পাইলস হলে কি খাওয়া যাবে এবং কি খাওয়া যাবে না

পাইলস হলে কি খাওয়া যাবে এবং কি খাওয়া যাবে না | পূর্ণাঙ্গ ডায়েট চার্ট

পাইলস বা অর্শ গেজ এমন একটি যন্ত্রণাদায়ক রোগ যা মূলত মলদ্বারের ভেতরের বা বাইরের রক্তনালী (Blood Vessels) ফুলে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। এই রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য (Constipation) এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা। ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা ছাড়া পাইলস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক খাদ্যাভ্যাসই পারে পাইলস বা অর্শের ব্যথা, রক্তপাত এবং ফোলাভাব ৫০-৭০% কমিয়ে আনতে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানব পাইলস হলে কি খাওয়া যাবে এবং কি খাওয়া যাবে না, এবং কীভাবে একটি সুষম খাদ্য তালিকা বা ডায়েট চার্ট আপনাকে সুস্থ রাখতে পারে।

পাইলস নিরাময়ে খাদ্যাভ্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পাইলস সরাসরি আমাদের পরিপাকতন্ত্র বা ডাইজেস্টিভ সিস্টেমের সাথে যুক্ত। যখন আমাদের খাবারে আঁশ বা ফাইবার (Fiber) এর অভাব ঘটে, তখন মল শক্ত হয়ে যায়। এই কঠিন মল বের করার সময় মলাশয়ে (Anal Canal) এবং মলদ্বারের শিরায় তীব্র চাপ প্রয়োগ (Straining) করতে হয়, যা পাইলসের ঝুঁকি বাড়ায়।

সঠিক ডায়েটের মূল লক্ষ্য হলো মলকে নরম ও ওজনে ভারী করা, যাতে এটি সহজেই কোনো চাপ ছাড়া শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় ফাইবারযুক্ত খাবার এবং পর্যাপ্ত তরল বা লিকুইড নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

পাইলস হলে কি খাওয়া যাবে 

পাইলসের উপসর্গ কমাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এমন খাবার বেছে নিতে হবে যা হজমশক্তি বাড়ায় এবং মলের আর্দ্রতা বজায় রাখে। একে আমরা চিকিৎসার ভাষায় “The Cure Layer” বা নিরাময় স্তর বলতে পারি।

১. উচ্চ আঁশযুক্ত শস্য 

পাইলস রোগীদের জন্য অদ্রবনীয় ফাইবার (Insoluble Fiber) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

  • লাল চাল (Brown Rice): সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল খাওয়া অভ্যাস করুন। লাল চালের ওপরের আবরণে প্রচুর ফাইবার থাকে যা সহজে হজম হয় এবং পেট পরিষ্কার রাখে।

  • লাল আটা ও ওটস (Whole Wheat & Oats): রিফাইন করা সাদা আটার রুটির বদলে লাল আটার রুটি বা ওটস খাওয়া শ্রেয়। ওটস বা জব (Barley) অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং মল নরম করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

২. আঁশযুক্ত ফল এবং খোসাযুক্ত খাবার

ফল খাওয়ার সময় খোসা ফেলে না দিয়ে খোসাসমেত খাওয়া উচিত (যেগুলো খাওয়া সম্ভব), কারণ খোসাতেই সবচেয়ে বেশি আঁশ থাকে।

  • পেঁপে (Ripe Papaya): পাকা পেঁপে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ওষুধের মতো কাজ করে। এতে ‘প্যাপাইন’ নামক এনজাইম থাকে যা হজমে সহায়তা করে।

  • বেল (Wood Apple): বেলের শরবত বা পাকা বেল মলের কঠোরতা দূর করতে এবং অন্ত্র পরিষ্কার রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।

  • নাশপাতি ও আপেল (Pear & Apple): আপেল ও নাশপাতি খোসাযুক্ত অবস্থায় খেলে তা শরীরে পেকটিন এবং ফাইবার সরবরাহ করে, যা মল নরম করে।

