা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ।
যৌনবাহিত রোগ (STIs/HIV)
নারীরা শারীরিক গঠনের কারণে যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। সিফিলিস, গনোরিয়া এবং এইচআইভি (HIV) শুধুমাত্র নারীর ক্ষতি করে না, বরং গর্ভাবস্থায় মা-থেকে-শিশুর সংক্রমণ (Mother-to-child transmission)-এর মাধ্যমে নবজাতকের জীবনও বিপন্ন করতে পারে।
অবস্টেট্রিক ফিস্টুলা (Obstetric Fistula)
এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি ভয়াবহ সমস্যা। দীর্ঘস্থায়ী এবং বাধাগ্রস্ত প্রসবের (Obstructed Labor) কারণে যোনিপথ এবং মূত্রথলি বা মলাশয়ের মাঝখানে ছিদ্র তৈরি হয়। এর ফলে নারীটি অনবরত প্রস্রাব বা পায়খানা ঝরার সমস্যায় ভোগেন। এটি প্রতিরোধযোগ্য হলেও, সঠিক সময়ে সিজারিয়ান সেকশন বা দক্ষ ধাত্রীর অভাবে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত হয়ে সমাজচ্যুত জীবনযাপন করছেন।
অ-প্রজননজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা
অধিকাংশ আলোচনায় নারী স্বাস্থ্যকে কেবল প্রজননতন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যা একটি বড় ভুল। বিশ্বজুড়ে নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো আসলে অ-প্রজননজনিত রোগ।
হৃদরোগ ও স্ট্রোক
নারীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের লক্ষণগুলো পুরুষদের মতো নাটকীয় হয় না। একে বলা হয় “সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক”। পুরুষদের মতো তীব্র বুকে ব্যথা না হয়ে নারীদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, চোয়ালে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা অত্যধিক ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকরা অনেক সময় এই লক্ষণগুলোকে এসিডিটি বা মানসিক চাপ বলে ভুল করেন, যা নারীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
ক্যান্সার
-
ফুসফুসের ক্যান্সার (Lung Cancer): অধূমপায়ী নারীদের মধ্যেও ফুসফুসের ক্যান্সার বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ নারীরা রান্নার জন্য বায়োমাস ফুয়েল (কাঠ, খড়) ব্যবহার করেন, যার ধোঁয়া ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে।
-
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার (Colorectal Cancer): এটি নারীদের ক্যান্সারে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ।
-
স্তন ক্যান্সার (Breast Cancer): বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্ণয়কৃত ক্যান্সার। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এটি নিরাময়যোগ্য।
অটোইমিউন রোগ
নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম পুরুষদের চেয়ে শক্তিশালী হলেও, এটি কখনও কখনও নিজের শরীরের বিরুদ্ধেই কাজ শুরু করে। লুপাস (Lupus), রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis) এবং থাইরয়েডের সমস্যা (যেমন—হাসিমোটোস থাইরয়েডাইটিস) নারীদের মধ্যে অনেক বেশি দেখা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৭৫% নারী।
মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
নারী স্বাস্থ্য কেবল শরীরের রোগ নয়, এটি মনের অবস্থা এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও গভীরভাবে নির্ভরশীল।
বিষণ্নতা ও উদ্বেগ (Depression & Anxiety)
নারীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ। এর পেছনে হরমোনের প্রভাব (যেমন—মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা, মেনোপজ) এবং সামাজিক চাপের ভূমিকা রয়েছে।
-
প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা (Postpartum Depression): সন্তান জন্মদানের পর অনেক মা তীব্র বিষণ্নতায় ভোগেন। সঠিক সমর্থন না পেলে এটি ‘পোস্টপার্টাম সাইকোসিস’-এর মতো মারাত্মক মানসিক অবস্থায় রূপ নিতে পারে।
গার্হস্থ্য হিংসা ও ট্রমা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজনের একজন নারী শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। গার্হস্থ্য হিংসা বা Domestic Violence নারীর দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, পেটের সমস্যা এবং মানসিক ট্রমার প্রধান কারণ। নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি।
লিঙ্গ বৈষম্য ও পুষ্টি
অনেক সমাজে নারীরা সবার শেষে এবং সবচেয়ে কম খাবার খান। এই সাংস্কৃতিক চর্চা নারীদের দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টিহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া শিক্ষার অভাবে নারীরা নিজেদের স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন না।
ইটিং ডিসঅর্ডার
সামাজিকভাবে “চিকন” বা “আকর্ষণীয়” হওয়ার চাপ থেকে অনেক তরুণী অ্যানোরেক্সিয়া (Anorexia) বা বুলিমিয়ার (Bulimia) মতো ইটিং ডিসঅর্ডারে ভোগেন, যা তাদের শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে।
প্রতিরোধ ও করণীয়: সুস্থ থাকার চাবিকাঠি
নারীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ—উভয়ই প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত স্তরে করণীয়
-
সুষম খাদ্য: আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ।
-
শারীরিক ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম হৃদরোগ এবং অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ করে।
-
নিয়মিত স্ক্রিনিং: ৩০ বছরের পর থেকে নিয়মিত ব্লাড প্রেসার, সুগার এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা। ৪০-এর পর ম্যামোগ্রাফি এবং প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট।
-
মানসিক যত্ন: নিজের জন্য সময় বের করা এবং প্রয়োজনে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্তরে করণীয়
-
বাল্যবিবাহ রোধ: বাল্যবিবাহ নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়। এটি রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
-
শিক্ষা ও সচেতনতা: নারী শিক্ষার হার বাড়লে মাতৃমৃত্যুর হার কমে এবং পরিবারের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
-
স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার: গ্রামীণ এবং প্রান্তিক নারীদের জন্য সুলভে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
উপসংহার
নারী স্বাস্থ্য” বিষয়টি কেবল একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত অধ্যায় নয়; এটি একটি জাতির উন্নয়নের সূচক। যখন একজন নারী সুস্থ থাকেন, তখন তার পরিবার সুস্থ থাকে, এবং একটি সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজ গঠন করে।
প্রজনন স্বাস্থ্যের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের তাকাতে হবে নারীর হৃদরোগ, ক্যান্সার, অটোইমিউন রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে। গর্ভাবস্থায় যেমন বাড়তি যত্নের প্রয়োজন, তেমনি মেনোপজের পরবর্তী সময়েও নারীর বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। কুসংস্কার, লজ্জা এবং লিঙ্গ বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে নারীদের তাদের স্বাস্থ্যের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার—সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে নারীর জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)
প্রশ্ন: নারী স্বাস্থ্য বলতে কি কেবল প্রজনন স্বাস্থ্যকেই বোঝায়?
