আপনি কি প্রায়ই হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করেন? রাতে পায়ে খিঁচুনি হয়? নখ ভেঙে যায় বা চুল পড়ে? এই সমস্যাগুলোর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি। বাংলাদেশে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬৫% নারী এবং ৪৫% পুরুষ পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ করেন না।
ক্যালসিয়াম শুধু হাড় মজবুত রাখে না এটি হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে, স্নায়ু সংকেত পাঠায় এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। অথচ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সঠিক ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।
এই গাইডে আমরা আলোচনা করব কোন খাবারে সবচেয়ে বেশি ক্যালসিয়াম আছে, বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী দৈনিক চাহিদা কত, কীভাবে ক্যালসিয়াম শোষণ বাড়ানো যায় এবং শাকাহারীদের জন্য সেরা বিকল্পগুলো কী। আসুন বিস্তারিত জানি।
ক্যালসিয়াম কী এবং শরীরে এর ভূমিকা কী?
ক্যালসিয়াম (Calcium) একটি অপরিহার্য খনিজ পদার্থ যা মানব শরীরে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। National Institutes of Health (NIH)-এর তথ্য অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রায় ১ কেজি ক্যালসিয়াম থাকে, যার ৯৯% হাড় ও দাঁতে সঞ্চিত থাকে এবং বাকি ১% রক্ত, পেশি ও কোষে থাকে।
শরীরে ক্যালসিয়ামের মূল কাজসমূহ
- হাড় ও দাঁত গঠন এবং ঘনত্ব (Bone Density) বজায় রাখা
- হৃৎপিণ্ডের পেশির সংকোচন ও শিথিলায়ন নিয়ন্ত্রণ
- স্নায়ুতন্ত্রের বার্তা পরিবহন (Neurotransmission) সহায়তা
- রক্ত জমাট বাঁধার (Blood Coagulation) প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ
- হরমোন নিঃসরণ ও এনজাইম কার্যক্রম পরিচালনা
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা (গবেষণায় প্রমাণিত)
গবেষণায় দেখা গেছে যে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে এই সম্পর্ক এখনও গবেষণাধীন।
বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদা
প্রতিটি মানুষের ক্যালসিয়ামের চাহিদা একই রকম নয়। WHO এবং NIH-এর সর্বশেষ গাইডলাইন (২০২৪) অনুযায়ী দৈনিক চাহিদার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| বয়সগোষ্ঠী |
পুরুষ (mg/দিন) |
নারী (mg/দিন) |
| ০–৬ মাস |
২০০ |
২০০ |
| ৭–১২ মাস |
২৬০ |
২৬০ |
| ১–৩ বছর |
৭০০ |
৭০০ |
| ৪–৮ বছর |
১০০০ |
১০০০ |
| ৯–১৮ বছর |
১৩০০ |
১৩০০ |
| ১৯–৫০ বছর |
১০০০ |
১০০০ |
| ৫১–৭০ বছর |
১০০০ |
১২০০ |
| ৭০+ বছর |
১২০০ |
১২০০ |
| গর্ভবতী/স্তন্যদায়ী মা |
— |
১০০০–১৩০০ |
সূত্র: National Institutes of Health (NIH), Office of Dietary Supplements, 2024
সেরা ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবারের তালিকা
খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়াম নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া। নিচে প্রতিটি বিভাগে সেরা উৎসগুলো দেওয়া হলো:
দুগ্ধজাত খাবার (Dairy Products)
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়ামের সর্বোত্তম প্রাকৃতিক উৎস কারণ এগুলো শরীরে সহজে শোষিত হয়।
- গরুর দুধ (১ কাপ/২৪০ মিলি): ২৭৬–৩০০ mg ক্যালসিয়াম দৈনিক চাহিদার প্রায় ৩০%