  • কলা (Ripe Banana): পাকা কলা মল পিচ্ছিল করতে সাহায্য করে। তবে কাঁচ কলা বা অত্যাধিক শক্ত কলা খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, এটি কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে।

৩. প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি

প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণ সবুজ শাকসবজি রাখা বাধ্যতামূলক। এগুলোতে প্রচুর পানি ও ফাইবার থাকে।

  • উপকারী সবজি: লাউ (Bottle gourd), মিষ্টি কুমড়া, ব্রকলি, গাজর এবং শসা।

  • শাক: পালং শাক, লাল শাক এবং কলমি শাক হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

  • বিশেষ নোট: সবজি খুব বেশি ভাজি না করে সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করে খাওয়া ভালো।

৪. ডাল এবং লিগিউম জাতীয় খাবার (Legumes)

মসুর ডাল, মটরশুঁটি এবং রাজমার মতো দানা জাতীয় শস্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে।

  • টিপস: ডাল রান্নার আগে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখুন এবং ভালোভাবে সেদ্ধ করুন। এটি হজম সহজ করবে এবং পেটে গ্যাস হওয়া প্রতিরোধ করবে।

৫. ইসবগুলের ভূষি এবং অন্যান্য সুপারফুড

  • ইসবগুলের ভূষি (Psyllium Husk): এটি দ্রবনীয় ফাইবার বা Soluble fiber-এর অন্যতম উৎস। পানির সংস্পর্শে এলে এটি জেলের মতো পিচ্ছিল আকার ধারণ করে, যা মলত্যাগ যন্ত্রণাহীন করে তোলে। রাতে ঘুমানোর আগে বা সকালে খালি পেটে এক গ্লাস পানিতে ১ চামচ ইসবগুল মিশিয়ে পান করা পাইলস রোগীদের জন্য মহৌষধ।

  • তিসি (Flax Seeds): তিসিতে ওমেগা-৩ এবং ফাইবার থাকে, যা অন্ত্রের প্রদাহ বা জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করে।

৬. হাইড্রেশন বা পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ

কেবলমাত্র ফাইবার খেলে হবে না, ফাইবারের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রচুর পানি পান করতে হবে।

  • দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।

  • ফাইবার পানি শোষণ করে মল নরম করে। পানি কম খেলে ফাইবার উল্টো মল শক্ত করে ফেলতে পারে (Entity Paradox)।

  • পানির পাশাপাশি ডাবের পানি, ফলের রস (চিনি ছাড়া) এবং সুপ খাওয়া যেতে পারে।

পাইলস হলে কি খাওয়া যাবে না 

এমন কিছু খাবার আছে যা সরাসরি অন্ত্রের প্রদাহ তৈরি করে এবং মল শক্ত করে দেয়, যা পাইলসের ব্যথা বা রক্তপাত বাড়িয়ে দেয়। এই খাবারগুলোকে আমরা “Trigger Foods” বা উদ্দীপক খাবার বলি।

১. রেড মিট (Red Meat) এবং উচ্চ প্রোটিন

গরুর মাংস, খাসির মাংস বা মহিষের মাংসে কোনো ফাইবার থাকে না। এগুলো হজম হতে অনেক বেশি সময় নেয় এবং অন্ত্রে দীর্ঘক্ষণ থাকে, ফলে মল শক্ত হয়ে যায়। পাইলস বা ফিশার থাকলে রেড মিট খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

২. মসলাদার এবং ঝাল খাবার 

অতিরিক্ত ঝাল, যেমন—কাঁচা মরিচ, শুকনা মরিচের গুঁড়া বা অতিরিক্ত গরম মসলা দেওয়া খাবার পাইলসের শত্রুর মতো।

  • কারণ: ঝাল খাবার হজম হওয়ার পর মলাশয় বা পায়ুপথে যাওয়ার সময় মিউকাস মেমব্রেনে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। এটি পাইলসের চুলকানি ও ব্যথা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