উত্তর: না, এটি একটি ভুল ধারণা। নারী স্বাস্থ্য বা Women’s Health বলতে নারীর সামগ্রিক শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতাকে বোঝায়। এর মধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্যের পাশাপাশি হৃদরোগ, ক্যান্সার, অটোইমিউন রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন: পুরুষদের তুলনায় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কেন আলাদা?
উত্তর: নারীদের ক্রোমোজোম (XX), হরমোন (ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন) এবং প্রজননতন্ত্র পুরুষদের থেকে ভিন্ন। এর ফলে নারীদের শরীরে রোগের লক্ষণ ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। যেমন, নারীদের হৃদরোগের লক্ষণ পুরুষদের মতো সবসময় বুকে ব্যথা হিসেবে দেখা দেয় না। এছাড়া গর্ভাবস্থা ও মেনোপজের কারণে নারীদের বিশেষ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রশ্ন: পিসিওএস (PCOS) কী এবং এটি কেন হয়?
উত্তর: পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS) হলো নারীদের একটি হরমোনজনিত সমস্যা। এতে ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সিস্ট তৈরি হয় এবং শরীরে অ্যান্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন)-এর মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে অনিয়মিত মাসিক, ওজন বৃদ্ধি, অবাঞ্ছিত লোম এবং গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও জিনগত কারণে এটি হতে পারে।
প্রশ্ন: মেনোপজ (Menopause) পরবর্তী সময়ে নারীদের কোন কোন বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত?
উত্তর: মেনোপজের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যায়। এর ফলে হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপরোসিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তাই এই সময়ে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং হার্ট চেকআপ করানো অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন: জরায়ু-মুখ ক্যান্সার (Cervical Cancer) প্রতিরোধের উপায় কী?
উত্তর: জরায়ু-মুখ ক্যান্সার এইচপিভি (HPV) ভাইরাসের কারণে হয়। এটি প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো কিশোরী বয়সে (৯-১৪ বছর) এইচপিভি টিকা নেওয়া। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের নিয়মিত (সাধারণত ৩০ বছরের পর) ভায়া টেস্ট (VIA Test) বা প্যাপ স্মিয়ার (Pap Smear) টেস্ট করানো উচিত।
প্রশ্ন: নারীদের হৃদরোগের লক্ষণগুলো কী কী? একে ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ বলা হয় কেন?
উত্তর: নারীদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সবসময় তীব্র বুকে ব্যথা হয় না। শ্বাসকষ্ট, চোয়ালে বা পিঠে ব্যথা, বমি বমি ভাব, অত্যধিক ক্লান্তি বা বদহজমের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। লক্ষণগুলো অস্পষ্ট হওয়ায় এবং অনেক সময় গ্যাস বা এসিডিটি ভেবে ভুল করায় একে ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ বলা হয়।
প্রশ্ন: অটোইমিউন রোগে নারীরা কেন বেশি আক্রান্ত হন?
উত্তর: গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) পুরুষদের চেয়ে বেশি সক্রিয়। এই অতি-সক্রিয়তার কারণে মাঝে মাঝে ইমিউন সিস্টেম নিজের শরীরের সুস্থ কোষকেই আক্রমণ করে বসে। একারণেই লুপাস, থাইরয়েড বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ৭৫%।
প্রশ্ন: প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা (Postpartum Depression) কি স্বাভাবিক?
উত্তর: সন্তান জন্মদানের পর হরমোনের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে মন খারাপ লাগা বা ‘বেবি ব্লুজ’ স্বাভাবিক, যা কয়েক দিনেই ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু যদি তীব্র বিষণ্নতা, কান্না, শিশুর ক্ষতি করার চিন্তা বা নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা জাগে, তবে তা ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’। এটি একটি গুরুতর মানসিক সমস্যা এবং এর জন্য দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন।
প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার প্রধান কারণ কী?
উত্তর: এর প্রধান কারণগুলো হলো—মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থায় বাড়তি পুষ্টির চাহিদা পূরণ না হওয়া এবং সামাজিক বৈষম্য। অনেক পরিবারে নারীরা সবার শেষে খাবার খান, ফলে মাছ, মাংস বা পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি থেকে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদী অ্যানিমিয়া তৈরি করে।
প্রশ্ন: কিশোরীদের জন্য এইচপিভি (HPV) টিকা কেন জরুরি?
উত্তর: এইচপিভি টিকা জরায়ু-মুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। কিশোরী বয়সে (যৌন জীবন শুরুর আগে) এই টিকা দিলে শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা ভবিষ্যতে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি প্রায় শতভাগ কমিয়ে দেয়।