- দই/টক দই (১ কাপ): ২৭৫–৪০০ mg প্রোবায়োটিকসহ হজমেও সহায়ক
- পনির/চিজ (৩০ গ্রাম): ২০০–২৫০ mg উচ্চ ক্যালোরি সম্পর্কে সচেতন থাকুন
- ছানা (১০০ গ্রাম): ১৫০–২০০ mg বাড়িতে তৈরি ছানা সর্বোত্তম
- মাখন দুধ/ঘোল (১ কাপ): ২৮৪ mg কম চর্বিতে উচ্চ ক্যালসিয়াম
সবুজ শাকসবজি (Green Vegetables)
শাকাহারীদের জন্য সবুজ শাকসবজি ক্যালসিয়ামের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে কিছু শাকে অক্সালেট থাকে যা ক্যালসিয়াম শোষণ কমায় — এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
- কাঁচা সরিষা শাক (১ কাপ রান্না): ১৬৫ mg ক্যালসিয়াম — অক্সালেট কম, শোষণ ভালো
- পালং শাক (১ কাপ রান্না): ২৪৫ mg — তবে অক্সালেট বেশি থাকায় শোষণ মাত্র ৫%
- কলমি শাক (১ কাপ রান্না): ১২০ mg — বাংলাদেশে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী
- মেথি শাক (১ কাপ রান্না): ২১৫ mg — ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও উপকারী
- ব্রকলি (১ কাপ রান্না): ৬২ mg — ক্যালসিয়াম শোষণের হার ৬১%, পালংয়ের চেয়ে বেশি
- বাঁধাকপি (১ কাপ কাঁচা): ৩৫ mg — কম অক্সালেট, ভালো শোষণযোগ্যতা
মাছ ও সামুদ্রিক খাবার (Fish & Seafood)
কাঁটাসহ ছোট মাছ ক্যালসিয়ামের অসাধারণ উৎস — এটি বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির একটি বড় সুবিধা যা অনেক দেশে নেই।
- ছোট মাছ (মলা, কাচকি, ধেলা) — ১০০ গ্রামে ৪৭৫–৬৫০ mg ক্যালসিয়াম (কাঁটাসহ)
- সার্ডিন মাছ (ক্যানজাত, কাঁটাসহ) — ৩৫৫ mg প্রতি ৮৫ গ্রামে
- স্যালমন মাছ (ক্যানজাত, কাঁটাসহ) — ২৩২ mg প্রতি ৮৫ গ্রামে
- চিংড়ি (১০০ গ্রাম) — ৭০–১০০ mg ক্যালসিয়াম
- শুটকি মাছ (ছোট, ১০০ গ্রাম) — ১৫০০ mg পর্যন্ত ক্যালসিয়াম — অত্যন্ত ঘনীভূত উৎস
বাংলাদেশের ছোট মাছ (মলা, কাচকি) বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ক্যালসিয়াম উৎসগুলোর মধ্যে একটি। FAO (Food and Agriculture Organization)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, এই ছোট মাছগুলো দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র পরিবারের ক্যালসিয়াম ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাদাম ও বীজ (Nuts & Seeds)
- তিল (Sesame Seeds) — ১ টেবিলচামচে ৮৮ mg; ১০০ গ্রামে ৯৭৫ mg — ক্যালসিয়ামের পাওয়ারহাউস
- চিয়া সিড — ২ টেবিলচামচে ১৭৯ mg ক্যালসিয়াম + ওমেগা-৩
- আমন্ড/কাঠবাদাম — ১ কাপে ৩৮৫ mg; প্রতিদিন মুঠোভর (২৩টি) খান
- হেজেলনাট (Hazelnut) — ১০০ গ্রামে ১১৪ mg
- পেস্তা — ১০০ গ্রামে ১০৫ mg ক্যালসিয়াম
ডাল ও শিম জাতীয় খাবার (Legumes)
- সয়াবিন (১ কাপ রান্না): ১৭৫ mg ক্যালসিয়াম
- সয়া দুধ (১ কাপ): ২৫০–৩০০ mg (ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ)
- টফু (১০০ গ্রাম): ৩৫০ mg — বিশেষত ক্যালসিয়াম সালফেট দিয়ে তৈরি
- কালো মটর/ছোলা (১ কাপ রান্না): ৮০ mg
- মসুর ডাল (১ কাপ রান্না): ৩৭ mg
- এডামামে (১ কাপ): ৯৮ mg
ফোর্টিফাইড খাবার (Fortified Foods)
বর্তমানে বাজারে অনেক খাবারে কৃত্রিমভাবে ক্যালসিয়াম যোগ করা হয়। এগুলো সহজলভ্য ও কার্যকর বিকল্প।
- ফোর্টিফাইড সিরিয়াল — প্রতি পরিবেশনে ১০০–১০০০ mg (লেবেল দেখুন)
- ফোর্টিফাইড কমলার রস — ১ কাপে ৩০০ mg
- ফোর্টিফাইড ওটমিল — ১৮৫ mg প্রতি প্যাকেটে
- ফোর্টিফাইড সয়া/বাদামের দুধ — ২০০–৪৫০ mg প্রতি কাপে
