🔒 গোপনীয়তার সাথে যৌন রোগের ফ্রি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন: — WhatsApp:          🔒 গোপনীয়তার সাথে যৌন রোগের ফ্রি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন: — WhatsApp:         

আখলাত (চার হিউমার) কী? ইউনানি চিকিৎসার মৌলিক ধারণা

আখলাত

আপনি কি কখনো ভেবেছেন — একজন মানুষ কেন সারাদিন ক্লান্ত থাকে, আরেকজন সবসময় রাগী, কেউ বা ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশিতে ভোগে? হাজার বছর আগে গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস এবং পরবর্তীতে ইবনে সিনা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন মানব শরীরের চার মৌলিক রসে — যাকে আরবিতে বলা হয় আখলাত (Akhlat) এবং ইংরেজিতে Four Humors।

ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতির একদম ভিত্তিমূলে রয়েছে এই আখলাত তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের শরীরে চারটি মূল রস বা আখলাত বিদ্যমান — দম (রক্ত/Blood), বলগম (কফ/Phlegm), সফরা (পিত্ত/Yellow Bile) এবং সওদা (কৃষ্ণপিত্ত/Black Bile)। এই চার আখলাতের সমতা মানে সুস্বাস্থ্য, আর তাদের ভারসাম্যহীনতা মানে রোগ।

এই আর্টিকেলে আমরা গভীরভাবে জানব — আখলাত কী, প্রতিটি আখলাতের বৈশিষ্ট্য কী, কীভাবে এগুলো আমাদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এবং ইউনানি হেকিমরা কীভাবে আখলাতের ভারসাম্য রক্ষা করে চিকিৎসা করেন।

আখলাত (Akhlat) কী?

Table of Contents

“আখলাত” শব্দটি আরবি “খিলত” (خِلْط) শব্দের বহুবচন, যার অর্থ “মিশ্রণ” বা “রস”। ইউনানি চিকিৎসাবিজ্ঞানে আখলাত বলতে বোঝায় শরীরে উৎপন্ন সেই চারটি মৌলিক তরল পদার্থ যা পুষ্টি গ্রহণ, বিপাক (Metabolism) এবং শারীরিক কার্যক্রমের মূল নিয়ন্ত্রক।

ঐতিহাসিকভাবে, এই ধারণার সূচনা প্রাচীন গ্রিসে। হিপোক্রেটিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০–৩৭০) প্রথম এই চার হিউমারের ধারণা দেন। পরে গ্যালেন (Galen, ১২৯–২১৬ খ্রি.) এবং সর্বোপরি ইবনে সিনা (Ibn Sina / Avicenna, ৯৮০–১০৩৭ খ্রি.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “আল-কানুন ফিত তিব” (القانون في الطب / Canon of Medicine)-এ এই তত্ত্বকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। এই গ্রন্থটি ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেডিকেল পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়েছে।

আখলাতের সাথে চার মৌলিক উপাদান (আরকান) ও মিজাজের সম্পর্ক

ইউনানি দর্শনে প্রতিটি আখলাত চারটি মৌলিক উপাদান (আরকান) — আগুন, বায়ু, পানি ও মাটি — এবং চারটি গুণ (গরম, ঠান্ডা, আর্দ্র, শুষ্ক) এর সাথে সংযুক্ত। এই সম্পর্ক নিচের ছকে বোঝা যায়:

  • দম (রক্ত) → উপাদান: বায়ু → গুণ: গরম ও আর্দ্র → অঙ্গ: হৃদয় (কলব)
  • বলগম (কফ) → উপাদান: পানি → গুণ: ঠান্ডা ও আর্দ্র → অঙ্গ: মস্তিষ্ক (দিমাগ)
  • সফরা (পিত্ত) → উপাদান: আগুন → গুণ: গরম ও শুষ্ক → অঙ্গ: যকৃত (জিগর)
  • সওদা (কৃষ্ণপিত্ত) → উপাদান: মাটি → গুণ: ঠান্ডা ও শুষ্ক → অঙ্গ: প্লীহা (তিহাল)

চার আখলাতের বিস্তারিত পরিচয়

১. দম (Dam) — রক্তরস বা Blood Humor

দম হলো সবচেয়ে উৎকৃষ্ট আখলাত। এটি হৃদয়ে উৎপন্ন হয় এবং পুরো শরীরে পুষ্টি, উষ্ণতা ও প্রাণশক্তি সরবরাহ করে। ইউনানি মতে, দমের আধিক্য মানুষকে প্রাণবন্ত, সামাজিক ও আশাবাদী করে তোলে — আধুনিক মনোবিজ্ঞানে যাকে “Sanguine personality” বলা হয়।

