ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যায় প্রতিটি ভেষজ উদ্ভিদ, খাদ্যদ্রব্য এবং এমনকি মানুষের শরীরেরও একটি নির্দিষ্ট মিযাজ বা স্বভাব রয়েছে। এই মিযাজের উপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় কোন খাবার বা ভেষজ কার জন্য উপকারী এবং কার জন্য ক্ষতিকর।

বিখ্যাত ইউনানি চিকিৎসক ইবনে সিনা (Ibn Sina / Avicenna) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-কানুন ফিত-তিব্ব (Canon of Medicine)-এ মিযাজ নির্ধারণের বিস্তারিত পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, যা আজও ইউনানি চিকিৎসার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই আর্টিকেলে আমি, হেকিম মোঃ সুলতান মাহমুদ, খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গবেষণা শিক্ষার্থী হিসেবে আমার ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা ও অধ্যয়নের আলোকে ভেষজ ও খাদ্যের মিযাজ নির্ধারণের পদ্ধতি সহজভাবে ব্যাখ্যা করব।
মিযাজ কী?
মিযাজ শব্দটি আরবি, যার অর্থ ‘স্বভাব’, ‘প্রকৃতি’ বা ‘মেজাজ’। ইউনানি চিকিৎসায় এটি একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। প্রতিটি বস্তু বা দেহের মধ্যে চারটি মৌলিক গুণের (কাইফিয়াত) একটি বিশেষ মিশ্রণ থাকে যা সেই বস্তুর মিযাজ নির্ধারণ করে।
ইউনানি চিকিৎসায় মনে করা হয় যে পৃথিবীর সকল বস্তু চারটি মৌলিক উপাদান বা আনাসির (Elements) দিয়ে গঠিত: আগুন (নার), বায়ু (হাওয়া), পানি (মা) এবং মাটি (তুরাব)। এই চার উপাদান থেকে জন্ম নেয় চারটি মৌলিক গুণ।
চার প্রকার মিযাজের বিস্তারিত পরিচয়
১. উষ্ণ মিযাজ (হার বা গরম প্রকৃতি)
উষ্ণ মিযাজের মূল বৈশিষ্ট্য: এই মিযাজের ভেষজ বা খাদ্য শরীরে তাপ বৃদ্ধি করে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং হজমশক্তি শক্তিশালী করে। আগুন (নার) উপাদানের প্রভাব এখানে বেশি।
ইউনানি চিকিৎসায় উষ্ণতার মাত্রা চারটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে (দরজা আওয়াল) সামান্য উষ্ণতা যা শরীরের জন্য উপকারী। দ্বিতীয় ধাপে (দরজা সানি) মাঝারি উষ্ণতা। তৃতীয় ধাপে (দরজা সালেস) তীব্র উষ্ণতা যা সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হয়। চতুর্থ ধাপে (দরজা রাবে) অত্যন্ত তীব্র উষ্ণতা যা ক্ষতিকর হতে পারে।
উষ্ণ মিযাজের সাধারণ ভেষজ ও খাদ্য:
- আদা (Zingiber officinale) — তীব্র উষ্ণ (দরজা তৃতীয়)
- দারুচিনি (Cinnamomum verum) — উষ্ণ ও শুষ্ক (দরজা দ্বিতীয়)
- মেথি (Trigonella foenum-graecum) — উষ্ণ ও শুষ্ক
- রসুন (Allium sativum) — অত্যন্ত উষ্ণ (দরজা চতুর্থ)
- কালোজিরা (Nigella sativa) — উষ্ণ ও শুষ্ক (দরজা তৃতীয়)
- মরিচ (Capsicum annuum) — তীব্র উষ্ণ
- মধু — উষ্ণ ও শুষ্ক (হালকা উষ্ণতা)
উষ্ণ মিযাজ চেনার উপায়:
- খাওয়ার পরে শরীরে উষ্ণতা বা গরম অনুভূতি হয়
- ঘাম বাড়ে বা শরীর লাল হয়ে যায়
- হজমশক্তি ও ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়
- শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা দ্রুত হয়
- তৃষ্ণা বাড়তে পারে
২. শীতল মিযাজ (বারেদ বা ঠান্ডা প্রকৃতি)
শীতল মিযাজের মূল বৈশিষ্ট্য: শরীরের তাপমাত্রা কমায়, প্রদাহ নিবারণ করে এবং শান্তভাব আনে। পানি (মা) ও মাটি (তুরাব) উপাদানের প্রভাব বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে যে শীতল মিযাজের ভেষজগুলো সাধারণত অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহবিরোধী যৌগ সমৃদ্ধ হয়। যেমন, শসায় (Cucumis sativus) বিদ্যমান কুকার্বিটাসিন এবং ফ্ল্যাভোনয়েড যৌগগুলো তার শীতলকারী গুণের জন্য দায়ী বলে আধুনিক গবেষণাও নিশ্চিত করেছে।
শীতল মিযাজের সাধারণ ভেষজ ও খাদ্য:
- শসা (Cucumis sativus) — শীতল ও আর্দ্র
- ধনেপাতা (Coriandrum sativum) — শীতল
- চন্দন (Santalum album) — শীতল ও শুষ্ক
- আমলকী (Phyllanthus emblica) — শীতল ও আর্দ্র
- গোলাপ (Rosa damascena) — শীতল ও আর্দ্র
- তরমুজ — শীতল ও আর্দ্র
- কলা — শীতল ও আর্দ্র
- পুদিনা (Mentha) — শীতল
শীতল মিযাজ চেনার উপায়:
- খাওয়ার পরে শরীরে ঠান্ডা বা স্নিগ্ধ অনুভূতি হয়
- জ্বর, জ্বালাপোড়া বা প্রদাহ কমে
- শরীর ঘাম কম ঝরায়
- হজম ধীর হতে পারে
৩. আর্দ্র মিযাজ (রতব বা ভেজা প্রকৃতি)
আর্দ্র মিযাজের মূল বৈশিষ্ট্য: শরীরে আর্দ্রতা বৃদ্ধি করে, শ্লেষ্মা (বালগাম) তৈরি বাড়ায়, ত্বক ও শ্লেষ্মা ঝিল্লিকে নরম করে। পানি (মা) উপাদানের প্রভাব প্রধান।
আর্দ্র মিযাজের সাধারণ ভেষজ ও খাদ্য:
- দুধ — শীতল ও আর্দ্র
- ঘি — উষ্ণ ও আর্দ্র
- মাখন — শীতল ও আর্দ্র
- কলা — শীতল ও আর্দ্র
- আঙুর — শীতল ও আর্দ্র
- মাছ (মিষ্টি পানির) — শীতল ও আর্দ্র
- শালগম — উষ্ণ ও আর্দ্র
আর্দ্র মিযাজ চেনার উপায়:
- শরীরে পিচ্ছিলভাব বা স্নিগ্ধতা অনুভব হয়
- মুখে লালা বৃদ্ধি পায়
- ত্বক নরম ও মসৃণ হয়
- অতিরিক্ত সেবনে কফ বা শ্লেষ্মা বাড়তে পারে
৪. শুষ্ক মিযাজ (ইয়াবেস বা রুক্ষ প্রকৃতি)
শুষ্ক মিযাজের মূল বৈশিষ্ট্য: শরীরের আর্দ্রতা কমায়, শ্লেষ্মা শুকায়, টিস্যু শক্ত করে। মাটি (তুরাব) ও আগুন (নার) উপাদানের প্রভাব।
শুষ্ক মিযাজের সাধারণ ভেষজ ও খাদ্য:
- বার্লি (যব) — শীতল ও শুষ্ক
- হলুদ (Curcuma longa) — উষ্ণ ও শুষ্ক
- অ্যালোভেরা — শীতল ও শুষ্ক (বাহ্যিকভাবে)
- লবণ — উষ্ণ ও শুষ্ক
- ডাল জাতীয় খাবার — শুষ্ক
- ভাজাপোড়া খাবার — উষ্ণ ও শুষ্ক
শুষ্ক মিযাজ চেনার উপায়:
- ত্বক বা মুখ শুকিয়ে যায়
- কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে
- মূত্র কম হয় ও গাঢ় হয়
- কফ কমে যায়
ইউনানি মিযাজ পরীক্ষার ৮টি মানদণ্ড