ক্যালসিয়াম শোষণ বাড়ানোর উপায়
শুধু ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার খেলেই হবে না — শরীর কতটুকু ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারছে সেটাই আসল কথা। এই বিষয়টি অনেকে জানেন না, কিন্তু এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যালসিয়াম শোষণ বাড়ায় যেসব উপাদান
- ভিটামিন ডি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন ডি ছাড়া ক্যালসিয়াম শোষণ ৩০-৪০% কমে যায়। সকালের রোদ (১০-১৫ মিনিট) এবং স্যালমন মাছ, ডিমের কুসুম থেকে পাওয়া যায়।
- ভিটামিন কে-২: হাড়ে ক্যালসিয়াম নির্দেশ করে — নাটো (Natto), গাঁজানো খাবার ও পনিরে পাওয়া যায়।
- ম্যাগনেশিয়াম: ক্যালসিয়াম বিপাকের সহায়ক। বাদাম, কলা, সবুজ শাকে প্রচুর পরিমাণে আছে।
- ল্যাকটোজ: দুধের চিনি ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে — দুধ পানে শোষণহার বেশি হয়।
- অ্যাসিডিক পরিবেশ: পেটে পর্যাপ্ত অ্যাসিড থাকলে ক্যালসিয়াম ভালো শোষিত হয়।
ক্যালসিয়াম শোষণ কমায় যেসব উপাদান
- অক্সালেট: পালং শাক, চকলেট, বাদামে — এগুলো ক্যালসিয়াম আটকে রাখে। পালং শাক রান্না করলে অক্সালেট কমে।
- ফাইটেট: গমের ভুসি ও কাঁচা শস্যে — ভিজিয়ে বা গাঁজিয়ে রান্না করলে কমে।
- অতিরিক্ত সোডিয়াম: বেশি লবণ প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম বের করে দেয়।
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন: দিনে ৪+ কাপ কফি ক্যালসিয়াম নির্গমন বাড়ায়।
- কোলা/সফট ড্রিংক: ফসফরিক অ্যাসিড ক্যালসিয়াম ব্যালেন্স নষ্ট করে।
- প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (PPI) ওষুধ: দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে ক্যালসিয়াম শোষণ কমে।
গবেষণা-ভিত্তিক অনন্য তথ্য: Harvard Medical School-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এককালীন ৫০০ mg-এর বেশি ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নিলে শোষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তাই একসাথে না খেয়ে সারাদিনে ভাগ করে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত।
ক্যালসিয়াম ঘাটতির লক্ষণ ও পরিণতি
ক্যালসিয়ামের অভাব বা হাইপোক্যালসেমিয়া (Hypocalcemia) ধীরে ধীরে শরীরে জমা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক সমস্যা তৈরি করে।
প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
- হাত-পা অসাড় হয়ে যাওয়া বা ঝিঁঝিঁ অনুভব (Tingling/Numbness)
- রাতে পায়ের পেশিতে খিঁচুনি (Nocturnal Leg Cramps)
- নখ ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে যাওয়া
- চুল পড়া ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- অবসাদ ও দুর্বলতা
- দাঁত ক্ষয় ও মাড়ির সমস্যা
দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি
- অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis): হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া — বিশেষত মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের ঝুঁকি সর্বোচ্চ
- অস্টিওম্যালাসিয়া: হাড় নরম হয়ে বাঁকা হয়ে যাওয়া
- উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- শিশুদের রিকেটস (Rickets): বিকৃত হাড়ের বৃদ্ধি