দমের বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • রঙ: উজ্জ্বল লাল
  • স্বাদ: মিষ্টি
  • গন্ধ: সুগন্ধি
  • মিজাজ: গরম ও আর্দ্র
  • সর্বোচ্চ সময়: বসন্তকাল এবং শৈশব-যৌবনকাল
  • আধুনিক সম্পর্ক: রক্তের হিমোগ্লোবিন, প্লাজমা প্রোটিন ও অক্সিজেন পরিবহন ব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্য রয়েছে।

দমের আধিক্যে রোগ: উচ্চ রক্তচাপ, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, মাথাব্যথা

২. বলগম (Balgham) — কফ বা Phlegm Humor

বলগম হলো ঠান্ডা ও আর্দ্র প্রকৃতির আখলাত। এটি মূলত মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে তৈরি হয় এবং শরীরের জয়েন্টগুলোকে পিচ্ছিল রাখে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সুরক্ষিত রাখে। বলগম প্রভাবিত ব্যক্তিরা সাধারণত শান্ত, ধৈর্যশীল কিন্তু কখনো কখনো অলস প্রকৃতির হন — যাকে “Phlegmatic” বলে।

বলগমের বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • রঙ: সাদা বা বর্ণহীন
  • স্বাদ: মিষ্টি বা স্বাদহীন
  • গন্ধ: গন্ধহীন
  • মিজাজ: ঠান্ডা ও আর্দ্র
  • সর্বোচ্চ সময়: শীতকাল ও শৈশব
  • আধুনিক সম্পর্ক: মিউকাস মেমব্রেন, সাইনোভিয়াল ফ্লুইড ও লিম্ফের সাথে সাদৃশ্য।

বলগমের আধিক্যে রোগ: ঠান্ডা, কাশি, শ্বাসকষ্ট, স্থূলতা, অলসতা, হাঁপানি, দীর্ঘমেয়াদি শ্লেষ্মা সমস্যা

৩. সফরা (Safra) — পিত্ত বা Yellow Bile Humor

সফরা হলো উত্তপ্ত ও শুষ্ক আখলাত। এটি যকৃতে (Liver) তৈরি হয় এবং পিত্তথলিতে সংরক্ষিত থাকে। হজম প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — বিশেষত চর্বি হজমে এবং অন্ত্রের পেরিস্টালসিস বজায় রাখতে। সফরা প্রভাবিত ব্যক্তিরা উচ্চাভিলাষী, সাহসী কিন্তু রাগী প্রকৃতির হন — “Choleric personality”।

সফরার বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • রঙ: হলুদ বা কমলা
  • স্বাদ: তেতো
  • গন্ধ: তীব্র
  • মিজাজ: গরম ও শুষ্ক
  • সর্বোচ্চ সময়: গ্রীষ্মকাল ও যৌবনকাল
  • আধুনিক সম্পর্ক: Bile acids, Cholesterol metabolism ও হজম এনজাইমের সাথে সাদৃশ্য।

সফরার আধিক্যে রোগ: গ্যাস্ট্রিক, হলুদ জ্বর, পিত্তপাথর, ত্বকে হলুদ আভা (জন্ডিস), অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ডায়ারিয়া

৪. সওদা (Sauda) — কৃষ্ণপিত্ত বা Black Bile Humor

সওদা হলো চার আখলাতের মধ্যে সবচেয়ে ভারী ও শীতল আখলাত। এটি প্লীহায় (Spleen) উৎপন্ন হয় এবং শরীরের কঠিন কাঠামো — হাড়, দাঁত ও নখ — মজবুত রাখতে সাহায্য করে। সওদা প্রভাবিত ব্যক্তিরা চিন্তাশীল, বিশ্লেষণাত্মক কিন্তু কখনো কখনো বিষণ্ণ প্রকৃতির হন — “Melancholic personality”।

সওদার বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • রঙ: কালো বা গাঢ় বাদামি
  • স্বাদ: টক বা তিক্ত
  • গন্ধ: তীব্র অপ্রীতিকর
  • মিজাজ: ঠান্ডা ও শুষ্ক
  • সর্বোচ্চ সময়: শরৎকাল ও বার্ধক্যকাল
  • আধুনিক সম্পর্ক: হজমের অবশিষ্ট, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

সওদার আধিক্যে রোগ: বিষণ্নতা, মৃগীরোগ, ক্যান্সার (দাউস সরাতান), দীর্ঘস্থায়ী চর্মরোগ, আর্থ্রাইটিস

আখলাত ও মিজাজ (Mizaj/Temperament) — কীভাবে সংযুক্ত?

