পাইলস (Hemorrhoids) হলো মলদ্বার বা পায়ুপথের রক্তনালীর (Vascular cushions) স্ফীত ও প্রদাহজনিত অবস্থা। এটি কেবল একটি শারীরিক অস্বস্তি নয়; বরং সঠিক চিকিৎসার অভাবে এটি এনাল ফিশার, ফিস্টুলা বা অ্যানিমিয়ার মতো জটিল আকার ধারণ করতে পারে। “চিরতরে মুক্তি” বলতে উপসর্গ কমানোর পাশাপাশি মলদ্বারের গঠনগত ত্রুটি মেরামত এবং জীবনযাত্রার স্থায়ী পরিবর্তন বোঝায়।
Table of Contents
Toggleনিচে পাইলস নিরাময় এবং প্রতিরোধের ২০টি পরীক্ষিত উপায় ৪টি প্রধান ক্যাটাগরিতে (খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, ঘরোয়া চিকিৎসা, এবং আধুনিক সার্জারি) ভাগ করে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির ২০ টি কার্যকর উপায়
১. অদ্রবণীয় ও দ্রবণীয় ফাইবারের ভারসাম্য
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ৩০-৩৫ গ্রাম ফাইবার নিশ্চিত করুন।
Entity: Isabgol (Psyllium Husk), ওটস, এবং লাল চাল।
মেকানিজম: ফাইবার মলের ‘বাল্ক’ বা আয়তন বাড়ায় এবং পানি শোষণ করে মলকে জেল-এর মতো নরম করে, যা মলদ্বারে ঘর্ষণ (Friction) প্রতিরোধ করে।
২. ফ্ল্যাভোনয়েড সমৃদ্ধ খাবার
সাইট্রাস ফল (লেবু, কমলা) এবং গাঢ় রঙের সবজিতে বায়ো-ফ্ল্যাভোনয়েড (Bioflavonoids) থাকে।
মেকানিজম: এটি শিরা বা ভেইনের দেয়াল শক্তিশালী করে এবং ভেনাস টোন (Venous Tone) বৃদ্ধি করে, যা রক্তনালীর প্রসারণ ও রক্তপাত কমায়।
৩. পর্যাপ্ত হাইড্রেশন থেরাপি
ফাইবারের কার্যকারিতা পানির ওপর নির্ভরশীল। দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার পানি পান করা আবশ্যক।
সম্পর্ক: পানিশূন্যতা > শক্ত মল > মলত্যাগে চাপ > পাইলসের অবনতি। পানি কোলনের মিউকোসা পিচ্ছিল রাখতে সাহায্য করে।
৪. প্রোবায়োটিক বা অন্ত্রের বন্ধু ব্যাকটেরিয়া
টক দই বা ইয়োগার্ট নিয়মিত খাওয়া উচিত।
কারণ: এটি অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম (Gut Microbiome) এর ভারসাম্য রক্ষা করে এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
৫. প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অ্যালকোহল বর্জন
রেড মিট (গরু/খাসি), অতিরিক্ত ঝাল, ক্যাফেইন (কফি) এবং অ্যালকোহল ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা তৈরি করে এবং অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এগুলো পাইলসের ‘ট্রিগার ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করে।
৬. টয়লেটে স্কোয়াটিং পজিশন (Correct Anatomy)
হাই কমোডে বসার সময় পায়ের নিচে একটি ছোট টুল (Stool) ব্যবহার করুন।
মেকানিজম: এটি পা ও শরীরের মাঝে ৩৫-ডিগ্রি কোণ তৈরি করে, যা পিউবোরেকটালিজ পেশী (Puborectalis muscle) কে শিথিল করে এবং রেকটাল প্যাসেজ সোজা করে দেয়। ফলে চাপ ছাড়াই মলত্যাগ সম্ভব হয়।
৭. মলত্যাগে অতিরিক্ত চাপ (Straining) বর্জন
মলত্যাগের সময় দম বন্ধ করে চাপ দেবেন না। এটি পেটের অভ্যন্তরীণ চাপ বা Intra-abdominal pressure বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি মলদ্বারের শিরাগুলোকে ফুলিয়ে দেয়।
৮. ‘ডোন্ট ইগনোর দ্য আর্জ’ (The Gastrocolic Reflex)
মলত্যাগের বেগ আসার সাথে সাথেই বাথরুমে যাওয়া উচিত। দেরি করলে কোলন মলের পানি শুষে নেয় এবং মল পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায় (Fecal Impaction)।
৯. বাথরুমে সময়ের সীমাবদ্ধতা
টয়লেটে মোবাইল বা পেপার নিয়ে ৫-১০ মিনিটের বেশি বসে থাকবেন না। দীর্ঘক্ষণ বসার ফলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পায়ুপথের শিরায় রক্ত জমাট বাধে।
১০. ভেজা টিস্যু বা ওয়াটার স্প্রে ব্যবহার
শুষ্ক ও খসখসে টয়লেট পেপার ঘষলে পাইলসের ফোলা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরিবর্তে হালকা গরম পানি বা অ্যালকোহল-মুক্ত ময়েস্ট ওয়াইপস ব্যবহার করুন।
১১. সিটজ বাথ (Sitz Bath Hydrotherapy)
কুসুম গরম পানিতে (৪০°-৪৫° সে.) কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে ১০-১৫ মিনিট বসে থাকা। দিনে ৩-৪ বার এবং মলত্যাগের পরপর এটি করা উচিত।
Entity: Epsom Salt.