- খিঁচুনি (Tetany বা Seizure) — গুরুতর ক্ষেত্রে
বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য ক্যালসিয়াম পরামর্শ
গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মায়েরা
গর্ভাবস্থায় শিশুর হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য প্রতিদিন ১০০০–১৩০০ mg ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত না পেলে মায়ের হাড় থেকে ক্যালসিয়াম নিয়ে শিশুর চাহিদা পূরণ হয়, যা মায়ের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। গর্ভবতী মায়েদের উচিত প্রতি বেলায় দুধ বা দই, ছোট মাছ ও সবুজ শাক রাখা।
শিশু ও কিশোর-কিশোরী (৯-১৮ বছর)
এই বয়সে সর্বোচ্চ হাড়ের ভর (Peak Bone Mass) তৈরি হয়। ৯-১৮ বছর বয়সে প্রতিদিন ১৩০০ mg ক্যালসিয়াম প্রয়োজন — এটি জীবনের সবচেয়ে বেশি চাহিদার সময়। এই সময়ে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম না পেলে ৪০ বছর পর অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
বয়স্ক ব্যক্তি (৫০+ বছর)
বয়স বাড়লে ক্যালসিয়াম শোষণের ক্ষমতা কমে এবং হাড়ের ঘনত্ব (Bone Density) হ্রাস পায়। ৫০ বছরের পর নারীদের ১২০০ mg ক্যালসিয়াম দরকার। ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট সাধারণত প্রয়োজন হয়। নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম হাড় শক্ত রাখতে সহায়তা করে।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু ব্যক্তি
দুধ হজম হয় না? তাহলে এই বিকল্পগুলো বেছে নিন:
- ল্যাকটোজ-মুক্ত দুধ (Lactose-free Milk)
- দই ও পনির — এগুলোতে ল্যাকটোজ কম থাকে
- ফোর্টিফাইড সয়া বা বাদামের দুধ
- তিল, কাঠবাদাম ও ছোট মাছ বেশি করে খান
- ক্যালসিয়াম সাইট্রেট সাপ্লিমেন্ট (খালি পেটেও কাজ করে)
একদিনে ১০০০ mg ক্যালসিয়াম পাওয়ার সহজ খাদ্যতালিকা
নিচে একটি বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী দৈনিক খাদ্যতালিকা দেওয়া হলো যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনুসরণযোগ্য:
| বেলা |
খাবার |
ক্যালসিয়াম |
| সকালের নাস্তা |
১ গ্লাস দুধ + ডিম সেদ্ধ + তিল মাখানো রুটি |
~৩৫০ mg |
| দুপুরের খাবার |
ভাত + মলা মাছের ঝোল + পালং বা মেথি শাক ভাজি |
~৩৫০ mg |
| বিকালের নাস্তা |
১ মুঠো কাঠবাদাম + ১ কাপ দই |
~১৮০ mg |
| রাতের খাবার |
ভাত + সবজি + সার্ডিন বা যেকোনো ছোট মাছ |
~২০০ mg |
| মোট |
|
~১০৮০ mg ✓ |
ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট
খাবার থেকে ক্যালসিয়াম পাওয়াই সর্বোত্তম। তবে কিছু ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে। বাজারে দুই ধরনের ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যায়:
ক্যালসিয়াম কার্বোনেট বনাম ক্যালসিয়াম সাইট্রেট
| বৈশিষ্ট্য |
ক্যালসিয়াম কার্বোনেট |
ক্যালসিয়াম সাইট্রেট |
| ক্যালসিয়াম পরিমাণ |
৪০% এলিমেন্টাল |
২১% এলিমেন্টাল |
| কখন খাবেন |
খাবারের সাথে |
যেকোনো সময় |
| হজমের প্রয়োজন |
পেটে অ্যাসিড দরকার |
অ্যাসিড ছাড়াও কাজ করে |
| উপযুক্ত কে |
সুস্থ পাকস্থলীর জন্য |
বয়স্ক, PPI ব্যবহারকারী |
| দাম |
সাশ্রয়ী |
তুলনামূলক বেশি |
সতর্কতা: অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট কিডনিতে পাথর ও কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সাপ্লিমেন্ট নেবেন না।