ইবনে সিনা তাঁর কানুনে মিযাজ নির্ধারণের জন্য নিম্নলিখিত আটটি সূচক বর্ণনা করেছেন। এই পদ্ধতি আজও খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়:
- স্পর্শে উষ্ণতা বা শীতলতার অনুভূতি
- সংযোগের সময় অনুভূত পরিবর্তন
- ব্যবহারের দ্রুততা বা বিলম্ব
- শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রতিক্রিয়া
- মল-মূত্রের পরিবর্তন
- ঘুম ও জাগরণে প্রভাব
- স্বপ্নের ধরন পরিবর্তন
- শারীরিক ক্রিয়াকলাপে পরিবর্তন
আধুনিক বিজ্ঞান ও মিযাজের সংযোগ
একটি অনন্য তথ্য যা সাধারণত আলোচিত হয় না: ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Tavares et al., PMC/NCBI) দেখা গেছে যে আমলকীর (Phyllanthus emblica) শীতল মিযাজের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। আমলকীতে বিদ্যমান ট্যানিন, গ্যালিক এসিড এবং এলাজিক এসিড শরীরের প্রদাহ কমায় ও তাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে — যা ইউনানি মতে শীতল মিযাজের লক্ষণ।
আরেকটি উদাহরণ: কালোজিরায় (Nigella sativa) বিদ্যমান থাইমোকুইনোন (Thymoquinone) যৌগটি শরীরে তাপীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা এর উষ্ণ মিযাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়। এটি মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া বৃদ্ধি করে বলে আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত।
মিযাজ অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচনের নীতি
ইউনানি মতে মানুষের শরীরও চার প্রকার মিযাজের হয়: দামাভী (উষ্ণ-আর্দ্র), সাফরাভী (উষ্ণ-শুষ্ক), বালগামী (শীতল-আর্দ্র) এবং সওদাভী (শীতল-শুষ্ক)।
| মিযাজের ধরন | শারীরিক লক্ষণ | উপযুক্ত খাবার | এড়িয়ে চলুন |
| দামাভী (উষ্ণ-আর্দ্র) | লালচে ত্বক, ঘাম বেশি, প্রাণবন্ত | শীতল-শুষ্ক খাবার | তীব্র উষ্ণ ভেষজ |
| সাফরাভী (উষ্ণ-শুষ্ক) | হলুদ ত্বক, তিক্ত স্বাদ, রাগী | শীতল-আর্দ্র খাবার | তেল ও মশলা |
| বালগামী (শীতল-আর্দ্র) | ফ্যাকাশে ত্বক, কফ বেশি, ধীর | উষ্ণ-শুষ্ক খাবার | দুধ, কলা, মিষ্টি বেশি |
| সওদাভী (শীতল-শুষ্ক) | কালচে ত্বক, শুষ্ক, উদ্বিগ্ন | উষ্ণ-আর্দ্র খাবার | শুষ্ক ও ঠান্ডা খাবার |
মিযাজের বিপরীত ও অনুকূল নীতি
ইউনানি চিকিৎসার একটি মৌলিক নীতি হলো “তাদবীরে মুতাযাদ” বা বিপরীত চিকিৎসা। অর্থাৎ, শরীরে যে মিযাজ বেড়ে যায়, তার বিপরীত মিযাজের খাবার ও ভেষজ দিয়ে ভারসাম্য ফেরানো হয়। উদাহরণস্বরূপ:
- জ্বর (উষ্ণতা বেশি) হলে শীতল মিযাজের খাবার যেমন শসা, তরমুজ দেওয়া হয়
- কফ রোগ (শীতল-আর্দ্রতা বেশি) হলে উষ্ণ-শুষ্ক মিযাজের আদা, তুলসী দেওয়া হয়
- কোষ্ঠকাঠিন্য (শুষ্কতা বেশি) হলে আর্দ্র মিযাজের ইসবগুল, ঘি দেওয়া হয়
ভেষজ ও খাদ্যের মিযাজ নির্ধারণের ব্যবহারিক পদ্ধতি
একজন অভিজ্ঞ হেকিম বা ইউনানি চিকিৎসক নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে ভেষজের মিযাজ যাচাই করেন:
- স্বাদ পরীক্ষা: ঝাল ও তিক্ত স্বাদ সাধারণত উষ্ণ মিযাজের। মিষ্টি ও টক স্বাদ শীতল বা আর্দ্র মিযাজের।
- গন্ধ পরীক্ষা: তীব্র সুগন্ধ সাধারণত উষ্ণ মিযাজের ইঙ্গিত দেয় (যেমন দারুচিনি, এলাচ)।
- স্পর্শ পরীক্ষা: ত্বকে লাগালে জ্বালা করলে উষ্ণ, শীতল লাগলে ঠান্ডা মিযাজ।
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ: খাওয়ার ১৫-৩০ মিনিট পরে শরীরে কোন পরিবর্তন আসে তা লক্ষ করুন।
- ঐতিহ্যগত জ্ঞান: ইউনানি গ্রন্থ যেমন মাখযানুল আদভিয়া, কিতাবুল মুফরাদাত অনুসরণ করুন।
রঙ ও আকৃতি দিয়ে মিযাজ চেনা
একটি অনন্য পর্যবেক্ষণ যা অনেক বইয়ে পাওয়া যায় না: ভেষজের রঙও মিযাজের ইঙ্গিত দিতে পারে।
- লাল ও কমলা রঙের ভেষজ: প্রায়শই উষ্ণ মিযাজের (যেমন গাজর, মরিচ)
- সবুজ রঙের ভেষজ: শীতল-আর্দ্র (পুদিনা, শসার পাতা)
- সাদা ও ক্রিম রঙের: শীতল মিযাজের ঝোঁক (দুধ, মূলা)
- কালো ও গাঢ় রঙের: শুষ্ক মিযাজের ঝোঁক (কালোজিরা, কালো তিল)
সাধারণ ভুল
⚠️ সতর্কতা: একই ভেষজ কাঁচা ও রান্না অবস্থায় ভিন্ন মিযাজ দেখাতে পারে। যেমন, কাঁচা পেঁয়াজ উষ্ণ-শুষ্ক, কিন্তু রান্না পেঁয়াজ কিছুটা কম উষ্ণ এবং আর্দ্র হয়।
- ভুল: মনে করা যে সব আর্দ্র খাবার স্বাস্থ্যকর — বালগামী মিযাজের মানুষের জন্য বেশি আর্দ্র খাবার ক্ষতিকর
- ভুল: মিযাজকে পুষ্টিমানের বিকল্প ভাবা — মিযাজ ও পুষ্টিবিজ্ঞান পরস্পর পরিপূরক
- ভুল: এককভাবে ভেষজ ব্যবহার — মিযাজ অনুযায়ী সমন্বয় জরুরি
- ভুল: শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য একই মাত্রা ব্যবহার — বয়স অনুযায়ী মিযাজের মাত্রা পরিবর্তন হয়
ঋতু অনুযায়ী মিযাজের পরিবর্তন
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা বেশিরভাগ বাংলা ব্লগে অনুপস্থিত: মানুষের শরীরের মিযাজ ঋতু পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়। ইউনানি মতে:
- বসন্তকাল (রবিউল আওয়াল): দামাভী মিযাজের প্রভাব বেশি — এই সময় উষ্ণ-আর্দ্র খাবার সামলে খাওয়া উচিত
- গ্রীষ্মকাল (সাইফ): সাফরাভী মিযাজের প্রভাব — শীতল-আর্দ্র খাদ্য গ্রহণ আবশ্যক
- শরৎকাল (খারিফ): সওদাভী মিযাজের প্রভাব — উষ্ণ-আর্দ্র খাদ্য উপকারী
- শীতকাল (শিতা): বালগামী মিযাজের প্রভাব — উষ্ণ-শুষ্ক খাবার সহায়ক
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে গ্রীষ্মকালে (মার্চ-মে) যখন তাপমাত্রা ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন তরমুজ, শসা ও আমলকীর মতো শীতল মিযাজের খাদ্য গ্রহণ করা শরীরকে ভারসাম্যে রাখে। এটি নিছক লোকজ্ঞান নয় — তরমুজের ৯২% পানি এবং এর লাইকোপিন উপাদান তাপজনিত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায় বলে আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: মিযাজ ও আয়ুর্বেদের ত্রিদোষ কি একই জিনিস?
না, এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা কিন্তু কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। আয়ুর্বেদে তিনটি দোষ (বাত, পিত্ত, কফ) এবং পাঁচটি মহাভূত (পঞ্চতত্ত্ব) নিয়ে কাজ হয়। ইউনানিতে চারটি আখলাত বা রস (দম, সাফরা, বালগাম, সওদা) এবং চারটি উপাদান (আনাসির আরবা) দিয়ে মিযাজ নির্ধারিত হয়। উভয় পদ্ধতিই শরীরের ভারসাম্যের উপর জোর দেয়, তবে তাত্ত্বিক কাঠামো আলাদা।
প্রশ্ন ২: ভেষজের মিযাজ কি পরিবর্তন হয়?
হ্যাঁ, কয়েকটি কারণে মিযাজ পরিবর্তন হতে পারে: (১) রান্না করলে (তাবখ) মিযাজ পরিবর্তন হয়, (২) অন্য উপাদানের সাথে মিশ্রণে মিযাজ পরিবর্তন হয় — যেমন দুধের সাথে আদা মিশালে আদার উষ্ণতা কিছুটা কমে, (৩) ভেষজ প্রক্রিয়াজাত করলে (তাসহিহ) মিযাজ পরিবর্তন করা যায়।
প্রশ্ন ৩: শিশুদের জন্য মিযাজ নির্ধারণ কীভাবে করা হয়?
ইউনানি মতে, শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই উষ্ণ-আর্দ্র মিযাজের হয়। তাই শিশুদের জন্য তীব্র উষ্ণ ভেষজ এড়িয়ে চলা উচিত। শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্রা (মিকদার) অত্যন্ত কম হওয়া জরুরি। যেকোনো ভেষজ শিশুকে দেওয়ার আগে অভিজ্ঞ হেকিমের পরামর্শ নেওয়া অবশ্যই।
প্রশ্ন ৪: কোন খাবার ও ভেষজের মিযাজ সবচেয়ে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা উচিত?
চতুর্থ মাত্রার (দরজা রাবে) উষ্ণ বা শীতল ভেষজ সবচেয়ে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, রসুন (উষ্ণতার চতুর্থ মাত্রা) বেশি পরিমাণে সেবন করলে গ্যাস্ট্রিক জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা বা রক্তচাপ পরিবর্তন হতে পারে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত শীতল মিযাজের ভেষজ হজমে সমস্যা ও কফ বৃদ্ধি করতে পারে।
প্রশ্ন ৫: ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মিযাজ অনুযায়ী খাবার কীভাবে নির্বাচন করবেন?
ইউনানি চিকিৎসায় ডায়াবেটিস (জুলাব-এ-সুক্কর) কে সাধারণত শীতল-আর্দ্র অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ক্ষেত্রে উষ্ণ-শুষ্ক মিযাজের ভেষজ যেমন মেথি, কালোজিরা, দারুচিনি এবং করলা উপকারী বলে ইউনানি মতে বলা হয়। আধুনিক গবেষণায়ও এই ভেষজগুলোর রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রমাণিত। তবে ওষুধের সাথে এগুলো সেবন করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
উপসংহার
মিযাজের ধারণা শুধু পুরনো একটি তত্ত্ব নয় — এটি আমাদের শরীর ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ককে বোঝার একটি অসাধারণ কাঠামো। ইবনে সিনা থেকে শুরু করে আজকের খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত এই জ্ঞান লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষায় কাজ করে আসছে।
আপনার শরীরের মিযাজ জানুন, মৌসুম অনুযায়ী খাবার বেছে নিন এবং উষ্ণ-শীতল-আর্দ্র-শুষ্ক এই চারটি গুণের ভারসাম্য বজায় রাখুন — এটিই ইউনানি স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মূলকথা।