কাজ: এটি Internal Anal Sphincter রিলাক্স করে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং ব্যথা বা ফোলা তাৎক্ষণিক কমায়।
১২. বরফ বা কোল্ড কমপ্রেশন (Cryotherapy Logic)
প্রদাহ বা ফোলা খুব বেশি হলে বরফের প্যাক ১০ মিনিট আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে রাখা যেতে পারে। এটি সাময়িকভাবে স্নায়ু অবশ করে ব্যথা কমায় এবং রক্তনালী সংকুচিত করে।
১৩. প্রাকৃতিক অ্যাসট্রিনজেন্ট: উইচ হেজেল (Witch Hazel)
তুলায় ভিজিয়ে উইচ হেজেল বা বিশুদ্ধ অ্যালোভেরা জেল বাহ্যিক পাইলসে লাগান।
মেকানিজম: উইচ হেজেলে থাকা ‘ট্যানিন’ (Tannins) টিস্যু সংকুচিত করতে এবং চুলকানি কমাতে সাহায্য করে।
১৪. কেগেল বা পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ
মলদ্বারের পেশী ৫ সেকেন্ড সংকুচিত ও ৫ সেকেন্ড শিথিল করার ব্যায়াম।
উপকারিতা: এটি পেলভিক অঞ্চলের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে ভেনাস কনজেশন বা রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে।
১৫. আরামদায়ক পোশাক নির্বাচন
সিন্থেটিক ও টাইট অন্তর্বাসের পরিবর্তে সুতির ঢিলেঢালা অন্তর্বাস পরুন। এটি বাতাস চলাচল নিশ্চিত করে এবং স্যাঁতস্যাঁতে ভাব বা ঘর্ষণজনিত ক্ষত প্রতিরোধ করে।
১৬. ওটিসি (OTC) ক্রিম এবং সাপোজিটরি
ডাক্তারের পরামর্শে হাইড্রোকার্টিসোন (Hydrocortisone) যুক্ত ক্রিম বা লিডোকেইন (Lidocaine) মলম ব্যবহার।
ব্যবহার: তীব্র ব্যথা, জ্বালাপোড়া এবং প্রদাহ কমাতে এটি স্বল্পমেয়াদী সমাধান।
১৭. ভেনোটনিক ওষুধ
Entity: Diosmin + Hesperidin (Daflon 500/1000mg).
কাজ: এই ওষুধগুলো শিরার ইলাস্টিসিটি বা স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়, লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ উন্নত করে এবং একিউট অ্যাটাক নিয়ন্ত্রণে আনে।
১৮. রাবার ব্যান্ড লাইগেশন
গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পাইলসের জন্য এটি একটি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড Non-surgical procedure।
প্রক্রিয়া: পাইলসের গোড়ায় একটি রাবার ব্যান্ড পরিয়ে দেওয়া হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে ১ সপ্তাহের মধ্যে পাইলসটি শুকিয়ে ঝরে পড়ে। এটি ব্যথাহীন এবং হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই।
১৯. লেজার সার্জারি
গ্রেড-২ ও গ্রেড-৩ পাইলসের জন্য সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতি।
প্রযুক্তি: লেজার ফাইবার ব্যবহার করে পাইলসের ভেতরে তাপ প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে পাইলস টিস্যু সংকুচিত বা Vaporize হয়ে যায়।
সুবিধা: রক্তপাতহীন, কাঁটাছেঁড়া নেই, দ্রুত কাজে ফেরা যায় এবং মলদ্বারের স্ফিংকটার পেশী অক্ষত থাকে।
২০. স্ট্যাপলড হ্যামোরয়েডোপেক্সি
প্রলাপসড বা মলদ্বারের বাইরে ঝুলে পড়া (গ্রেড-৩ ও ৪) পাইলসের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর।
প্রক্রিয়া: একটি বিশেষ স্ট্যাপলার গান ব্যবহার করে ঝুলে পড়া টিস্যুকে কেটে সঠিক স্থানে বসানো হয় এবং রক্ত সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এটি প্রথাগত ওপেন সার্জারির (Hemorrhoidectomy) তুলনায় অনেক কম যন্ত্রণাদায়ক এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।
উপসংহার
পাইলস বা অর্শ রোগের স্থায়ী সমাধান একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। ‘খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা পরিবর্তন’ (১-১০ নং উপায়) রোগ প্রতিরোধ করে, ‘ঘরোয়া পদ্ধতি ও ওষুধ’ (১১-১৭ নং উপায়) রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখে, এবং ‘আধুনিক পদ্ধতিসমূহ’ (১৮-২০ নং উপায়) জটিল ও পুরনো পাইলস নির্মূল করে।
যদি মলের সাথে কালচে রক্ত যায় বা অসহ্য ব্যথা হয়, তবে কালক্ষেপণ না করে একজন বিশেষজ্ঞ কোলোরেক্টাল সার্জন (Colorectal Surgeon)-এর পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণই আপনাকে এই যন্ত্রণাদায়ক রোগ থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে পারে।