ইউনানি চিকিৎসায় “মিজাজ” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মিজাজ মানে হলো একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বভাব বা প্রকৃতি, যা তার প্রধান আখলাত দ্বারা নির্ধারিত হয়। প্রতিটি মানুষের শরীরে চারটি আখলাতই থাকে, কিন্তু একটি আখলাত সাধারণত প্রাধান্য পায় — সেটিই তার মিজাজ নির্ধারণ করে।

মিজাজ নির্ণয়ের পদ্ধতি (কীভাবে হেকিম মিজাজ বোঝেন)

একজন অভিজ্ঞ হেকিম রোগীর মিজাজ নির্ধারণ করেন নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে:

  • নবজ (নাড়ি/Pulse) পর্যবেক্ষণ: নাড়ির গতি, শক্তি, ছন্দ ও উষ্ণতা বিশ্লেষণ।
  • বাওল (প্রস্রাব/Urine) পরীক্ষা: রঙ, ঘনত্ব ও গন্ধ বিশ্লেষণ।
  • বারাজ (মল/Stool) বিশ্লেষণ: মলের গঠন, রঙ ও পরিমাণ পর্যবেক্ষণ।
  • শারীরিক গঠন: ত্বকের রঙ, শরীরের ওজন ও কাঠামো।
  • মানসিক অবস্থা: মেজাজ, আচরণ ও ঘুমের ধরন।

উল্লেখযোগ্য তথ্য: ২০১৯ সালে Journal of Traditional and Complementary Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ইউনানি মিজাজ নির্ণয় পদ্ধতি এবং আধুনিক Chronobiology (জৈব-ছন্দ বিজ্ঞান) এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে — উভয় ক্ষেত্রেই শরীরের ছন্দ ও চক্রকে স্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়

আখলাতের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করবেন?

ইউনানি চিকিৎসায় আখলাতের ভারসাম্য রক্ষার জন্য “আসবাব-ই-সিত্তা জারুরিয়া” (ছয়টি অপরিহার্য কারণ) মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়:

আসবাব-ই-সিত্তা জারুরিয়া: স্বাস্থ্যের ছয় ভিত্তি

  • হাওয়া (বায়ু/Air): পরিষ্কার, তাজা বায়ু সেবন এবং পরিবেশ দূষণ থেকে দূরে থাকা।
  • মাকুল ও মাশরুব (খাবার ও পানীয়): মিজাজ অনুযায়ী সঠিক খাবার গ্রহণ। দম মিজাজে মসলাদার খাবার কম, বলগম মিজাজে গরম মশলা বেশি উপকারী।
  • হারাকাত ও সুকুন (নড়াচড়া ও বিশ্রাম): নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুম।
  • নওম ও ইয়াকাজাত (ঘুম ও জাগরণ): রাত্রে সঠিক ঘুম আখলাতের পুনর্গঠনে সাহায্য করে।
  • ইস্তেফরাগ ও ইহতেবাস (নিঃসরণ ও ধারণ): শরীরের বর্জ্য নিয়মিত নির্গমন।
  • আহওয়াল-ই-নফসানিয়া (মানসিক অবস্থা): মানসিক শান্তি, ধ্যান ও ইতিবাচক চিন্তা।

আখলাত ও খাদ্য: কোন খাবার কোন আখলাতকে প্রভাবিত করে?

ইউনানি পুষ্টিবিজ্ঞানে প্রতিটি খাবারের একটি নির্দিষ্ট মিজাজ আছে। সঠিক খাবার নির্বাচনের মাধ্যমে আখলাতের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব:

দম (রক্ত) বৃদ্ধিকারী খাবার:

খেজুর, আঙুর, মধু, ডালিম, কালো কিশমিশ, গরুর কলিজা, মসুর ডাল। এই খাবারগুলো দমের উৎপাদন বাড়ায় এবং রক্তস্বল্পতায় উপকারী।

বলগম (কফ) কমানোর খাবার:

আদা, রসুন, দারুচিনি, গোলমরিচ, তুলসী পাতা, হলুদ, কালো জিরা। এই গরম মিজাজের খাবারগুলো বলগমের আধিক্য কমাতে সাহায্য করে।

সফরা (পিত্ত) নিয়ন্ত্রণকারী খাবার:

ধনেপাতা, পুদিনা, শসা, দই, নারকেল পানি, আমলকী, লেবু। এই ঠান্ডা ও আর্দ্র খাবারগুলো সফরার অতিরিক্ততা প্রশমিত করে।

সওদা (কৃষ্ণপিত্ত) ভারসাম্যকারী খাবার:

হিং, ত্রিফলা, এলাচ, মেথি, সরিষা তেল, সিরকা। এই খাবারগুলো সওদার ঘনত্ব কমায় এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: salihatfood.com-এ আমরা মিজাজ অনুযায়ী অর্গানিক খাবার সরবরাহ করি আপনার মিজাজ অনুযায়ী সঠিক খাবার জানতে আমাদের বিশেষজ্ঞ হেকিমদের সাথে পরামর্শ করুন

আখলাত তত্ত্ব বনাম আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান

অনেকেই প্রশ্ন করেন — আখলাত তত্ত্ব কি এখনো প্রাসঙ্গিক? আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাথে এর পার্থক্য ও মিল কোথায়?

আখলাত তত্ত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞানের মিল

  • দম ↔ রক্তের হিমোগ্লোবিন ও প্লাজমা — উভয়ই অক্সিজেন পরিবহন ও পুষ্টি সরবরাহের কেন্দ্রে।
  • বলগম ↔ মিউকাস ও লিম্ফ — শরীরের সুরক্ষা ও আর্দ্রতা রক্ষায় সমান ভূমিকা।
  • সফরা ↔ Bile (পিত্ত) — আধুনিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে পিত্তের হজম ভূমিকা ইউনানি বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • সওদা ↔ Metabolic waste & oxidative stress — প্লীহার কার্যক্রম ও রক্তকণিকা ভাঙনের সম্পর্ক আধুনিকভাবে প্রমাণিত।
  • মিজাজ ↔ Psychosomatic medicine — আধুনিক গবেষণায়ও মানসিক অবস্থা ও শারীরিক রোগের সংযোগ স্বীকৃত।

পার্থক্য ও সীমাবদ্ধতা

আখলাত তত্ত্ব গুণগত ও সামগ্রিক (Holistic) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শরীরকে দেখে, যেখানে আধুনিক চিকিৎসা আণবিক ও জৈব রাসায়নিক স্তরে কাজ করে। আখলাত তত্ত্বে ব্যক্তিগত মিজাজ বিশেষ গুরুত্ব পায়, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসায় রোগের কারণ (Pathogen/Gene) অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক Personalized Medicine ও Precision Health আন্দোলন ইউনানি মিজাজ ধারণার সাথে মিলে যাচ্ছে।

ইউনানি চিকিৎসায় আখলাত সংশোধনের পদ্ধতিসমূহ

ইউনানি হেকিমরা আখলাতের ভারসাম্যহীনতা সংশোধনে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন:

  • তাদবির-ই-গিজা (Dietary Therapy): মিজাজ বিরোধী খাবার খাওয়া। গরম মিজাজে ঠান্ডা খাবার, ঠান্ডা মিজাজে গরম খাবার।
  • ইলাজ-বিল-আদভিয়া (Herbal Medicine): তিতা-বাবলা, সোনামুখী, হারড়া, বহেড়া, আমলকী, হালিলা, সনা মাক্কী — এই জড়িবুটি আখলাত পরিশোধনে ব্যবহৃত।
  • ইলাজ-বিল-তাদবির (Regimenal Therapy): ফাসাদ (রক্তমোক্ষণ), হিজামা (কাপিং), হাম্মাম (বাষ্পস্নান), দালাক (ম্যাসাজ) — এই পদ্ধতিগুলো অতিরিক্ত আখলাত শরীর থেকে বের করতে সাহায্য করে।
  • ইলাজ-বিল-জারাহাত (Surgical Therapy): প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার — তবে এটি সর্বশেষ বিকল্প।

সাধারণ ভুল

আখলাত তত্ত্ব নিয়ে অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি হয়। কিছু সাধারণ ভুল এবং সঠিক তথ্য:

  • ভুল ধারণা: আখলাত তত্ত্ব সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিকসঠিক তথ্য: আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, আখলাত ধারণার অনেক দিক আধুনিক ফিজিওলজির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • ভুল ধারণা: যে কেউ নিজেই মিজাজ বুঝে চিকিৎসা করতে পারেনসঠিক তথ্য: মিজাজ নির্ণয় একটি জটিল বিজ্ঞান — এটি শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত হেকিমের দ্বারাই সঠিকভাবে সম্ভব।
  • ভুল ধারণা: ইউনানি চিকিৎসায় শুধু ভেষজ ওষুধ ব্যবহার হয়সঠিক তথ্য: ইউনানি চিকিৎসা খাদ্য, জীবনযাপন, মানসিক স্বাস্থ্য ও ভেষজ — সবকিছুর সমন্বয়।
  • ভুল ধারণা: আখলাত স্থির ও অপরিবর্তনীয়সঠিক তথ্য: ঋতু, বয়স, খাবার, আবহাওয়া এবং মানসিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে আখলাতের মাত্রা পরিবর্তিত হয়।

প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: আখলাত কি রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায়?