৩. পরিশোধিত শর্করা 

সাদা চাল, ময়দা, বিস্কুট, কেক এবং পাউরুটি—এগুলোকে রিফাইন বা শোধন করার ফলে এগুলোর আঁশ নষ্ট হয়ে যায়। এই ধরনের Low-fiber foods খেলে পেট পরিষ্কার হয় না এবং মলের জন্য প্রচুর চাপ দিতে হয়।

৪. দুগ্ধজাত খাবার 

দুধ, পনির বা আইসক্রিম জাতীয় খাবার অনেকেরই হজম হয় না বা কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি করে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে দুধ এড়িয়ে চলা উচিত। তবে টক দই বা প্রোবায়োটিক খাওয়া যেতে পারে কারণ এটি অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখে।

৫. ক্যাফেইন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার

  • কফি এবং চা: অতিরিক্ত চা বা কফি পান করলে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায় (Diuretic effect), যা ডিহাইড্রেশন তৈরি করে এবং মল শক্ত করে।

  • ফাস্ট ফুড: চিপস, বার্গার, পিৎজা বা ভাজাপোড়া খাবারে পুষ্টি ও ফাইবার নেই বললেই চলে, যা পাইলসের অবস্থা শোচনীয় করে তোলে।

পাইলস রোগীর জন্য ১ দিনের নমুনা ডায়েট চার্ট 

প্রতিদিন কী খাবেন তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকলে নিচের তালিকাটি অনুসরণ করতে পারেন:

খাবারের সময় খাদ্য তালিকা উপকারিতা
সকাল (Breakfast) ১ বাটি ওটস / ২টি লাল আটার রুটি + সবজি ভাজি + ১টি পাকা পেঁপে। অদ্রবনীয় ফাইবার ও এনজাইম সকালে পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
মধ্যাহ্নভোজ (Lunch) ১ বাটি লাল চালের ভাত + ১ বাটি পাতলা ডাল + ১ পিস মাছ/মুরগির মাংস (চামড়া ছাড়া) + পালং শাক বা লাউ তরকারি। প্রোটিন ও ফাইবারের ভারসাম্য রক্ষা করে।
বিকাল (Snack) ১ গ্লাস ফলের জুস / ১টি আপেল / মুড়ি বা টোস্ট বিস্কুট (চিনি ছাড়া)। হালকা নাস্তা যা গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ করে।
রাতের খাবার (Dinner) নরম খিচুড়ি (সবজি ও ডাল দিয়ে) / ২টি রুটি + সবজি। ঘুমানোর আগে ১ গ্লাস ইসবগুলের ভূষি। রাতের খাবার হালকা হলে হজম সহজ হয় এবং সকালে কোষ্ঠকাঠিন্য হয় না।

এক নজরে: পাইলস হলে খাদ্য তালিকার সারসংক্ষেপ

দ্রুত মনে রাখার জন্য নিচের তালিকাটি মনে রাখুন:

  • অবশ্যই খাবেন: লাল চাল, ওটস, পাকা পেঁপে, লাউ, ইসবগুল, প্রচুর পানি, শাকসবজি, মাছ।

  • এড়িয়ে চলবেন: গরুর মাংস, খাসির মাংস, শুকনা মরিচ, ফাস্ট ফুড, সাদা ময়দার তৈরি খাবার, সফট ড্রিংকস।

উপসংহার

পাইলস বা অর্শ নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল চাবিকাঠি হলো মল নরম রাখা। আর এর জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার কোনো বিকল্প নেই। উপরে উল্লেখিত “পাইলস হলে কি খাওয়া যাবে এবং কি খাওয়া যাবে না” এর নির্দেশিকা মেনে চললে এবং উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে আপনি দীর্ঘস্থায়ী আরাম পাবেন। তবে, মলদ্বার দিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা তীব্র ব্যথা হলে ঘরোয়া ডায়েটের পাশাপাশি একজন বিশেষজ্ঞ কলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

Shopping Cart
Scroll to Top