ক্যালসিয়াম গ্রহণে সাধারণ ভুল — সতর্ক থাকুন
- একসাথে ৫০০ mg-এর বেশি ক্যালসিয়াম না খাওয়া — বিভক্ত করে সারাদিনে নিন
- আয়রন সাপ্লিমেন্টের সাথে একসাথে না নেওয়া — দুটো একসাথে খেলে দুটোরই শোষণ কমে
- শুধু সাপ্লিমেন্টের উপর নির্ভর না করে খাবার থেকে ক্যালসিয়াম নেওয়ার চেষ্টা করুন
- পালং শাক বেশি খেলেই ক্যালসিয়াম বেশি পাবেন — এটি ভুল ধারণা (অক্সালেটের কারণে শোষণ কম)
- ভিটামিন ডি ছাড়া ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নেওয়া — একসাথে না নিলে উপকার কম
- দুধ না খেলে ক্যালসিয়াম পাওয়া যাবে না — এটি মিথ; অনেক উদ্ভিদ উৎসে প্রচুর ক্যালসিয়াম আছে
উপসংহার
ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার গ্রহণ কোনো জটিল বিষয় নয় — সঠিক জ্ঞান থাকলে প্রতিদিনের সাধারণ খাদ্যতালিকা থেকেই শরীরের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। দুধ, দই, ছোট মাছ, তিল, বাদাম ও সবুজ শাক নিয়মিত খান। ভিটামিন ডি-র জন্য প্রতিদিন সকালে ১০-১৫ মিনিট রোদে থাকুন।
আজই আপনার পরিবারের খাদ্যতালিকা পর্যালোচনা করুন। প্রতিদিনের প্রতিটি বেলায় অন্তত একটি ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিশেষ সমস্যা থাকলে একজন পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: কোন খাবারে সবচেয়ে বেশি ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়?
উত্তর: শুটকি মাছ (১০০ গ্রামে ১৫০০ mg পর্যন্ত), তিল (১০০ গ্রামে ৯৭৫ mg) এবং পনির (১০০ গ্রামে ৭০০+ mg) সর্বোচ্চ ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবারের মধ্যে পড়ে। তবে দৈনন্দিন জীবনে দুধ, দই ও ছোট মাছ সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উৎস।
প্রশ্ন ২: রাতে দুধ পান করলে কি বেশি উপকার পাওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে রাতে ক্যালসিয়াম গ্রহণ বেশি কার্যকর হতে পারে, কারণ হাড়ের পুনর্গঠন (Bone Remodeling) রাতে বেশি হয়। তবে সারাদিনে ভাগ করে নেওয়াই সর্বোত্তম।
প্রশ্ন ৩: শিশুদের জন্য কোন ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার সবচেয়ে উপকারী?
উত্তর: শিশুদের জন্য দুধ, দই, ছোট মাছের ঝোল ও মেথি শাক সর্বোত্তম। ১-৩ বছর বয়সে প্রতিদিন ৭০০ mg ক্যালসিয়াম দরকার। শিশুকে কাচকি বা মলা মাছের ঝোল দেওয়া খুবই উপকারী।
প্রশ্ন ৪: ভেগান বা শাকাহারীরা কীভাবে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম পাবেন?
উত্তর: ভেগানদের জন্য তিল, চিয়া সিড, কাঠবাদাম, টফু, সয়া দুধ, ফোর্টিফাইড উদ্ভিদ দুধ এবং সবুজ শাকসবজি (বিশেষত মেথি, কলমি, ব্রকলি) সেরা উৎস। প্রতিদিন বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার নিশ্চিত করলে ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
প্রশ্ন ৫: ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়?
উত্তর: কিছু গবেষণায় (বিশেষত ২০১৬ সালের JAMA Internal Medicine গবেষণায়) দেখা গেছে যে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট হার্টের ধমনীতে ক্যালসিয়াম জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে খাবার থেকে প্রাকৃতিক ক্যালসিয়াম এই ঝুঁকি তৈরি করে না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত নয়।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)