উত্তর: না, আখলাত একটি কার্যকরী ধারণা যা শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করে — এটি নির্দিষ্ট কোনো একক পদার্থ নয়। আধুনিক রক্ত পরীক্ষা আখলাতের কিছু দিক পরিমাপ করতে পারে (যেমন Bilirubin সফরার অংশ), কিন্তু সম্পূর্ণ আখলাত মূল্যায়ন করতে ইউনানি পদ্ধতিতে নাড়ি পরীক্ষা, প্রস্রাব বিশ্লেষণ ও মলের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

প্রশ্ন ২: কীভাবে বুঝব আমার কোন আখলাতের সমস্যা আছে?

উত্তর: কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখে ধারণা নেওয়া যায় — ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশি মানে বলগমের সমস্যা; অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক বা জ্বালাভাব মানে সফরার আধিক্য; বিষণ্নতা বা শুষ্ক ত্বক সওদার ইঙ্গিত; আর উচ্চ রক্তচাপ বা গরম অনুভূতি দমের আধিক্যের লক্ষণ হতে পারে। তবে সঠিক নির্ণয়ের জন্য অভিজ্ঞ হেকিমের কাছে যাওয়া উচিত।

প্রশ্ন ৩: আখলাত কি ঋতু পরিবর্তনের সাথে বদলায়?

উত্তর: হ্যাঁ, ইউনানি মতে ঋতু পরিবর্তনের সাথে আখলাতের মাত্রা পরিবর্তন হয় — বসন্তে দম, গ্রীষ্মে সফরা, শরতে সওদা এবং শীতে বলগমের প্রাধান্য থাকে। এজন্য ঋতু পরিবর্তনের সময় সংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। ঋতু অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে আখলাত ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।

প্রশ্ন ৪: ইউনানি চিকিৎসা কি বাংলাদেশে স্বীকৃত?

উত্তর: হ্যাঁ। বাংলাদেশ সরকার ইউনানি চিকিৎসাকে স্বীকৃত বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে মেনে নিয়েছে। দেশে বর্তমানে বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ইউনানি মেডিকেল কলেজ রয়েছে, যার মধ্যে খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অন্যতম। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড (BUAB) কাজ করছে।

প্রশ্ন ৫: আখলাত ও আয়ুর্বেদের ত্রিদোষের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: আয়ুর্বেদে ত্রিদোষ (বাত, পিত্ত, কফ) এবং ইউনানিতে চার আখলাত (দম, বলগম, সফরা, সওদা) — দুটিই শরীরের মৌলিক শক্তিকে বর্ণনা করে। আয়ুর্বেদ ভারতীয় দর্শন থেকে উদ্ভূত এবং তিনটি দোষ ব্যবহার করে, যেখানে ইউনানি গ্রিক-আরবি দর্শন থেকে উদ্ভূত এবং চারটি আখলাত ব্যবহার করে। উভয়ই সামগ্রিক (Holistic) চিকিৎসা ব্যবস্থা।

উপসংহার

আখলাত বা চার হিউমার তত্ত্ব শুধু একটি প্রাচীন ধারণা নয় — এটি এমন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য দর্শন যা হাজার বছর ধরে মানুষের শরীর ও মনের সুস্থতার পথ দেখিয়ে আসছে। দম, বলগম, সফরা ও সওদার ভারসাম্য রক্ষা করেই ইউনানি চিকিৎসা রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় করে।

 

আপনার মিজাজ অনুযায়ী সঠিক খাদ্যাভ্যাস জানতে এবং অর্গানিক ইউনানি পণ্য সম্পর্কে জানতে salihatfood.com ভিজিট করুন আমাদের বিশেষজ্ঞ হেকিম মোঃ সুলতান মাহমুদ-এর সাথে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন

 

লেখক: হেকিম মোঃ সুলতান মাহমুদ — গবেষণা শিক্ষার্থী, খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Scroll to Top